Sarat Chandra Pandit
কলেরা তখন মাঝে মাঝেই মহামারির আকার নিত। একবার তেমনটাই হল মুর্শিদাবাদের দফরপুর গ্রামে। মৃতের সংখ্যা ৯০ ছুঁইছুঁই। গ্রামের মাতব্বর হরিপ্রসাদ চাটুজ্যে এহেন অবস্থায় আয়োজন করলেন হরি সংকীর্তনের। ওলাওঠার প্রকোপ যদি কমে! হরিনাম সংকীর্তন হল, তবে তার থেকেও বেশি হল ওই হরিনাম সংকীর্তনের প্যারোডি।—
“ভাই হরিবল দুই বাহু তুলে।
শমন-দমন যাতে হবে রে!
রাজার যে রাজ্যপাট
যেন নাটুয়ার নাট, ভাই রে,
দেখিতে দেখিতে কিছু নাই রে।
ভাই হরিবল দুই বাহু তুলে…”
হরিনাম করে কলেরা কমানোর চেষ্টাকে তীব্র চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণ! ধন্য ধন্য রব উঠল প্যারোডি গায়কের নামে। গায়ক হলেন শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। তবে, গ্রামব্যাপী সকলে তাঁকে চেনেন দাদাঠাকুর নামে। শুধু দফরপুর নয়, গোটা বাংলাতেও আজ তিনি এই নামে খ্যাত।
দাদাঠাকুরের জন্ম ১৮৮১ সালের ২৭ এপ্রিল, বীরভূমে। তবে শৈশব থেকে কর্মজীবন মুর্শিদাবাদে। অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারান। চলে আসেন দফরপুরে, কাকা রসিকলালের কাছে। বাল্যকাল থেকেই পড়াশোনায় তুখোড়, পাশাপাশি শান দিতেন ছড়া ও গানে। সেই সব ছড়া আর গান একদিকে যেমন রসবোধে ভরপুর, অন্যদিকে তেমনই তীব্র শ্লেষাত্মক।
বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, তিন ভাষাতেই ছিল তাঁর সমান দক্ষতা। মাত্র তেইশ বছর বয়সে উপার্জনের তাগিদে প্রেসের ব্যবসা শুরু করেন— পণ্ডিত প্রেস। সেই প্রেস থেকে প্রথমে প্রকাশিত হয় ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’ সাপ্তাহিক পত্রিকা। তার কিছুকাল পরে ‘বিদূষক’। এই ‘বিদূষক’ পত্রিকাই তাঁকে বাংলা সাহিত্যে ও সাংস্কৃতিক জগতে আজও অবিস্মরণীয় করে তোলে।
‘বিদূষক’- এর প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদও ছিল বেশ আকর্ষণীয়। এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের ব্যঙ্গচিত্র, কপালে লেখা ‘দুঃখ’ আর পেটের উপর লেখা ‘উদররে তুহু মোর বড়ি দুশমন’। স্পষ্টতই, দু-বেলা দু-মুঠো খাবার জোগাড় করার জন্যই পত্রিকা ছাপা শুরু— সে কথাই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন প্রচ্ছদে। সম্পাদক থেকে বিক্রেতা, সব ভূমিকাতেই ছিলেন দাদাঠাকুর নিজে। ছাপা হয়ে গেলেই পত্রিকার বাণ্ডিল নিয়ে চলে আসতেন কলকাতা। ফুটপাতে ফেরি করে বেড়াতেন সারাদিন। সে-ই নিয়েও রয়েছে প্যারোডি—
ভিডিও: বাংলা কথাসাহিত্যের হীরে-‘মানিক’ – জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
“জন্ম আমার জঘন্য স্থান পল্লীগ্রামের জঙ্গলে,
দেশের মঙ্গল যেমন তেমন নিজের পেটের মঙ্গলে,
আজ রাত্তিরে ভরে রাখি, খালি আবার কালকে তা,
পেটের জ্বালায় ‘বিদূষক’ চলে এলেন কলকাতা”
আমৃত্যু দাদাঠাকুর লড়াই করেছেন দারিদ্রের সঙ্গে। কত লোকে কতবার যে অর্থসাহায্য করতে চেয়েছে! নেননি, সবিনয়ে ফিরিয়েছেন। প্রয়োজনের চেয়ে একটি পয়সাও বেশি খরচ করতেন না ‘বোতল পুরাণ’ রচয়িতা।
