Girish Karnad
১৯৭১ সাল। টমাস মানের দ্য ট্রান্সপোজড হেডসর উপন্যাসিকার পুনঃনির্মাণ করে কন্নড় ভাষায় রচিত হল এক নাটক। এগারো শতকের কথাসরিৎসাগরের অনুসরণে নাটকটিকে দেশজ করে তুললেন নাট্যকার। নাটকটির প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এক নতুন যুগের সূচনা হল ভারতীয় নাট্যজগতে। নাটকটির নাম ‘হয়বদন’, এবং সেই নাট্যকার আর কেউ নন গিরিশ রঘুনাথ কারনাড!
১৯৩৮ সালের ১৯মে মহারাষ্ট্রের মাথেরানে আদি ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম। কিছুদিনের মধ্যে গিরিশের বাবা বদলি হয়ে যান শিরসিতে। ছেলেবেলা কাটে কোম্পানি নাটক আর পার্সি থিয়েটার দেখে। এসবের মাঝেই স্নাতক অবধি পড়াশোনা শেষ করা এবং কবিতার প্রেমে পড়া। রাশিবিজ্ঞান ও গণিত ছেড়ে, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করতে রোডস স্কলার হয়ে পাড়ি জমালেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইতোমধ্যে, মাত্র তেইশ বছর বয়সেই লিখে ফেলেছেন তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের নাটক ‘যযাতি’।
ভিডিও: বাংলা কথাসাহিত্যের হীরে-‘মানিক’ – জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
এরপর লন্ডনে বসে লিখলেন ‘অঞ্জুমাল্লিগে’, যার বাংলা নাম ‘যামিনী’। ১৯৬৪ সালে নেহরুর মৃত্যুর পর মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে লিখলেন তাঁর কালজয়ী নাটক ‘তুঘলক’। এই নাটকটিকে তাঁর সর্বাধিক পরিচিত এবং অভিনীত নাটক বলে মনে করা হয়। সেই থেকেই শুরু বিতর্ক। জরুরি অবস্থার সময় গিরিশের এই নাটক নিষিদ্ধও করে দেওয়া হয়। এরপর, বাদল সরকারের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ অনুবাদ শুরু করেন ৬০-এর দশকের শেষে। গিরিশ নিজেই বলেছেন, তাঁর নাট্য রচনার নতুন পর্ব শুরু হয়েছিল এই সময় থেকেই।
কলকাতার বুকে কয়েকটি নাট্যদল মিলিতভাবে শ্যামানন্দ জালানের নির্দেশনায় তাঁর ‘তুঘলক’ নাটকটি মঞ্চস্থ করে। তুঘলকের ভূমিকায় অভিনয় করেন স্বয়ং শম্ভু মিত্র, মঞ্চ পরিকল্পনায় ছিলেন খালেদ চৌধুরী এবং আলোকপ্রক্ষেপণে তাপস সেন। বাংলায় যখন তুঘলকের প্রথম অভিনয় চলছে, তখনই গিরিশ লিখছেন হয়বদন। ১৯৭৪ সালে তাঁর করা বাদল সরকারের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকের অনুবাদ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে। ১৯৮৮-তে লেখেন আরও একটি বিখ্যাত নাটক ‘নাগমণ্ডল’ এবং ১৯৯০-তে মণ্ডল কমিশন ও বাবরি মসজিদ নিয়ে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে লেখেন ‘তালেদণ্ড’।
ভিডিও: সহজিয়া সুরের অমর গানওয়ালা – অমর পাল
নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গেও ছিল তাঁর নিবিড় যোগ। ১৯৭০-এ মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সংস্কার’ গিরিশ কারনাডের লিখিত ও অভিনীত প্রথম ছবি। একে একে ‘নিশান্ত’, ‘মন্থন’, ‘স্বামী’, ‘পুকার’ থেকে শুরু করে ‘ইকবাল’-এর মতো ছবিতে তাঁর কাজ মুগ্ধ করে দর্শকদের। হিন্দি ছাড়া আরও কয়েকটি ভাষায় অভিনয় করেছেন তিনি, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হিসাবেও কাজ করেছেন বেশ কয়েকটি ছবিতে। এছাড়া, জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘মালগুড়ি ডেজ’-এও অভিনয় করেছিলেন।
দীর্ঘ সৃষ্টিশীল জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত করেছে। ১৯৮৮ সালে পেয়েছেন জ্ঞানপীঠ। এছাড়াও, পেয়েছেন চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কার, চার বার ফিল্মফেয়ারও জিতেছেন তিনি। সামলেছেন পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটের ডিরেক্টর ও সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি-র চেয়ারম্যানের মতো গুরুদায়িত্ব। চার দশকের শিল্পীজীবনে তাঁর লেখা অসংখ্য নাটক, চিত্রনাট্য, অনুবাদ বা কন্নড় ও বলিউডি চলচ্চিত্রে নির্দেশনা এবং অভিনয়ের কথা মাথায় রেখেই বলা যায়, আজকের এই বিভেদকামী, সাম্প্রদায়িকতায় জীর্ণ সমাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে তাঁর শৈল্পিক ও বৌদ্ধিক অবস্থান, যেকোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছেই অনুপ্রেরণার রসদ। সমাজ ও মানবিকতার কাছে সদা দায়বদ্ধ এই শিল্পীর জন্মদিনে আমাদের প্রণাম!