Ramkinkar Baij
(Purnendu Pattrea)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন মাঝে মাঝেই আশ্রম প্রাঙ্গণে ঘুরতেন। হঠাৎ একদিন তাঁর চোখে পড়ে ‘সুজাতা’ ভাস্কর্যটি। সঙ্গে সঙ্গে ডাক পড়ল শিল্পীর। খানিকটা উদ্বিগ্ন হয়েই শিল্পী পৌঁছলেন গুরুদেবের ঘরে। শান্তিনিকেতন ছাড়তে বলবেন নাকি? ঘরে যেতেই শুরু হল ওই ভাস্কর্য নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ! প্রশ্ন শেষে গুরুদেব আদেশ দিলেন— এমন করেই আশ্রম প্রাঙ্গণ একের পর এক ভাস্কর্যে ভরিয়ে তুলতে হবে। শিল্পী মাথা পেতে নিয়েছিলেন সেই আদেশ। শান্তিনিকেতন আজ সমৃদ্ধ তাঁর ‘বুদ্ধ’, ‘গান্ধী’, ‘সাঁওতাল পরিবার’, ‘ব্ল্যাক হাউস’-এর মতো অসামান্য সব ভাস্কর্যে। সেই শিল্পী আর কেউ নন, স্বয়ং রামকিঙ্কর বেইজ।
বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত গ্রাম যোগীপাড়ায় জন্ম। বাবা চণ্ডীচরণ বেইজ পেশায় ছিলেন নাপিত। শিল্পীর জন্মসাল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে বিশ্বভারতীর নথি বলে, তাঁর জন্মতারিখ ১৯০৬ সালের ২৫শে মে।
প্রতিবেশী অনন্ত সূত্রধর ছিলেন রামকিঙ্কর বেইজের প্রথম শিল্পশিক্ষক। প্রতিমা গড়তে হাতে হাতে সাহায্য করতেন অল্প বয়স থেকেই। পরে রামকিঙ্কর নিজেই কাদামাটি দিয়ে মূর্তি গড়া শুরু করেন। এহেন প্রতিভাই একদিন নজর কাড়ে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের। তিনি তখন প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক। বাড়ি ওই যোগীপাড়া গ্রামেই। পত্রিকা সম্পাদনার সুবাদে কলকাতার সাংস্কৃতিক জগতে তিনি বেশ পরিচিত।
প্রতিভা চিনতে তাঁর ভুল হয়নি। সোজা রামকিঙ্কর বেইজকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন শান্তিনিকেতন।১৯২৫ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে রামকিঙ্কর বেইজের শান্তিনিকেতনে আগমন। মাষ্টারমশাই নন্দলাল বসু তাঁর কাজ দেখে বলেছিলেন, ‘তুমি তো সবই জানো, আবার এখানে কেন?’ তারপর কী ভেবে আবার বলেন, ‘আচ্ছা দু-তিন বছর থাকো।’ সেই দুই-তিন বছরের কোর্স শেষ হয় ৫৫ বছর পর, প্রয়াণের কিছুদিন আগে।
ভিডিও: বাংলা কথাসাহিত্যের হীরে-‘মানিক’ – জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
আজীবন শান্তিনিকেতন আশ্রয় করে থাকলেও শান্তিনিকেতনি প্রথা তাঁকে বাঁধতে পারেনি। কলাভবনে তখন অয়েল পেন্টিং হত না। রামকিঙ্কর বেইজ এসেই নিয়ম ভাঙলেন। মাষ্টারমশাই নন্দলাল বসুর প্রবল আপত্তি ছিল। কিন্তু, ধোপে টেকেনি। মাষ্টারমশাইয়ের সঙ্গে বিরোধ হয়েছিল কিউবিজম ও জীবন্ত মডেলের ব্যবহার নিয়ে। পরে এক সাক্ষাৎকারে রামকিঙ্কর জানাচ্ছেন, ‘আমি তাঁর উপদেশ মেনে চলিনি।’
প্রথমে ছাত্র, তারপর শিক্ষক ও সবশেষে কলাভবনের অধ্যক্ষ। ছাত্রছাত্রীদের পরামর্শ দিতেন, শিল্পের ব্যাপারে আপসহীন হতে। কাজ ভাল না হলে ভেঙে ফেলে আবার করতে বলতেন। কখনও কখনও নিজেই ভেঙে দিতেন। একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন নিজের কাজের ব্যাপারেও।
একবার রবীন্দ্রনাথে ঠাকুরের প্রতিকৃতি গড়তে গিয়ে বেশ রিয়ালিস্টিক করে ফেললেন। সবাই খুশি, প্রশংসায় পঞ্চমুখ। হঠাৎ পরের দিন শিল্পীর ঘর থেকে শোনা গেল কিছু ভাঙার আওয়াজ। দরজা খুলতে দেখা গেল, মূর্তিটা আর নেই। এরপর নতুন করে রবীন্দ্রনাথের যে মূর্তিটি গড়েছিলেন, আজ তা দেশে বিদেশে সমাদৃত।
ভিডিও: মুক্তারামের রামকথা – জন্মদিনে শিবরাম
মধ্যবিত্ত ভদ্রতার আঁটোসাঁটো মার্জিনের বাইরে সংসার পেতেছিলেন রামকিঙ্কর বেইজ। সুরাপান থেকে নারীসঙ্গ, প্রথা ভাঙা থেকে অগোছালো দিনযাপন, কোনওকিছুতেই পিছপা হননি শিল্পের স্বার্থে। তোয়াক্কা করেননি সমাজের।
শিক্ষকজীবনে ছাত্রী বিনোদিনীর সঙ্গে তৈরি হয় সম্পর্ক। ৪০ বছরের শিক্ষকের মডেল হয়ে উঠেছিলেন ২১ বছরের ছাত্রী। বহু ছবি ও ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছিল ‘মণিপুর রাজকন্যা’ বিনোদিনীর প্রতিকৃতি। একইভাবে ‘পদ্মশ্রী’ লেখিকা বিনোদিনীর ‘আসংবা নোংগিয়াবি’ নাটকে ফুটে উঠেছিলেন রামকিঙ্করও। বহুবার সে নাটক সম্প্রচারিত হয়েছে আকাশবাণীতে।
১৯৭০ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৭৬-এ অকাদেমির ফেলো নির্বাচিত হন শিল্পী। ১৯৭৭ সালে বিশ্বভারতী থেকে পান ‘দেশিকোত্তম’ সম্মান। ১৯৭৯ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডিলিট দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালে এই বরেণ্য শিল্পীর জীবনকাহিনিকে কেন্দ্র করে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটক।
বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসে, সাধারণ নাপিতের সন্তান হয়েও, কেবলমাত্র নিজ প্রতিভায় ভারতীয় শিল্পজগতকে উজ্জ্বলতর করেছেন রামকিঙ্কর বেইজ। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে আজ বাংলালাইভের বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য।