কলকাতা কর্পোরেশনে তখন মুখ্য নির্বাহী আধিকারিক সুভাষচন্দ্র বসু। পুলিশের ঝামেলা থেকে দাদাঠাকুরকে বাঁচাতে নিজের খরচে লাইসেন্স বানিয়ে দেন। সেই একবারই অর্থ সাহায্য নিয়েছিলেন। কারণ, লাইসেন্সের চার টাকা ছ’আনা দেওয়ার মতো সামর্থ্যও ছিল না তখন।
সারাজীবন খালি পায়েই চষে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে শহর। ছোটবেলায় একবার কাকার কাছে জুতোর আবদার করেছিলেন। কিন্তু সে আবদার পূরণ হয়নি। তারপর থেকেই ‘জুতোস্থ’র বদলে ‘পদস্থ’ থাকার সিদ্ধান্ত। রসিকতা করে বলতেন— বাগদাদের রাজারা খালিফা আর তিনি হলেন ‘খালি পা’।
জুতো অবশ্য সামান্য বস্তু। লালগোলার মহারাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ রায় তাঁকে ভাল প্রেস তৈরির জন্য পঁচিশ হাজার টাকা দিতে চাইলেন একবার। সেই যুগে এই অঙ্কের টাকা রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো। সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন সেই অর্থও। জিজ্ঞেস করলে বলতেন— ‘যত অভাবই থাক, মানুষের ঠিক চলে যায়।’
ভিডিও: মুক্তারামের রামকথা – জন্মদিনে শিবরাম
পত্রিকার সূত্রে বন্ধুত্ব হয় কাজী নজরুল ইসলাম, বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র, শিশির কুমার ভাদুড়ী, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, জহর রায়ের মতো তাবড় তাবড় ব্যক্তিত্বর সঙ্গে। পরের দিকে বেতারে ‘ছোটদের বৈঠক’ ও ‘পল্লীমঙ্গল’ অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিতেন। ‘আত্মঘাতী দেবশর্মা’ ছদ্মনামে তাঁর ‘কলকাতার ভুল’ ও ‘কলকাতার খেদ’ গান দুটির রেকর্ডও জনপ্রিয় হয়েছিল। নলিনীকান্ত সরকারের কণ্ঠে ‘কলকাতার ভুল’ গানটি শুনে প্রশংসা করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
হাস্যরসের আড়ালে বারবার তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে তীব্র শ্লেষ। ভোটের মরসুমে ‘ভোট ভিখারি’দেরও ছেড়ে কথা বলেননি দাদাঠাকুর। তখন বঙ্গীয় আইন পরিষদের ভোটে বেশ ভাল ফল করছে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য দল। একবার ভোটে ক্যানভাসিংয়ের বহর দেখে লিখেই ফেললেন ‘ভোটামৃত’। ১৩৩০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত পত্রিকায় দেখা গেল শ্লেষাত্মক দুটি কবিতাও। কিছু লাইন তার এরকম—
কোন গাঁয়ে তুই ভোট ভিখারি,
কোন গাঁয়ে তোর ঘর?
ভোট নিবি তো গোটাকত
কথার জবাব কর
এবার নূতন নামলি না তুই
আর একবারও ছিলি
ছিলি যদি বল না দেশের
কি ফয়দা করিলি?
প্রবল দারিদ্র্যে আধপেটা খেয়েও থেকেছেন কোনও কোনও দিন, কিন্তু অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেননি কখনও। নির্দ্বিধায় বলতেন— ‘it’s better to starve than serve’। যতদিন ‘ভোট ভিখারি’রা কথার ফুলঝুরি ছোটাবেন, নানাবিধ রঙ্গ করে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাবেন; ততদিন সদর্পে বেঁচে থাকবে দাদাঠাকুরের ‘ভোটামৃত’ ও ভোটের প্যারোডি।
হাস্যরসে মাতিয়েও, আয়না দেখানোর কারিগর দাদাঠাকুরকে তাঁর জন্মবার্ষিকীতে বাংলালাইভের শ্রদ্ধার্ঘ্য।