(Eli Cohen 14)
এলি কোহেন যখন তাঁর সিরীয় অভিযানে যাচ্ছেন, তখন সদ্য অন্তরিন অ্যাডল্ফ আইখম্যান সারা দুনিয়ার সংবাদের শিরোনামে। কিন্তু এই পলাতক নাৎসি অফিসারের খোঁজ পেতেই মোসাদ ও নাৎসি হান্টারদের এক যুগ লেগে গিয়েছিল। তাও বোধহয় সম্ভব হত না, যদি না এক ভঙ্গুর প্রেমকাহিনির উপসংহারে- এক তরুণী আর তাঁর প্রায়ান্ধ পিতার অধ্যাবসায় ও ধীশক্তির জোরে একে খুঁজে বার করতেন। ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই কাহিনিরই কিয়দাংশ এখানে দেওয়া হল।
শুরু হল এলি কোহেন চতুর্দশ পর্ব।
পড়ুন এলি কোহেনের আগের পর্ব – (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯) (১০), (১১), (১২), (১৩)
আপনি কি আইখম্যান?
দুরুদুরু বক্ষে কলিং বেল টিপল সিলভিয়া। কে যেন জানলার ওপার থেকে পর্দার আড়ালে সরে গেল। সিলভিয়ার বেশ ভয় ভয়ই করছে। এই বাড়িতে আসার উদ্দেশ্য একটাই। অ্যাডল্ফ আইখম্যান আদৌ বেঁচে আছে কি না তা সরেজমিনে যাচাই করা। ব্যয়র জার্মানি থেকে আইখম্যানের যুদ্ধের সময়কার ছবি পাঠিয়েছে। কিন্তু সেই ছবি এমনই ঝাপসা যে আইখম্যানকে ভাল করে বোঝা যাচ্ছে না। এখনকার পঞ্চাশোর্ধ লোকটাকে কি আদৌ চেনা যাবে সেই বছর পনেরো আগের ঝাপসা ছবি দেখে? তবে আইখম্যানের দুই ছেলে নিক আর ডিটেরের যে বর্ণনা আছে, তা মিলে যাচ্ছে। কারণ নিকের এই ছোট ভাইয়ের সঙ্গে সিলভিয়ার পরিচয় হয়েছিল। আবার বেঁফাস কিছু বলে ফেললে যে ভয়ঙ্কর পরিণতি হতে পারে, তাও মাথায় ছিল সিলভিয়ার।
যে লোকটা ঠাণ্ডা মাথায় লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে মরণের মুখে ঠেলে দিয়েছে, সে যদি বোঝে তার এতদিনকার গা ঢাকা দেওয়া কেউ ধরে ফেলেছে, তবে তাকে যে সে বিন্দুমাত্র দয়ামায়া দেখাবে না, তা আর বলে দিতে হয় না।
সিলভিয়ার এইসব সাত-পাঁচ ভাবনার মধ্যেই দরজা খুলে গেল। বাচ্চা কোলে এক বেঁটেখাটো শক্তসমর্থ মাঝবয়সী মহিলা দরজার মুখে দাঁড়িয়ে।
সিলভিয়ার এইসব সাত-পাঁচ ভাবনার মধ্যেই দরজা খুলে গেল। বাচ্চা কোলে এক বেঁটেখাটো শক্তসমর্থ মাঝবয়সী মহিলা দরজার মুখে দাঁড়িয়ে।
‘কাকে চাই?’
‘আন্টি। আমি নিকের বন্ধু। ও আছে কি?’
মহিলা খানিকটা ইতস্তত করে বলল, ‘আমি নিকের মা। তুমি ভিতরে এস না?’
সিলভিয়া বুঝল ব্যয়রের চিঠিতে বর্ণিত এই মহিলা হল অ্যাডল্ফ আইখম্যানের স্ত্রী ভেরোনিকা।

‘কফি আর কেক চলবে?’
মহিলার কথায় একটু আশ্বস্ত হল সিলভিয়া। যাক, মহিলা কোনওরকম সন্দেহ করেনি।
‘থ্যাঙ্কস আন্টি। দিব্বি চলবে।’
ঘরের একপাশে ডিটেরের দেখা পেল সিলভিয়া। তাকেই জিজ্ঞাসা করল, ‘নিক বাড়ি আছে?’
ডিটের তো চমকে উঠল সিলভিয়াকে দেখে। কোনওমতে বলল, ‘না, ঘণ্টাখানেক আগে বেরিয়েছে।’
ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসল সিলভিয়া। সেই সময় ঘরে ঢুকল চশমা পরিহিত পঞ্চাশোর্ধ্ব এক লোক। ব্যয়রের ছবির সঙ্গে অবয়ব মিলে যাচ্ছে। সিলভিয়ার বুঝতে বাকি রইল না এই হল অ্যাডল্ফ আইখম্যান। একটু ঝুঁকে মেঝেতে কিছু দেখছিল সে।
‘গুড আফ্টারনুন’
সিলভিয়ার সম্ভাষণের প্রত্যুত্তরে মাথা অল্প নিচু করে অভিবাদনের ভঙ্গিতে লোকটা পরিষ্কার জার্মানে বলল, ‘pleased to meet you, young lady.’
গলার স্বর শুনেই প্রমাদ গুনল সিলভিয়া। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সাত তাড়াতাড়ি সিলভিয়া বলতে শুরু করল হাইস্কুল উতরিয়ে এখন সে ভাবছে বিদেশি ভাষা নিয়ে উচ্চশিক্ষা করার কথা।
সিলভিয়া একটু সাহসে ভর করে বলে বসল, ‘আপনি কি আইখম্যান?’
কোনও উত্তর এল না।
সিলভিয়া বুঝল বেমক্কা প্রশ্নটা করা ভুল হয়েছে। তাই একটু শুধরে জিজ্ঞাসা করল, ‘মানে আপনি কি নিকের বাবা?’
এবার একটু থেমে কর্কশ গলায় উত্তর এল, ‘না। আমি ওর কাকু।’
গলার স্বর শুনেই প্রমাদ গুনল সিলভিয়া। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সাত তাড়াতাড়ি সিলভিয়া বলতে শুরু করল হাইস্কুল উতরিয়ে এখন সে ভাবছে বিদেশি ভাষা নিয়ে উচ্চশিক্ষা করার কথা।
‘আচ্ছা আপনি ইংরেজি বা ফরাসি জানেন?
‘তেমন না। যুদ্ধের সময় ফ্রান্স আর বেলজিয়ামে থাকার সময় অল্প কিছু কাজ চালানো গোছের ফরাসি শিখেছিলাম’।

লোকটা একটু সহজ হল। এ কথা সে কথা যখন চলছে তখনই নিক ঢুকল। সিলভিয়াকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। চিৎকার করে বলল, ‘কে দিল আমার ঠিকানা? কে বলল তুমি আমার কাছে আসতে পার?’
এই অপমানের প্রত্যুত্তরে সিলভিয়াও চিৎকার করতে পারত। কিন্তু তাতে আসার উদ্দেশ্যই বিফলে যাবে। তাই ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘আরে আমাদের দু’জনেরই চেনা বন্ধুদের কাছ থেকে তোমার ঠিকানা পেলাম। বুয়েন্স এয়ার্সে এলাম যখন, তখন ভাবলাম দেখাটা করেই যাই। কেন কিছু ভুল করেছি?’
লোকটা এবার পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বলল, ‘আরে না না। ভুল কেন করবে। you are most welcome.’
পরিস্থিতি যাতে আর না বিগড়োয়, তাই এবার সিলভিয়া উঠে দাঁড়াল।
‘আজ যাই। আরও কয়েকটা কাজ আছে বুয়েন্স এয়ার্সে। পরে আরেকদিন আসব। সেদিন অনেকক্ষণ থেকে জমিয়ে গল্প করা যাবে।’
নিক ততক্ষণে বুঝে গিয়েছে, তার অতটা উত্তেজিত হওয়া ঠিক হয়নি। একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি সহজ করার জন্য লোকটাকে নিক বলল, ‘বাবা, আমি সিলভিয়াকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত একটু এগিয়ে দিয়ে আসি।’
লোকটা বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত সিলভিয়াকে এগিয়ে দিল।
নিক ততক্ষণে বুঝে গিয়েছে, তার অতটা উত্তেজিত হওয়া ঠিক হয়নি। একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি সহজ করার জন্য লোকটাকে নিক বলল, ‘বাবা, আমি সিলভিয়াকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত একটু এগিয়ে দিয়ে আসি।’
বাসস্ট্যান্ডে যেতে যেতে সিলভিয়া নিককে জিজ্ঞাসা করল, ‘ওঁকে তুমি বাবা বললে কেন?’
নিক বলল, ‘আরে ও কিছু না। সম্মান দেওয়া আরকি?’
লোথারের সঙ্গে যখন দেখা হল সিলভিয়ার, তখন সে বলল, ‘অ্যাডল্ফ আইখম্যান বউ ছেলে নিয়ে বহাল তবিয়তে বুয়েন্স এয়ার্সে আছে।
ব্যয়ারের কাছে লোথার লিখলেন- ‘আইখম্যানের হদিশ আর ঠিকানা দুইই পাওয়া গিয়েছে’

কিন্তু সরকারি যন্ত্রকে অত সহজে নড়ানো যায় নাকি। এ ব্যাপারে যে এগোতে রাজি নয় বার্লিন, তা আগেই বুঝিয়ে দিয়েছে। অগত্যা ইজরায়েল ভরসা। কিন্তু এর মধ্যে বেশ কয়েকবার গুজবের পিছনে দৌঁড়েছে তেল আভিভ। তাই এবার কষ্টিপাথরে হের্মানদের তথ্য যাচাই করা শুরু হল। আরও তথ্য প্রমাণ জোগাড়ের জন্য বাবা মেয়েকে ফের বুয়েন্স এয়ার্স আসতে হয়েছিল। এরপর ১৯৫৯ সালে শহরের প্রান্তিক অংশ গ্যারিবল্ডি স্ট্রিটে জমি কিনে বাড়ি করল আইখম্যান। তার নতুন ঠাঁই খুঁজে পেতেও সময় লাগল মোসাদের। সব মিলিয়ে পাকা খবর পাওয়ার পরও মোসাদের পাক্কা সাড়ে তিন বছর লেগে গেল আইখম্যানকে ধরতে।
কিন্তু একটা প্রশ্ন নিরন্তর ইজরায়েলি গোয়েন্দাদের ভাবিয়েছে। আইখম্যান নিজে রিকার্ডো ক্লিমেন্টের ছদ্ম পরিচয়ে থাকলেও ছেলেদের কেন আইখম্যান পদবি ব্যবহার করতে দিলেন? শেষ হিসাবে কিন্তু নিকের আইখম্যান পদবিই তার ধরা পড়ার অন্যতম মুখ্য কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৬০ সালের ১১ মে রাতে আইখম্যানকে তার গ্যারিবল্ডি স্ট্রিটের বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ করে মোসাদ। সেই রাতেই বুয়েন্স এয়ার্সের এক সেফ হাউসে জেরার মুখে পড়ে আইখম্যান। ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ গুপ্তচর ব্যবস্থা ও সন্ত্রাসবিরোধী কাজকর্ম দেখা জেনারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (সংক্ষেপে জিএসএস) বা শিন বেতের ইন্টারোগেশন বিভাগের ডিরেক্টর জভি আহারোনি যখন জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমার পরিবার কেন ক্লিমেন্ট পদবি ব্যবহার করল না?’ তখন নিরুত্তাপ আইখম্যানের জবাব, ‘আমার জন্য পরিবারকে মিথ্যা বলতে বলব, এটা কি করে ভাবলে?’ উত্তর শুনে সবাই হতচকিত হয়ে পড়ে।
যে লোকটা নিজের হাতে কোন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে কত ইহুদি পাঠানো হবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তালিকা করত, গ্যাস চেম্বারে লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে ঠেলে দিয়ে, সেই বিচারসভায় দাঁড়িয়ে নিজেকে নির্দোষ বলেছিল, বলেছিল সে ইহুদি নিধনের জন্য উর্ধ্বতন অফিসারদের আদেশ প্রতিপালন করেছিল মাত্র।
যে লোকটা মিথ্যার পর মিথ্যার জাল বুনে পনেরো বছর গা ঢাকা দিয়ে ছিল, যে নিজের ছেলেকে সবার সামনে ভাইপো বলছে, যে নিজের বউকে ভিন্ন নামে ফের বিয়ে করেছে, যার নিজেরই গোটা তিনেক ছদ্মনাম ছিল, তার মুখে নীতিকথা!
আদতে অ্যাডল্ফ আইখম্যান ছিল দ্বিচারিতায় ভরা। যে লোকটা নিজের হাতে কোন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে কত ইহুদি পাঠানো হবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তালিকা করত, গ্যাস চেম্বারে লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে ঠেলে দিয়ে, সেই বিচারসভায় দাঁড়িয়ে নিজেকে নির্দোষ বলেছিল, বলেছিল সে ইহুদি নিধনের জন্য উর্ধ্বতন অফিসারদের আদেশ প্রতিপালন করেছিল মাত্র। সেই কিন্তু ইহুদি নীতি নির্ধারক কমিটির ১২ সদস্যের অন্যতম ছিল।
If my life ends, what will become my dairy?
এখানে একটু জার্মানির ইতিহাস ঝালিয়ে নেওয়া যাক। জার্মান শব্দ রাইখ অর্থ সাম্রাজ্য। ৯৬২ সালে তৎকালীন পোপ দ্বাদশ জন রোমে ইতালি ও হাঙ্গেরি যুদ্ধের বিজেতা ৫০ বছর বয়সি জার্মানরাজ প্রথম অটোকে ‘হোলি রোমান এম্পারার’ হিসাবে ঘোষণা করেন। শুরু হল হোলি রোমান এম্পায়ার বা প্রথম রাইখ। ৮৪৪ বছর ধরে টিকে থাকা এই রাজত্ব নেপোলিয়নের উত্থানে ১৮০৬ সালে ভেঙে পড়ে। ১৮৭১ সালে শুরু হয় দ্বিতীয় রাইখ, যখন প্রাশীয় রাজ প্রথম উইলহেলম একত্রিত জার্মান প্রদেশগুলোর সম্রাট বা কাইজার হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হলে ১৯১৮ সালে দ্বিতীয় রাইখের পতন ঘটে।

তবে এই পরাজয় জার্মানি মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। তাদের মনে হয় শুধু, যে তাঁদের অন্যায়ভাবে যুদ্ধে হারানো হয়েছে তাই, ইহুদিদের অন্তর্ঘাতও এই অপমানের জন্য অনেকাংশে দায়ী। বস্তুত গোটা দেশের বুকের মধ্যে জ্বলতে থাকা এই ক্ষোভের আগুনকে কাজে লাগিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অ্যাডল্ফ হিটলার নামে আহত এক অস্ট্রীয় সৈনিক বিশ্বকে সর্বব্যাপী আরেক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেন।
তবে অনেকের মতে নাৎসিরা এই রাইখের ধারণাটা পায় ১৯২৩ সালে প্রকাশিত জার্মান সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক আর্থার মুলার ভ্যান দান ব্রুকের ‘দাস দ্রিতে রাইখ’ বা তৃতীয় রাইখ বইটা থেকে। আর্থার মুলারের মতে, জার্মানির পুনর্জাগরণ প্রথাগত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক ভাবে শাসক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্য দিয়ে আসবে না। এর জন্য দরকার রাইখ বা সাম্রাজ্য গঠন। আর্থার মুলার এই নতুন সাম্রাজ্যের নাম দিলেন তৃতীয় রাইখ। মুলারের মতে, ৯৬২ থেকে ১৮০৬ পর্যন্ত চলা হোলি রোমান এম্পায়ার হল প্রথম রাইখ আর ১৮৭১ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত প্রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন জার্মানি হল দ্বিতীয় রাইখ।
গণতন্ত্রের চিতাভষ্মের উপরে এই তৃতীয় রাইখ গড়ে তোলার ধারণাটা নাৎসী পার্টি লুফে নিল। বস্তুত রাইখস্টাগ বা সংসদে আগুন লাগিয়ে ১৯৩৩ সালে হিটলার যখন চ্যান্সেলর হয়ে বসলেন, তখন নাৎসিরা উর্ধ্ববাহু নৃত্য করে এক হাজার বছর ব্যাপী তৃতীয় রাইখের শুরু বলল। যদিও এর ১২ বছর পরে ১৯৪৫ সালে বার্লিন বাঙ্কারে হিটলারের আত্মহত্যা তৃতীয় রাইখকে ইতিহাসে বিলীন করে দেয়।
জার্মানির গণ ইহুদি বিদ্বেষ নিয়েও একটু বলা দরকার। ১৯০১ সালে বেলারুশে জন্মগ্রহণকারী ইহুদি হিব্রু শিক্ষাবিদ হায়াম অ্যারম কাপলান নাৎসি জার্মানির অধিকৃত পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে সাধারণ ইহুদিদের নিয়ে গিয়ে রাখা ঘেটো সামনে থেকে দেখেছেন।
জার্মানির গণ ইহুদি বিদ্বেষ নিয়েও একটু বলা দরকার। ১৯০১ সালে বেলারুশে জন্মগ্রহণকারী ইহুদি হিব্রু শিক্ষাবিদ হায়াম অ্যারম কাপলান নাৎসি জার্মানির অধিকৃত পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে সাধারণ ইহুদিদের নিয়ে গিয়ে রাখা ঘেটো সামনে থেকে দেখেছেন।
ঘেটোতে গরু ছাগলের মতো ইহুদি ঢোকানো, তাদের ক্ষুধার্ত রেখে দিনের পর দিন অমানুষিক কাজ করিয়ে তিলে তিলে মেরে ফেলা ও শহরে ধীরে ধীরে আতঙ্ক গ্রাস করা নিয়ে কাপলান ১৯৩৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৪২-এর ৪ অগস্ট পর্যন্ত একটি দিনলিপি লেখেন। শেষের দিনলিপিতে যে কোনও মুহুর্তে গেস্তাপো তাঁকে ও তাঁর স্ত্রী তউবাকে যে ধরে নিয়ে যেতে পারে, সেই আশঙ্কার কথা লিখছিলেন। কাপলানের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছিল। ১৯৪২-এর ডিসেম্বর বা ১৯৪৩-এর জানুয়ারিতে হায়াম ও তাঁর স্ত্রী তউবাকে পোল্যান্ডের ত্রেবলিঙ্কা কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে খুন করা হয়। তবে গেস্তাপো ধরার আগেই নোটবুকগুলো বন্ধু রুবিনস্টেজকে দিয়ে যান কাপলান।
১৯৪২-এর ৪ অগস্ট শেষ দিনলিপির শেষ লাইন ছিল- ‘if my life ends, what will become my dairy?’ তাঁর সেই আশঙ্কা অবশ্য সত্য হয়নি। কাপলানের মৃত্যুর ২২ বছর পর বহু হাত ঘুরে অবশেষে ১৯৬৫ সালে তাঁর সেই দিনলিপি ইংরেজিতে ‘স্ক্রল অফ অ্যাগোনি- দ্য ওয়ারশ ডায়েরি অফ হায়াম এ কাপলান’। হলোকাস্টের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল হিসাবে ধরা হয় এই দিনলিপিকে।

এই নরমেধ যজ্ঞে গণ ইহুদি বিদ্বেষের যে পূর্ণ সহযোগিতা ছিল, তা তাঁর দিনলিপিতে পরিষ্কার লিখেছেন। তাঁর দিনলপির ১২৯-৩০ পাতায় কাপলান লিখছেন, ‘পোলিশ ইহুদিদের উপর যে সর্বব্যাপী সর্বনাশের অমানিশা নেমে এসেছিল, তা তাদের ইতিহাসের অন্ধকারতম সময়েও হয়নি। প্রথমত এ এক অতলস্পর্শী ঘৃণা। এই বিদ্বেষ কেবলমাত্র রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে আসেনি। এই বিদ্বেষ শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্যও নয়। এই বিদ্বেষ অনেকটাই মনস্তাত্ত্বিক। ইহুদিকে ভাবা হচ্ছে শরীরে, মনে এক নোংরা অস্তিত্ব। ঠিক যেমন কুষ্ঠ রোগীর জনসমাজে কোনও ঠাঁই নেই। প্রভুরা যা শিখিয়েছে, জার্মান জনমানসের মরমেও তাই পৌঁছেছে। ইহুদি মানেই নোংরা, ঠগ, ইহুদি মানেই শয়তান। ইহুদিদের জন্যই জার্মানির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়েছে। জার্মানির সর্বনাশের মূলে যে ভার্সাই চুক্তি, তারও মূল কুশীলব এই ইহুদিরা।‘
(প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯১৯ সালের ২৮শে জুন ফরাসি মহানগর ভার্সাইয়ের প্যালেস অব ভার্সাইয়ের হল অফ মিরর-এ পরাজিত জার্মানিকে এক অপমানজনক চুক্তিতে বিজয়ী মিত্রপক্ষ সই করায়। বলা হয়, এই ভার্সাই চুক্তিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ পুঁতে দেয়।)
কাপলান আরও লেখেন, ’ইহুদিদের মনে করা হত যত নষ্টের গোড়া। এরাই দেশে দেশে বিভেদ ঘটায়। তারপর যুদ্ধ লাগিয়ে সেখান থেকে মুনাফা কামায়।‘
ড্যানিয়েল জোনাহ গোল্ডহাগেন তাঁর ‘হিটলার্স উইলিং এক্সিকিউশনার্স- অর্ডিনারি জার্মানস অ্যাণ্ড দ্য হলোকাস্ট’ বইতে পরিষ্কার দেখিয়েছেন, শুধু হিটলারের এসএস বাহিনী নয়, অনেক সময় সাধারণ জার্মানরাও এই নরমেধ যজ্ঞে মদত দিয়েছে।
ড্যানিয়েল জোনাহ গোল্ডহাগেন তাঁর ‘হিটলার্স উইলিং এক্সিকিউশনার্স- অর্ডিনারি জার্মানস অ্যাণ্ড দ্য হলোকাস্ট’ বইতে পরিষ্কার দেখিয়েছেন, শুধু হিটলারের এসএস বাহিনী নয়, অনেক সময় সাধারণ জার্মানরাও এই নরমেধ যজ্ঞে মদত দিয়েছে।
গোল্ডহাগেন তাঁর বইয়ে লিখেছেন, সেই সময়ে জার্মান জনমানসে এক বদ্ধমূল ইহুদি বিদ্বেষ ছাড়া এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে না। হিটলার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা ইহুদি নিধন করার জায়গায় পৌঁছাতেই পারত না, এই গণইহুদি বিদ্বেষ ছাড়া। সত্যি বলতে কি, এই গণ ইহুদি বিদ্বেষ ছাড়া হিটলারের ইহুদি হত্যাযজ্ঞ এই ব্যাপ্তিই পেত না।
কাপলান আর গোল্ডহাগেনের কথার মান্যতা কার্যত অন্যভাবেও মেলে। দ্য ওয়েনার হলোকাস্ট লাইব্রেরির এক প্রতিবেদনের হিসাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রায় হাজার দশেক জার্মান আর্জেন্টিনায় পালায়। বলাই বাহুল্য, এই পলাতকদের সিংহভাগই নাৎসি বাহিনীর সদস্য। আইখম্যান এবং হাতে গোনা দু’একজন বাদে কারুরই পরে আর কোনও খোঁজ মেলেনি। আগেই বলা হয়েছে, তৎকালীন আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ের স্থানীয় জার্মান বাসিন্দারা হিটলারেরই সমর্থক ছিলেন। ফলে সেই জনারণ্যে পলাতক নাৎসিদের মিশে যেতে কোনও অসুবিধাই হয়নি।
তথ্যসূত্র
(১) ড্যানিয়েল গর্ডিস- ইজরায়েল-আ কনসাইজ হিস্টরি অফ আ নেশন রিবর্ন
(২) জ্যাক্সন হ্যালে- এলি কোহেন-দ্য স্পাই হু নিয়ারলি বিকেম আ সিরিয়ান মিনিস্টার-
(৩) এলি কোহেন- আ লাইফ অফ এসপিওনাজ অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস
(৪) নীল বসকম্ব- হান্টিং আইখম্যান-চেজিং ডাউন দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট নটোরিয়াস নাৎসী
(৫) গাই ওয়াল্টার্স- হান্টিং ইভিল
(৬) উকি গোনি- হাউ নাৎসি ওয়্যার ক্রিমিনালস এসকেপড ইউরোপ
(৭) সাইমন উইজেনথাল- জাস্টিস নট ভেঞ্জেন্স
(৮) লি সণ্ডার্স- দ্য পাজল
(৯) হায়াম এ কাপলান- স্ক্রল অফ অ্যাগোনি-দ্য ওয়ারশ ডায়েরি অফ হায়াম এ কাপলান
(১০) ড্যানিয়েল জোনাহ গোল্ডহাগেন- হিটলার্স উইলিং এক্সিকিউশনার্স-অর্ডিনারি জার্মানস অ্যাণ্ড দ্য হলোকাস্ট
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত