(Fifa World Cup)
ব্রিটিশ সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েল ১৯৪৫ সালে তাঁর ‘দ্য স্পোর্টিং স্পিরিট’ প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক খেলাধুলার মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটি মন্তব্য করেছিলেন— ‘সিরিয়াস স্পোর্ট ইজ ওয়ার মাইনাস দ্য শুটিং’— অর্থাৎ, খেলাধুলা হল বন্দুকের গুলিবিহীন এক যুদ্ধ। ২০২৬-এর এই চরম উত্তপ্ত, শ্বাসরুদ্ধকর এবং মেরুকৃত ভূ-রাজনৈতিক আবহে দাঁড়িয়ে অরওয়েলের সেই মন্তব্য যেন এক নিষ্ঠুর, রক্তাক্ত বাস্তবতায় রূপ নিতে চলেছে।
একদিকে যখন উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ জনপদে— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ষোলোটি চোখ ধাঁধানো শহরে— আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপের কিক-অফের জন্য আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা, তখনই আটলান্টিকের ওপারে মধ্যপ্রাচ্যের বুক চিরে বইছে বারুদের উৎকট গন্ধ। ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে এবং ১০৪টি ম্যাচে সাজানো এই সুবিশাল ফুটবল মহোৎসব যখন চূড়ান্ত প্রস্তুতির রূপরেখা টানছে, তখন ইজরায়েল, ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাত সমগ্র বিশ্বব্যবস্থাকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
আরও পড়ুন: বাংলার ডব্লিউ জি গ্রেস
ইজরায়েল ফুটবল দল এই আসন্ন বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে; কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির এক অদ্ভুত ও নির্মম সমীকরণ হল, যে দেশ মাঠের লড়াইয়ে অনুপস্থিত, সেই দেশটির ভূ-রাজনৈতিক ছায়া এবং সামরিক পদক্ষেপই আজ গোটা বিশ্বকাপ আয়োজনের সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটবল নামক ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ বরাবরই মানুষের আবেগ ও শান্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে এসেছে, কিন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল দাবার বোর্ডে ফিফা বিশ্বকাপ আজ আর কেবল এক নিছক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নেই; ইজরায়েলের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তা মানবতা, শক্তি প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম বড় রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এই মেগা ইভেন্ট কখনই তার সমসাময়িক রাজনৈতিক উত্তাপ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেনি। ক্রীড়া ও কূটনীতির এই ককটেল ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে ফিরে এসেছে। ১৯৩৪-এর ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপকে ফ্যাসিস্ট একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি ব্যবহার করেছিলেন তাঁর অহমিকাপূর্ণ জাতীয়তাবাদের বিজ্ঞাপনী প্রচার হিসেবে, যেখানে ইতালীয় কোচ ভিত্তোরিও পোজ্জোর দলকে মুসোলিনির তরফ থেকে ‘জয় অথবা মৃত্যু’ বার্তার মতো ভয়ানক মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে খেলতে হয়েছিল।
আবার ১৯৭৮-এ আর্জেন্টিনায় যখন জর্জে রাফায়েল ভিদেলার নেতৃত্বাধীন সামরিক জুন্টা ‘অপারেশন কন্ডোর’-এর অধীনে হাজার হাজার বিরোধী মতাদর্শীকে গুম করে দিচ্ছে, ঠিক তখনই মাত্র কয়েক মাইল দূরে বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টালে উঠছিল মারিও কেম্পেসের গোলের উল্লাস। এমনকি নব্বইয়ের দশকে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৭৫৭ নম্বর প্রস্তাবনার ভিত্তিতে বলকান যুদ্ধের কারণে যুগোস্লাভিয়াকে ১৯৯২ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে ও পরবর্তীতে বিশ্বকাপ থেকেও নির্বাসিত করা হয়েছিল। অতি সম্প্রতি ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের আগেও ইউক্রেন আক্রমণের জেরে রাশিয়াকে ফিফা নির্বাসিত করেছে।

কিন্তু বর্তমান ইজরায়েল-আমেরিকা-ইরান সংঘাত অতীতের সমস্ত সমীকরণকে ছাপিয়ে গিয়েছে, এর ভৌগোলিক ব্যাপ্তি, সামরিক সমীকরণ এবং সর্বোপরি আয়োজক দেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকার কারণে। ইজরায়েল যোগ্যতা অর্জন না করায় ফিফা হয়তো ইরান বনাম ইজরায়েল ম্যাচের মতো কোনও চরম কূটনৈতিক ও লজিস্টিক্যাল দুঃস্বপ্নের হাত থেকে আপাতত বেঁচে গেল, কিন্তু আয়োজক দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এই সংকটকে অন্য এক বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আমেরিকা হল ইজরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কৌশলগত মিত্র এবং প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী। আমেরিকা থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা তেল আভিভে পৌঁছায়।
২০২৬ বিশ্বকাপের মতো একটি টুর্নামেন্টে, যেখানে আশা করা হচ্ছে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষেরও বেশি দর্শক এক শহর থেকে অন্য শহরে এবং মহাদেশ পার হয়ে আকাশপথে যাতায়াত করবেন, সেখানে এই মূল্যবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে এক বিরাট অশনি সংকেত।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ‘অ্যাক্সিস অফ রেসিস্ট্যান্স’-এর নেতৃত্ব দেওয়া ইরান হল ইজরায়েলের ঘোষিত শত্রু এবং আমেরিকার প্রবল প্রতিপক্ষ। ফলত, ইজরায়েল মাঠে না থাকলেও তাদের প্রতি আমেরিকার শর্তহীন সমর্থনের কারণে গোটা টুর্নামেন্ট জুড়েই এক অদৃশ্য রাজনৈতিক উত্তাপ বজায় থাকবে, যেখানে ফুটবলের রেফারির বাঁশিও যেন দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলের শব্দের কাছে সাময়িকভাবে বধির হয়ে যেতে পারে।
অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করলে, এই সংঘাতের অভিঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই যে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে বিশ্বকাপের সফল আয়োজনের উপরেও। ফিফার ২০২৩–২০২৬ বাণিজ্যিক চক্রে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার আয়ের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তাতে বড়সড় ধাক্কা দিতে পারে। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ কেবল নির্দিষ্ট ভৌগোলিক রণাঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, নিমেষে তা ধ্বংস করে দেয় গ্লোবাল সাপ্লাই চেন বা বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলকেও। মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েল ও ইরানের প্রত্যক্ষ সংঘাতের অর্থই হল লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালীর মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথগুলোর নিরাপত্তা চূড়ান্তভাবে বিঘ্নিত হওয়া।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালী হয়েই পরিবাহিত হয়। এই অঞ্চলে সামান্যতম অস্থিরতা তাই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামকে ব্যারেল প্রতি ১২০-১৫০ ডলারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, যার প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতি বিশ্বজুড়ে এক ভয়ানক মুদ্রাস্ফীতি এবং অ্যাভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল বা বিমানের জ্বালানির লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি। ২০২৬ বিশ্বকাপের মতো একটি টুর্নামেন্টে, যেখানে আশা করা হচ্ছে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষেরও বেশি দর্শক এক শহর থেকে অন্য শহরে এবং মহাদেশ পার হয়ে আকাশপথে যাতায়াত করবেন, সেখানে এই মূল্যবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে এক বিরাট অশনি সংকেত।
অর্থনীতি যখন ধুঁকতে থাকে, তখন ভারত, ব্রেজিল, মেক্সিকো বা সেনেগালের মতো গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষের কাছে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখার জন্য আমেরিকায় পাড়ি দেওয়া প্রায় অসম্ভব বিলাসিতায় পরিণত হয়। তেলের দাম বাড়ার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপি সংকুচিত হয়, যার ফলে বিশ্বব্যাপী পর্যটন এবং ফিফার মার্চেন্ডাইজিং থেকে আয়ের বিপুল ঘাটতি দেখা দেওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা। এর পাশাপাশিই, বিশ্ব ফুটবলের বর্তমান বাণিজ্যিক কাঠামো ব্যাপকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের কর্পোরেট সংস্থা এবং সার্বভৌম তহবিলগুলোর (যেমন সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড বা কাতারের স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্ট) বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে, এই শক্তিগুলো যদি তাদের বিনিয়োগের অভিমুখ পরিবর্তন করে ক্রীড়ার বদলে নিজেদের প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার দিকে মনোনিবেশ করে, তবে বিশ্ব ফুটবলের স্পনসরশিপ ইকোসিস্টেমে এক বড় মাপের ভূমিকম্প সৃষ্টি হবে।
ইজরায়েলের অনুপস্থিতি গ্যালারিতে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন বা মার্কিন নীতির বিরোধিতাকে কোনওভাবেই আটকাতে পারবে না। বরং, আমেরিকার মাটিতে হাজার হাজার দর্শককে গ্যালারিতে প্যালেস্টাইনের পতাকা ওড়ানো, যুদ্ধবিরোধী ব্যানার প্রদর্শন বা স্লোগান দেওয়া থেকে বিরত রাখা প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে প্রায় অসম্ভব একটি কাজ হয়ে দাঁড়াবে।
নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রশ্নে মার্কিন প্রশাসন এখন এক চরম উভয়সংকটের মুখে। ইজরায়েল টুর্নামেন্টে না থাকলেও, ইজরায়েল-নীতির কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বজুড়ে ক্ষুব্ধ শক্তিগুলোর নিশানায় পরিণত। ইতিহাস ভোলেনি ১৯৭২-এর মিউনিখ অলিম্পিকে ইজরায়েলি অ্যাথলিটদের উপর ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর গোষ্ঠীর সেই নির্মম আক্রমণের কথা। প্রথাগত সন্ত্রাসবাদের পাশাপাশিই বর্তমান যুগে আবার যোগ হয়েছে সাইবার সন্ত্রাস বা অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ারের নতুন মাত্রাও।
আমেরিকার আয়োজক শহরগুলোর স্টেডিয়ামের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, গ্লোবাল ব্রডকাস্টিং নেটওয়ার্ক বা ফিফার টিকিটিং সার্ভারের উপর হ্যাকারদের আক্রমণ প্রতিহত করতে আমেরিকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং এফবিআই-কে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হচ্ছে, তা আয়োজকদের বাজেটের সমস্ত পূর্ববর্তী রেকর্ড ইতিমধ্যেই ভেঙে দিয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নাগরিক সমাজের তীব্র প্রতিক্রিয়াও। বিগত মাসগুলোয় আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে এবং রাজপথে মধ্যপ্রাচ্য নীতির প্রতিবাদে যে প্রবল বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে, তা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে, মার্কিন জনসমাজ এ বিষয়ে গভীরভাবে বিভক্ত। ফিফার নিজস্ব নিয়মের ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, মাঠে কোনও প্রকার রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত স্লোগান বা বার্তা প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী নাগরিকদের বাকস্বাধীনতার যে অবাধ ও সুদৃঢ় আইনি সুরক্ষা প্রদান করে, তার সঙ্গে ফিফার সেন্সরশিপের সরাসরি আইনি সংঘাত অবশ্যম্ভাবী।

ইজরায়েলের অনুপস্থিতি গ্যালারিতে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন বা মার্কিন নীতির বিরোধিতাকে কোনওভাবেই আটকাতে পারবে না। বরং, আমেরিকার মাটিতে হাজার হাজার দর্শককে গ্যালারিতে প্যালেস্টাইনের পতাকা ওড়ানো, যুদ্ধবিরোধী ব্যানার প্রদর্শন বা স্লোগান দেওয়া থেকে বিরত রাখা প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে প্রায় অসম্ভব একটি কাজ হয়ে দাঁড়াবে।
কূটনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে বড় নাটকীয়তা ও প্রশাসনিক দুঃস্বপ্ন তৈরি হতে পারে ইরানের ম্যাচগুলোকে কেন্দ্র করে। ইজরায়েল ছিটকে গেলেও ইরান যদি শেষ পর্যন্ত আমেরিকার মাটিতে খেলতে আসে, তবে মার্কিন স্বরাষ্ট্র দফতর কীভাবে ইরানি খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং সাংবাদিকদের নির্বিঘ্নে ভিসা প্রদান করবে, এবং তাদের সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে, তা এক বড় প্রশ্ন।
মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তি মানেই এশিয়ার ফুটবল পরিকাঠামোর অপমৃত্যু। যদি ইজরায়েল-আমেরিকা-ইরান সংঘাত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের সাপ্লাই চেন এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনকে ধ্বংস করবে।
১৯৯৮-এর ২১ জুন ফ্রান্সের লিয়ঁ শহরের স্টেড ডি জেরলান্ড-এ আমেরিকা বনাম ইরানের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচটির কথা ফুটবলপ্রেমীদের আজও মনে আছে। হামিদ এস্তিলির সেই আইকনিক গোল এবং ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সাদা গোলাপ বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ওই ম্যাচে অপরূপ শান্তির বার্তা দেওয়া হয়েছিল। আজও ক্রীড়াক্ষেত্রে তা এক মিথ। কিন্তু ২০২৬-এর এই চরম বৈরী পরিবেশে দাঁড়িয়ে পুনরায় তেমন কোনও স্পোর্টিং স্পিরিটের প্রত্যাশা করা ঘোরতর কল্পনাবিলাস। ইরানের প্রতিটি ম্যাচই পরিণত হবে এক একটি হাই-প্রোফাইল নিরাপত্তা বলয়ে, যেখানে মাঠের ফুটবলের চেয়ে মাঠের বাইরের রাজনৈতিক স্লোগান গুরুত্ব পাবে অনেক বেশি। ইজরায়েল নামক ‘অদৃশ্য প্রতিপক্ষ’-এর বিরুদ্ধে ইরানের পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, এবং আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকারই নীতির বিরোধিতা এই বিশ্বকাপকে পরিণত করবে এক ভিন্নতর স্নায়ুযুদ্ধের মঞ্চে।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ২০৩৪-এর বিশ্বকাপ, যার আয়োজক হওয়ার দৌড়ে সৌদি আরব প্রায় নিশ্চিত। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ২০৩৪-এর স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। সৌদি আরবের মতো দেশগুলো যখন তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ সফল করতে মরিয়া, তখন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ তাদের সমস্ত পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তি মানেই এশিয়ার ফুটবল পরিকাঠামোর অপমৃত্যু। যদি ইজরায়েল-আমেরিকা-ইরান সংঘাত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের সাপ্লাই চেন এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনকে ধ্বংস করবে। বিশ্বকাপের মতো ইভেন্টগুলো দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্বশান্তি এবং সহযোগিতার উপর। যখন সেই ভিতটিই নড়বড়ে হয়ে যায়, তখন ফিফার গোল্ডেন ট্রফিটাকেও মরীচিকার মতো মনে হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সভ্যতার সংকট’-এ উচ্চারিত সতর্কবাণী আজ যেন মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গনে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত রূপ ধরে ফিরে এসেছে। এমন এক রক্তস্নাত প্রেক্ষাপটে, একদিকে মৃত্যুপুরীর আর্তনাদ, আর অন্যদিকে বিলিয়ন ডলারের জাঁকজমকপূর্ণ ক্রীড়া মহোৎসব— এই দু’য়ের তীব্র নৈতিক দ্বন্দ্ব আধুনিক বিশ্বকাপকে দাঁড় করিয়েছে এক অভাবনীয় মনস্তাত্ত্বিক মোহনায়।
ফরাসি দার্শনিক অ্যালবার্ট কামু ফুটবল মাঠকে যে ‘নৈতিকতার পাঠশালা’ বলেছিলেন, তা আজ পরিণত হতে চলেছে বিশ্বজনমতের এক বিশাল ব্যারোমিটারে— যেখানে সামাজিকভাবে সচেতন কোনও ক্রীড়াবিদের একটি নীরব প্রতিবাদও নিমেষে টলিয়ে দিতে পারে কূটনীতির শক্ত ভিত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের ভেটো বা রাজনীতির দাবার চালের অনেক উর্ধ্বে উঠে মানবসভ্যতার অদম্য স্পিরিট আজও বেঁচে থাকে ওই বাইশজনের বল পায়ে ছুটে চলার নির্মল আনন্দে। তাই বিশ্বকাপের দোরগোড়ায়, এই উৎকণ্ঠিত প্রহরে বিশ্বজুড়ে অগণিত ফুটবলপ্রেমীর আজ একটাই প্রার্থনা— খণ্ডিত, রক্তাক্ত এই পৃথিবীতে ফুটবলই হয়ে উঠুক ঐক্যের সেই জাদুকরী সুতো, যা ভূ-রাজনীতির চোখে চোখ রেখে স্পর্ধার সঙ্গে প্রমাণ করবে, বন্দুকের নলের চেয়ে মানুষের ঐক্যের জোর অনেক বেশি; আর ধ্বংসের চেয়ে সৃষ্টি ও মিলনই সভ্যতার সবচেয়ে সুন্দর ও শাশ্বত সত্য।
তথ্যসূত্র
১। অরওয়েল, জর্জ। ‘দ্য স্পোর্টিং স্পিরিট’ (১৯৪৫)
২। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিসংখ্যান
৩। কামু, অ্যালবার্ট। ‘হোয়াট আই ও টু ফুটবল’ (১৯৫৭)
৪। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। ‘সভ্যতার সংকট’ (১৯৪১)
৫। ফিফা নিয়মাবলি। ৪ নম্বর ধারা
৬। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল ও সামরিক তথ্য। ইজরায়েলকে প্রতি বছর ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা প্রদান
৭। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান। প্রথম সংশোধনী
৮। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ। প্রস্তাবনা ৭৫৭ (যুগোস্লাভিয়া নির্বাসন, ১৯৯২)
৯। সৌদি আরবের সরকারি নীতি। ‘ভিশন ২০৩০’ (ক্রীড়া ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপরেখা)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত