(Lal Khorgosh)
অনেকদিন আগে এক বন ছিল। সেই বনের নাম ছিল ঝিলমিল বন। সেখানে নানা জন্তু-জানোয়ার বাস করত। সেখানে যেমন ছিল হরিণ, খরগোশ, সজারু; তেমনই ছিল নানা রং-বেরঙের পাখিরা। ছিল নানা প্রজাতির হরেক গাছ। নতুন, কচি গাছ যেমন ছিল; তেমনি ছিল প্রাচীন সব বৃক্ষ। এই সব বৃক্ষে যা-সব ফল-পাকুড় ফলত; পাখিরা তা মহানন্দে খেত।
যে সিংহ এখানে রাজা হয়ে শাসন করতেন, তাঁর নাম ছিল মহানিকুম্ভ। তিনি ছিলেন ভীষণ ভাল মানুষ। সকল প্রাণীদের সঙ্গে নিয়ে থাকতেন। জীব-হিংসা তিনি একেবারে পছন্দ করতেন না। এইভাবে তিনি ঝিলমিল বন চালাতেন।
কিন্তু সময় বসে থাকে না। রাজার বয়স হচ্ছিল। শরীরে নানা রকম রোগ ঢুকল। বাতে আক্রমণ করল। তখন ভুঁড়োশিয়াল তাকে দেখতে এল। ভুঁড়োশিয়াল জঙ্গলের ডাক্তার। কিছুদিন আগে অন্য বনে গিয়ে সে পনেরো দিনের একটা ট্রেনিং নিয়ে এসেছে। সে যখন খবর পেল সিংহমশায় সুগার, থাইরয়েডসহ নানা রোগে কাবু; সে গলায় নতুন একখানা স্টেথো ঝুলিয়ে চলে এল। বলল, দেখি রাজামশায় আপনার নাড়ী।
সিংহমশাই তার ডান থাবাখানা বাড়িয়ে দেন।
পালস্ চেক করা হয়ে গেলে শিয়াল বলল, দেখি মহারাজের জিভখানা।

সিংহ অমনি তার জিভটা লম্বা করে ঝুলিয়ে দিলেন।
শিয়াল এইভাবে সিংহের সব অঙ্গ-প্রতঙ্গ নানাভাবে পরীক্ষা করল, আর নিদান দিল; মহারাজের অম্লশূল হয়েছে; তিনমাস পশ্চিমের গভীর অরণ্যের ভিতর বাস করে শীতল বনের বাতাস খেতে হবে, তবে শরীর সারবে।
পশ্চিমের বন তো আর হেথা নয়, সে হল তিনপাহাড়ের দেশে। সেখানে ঝর্নার জল নীল, আকাশ নীল, বাতাস দূষণহীন, পরিস্কার। স্বাস্থ্য উদ্ধারে অনেকেই সেখানে যায়। জায়গাটা চমৎকার হলে কী হবে, পথ অনেক দূর। যেতেই মাসখানেক সময় লাগে। তার উপরে আছে তিনটি পাহাড় ডিঙানো। সে কম ঝক্কির ব্যাপার নয়। সিংহ ইতস্তত করছিলেন।
রাজা বললেন, সে নাহয় বুঝলুম। কিন্তু এখানের কী হবে? রাজপাট কে সামলাবে? ঝিলমিল বনকে দেখবে কে? বিদেশি আক্রমণের হাত থেকে কে বাঁচাবে?
ইতিমধ্যে মহারাজের অসুস্থতার খবর পেয়ে সকল প্রজারা এসে উপস্থিত হয়েছে। তারা বললে, মহারাজ, আমরা চাই আপনি সেখানে যান আর শরীর সারিয়ে ফিরে আসুন।
রাজা বললেন, সে নাহয় বুঝলুম। কিন্তু এখানের কী হবে? রাজপাট কে সামলাবে? ঝিলমিল বনকে দেখবে কে? বিদেশি আক্রমণের হাত থেকে কে বাঁচাবে?
তখন নেউল এগিয়ে এসে বলল, মহারাজ আপৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনি বাঘমশাইকে মনোনীত করে যান। আপনি শরীর সারিয়ে ফিরে এসে আবার রাজ্যের দায়িত্ব নেবেন।
সকলের মনে ধরল এই প্রস্তাব। বাঘও লজ্জা-লজ্জা মুখ করে রাজি হল। আর বলল, এ হল মহারাজের মহানুভবতা। আশা করি, আপনার নির্দেশিত পথেই আমরা সবাই মিলে আমাদের বনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। বনের বৃদ্ধি ঘটাতে পারব। নতুন নতুন জলাশয় তৈরি করতে পারব, যাতে গরমের দিনে আমাদের জলকষ্ট পেতে না হয়।
সকলে সম্মত হলে, সিংহ এক এক করে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, তিনপাহাড়ের দেশের পথে পা বাড়ালেন। একটা বনের মহারাজাকে তো আর একা ছেড়ে দেওয়া যায় না; তাই একপাল ভোঁদড় তাঁর সঙ্গে গেল। মাথার উপর চিল উড়ল পঁচিশটা। এরা বিপদ চেনাবে, পথ দেখাবে। অচেনা বনে এরাই মহারাজের দেখাশোনা করবে। জলখাবার এনে দেবে।
রাজা হয়েই বাঘের ইচ্ছে হল লাল খরগোশের মাংস খাওয়ার। বাপ-ঠাকুরদার মুখে সে শুনেছে, লাল খরগোশের মাংস অতি উপাদেয়। খেলে বল বৃদ্ধি পায়। অনেক অজানা রোগের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচা যায়।
সিংহ গেল, বাঘ-বাবাজি তার চেয়ারে বসল। বসেই সে ভাবল, রাজা হয়েছি, মনে বেশ তা লাগছে। আমাদের এই ঝিলমিল বনে একটিই সিংহ ছিল। সে বিদায় নিয়েছে। সে যদি না ফেরে, তো বেশ হয়। আমিই চিরকাল রাজা হয়ে রয়ে যাব। দরকারে অরণ্যের সংবিধান বদল করে, অরণ্যের রাজা হিসেবে সিংহের বদলে বাঘের নাম ঢোকাতে হবে।
রাজা হয়েই বাঘের ইচ্ছে হল লাল খরগোশের মাংস খাওয়ার। বাপ-ঠাকুরদার মুখে সে শুনেছে, লাল খরগোশের মাংস অতি উপাদেয়। খেলে বল বৃদ্ধি পায়। অনেক অজানা রোগের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচা যায়।

কিন্তু, উপায় নেই। এই বনে লাল খরগোশ শিকার করা আইনত নিষিদ্ধ। বনে মেরে খাওয়ার জন্য অনেক প্রজাতির হরিণ, শূকর ও খরগোশ আছে। কিন্তু লাল খরগোশ মাত্র দশটি। কৃত্রিম পদ্ধতিতে তাদের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। এই অবস্থায় একজন মহারাজ হয়ে সে নিজেই আইনবিরুদ্ধ কাজ করতে পারে না।
বাঘ আবার ভাবল। তবে সে রাজা হয়েছে কেন? কেবল প্রজাদের সেবা করার জন্যে? তাহলে নিজের জন্য হাতে কী রইল? লম্বাটে জেব্রার খটখটে শুকনো হাড়? না। সে ভাবল, এমনি এমনি লাল খরগোশ ধরে খাওয়া যাবে না। এর জন্যে ফন্দি-ফিকির করতে হবে।
বাঘের গলার তেজে শিয়াল এবার চমকে গেল। বুঝে গেল নতুন মহারাজ অন্য কিছু বলতে চাইছেন। ডাক্তারি ছেড়ে সে এখন সাধারণ মানুষ হয়ে গেল। বিগলিত হয়ে বলল, বলুন মহারাজ।
সে তখন ভুঁড়োশিয়ালকে ডাকল। ডেকে বলল, দেখো তো হে ডাক্তার, প্রাণটা এমনি আইঢাই করছে কেন?
শিয়াল সব দেখেশুনে বলল, ও কিছু না, মনের ভুল।
কিছু না বলছ? তবে জিভ এমন শুকিয়ে যায় কেন?
বেশি করে জল খান। আর গন্ধরাজ লেবুর শরবত।
গলাটা মনে হয় খসখস করছে। বলে বাঘ দু-একবার কাশার চেষ্টা করল।
রোজ গার্গল করুন।
পেট ভরে খেলেও আমার সব সময় খিদে খিদে পায়। বাঘ মুখ বিকৃত করে বলল।
তবে জোয়ানের আরক খান।
কিছুতেই শিয়ালকে পেড়ে ফেলা যাচ্ছে না দেখে বাঘ এবার তড়পে উঠে বলল, পন্ডিত!
বাঘের গলার তেজে শিয়াল এবার চমকে গেল। বুঝে গেল নতুন মহারাজ অন্য কিছু বলতে চাইছেন। ডাক্তারি ছেড়ে সে এখন সাধারণ মানুষ হয়ে গেল। বিগলিত হয়ে বলল, বলুন মহারাজ।
লাল খরগোশের মাংসে কোন রোগ দূর হয়?
একটু আমতা আমতা করে শিয়াল বলে, ভুলে যাওয়া রোগ।
বিরোধীরা যদি এই নিয়ে হইচই করে, তাহলে তাদের এই জবাব দিও— বাকি যে পাঁচটা লাল খরগোশ রয়ে যাবে, তাদের সংখ্যা বৈজ্ঞানিক উপায়ে আমরা আরও বাড়াব। এই নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। মাত্র পাঁচটিকে হত্যা করার ফরমান জারি করা হচ্ছে, ঝিলমিল বনের মঙ্গলের জন্য।
তবে যাও, সারা বনে এটাই প্রচার করো। আর বলো, সিংহের চেয়েও যে রাজা অতি দক্ষতার সঙ্গে এই বন চালাচ্ছেন, তিনি এখন ভুলে যাওয়া রোগের শিকার। তার জন্যে গোটা পাঁচেক লাল খরগোশকে হত্যা করতেই হবে, নইলে এই গোটা বন ছারেখারে যাবে। আর—
বলুন মহারাজ।

বিরোধীরা যদি এই নিয়ে হইচই করে, তাহলে তাদের এই জবাব দিও— বাকি যে পাঁচটা লাল খরগোশ রয়ে যাবে, তাদের সংখ্যা বৈজ্ঞানিক উপায়ে আমরা আরও বাড়াব। এই নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। মাত্র পাঁচটিকে হত্যা করার ফরমান জারি করা হচ্ছে, ঝিলমিল বনের মঙ্গলের জন্য।
পরেরদিন সকালেই সারা বনে এই মর্মেই ঢ্যাঁড়া পেটানো হল গাধাকে দিয়ে। সকলেই শুনল। তারা বলাবলি করল, রাজার স্মৃতি কিছুতেই ভ্রষ্ট হতে দেওয়া যায় না। নতুন রাজা নতুন নতুন লতাপাতা, ফলফুল ও পতঙ্গ জন্মাতে নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। বনের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে নানান জাতের গাছ পুঁতেছেন। বন আগের চেয়ে সবুজ হয়েছে। পাখিদের জন্য নানান আবাস গড়ে তুলেছেন। অন্য বন থেকে নানা পাখিরা বসবাসের জন্য এখানে আসছে। নদীতে জল খাবার রাস্তা পরিষ্কার করানো হয়েছে। এহেন প্রজারঞ্জনের কাজ যে রাজা করে, তার জন্যে মাত্র পাঁচটি খরগোশের বলি চড়ানোই যায়। সুতরাং খরগোশ ধরতে লোক পাঠাও।
সিংহ তাদের দেখে অবাক। বলেন, কী হয়েছে আমার প্রিয় লাল খরগোশেরা? এমনি আকুল হয়ে তোমরা এখানে ছুটে এসেছ কেন!
আর লাল খরগোশেরা? গাধা যে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে গেল, সেটা তারাও শুনেছে। শুনেই বুকের ধুকপুকানি শুরু হয়েছে। ঢ্যাঁড়ার শব্দ কানে যাওয়ার পর থেকেই তারা তাদের প্রিয় বাসস্থান বটের শিকড়ের ফোকর থেকে বেরিয়ে এল সকলের অগোচরে। আশ্রয় নিল একটা মজা পুকুরের পাড়ের ঝোপের মধ্যে, যেখানে কেউ যায় না। তারপরে দিন শেষ হল, রাত নামল। রাতের অন্ধকারে তারা গোপন আস্তানা থেকে বের হল। তারপরে ছুট ছুট ছুট— সেই তিন পাহাড়ের দিকে। কোনওদিকে তাকানোর সময় নেই, দাঁড়ানোর উপায় নেই। একরাতের মধ্যেই তাদের পৌঁছে যেতে হবে তিন পাহাড়ে। সেখানে তাদের পুরাতন মহারাজ সিংহ সাহেব বাস করেন।
একরাত নয়, সেখানে পৌঁছতে লাগল দু’দিন। গিয়েই তারা সিংহের পায়ে পড়ে গেল। বলল, মহারাজ আমাদের বাঁচান।
সিংহ তাদের দেখে অবাক। বলেন, কী হয়েছে আমার প্রিয় লাল খরগোশেরা? এমনি আকুল হয়ে তোমরা এখানে ছুটে এসেছ কেন!
লাল খরগোশেরা বলে, মহারাজ আমরা বিপন্ন।
মানে!
তখন তারা সব কথা খুলে বলে। সিংহ সব শুনে চিন্তিত। বলেন, এ তো হতে দেওয়া যায় না।
আমাদের এখানেই রেখে দিন মহারাজ।
তা-ই বা কী করে হয়?
তবে কি আপনি আমাদের বাঘের মুখে ঠেলে দেবেন?
না। অনেক কষ্টে তোমাদের প্রজাতিকে রক্ষা করা গিয়েছে। আমিই করেছি। এখন বাঘের মাথায় যদি উটকো বুদ্ধি ঢোকে, তার জন্যে আমি তোমাদের হত্যা করার নীতিকে সমর্থন করতে পারি না।
তখন সিংহমশায় ভোঁদড়দের হাঁক দিলেন। দশটি ভোঁদড় সামনে এসে দাঁড়াল। সিংহ বললেন, শুনলে তো সব। এখন যাও, এই অন্যায়ের প্রতিবিধান করো।
তবে আমাদের কী হবে মহারাজ?
তখন সিংহমশায় ভোঁদড়দের হাঁক দিলেন। দশটি ভোঁদড় সামনে এসে দাঁড়াল। সিংহ বললেন, শুনলে তো সব। এখন যাও, এই অন্যায়ের প্রতিবিধান করো।

তখন ভোঁদড়-সর্দার এগিয়ে এল। তার নাম বাহার। সে দশজন ভোঁদড়ের গায়ে লাল রং মাখিয়ে তাদের করে দিল লাল খরগোশ! আর বলল, যাও। যা বললাম, তা করো।
লাল খরগোশ সেজে সেই দশটি ভোঁদড় চলল তিন পাহাড় পেরিয়ে নিজেদের দেশে। সেখানে গিয়ে অন্য ভোঁদড়দের তারা মহারাজের আদেশের কথা জানাল। লাল খরগোশ ধরার সব জাল কেটে দিল। বাকি ভোঁদড়দের খবর দিল। সঙ্গে আরও অন্যান্য ছোট ছোট প্রাণীরা, যাদের উপর বাঘরাজা নিকুম্ভ অত্যাচার চালাত। সকলে মিলে রাজার গুহা ঘেরাও করল। ঝর্নার জলের উৎস বন্ধ করা হল, যাতে বাঘের পক্ষের লোকজন জল না পায়। বাঘের গুহা ঘিরে মিগ ফাইটার বিমানের মতো পাক খেতে লাগল এক হাজার চিল।
সিংহাসনে বসে মহারাজা ঘোষণা করলেন, আজ থেকে আর লাল খরগোশকে আলাদা আলাদা ভাবে বাস করতে হবে না। তাদের জন্য আলাদা বন সংরক্ষণ করা হবে। আর লাল খরগোশের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।
ইতিমধ্যে খবর রটে গেছে, সিংহ মহারাজ ফিরে আসছেন। তাঁর শরীর সেরে গিয়েছে। তিনি আসছেন বীর বিক্রমে।
ভয়ে বাঘ গুহা ছেড়ে পালাল। ঝিলমিল বন ছেড়ে সে অন্য বনে আশ্রয় নিল।
তারপরে সিংহমশাই ফিরলেন। পিছুপিছু দশখানা লাল খরগোশ।
নতুনভাবে সিংহাসনে বসে মহারাজা ঘোষণা করলেন, আজ থেকে আর লাল খরগোশকে আলাদা আলাদা ভাবে বাস করতে হবে না। তাদের জন্য আলাদা বন সংরক্ষণ করা হবে। আর লাল খরগোশের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। তার জন্যে বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে দিলেন। পশু বিশারদকে খবর করা হল। লাল খরগোশের নিরাপত্তার জন্য সেই দশটি ভোঁদড়কে পাহারায় রাখা হল। রাজা বললেন, আমি আছি, ভয় নেই।
দশটি লাল খরগোশ মহারাজাকে সেলাম ঠুকে বলল, জয় ঝিলমিল বনের জয়।
সিংহমশাই মৃদুভাবে হাসলেন।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত