(Allen Ginsberg)
এই শহরের মায়াভরা পথে যাঁরা হেঁটেছেন অনেকটা দূর, তাঁদের মনে পড়বে সেই বিট-বংশের কথা। যার প্রধান মুখ অ্যালেন গিনসবার্গ আজ পৌঁছলেন শততম জন্মদিনে।
পৌঁছলেন বললে অবশ্য একটা সাম্প্রতিকের ছোঁয়া লাগে। মনে হয় যেন তাঁর অস্তিত্ব আজও ছুঁয়ে আছে এই শহরকে। আছে। ধুলোমাখা স্মৃতির মতো। নইলে, আপাতভাবে, আজকের তরুণের স্বপ্নে কিংবা বিদ্রোহে অ্যালেন নিতান্তই এলিয়েন।
আরও পড়ুন: ছাপা-সুন্দরীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ
অথচ একদিন, কফিহাউসের ধোঁয়াটে আড্ডায় জ্যাক কেরুয়াক বা অ্যালেন গিন্সবার্গ নামগুলো ছিল যেন বিদ্রোহের ইশতেহার। অ্যালেন যখন কলকাতায় এলেন, তখন যেন আন্তর্জাতিক বোহেমিয়ানিজমের সঙ্গে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সেই রুক্ষ, অকৃত্রিম বোহেমিয়ান জীবনের এক আশ্চর্য সেতু তৈরি হয়ে গেল। কলকাতার অলি-গলি-পাকস্থলির সেই অস্থির তারুণ্যের কবিতা প্রতিচ্ছবি দেখল গিনসবার্গের কবিতায়।

যাবই, আমি ভারতবর্ষে যাবই। আমেরিকায় যখন তাঁর দেখা হল দেশান্তরী বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে, তখন প্রায় এমন করেই বলছিলেন অ্যালেন, ‘পিট আর আমি বুধবারে বেরোচ্ছি এখান থেকে: প্রথমে প্যারিস, তারপর— জানি না। কিন্তু এ-কথা ঠিক জানবেন যে সারা পথ হাঁটতে হ’লেও ভারতবর্ষে আমরা একদিন পৌঁছবোই, আপনাদের সঙ্গে কলকাতায় আবার দেখা হবে।’
দেখা হয়েছিল। শুধু বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে নয়, কলকাতার সঙ্গে। আর সেই মত্ত অবস্থায় কলকাতা-শাসন-করা যুবকদের সঙ্গেও। ১৯২৬ সালের ৩ জুন নিউ জার্সিতে জন্ম নেওয়া শিশুটি আমেরিকার কবিতা-মানচিত্রটাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে ভালবেসেছিলেন কলকাতাকে, তাকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষকেই। বিশ শতকের সেই ষাটের দশকে আমেরিকার পুঁজিবাদী ইঁদুর দৌড়, ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রাক-প্রস্তুতি আর কনজ্যুমারিজমের দমচাপা হাওয়ায় হাঁফিয়ে উঠে আত্মার মুক্তি চেয়েছিল ‘বিট জেনারেশন’। জ্যাক কেরুয়াক, উইলিয়াম এস বারোজ এবং তাঁদের অন্যতম প্রধান মুখ অ্যালেন গিনসবার্গ।

‘Beat’, ‘Beatitude’: এই দুটি শব্দের যমকে এঁদের নামকরণ’ লিখছেন বুদ্ধদেব বসু, ‘বীটবংশ বলতে চান যে তাঁরা সমাজের কাছে স্বেচ্ছায় হেরে গেছেন, এবং তাঁরা পুণ্যের পিয়াসী। এক সাংবাদিক একবার বিদ্রূপ ক’রে এঁদের যে-আখ্যা দিয়েছিলেন, সেই ‘beatnik’ও এখন মার্কিনি শব্দকোষের অন্তর্ভূত। আন্দোলনের সূত্রপাত হয় সান ফ্রান্সিস্কোতে, তখন ১৯৫৬ সাল; মাত্র পাঁচ বছরে এই ‘পরাজিত’রা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহদাকার দেশে যেরকমভাবে জয়ী হয়েছেন, তার তুলনা সাহিত্যের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া শক্ত।’
সেই অমনি-আসা-টানেই ১৯৬২ সালে সঙ্গী পিটার অরলভস্কিকে নিয়ে তিনি পা রাখলেন ভারতে। তাঁর সেই ভারতভ্রমণের এপিসেন্টার হয়ে উঠল কলকাতা। কফি হাউসের কোলাহলে মিশলেন লড়াই করা তরুণ কবিদের সঙ্গে।
অবশ্য সমাজ যেমন তাঁরা মানতেন না, জয়-পরাজয়ের হিসেবও তাঁরা করেননি। কবিতাও তাঁরা হিসেব করে লেখেন না। যেমন আছ তেমনি এসো, এই তাঁদের কবিতার কাছে আবেদন। গিনসবার্গের ‘হাউল’ (Howl) তখন মার্কিন সমাজের ঝুঁটি নেড়ে দিয়েছে। তিনি নিজেই বলছেন বুদ্ধদেব বসুকে, ‘জানেন আমি কী চাই? আমি চাই প্রেরণা, চাই স্বর্গ খুলে যাক আমার সামনে, আমি ভগবানকে চাই। আমার “Howl” কবিতা এক বৈঠকে লিখেছিলাম, শুক্রবার রাত্তিরে আরম্ভ ক’রে যখন শেষ করলাম তখন রবিবার সকাল। না, আমি যা লিখি তা কখনও কাটি না, বদলাই না কিছু, কোনও মাজা-ঘষা করি না, আমার যখন আসে তখন অমনি আসে।’

সেই অমনি-আসা-টানেই ১৯৬২ সালে সঙ্গী পিটার অরলভস্কিকে নিয়ে তিনি পা রাখলেন ভারতে। তাঁর সেই ভারতভ্রমণের এপিসেন্টার হয়ে উঠল কলকাতা। কফি হাউসের কোলাহলে মিশলেন লড়াই করা তরুণ কবিদের সঙ্গে। সুনীল তখন জীবিকার সন্ধানে অহোরাত্র— সকালে টিউশনি, দুপুরে কেরানিগিরি আর রাতে খবরের কাগজ দপ্তরে পার্টটাইম কাজ। সঙ্গে কৃত্তিবাস সম্পাদনার জেদ, সেই সময়ের আসল সুর ছিল এটাই।
নিমতলা শ্মশানে রাত কাটাতেন অ্যালেন। সে ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় জায়গা। সাধুদের সঙ্গে হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে তত্ত্ব আলোচনা করতেন। জীবনের এই নগ্ন, রূঢ় রূপ তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। পিটার অরলভস্কিকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন তারাপীঠে। বামাখ্যাপার সাধনপীঠে গিয়ে তন্ত্র এবং শ্মশান-বৈরাগ্যের এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান পান। বাংলার বাউলদের সঙ্গেও গভীর আত্মিক যোগ তৈরি হয়েছিল। বাউলদের দেহতত্ত্ব, তাঁদের গানে ঈশ্বরকে ‘মনের মানুষ’ হিসেবে খোঁজার যে দর্শন, মুগ্ধ হয়েছিলেন তার টানে। নিজেকে বলতেন ‘আমেরিকান বাউল’। বেনারস, পুরী, কলকাতা চষে বেড়িয়ে এই মানুষটি আসলে নিজের ভেতরের শূন্যতাকেই পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন বাংলার মাটি দিয়ে।

সুনীল লিখেছেন সেই স্মৃতি, ‘আমাদের দেশে সাধু-সন্ন্যাসী, সঙ্গীতশিল্পী থেকে রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালারা পর্যন্ত অনেকেই গাঁজায় দম দেয় বহু যুগ ধরে, মধ্যবিত্তদের মধ্যে তা ছিল ঘৃণার বস্তু। মধ্যবিত্ত এমনকী উচ্চবিত্ত সমাজের ছেলেমেয়েরা গাঁজা টানতে শেখে সাহেবদের কাছ থেকে। প্রথমে বিট জেনারেশন, পরবর্তীকালে তাদেরই বংশধর হিপিরা গাঁজার ধোঁয়াকে জাতে তুলে দেয়। ভিয়েতনামে আমেরিকানদের অন্যায্য ও অমানবিক যুদ্ধের প্রতিবাদেই হিপি সম্প্রদায়ের উদ্ভব এবং তারা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। অ্যালেন গিন্সবার্গকে তারা গুরু বলে মেনেছিল, তার কাছ থেকে ওরা প্রধানত তিনটি জিনিস নেয়, রাস্তাঘাটে শুয়ে থাকার মতন কষ্টসহিষ্ণুতা, গাঁজা ও ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ গান।’
সুনীল লিখেছেন, ‘অ্যালেন আর পিটার প্রথমে এসে উঠেছিল চাঁদনি বাজারের কাছে আমজাদিয়া নামে একটি অতি নিম্নমানের হোটেলে, স্যাঁতসেঁতে ঘর, দেওয়ালে ময়লা দাগ, জানলা বন্ধ হয় না, বিছানা ভর্তি ছারপোকা। শৌচাগারটি এমনই নোংরা ও কদর্য যে আমাদেরও গা ঘিনঘিন করে, হাতল ভাঙা মগটিও শ্যাওলা ধরা।’
সুনীলের কথায়, ‘এ ব্যাপারে আমারও সামান্য কৃতিত্ব আছে। অ্যালেন হরে কৃষ্ণ গানটি প্রথম শোনে কাশীতে, কিন্তু সুরটি ঠিক তুলতে পারছিল না। তার অনুরোধে এক রাত্রে ওই দু’লাইন গান অন্তত পঞ্চাশবার গেয়ে শোনাতে হয়। আমি বারবার তাকে শুধরে দিয়েছি, হড়ড়ড়ে কৃস্সা নয়, হরে কৃষ্ণ, ড়্যাম নয়, রাম…। অর্থাৎ হিপিদের গুরু অ্যালেন গিন্সবার্গ, আমি অ্যালেন গিন্সবার্গের ওই গানের গুরু বলা যেতে পারে। ও গান তো আর আমাদের শিখতে হয় না, বাল্যকাল থেকে শুনে শুনে কানে গেঁথে যায়।’
এই কলকাতা-পর্ব কেবল গিনসবার্গের জীবনে নয়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সেকালের ‘হাংরি জেনারেশন’-এর তরুণ তুর্কিদের সঙ্গে তাঁর সেই নিবিড় সখ্য বাংলা কবিতায় এক নতুন মাত্রার জন্ম দিয়েছিল। কলকাতা গিনসবার্গকে কী দিয়েছিল? এক কথায় বললে— আশ্রয়। আমেরিকার এক ‘বিদ্রোহী’ কবি, যাঁকে তাঁর স্বদেশের প্রশাসন সন্দেহের চোখে দেখে, তিনি এসে উঠলেন কলকাতার চৌরঙ্গী সংলগ্ন ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের এক সস্তা হোটেলে।

সুনীল লিখেছেন, ‘অ্যালেন আর পিটার প্রথমে এসে উঠেছিল চাঁদনি বাজারের কাছে আমজাদিয়া নামে একটি অতি নিম্নমানের হোটেলে, স্যাঁতসেঁতে ঘর, দেওয়ালে ময়লা দাগ, জানলা বন্ধ হয় না, বিছানা ভর্তি ছারপোকা। শৌচাগারটি এমনই নোংরা ও কদর্য যে আমাদেরও গা ঘিনঘিন করে, হাতল ভাঙা মগটিও শ্যাওলা ধরা। শ্বেতাঙ্গ, তায় আমেরিকান, তারা যে এমন কষ্টসহিষ্ণু হতে পারে তা আমাদের ধারণায় ছিল না। ওদের দেশে অনেক গণ্ডা ফাউন্ডেশন, নানাভাবে অর্থ সাহায্য করে, বিট জেনারেশনের কেউ তাদের দ্বারস্থ হবে না, সরকারি অনুগ্রহও নেবে না। শুধু বই বিক্রির টাকায় পিটারসহ অ্যালেনের বিশ্বপরিভ্রমণ। যতই বিক্রি হোক, চটি কবিতার বই, তার দামও সামান্য। এই আত্মনিগ্রহও যেন সাধনা। অ্যালেন প্রায়ই বলত, কবিতা রচনা চব্বিশ ঘণ্টার কাজ, সুতরাং অন্য কোনও জীবিকা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’
গিনসবার্গের কলকাতা বাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়টি বোধহয় ‘হাংরি জেনারেশন’ বা হাংরিয়ালিস্টদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলা সাহিত্যের তথাকথিত ‘ভদ্রলোকী’ বা প্রাতিষ্ঠানিক খোলসটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া। তাঁদের কবিতায় উঠে আসছিল অবদমিত যৌনতা, তীব্র হতাশা, বেকারত্ব এবং রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের প্রবল অনাস্থা। গিনসবার্গের সঙ্গে মলয় রায়চৌধুরীর যোগাযোগ হয়। গিনসবার্গ হাংরিদের কবিতা ও ইশতেহার পড়ে চমকে ওঠেন। তিনি বুঝতে পারেন, এই তরুণদের ক্ষোভের ভাষা আমেরিকার বিট জেনারেশনের ক্ষোভের মতোই অকৃত্রিম।
লাখ লাখ ছিন্নমূল মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশা, ক্ষুধার্ত শিশু, কাদায় লুটোপুটি খাওয়া মানুষের হাহাকারের দলিল হয়ে আছে তাঁর বিখ্যাত কবিতা, যা পরে গানে রূপান্তরিত হয়— ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’, বব ডিলান পরে যে গান গেয়েছিলেন।
আমেরিকার ‘হাউল’ আর বাংলার ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ যেন একই মুদ্রার দুই পিঠ। মলয় রায়চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে গিনসবার্গ তাঁদের সাহিত্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন, এবং তাঁদের লেখা পাশ্চাত্যের সাহিত্য জগতে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। হাংরিদের বিরুদ্ধে যখন পুলিশি ধরপাকড় শুরু হল, তাঁদের কবিতা ‘অশ্লীল’ অভিযোগে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা হল, তখন গিনসবার্গ তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কারণ, কয়েক বছর আগেই আমেরিকায় তাঁর ‘হাউল’ কবিতাকেও ঠিক একইরকম অশ্লীলতার দায়ে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল।

কলকাতা ছাড়ার পরও গিনসবার্গের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আবার ফিরে এসেছিলেন। সোজা চলে গিয়েছিলেন বনগাঁ সীমান্তে, উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে। সেখানে লাখ লাখ ছিন্নমূল মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশা, ক্ষুধার্ত শিশু, কাদায় লুটোপুটি খাওয়া মানুষের হাহাকারের দলিল হয়ে আছে তাঁর বিখ্যাত কবিতা, যা পরে গানে রূপান্তরিত হয়— ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’, বব ডিলান পরে যে গান গেয়েছিলেন। আমেরিকার বিটপ্রজন্মের কবি এ ভাবেই হয়ে উঠলেন বেড়াভাঙা বাঙালির যন্ত্রণার আন্তর্জাতিক ভাষ্যকার।
শতাব্দী পেরিয়েছে, মানুষের মূল ছিন্ন থেকে ছিন্নতর হয়েছে। হয়তো নতুন করে গিনসবার্গের কবিতার সেই বন্য, আদিম চিৎকার প্রস্তুত হচ্ছে গঙ্গার ধারের এই ধুলোমাখা জাদুনগরীতে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত