(Rabindranath Tagore Printing)
‘এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে।’ কথাগুলো লিখেছিলেন ১৮৮৬ সালে, ‘লাইব্রেরি’ প্রবন্ধে। ‘কাগজের কারাগার’ থেকে ক্রমে ‘মানবাত্মার অমর আলোক’কে মুক্তি দিতে দিতে চলাটাই রবীন্দ্রনাথের বই-ভাবনার মূল সুর। বই যে কেবল বাঁধাই করা ছাপা কাগজ নয়, বরং আলোর এক উৎস, সেই কথাই বার বার ছুঁয়ে যায় তাঁর বইভাবনায়।
বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগের সহকারী সচিব কিশোরীমোহন সাঁতরাকে লেখা রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলি (১৯২৫-১৯৪০) এবং সমকালীন প্রকাশনা ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় গ্রন্থনির্মাণ, প্রচ্ছদ পরিকল্পনা, প্রুফ সংশোধন, বানানবিধি এবং প্রকাশনা শিল্প নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার নেপথ্যে বাস করতেন এক বড় অর্থের কবি ও পথিক।
আরও পড়ুন: আবির আবিরাবীর্ম এধি!
রবীন্দ্রনাথ কোনওদিনই বিদ্যাসাগরের মতো পুরোদস্তুর ‘বই-ব্যবসায়ী’ হয়ে উঠতে চাননি। কিন্তু, স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ব্রহ্মচর্যাশ্রম ও বিশ্বভারতীর বিপুল ব্যয়নির্বাহের জন্য নিজের লেখক সত্তাকে বিশ্বভারতীর গ্রন্থনবিভাগের কাছে একপ্রকার বন্ধক রেখেছিলেন। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে একটি চিঠিতে স্পষ্টই জানিয়েছিলেন, ‘জমিদারী ছাড়া প্রায় আমার সমস্ত আয় বিশ্বভারতীর। সেইজন্যে শেষ কালটায় লেখার ব্যবসা ধরতে হোলো।’

ইন্ডিয়ান প্রেসের মালিক চিন্তামণি ঘোষকে ১৯২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর এক ঐতিহাসিক পত্রে রবীন্দ্রনাথ জানান, তিনি তাঁর সমস্ত বাংলা বইয়ের স্বত্ব বিশ্বভারতীর হাতে অর্পণ করে সম্পূর্ণ নিষ্কৃতি পেতে চান। দীর্ঘ আলোচনার পর, ইন্ডিয়ান প্রেসের কাছে থাকা রবীন্দ্রনাথের মুদ্রিত বইয়ের মজুত মূল্য ৭৮,০০০ টাকা নির্ধারিত হলেও, চিন্তামণি ঘোষ বিশ্বভারতীর মঙ্গলকামনায় মাত্র ২৬,০০০ টাকার বিনিময়ে সমস্ত বই ও স্বত্ব বিশ্বভারতীকে হস্তান্তর করেন।
১৯১৭ সালে আমেরিকার লিঙ্কন শহরের অধিবাসীরা রবীন্দ্রনাথকে ‘দ্য লিঙ্কন প্রেস’ নামের একটি মুদ্রণযন্ত্র উপহার দিয়েছিলেন, যা শান্তিনিকেতনে স্থাপিত হয়ে ‘শান্তিনিকেতন প্রেস’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই প্রেস থেকেই ১৯২৩ সালে বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়ের (পরবর্তীকালে যা গ্রন্থনবিভাগ) প্রথম প্রকাশিত বই রবীন্দ্রনাথের ‘বসন্ত’ নাটিকা। পরে মুদ্রণ, কাগজ, কালি ও বিপণনের সুবিধার জন্য গ্রন্থনবিভাগের প্রধান কার্যালয় কলকাতার ২১0 কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট, এবং আরও পরে জোড়াসাঁকোর ‘বিচিত্রা’য় স্থানান্তরিত হয়।
১৯২৩ সালের কিছু পরে কিশোরীমোহন সাঁতরা প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের সূত্রে এই গ্রন্থনবিভাগের সঙ্গে যুক্ত হন, এবং ক্রমশ রবীন্দ্রনাথের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। যাবতীয় গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে কিশোরীমোহন ছিলেন কবির প্রধানতম ভরসাস্থল।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘সেকালের কথা’তে প্রথম হাফটোন ব্লকের ব্যবহার বা নন্দলাল বসুর আঁকা ‘চয়নিকা’র গাছের মোটিফযুক্ত প্রচ্ছদ এবং ‘সহজ পাঠ’-এর অবিস্মরণীয় অলংকরণ বাংলা প্রকাশনায় এক নতুন নান্দনিকতার জন্ম দিয়েছিল।
বিশ শতকের গোড়ায় বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘সেকালের কথা’তে প্রথম হাফটোন ব্লকের ব্যবহার বা নন্দলাল বসুর আঁকা ‘চয়নিকা’র গাছের মোটিফযুক্ত প্রচ্ছদ এবং ‘সহজ পাঠ’-এর অবিস্মরণীয় অলংকরণ বাংলা প্রকাশনায় এক নতুন নান্দনিকতার জন্ম দিয়েছিল। তবে গ্রন্থের বহিরঙ্গ বা প্রচ্ছদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের এক নিজস্ব দার্শনিক অবস্থান ছিল। পরিণত বয়সে তিনি এক আশ্চর্য পরিমিতিবোধের দিকে ঝোঁকেন।
১৯১৬ সালে জাপান ভ্রমণের সময় সেখানকার স্থাপত্য, অন্দরসজ্জা এবং শিল্পে পরিমিতিবোধ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তার প্রত্যক্ষ প্রভাব এসে পড়ে গ্রন্থভাবনায়। কিশোরীমোহন সাঁতরাকে ১৯৩৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এক চিঠিতে ‘বীথিকা’ কাব্যের প্রচ্ছদ নিয়ে তিনি যে নির্দেশ দিচ্ছেন, তা এই নন্দনতাত্ত্বিক পালাবদলের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ— ‘মলাটে সাদা অক্ষরে ‘বীথিকা’ যেন লেখা থাকে, আমি অলঙ্কৃত করে দেবো না। এই রকম সাজসজ্জা বাঙালে রুচি, নিজের বই সম্বন্ধে নতুন লেখকের গদগদ স্নেহের সোহাগ এতে প্রকাশ পায়।’

এখানে তিনি একটি অসামান্য রূপক ব্যবহার করেছেন, যা তাঁর গ্রন্থভাবনার আন্তর্জাতিক মানকে চিনিয়ে দেয়— ‘জাপানীরা তলোয়ারে কারুকার্য্য করে, খাপ রাখে অত্যন্ত সাদা, যেহেতু তারা আর্টিস্ট—যদিচ পূর্ববঙ্গ পেরিয়েও পূর্ব্বতর দেশে তাদের জন্ম।’ অর্থাৎ, তরবারি বা মূল রচনাই হল আসল তীক্ষ্ণতা, তার খাপ বা প্রচ্ছদ হবে আড়ম্বরহীন।
নিজের ছবি বইয়ে বারবার ব্যবহারেও তীব্র অনীহা তৈরি হয়েছিল। ‘ছেলেবেলা’ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘নিজের ছবি আমি আর দিতে চাই নে, লজ্জা বোধ হয়। রচনাবলী তো কিলবিল করচে ছবিতে। আর কেন?’ এই নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে দেয়, তিনি বইকে ব্যক্তিসর্বস্ব না করে বিষয়সর্বস্ব করতে চেয়েছিলেন। বিশ্বভারতীর বইগুলি থেকে নামের পূর্বে ব্যবহৃত ‘শ্রী’ শব্দটিও তিনি তুলে দিয়েছিলেন, যা নামহীনতার সংস্কৃতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বিশেষ করে ‘বিশ্বপরিচয়’ বা ‘বাংলাভাষা পরিচয়’-এর মতো বিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। কিশোরীমোহনকে সতর্কবাণী দিয়েছিলেন, ‘মনে রেখো ওটা বিজ্ঞানের বই— ভুল থাকা অমার্জনীয়’।
প্রুফ নিয়ে তাঁর খুঁতখুঁতে স্বভাব ছিল প্রবাদপ্রতিম। একজন দক্ষ প্রুফ রিডার কেবল বানান ভুল দেখেন না। বরং, শব্দের অর্থ, বাক্যগঠন এবং বহিরঙ্গের সৌন্দর্যের প্রতিও দৃষ্টি রাখেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে একটি ভুল শব্দ বা যতিচিহ্ন শারীরিক যন্ত্রণার সমতুল্য ছিল।
বিশেষ করে ‘বিশ্বপরিচয়’ বা ‘বাংলাভাষা পরিচয়’-এর মতো বিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। কিশোরীমোহনকে সতর্কবাণী দিয়েছিলেন, ‘মনে রেখো ওটা বিজ্ঞানের বই— ভুল থাকা অমার্জনীয়’। ‘বিশ্বপরিচয়’ তৃতীয় সংস্করণে ‘খুদে খুদে ছাপার ভুল’ দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, এবং চতুর্থ সংস্করণে নিজ হাতে সংশোধন করার তাগিদ অনুভব করেছিলেন।
মুদ্রণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের, বিশেষত সুধীরচন্দ্র করের কর্মপদ্ধতি নিয়ে তিনি প্রায়ই বিরক্ত হতেন। পরিহাস করে সুধীর করকে ‘বাঙাল’ বলতেন, এবং তাঁর একগুঁয়েমি নিয়ে কিশোরীমোহনকে লিখতেন— ‘ছাপাখানা আনাড়ি এবং সুধীর কর বাঙাল। দূরের থেকে তুমি যে সেনাপতিত্ব করবে তা চলবে না।’
বই ছাপার কাজ আটকে থাকলে তাঁর নিজেকে ‘home internment’-এ বা গৃহবন্দি মনে হত। পাণ্ডুলিপি থেকে মুদ্রিত বইয়ে রূপান্তরের মধ্যবর্তী সময়টি তাঁর কাছে ছিল এক অবর্ণনীয় মানসিক চাপের সময়। ‘খাপছাড়া’ এবং ‘সে’ বইয়ের মুদ্রণ থেকে যতদিন না মুক্তি পাচ্ছেন, ততদিন নিজের মুক্তি নেই বলে ঘোষণা করেছিলেন তিনি।

গ্রন্থ সম্পাদনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হল বানানবিধি। ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যখন বাংলা বানানের নিয়ম স্থির করার জন্য একটি কমিটি গঠন করে (সভাপতি ছিলেন রাজশেখর বসু), তখন রবীন্দ্রনাথ সাধারণভাবে তা সমর্থন করলেও, অন্ধভাবে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। তাঁর বানান-ভাবনা ছিল ধ্বনিমাধুর্য, এবং বাংলা ভাষার নিজস্ব প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল।
১৯৩৭ সালের ১৩ জুলাই কিশোরীমোহনকে লেখা চিঠিতে স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দের বানান নিয়ে যে ভাষাতাত্ত্বিক যুক্তি দিয়েছেন, তা তাঁর গভীর প্রজ্ঞার পরিচায়ক। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘গয়লানী প্রভৃতি শব্দে আমি দীর্ঘ ঈ দিই নে তার কারণ এ প্রত্যয় সংস্কৃত প্রত্যয় নয়। এক হিসাবে প্রাকৃত বাংলায় স্ত্রীলিঙ্গের প্রত্যয় নেই… বাঘিনী সংস্কৃত ব্যাকরণ মতে শুদ্ধ নয়… বস্তুত বাঘিনী ছাড়া কোনও জন্তুশব্দের স্ত্রীলিঙ্গ বাংলায় দুর্লভ। তাঁর মতে, তৎসম শব্দে দীর্ঘ ‘ঈ’ দিতে আমরা বাধ্য হলেও, তদ্ভব শব্দে খাস বাংলা নিয়ম অর্থাৎ হ্রস্ব ‘ই’ প্রযুক্ত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘তদ্ভব শব্দে আমাদের স্বরাজ খাটবে না কেন?’
তিনি জানতেন, মুদ্রিত গ্রন্থই ভাষার এই প্রমিত রূপকে যুগ যুগ ধরে বহন করবে। তাই বানান সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্ধ অনুকরণের বদলে, বাংলার নিজস্ব ধ্বনিপ্রকৃতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
এই ভাষাতাত্ত্বিক স্বাধিকারবোধ থেকে প্রমাণিত, তিনি কেবল ভাষার সৌন্দর্য নিয়েই ভাবতেন না, ভাষার বিবর্তন ও বৈজ্ঞানিক কাঠামোর প্রতিও তাঁর প্রখর দৃষ্টি ছিল। তিনি জানতেন, মুদ্রিত গ্রন্থই ভাষার এই প্রমিত রূপকে যুগ যুগ ধরে বহন করবে। তাই বানান সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্ধ অনুকরণের বদলে, বাংলার নিজস্ব ধ্বনিপ্রকৃতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
বইয়ের দাম নির্ধারণ এবং পাঠকের কাছে তার সহজলভ্যতার প্রশ্নে ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল। শিক্ষা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যায়তনের চার দেওয়ালে আবদ্ধ থাকলে চলবে না, তা রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। এই উদ্দেশ্যেই তাঁর প্রচেষ্টায় বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’ এবং ‘বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ’ নামে দুটি যুগান্তকারী প্রকল্প হাতে নেয়।
‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’-র ১৩টি এবং ‘বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ’-এর ১৩৩টি মিতায়তন পেপারব্যাক গ্রন্থ মূলত সেইসব সাধারণ পাঠকের জন্য, যাঁরা প্রথাগত উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাননি, অথচ জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী। চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যের সহযোগিতায় এই গ্রন্থগুলি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান ও সমাজবিদ্যা চর্চার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

বইয়ের মূল্য নিয়ে তাঁর সংবেদনশীলতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ‘গীতবিতান’-এর স্বরলিপি গ্রন্থ। তিনি নিজের প্রাপ্য ১২.৫ শতাংশ রয়্যালটি ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। এর পেছনে কোনও ব্যবসায়িক হিসাব ছিল না, ছিল সুদূরপ্রসারী এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষার তাগিদ।
১৯৩৪ সালের ৭ মার্চ এক চিঠিতে লিখছেন— ‘জিনিষটা কেবলমাত্র লাভলোকসানের ব্যাপার নয়—এতে আমার নিজের ব্যক্তিগত দরদ আছে— আমার রচিত গানের সুরগুলি রক্ষা করবার যোগ্য বলেই আমি কল্পনা করি— আমার কাব্যের কোনো কালে অনাদর হতেও পারে কিন্তু বাংলাদেশের লোককে সুখে দুঃখে আমার গান গাইতেই হবে— সেই গানের সুরগুলি যদি বিকৃত বা লুপ্ত হয় তবে তাতে দেশের ক্ষতি এ আমি অহঙ্কার করেই বলতে পারি— অতএব স্বরলিপি থেকে আমি আর্থিক লাভ করতে চাই নে।’ এই একটিমাত্র বয়ানই স্পষ্ট করে দেয়, তিনি গ্রন্থকে কেবল পণ্য হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন জাতীয় সংস্কৃতির সংরক্ষক হিসেবে।
নিজের গ্রন্থ প্রকাশের পাশাপাশি অন্যান্য সংকলন গ্রন্থ এবং পাঠ্যপুস্তক সম্পাদনার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এক নির্মম ও তীক্ষ্ণ বিচারক। ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ সম্পাদনার সময় তিনি কিশোরীমোহন এবং অন্যান্য সহকারীদের (যেমন কাননবিহারী মুখোপাধ্যায়, নন্দগোপাল সেনগুপ্ত) যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা থেকে সমকালীন সাহিত্যিকদের সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংকলনের মানদণ্ডের স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
নিজের কবিতা সম্পর্কেও তাঁর উক্তি ‘চয়নিকার প্রথম দুটি কবিতা চলতেই পারে না। ছেলেমানুষিকে আমার নামে প্রচার কোরো না… চয়নিকায় বিস্তর বাজে মাল আছে—লজ্জা বোধ করি।’নিজের রচনার এই নির্মম বিশ্লেষণ একমাত্র প্রকৃত স্রষ্টার পক্ষেই সম্ভব।
প্রথমত, তিনি কবিতায় অশ্লীলতা বা ‘আদিরস’-এর প্রয়োগ নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। ময়মনসিংহগীতিকা থেকে কবিতা নির্বাচনের সময় প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আদিরস বাঁচাতে হলে সমগ্র তোলা যায় কি?’ কোনও নবীন কবির (যেমন চিঠিতে উল্লিখিত ‘সুরেশ বাড়ুজ্জে’) লেখায় ‘ঘোরতর আদিরসিকতা’ থাকলে, তিনি তা বর্জন করার পক্ষপাতী ছিলেন।
দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত সম্পর্কের উর্ধ্বে উঠে সাহিত্যের মান বিচার করা তাঁর স্বভাব ছিল। জীবনময় রায়ের কবিতা সম্পর্কে তিনি নির্মোহভাবে জানান, ‘জীবনের কবিতা আমি ওর খ্যাতির খাতিরে নিই নি— নিয়েছিলুম বন্ধুত্বের খাতিরে। ভুল করেছিলুম, ভুল ভাঙতে কতক্ষণ।’ হাস্যরসের প্রতি তাঁর গভীর পক্ষপাত ছিল। তাই সুকুমার রায়ের ‘গোঁফচুরি’, ‘রামগরুড়ের ছানা’ অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘বাঁশিওয়ালা’ কবিতাটি মেয়েদের প্রিয় উল্লেখ করে তা সঞ্চয়িতায় যোগ করার নির্দেশ দেন। আবার উপেন্দ্র গাঙ্গুলি ও সুবোধ রায়ের কবিতা ‘কাঁচা’ ও ‘জটিল’ আখ্যা দিয়ে সংকলনে বর্জনের নির্দেশ দেন। এমনকি নিজের কবিতা সম্পর্কেও তাঁর উক্তি ‘চয়নিকার প্রথম দুটি কবিতা চলতেই পারে না। ছেলেমানুষিকে আমার নামে প্রচার কোরো না… চয়নিকায় বিস্তর বাজে মাল আছে—লজ্জা বোধ করি।’নিজের রচনার এই নির্মম বিশ্লেষণ একমাত্র প্রকৃত স্রষ্টার পক্ষেই সম্ভব।

নবীন কবিদের কাছ থেকে চিঠি লিখে কবিতা সংগ্রহ করার পদ্ধতিটি তাঁর অপছন্দ ছিল। তিনি মনে করতেন, ‘কবিরা যা পাঠাবেন আমরা তা যদি গ্রহণ না করি তাহলে অনর্থক একটা অভিমানের সৃষ্টি হবে।’ সমকালীন কবিদের (যেমন যতীন্দ্রমোহন বাগচী বা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত) মান-অভিমান সামলাতেও তাঁকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। পরে চিঠিতে ‘কবি জাতটাই খুঁতখুঁতে’ বলে আক্ষেপ করেছেন।
মুদ্রণের পর একটি গ্রন্থ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিপণন কৌশল নিয়েও রবীন্দ্রনাথ ওয়াকিবহাল ছিলেন। বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ অনেক সময় বই ছাপিয়ে তা ফেলে রাখত। যথাসময়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে বা পত্রিকায় পর্যালোচনার জন্য পাঠাত না। ‘শান্তিনিকেতন’ বইটি ১১ই মাঘ উৎসবের সময় বিক্রি না হওয়ায়, এবং নন্দলাল বসুকে দামের উল্লেখসহ রসিদ পাঠানোয়, তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। লিখেছিলেন, ‘এগারই মাঘে বইটা কি টেকনিকাল ভাবেই বেরিয়েছে? যথোচিত সময়ে যথেষ্ট পরিমাণে বেরতে পারত যদি… এদের অনর্থক পত্রব্যবহার না করতে হত!’
‘যুগান্তরের মতো দৈনিক কাগজের সমালোচনার হাটের দর বেশি—প্রবোধ সান্যাল আমার একজন ভক্ত পাঠক, তাকে বই পাঠালে প্রবাসীর চেয়ে তোমাদের ব্যবসার সুবিধে হবে এতে সন্দেহ নেই।’
সংবাদপত্রে গ্রন্থসমালোচনা সম্পর্কে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। ‘যুগান্তর’ পত্রিকার মতো বহুল প্রচারিত দৈনিকে তাঁর বই পর্যালোচনার জন্য না পাঠানোয়, গ্রন্থনবিভাগকে ভর্ৎসনা করেন— ‘যুগান্তরের মতো দৈনিক কাগজের সমালোচনার হাটের দর বেশি—প্রবোধ সান্যাল আমার একজন ভক্ত পাঠক, তাকে বই পাঠালে প্রবাসীর চেয়ে তোমাদের ব্যবসার সুবিধে হবে এতে সন্দেহ নেই।’
এমনকি ‘তাসের দেশ’ অভিনয়ের পূর্বে তিনি চেয়েছিলেন বইটির একটি সমালোচনা সুভাষচন্দ্র বসুর মতো ব্যক্তিত্বের কাছে পৌঁছোক, এবং সংবাদমাধ্যমে তা প্রচারিত হোক, যাতে অভিনয়ের ক্ষেত্রে তা কাজে লাগে।
নতুন বই প্রকাশের ক্ষেত্রেও তিনি পাঠকের মনস্তত্ত্ব বিবেচনা করতেন। ‘সানাই’ প্রকাশের সময় তিনি ‘নবজাতক’ বইটির সঙ্গে এর যাতে কোনও প্রতিযোগিতা না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে বলেছেন— ‘নবজাতক বইটা পাঠকদের ভালো লাগতে আরম্ভ করেছে তাড়াতাড়ি তার উপরে আর একটা নতুন বই চাপা দিলে রস ভোগে ব্যাঘাত হবে…’

কিশোরীমোহনকে লেখা চিঠিপত্রের শেষ পর্বে (১৯৩৮-১৯৪০) রবীন্দ্রনাথের একটি গভীর ট্র্যাজিক স্বর অনুরণিত হয়েছে। আয়ু ফুরিয়ে আসছে বুঝতে পেরে লিখেছিলেন, ‘যমরাজ হঠাৎ কানে ধরে যে শিক্ষা দিয়েছেন সেটা উপেক্ষা করবার নয়। অতএব দ্বিতীয়বার তাঁকে সাংঘাতিক কৌতুক করবার অবকাশ দেবার পূর্ব্বেই কাজ গুছিয়ে রাখার কথা আমার মনে এসেছিল।’
এই সময়ের চিঠিগুলিতে বারবার ফিরে এসেছে ‘ছুটি চাই’ কথাটা। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসুস্থ এবং অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায়, গ্রন্থ প্রকাশের যাবতীয় দায়িত্ব তিনি কিশোরীমোহনের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। ‘আমি যেমন বিরক্ত তেমনি শ্রান্ত হয়েছি, কোনো কাজে মন দেবার সময় আমার নেই—ভালোও লাগে না, পারিও না।’
দুর্ভাগ্যবশত, কিশোরীমোহন সাঁতরাও এই সময়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। রক্তচাপ ও অন্যান্য ব্যাধিতে আক্রান্ত কিশোরীমোহনের স্বাস্থ্যের অবনতিতে রবীন্দ্রনাথ বিচলিত হন। ১৯৪০ সালের ২০ অক্টোবর কিশোরীমোহন সাঁতরার প্রয়াণ ঘটে।
তবুও, এই ভগ্নস্বাস্থ্যেও ‘বিশ্বপরিচয়’, ‘বাংলাভাষা পরিচয়’, ‘সানাই’ বা ‘ছেলেবেলা’র মতো গ্রন্থগুলি নির্ভুল প্রকাশের জন্য তাঁর যে নিরলস তাগিদ, তা বিস্ময়কর। কালিম্পং, মংপু বা পুরী— যেখানেই থেকেছেন, সেখান থেকেই অবিরত চিঠির পর চিঠি লিখে মুদ্রণের খোঁজখবর নিয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশত, কিশোরীমোহন সাঁতরাও এই সময়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। রক্তচাপ ও অন্যান্য ব্যাধিতে আক্রান্ত কিশোরীমোহনের স্বাস্থ্যের অবনতিতে রবীন্দ্রনাথ বিচলিত হন। ১৯৪০ সালের ২০ অক্টোবর কিশোরীমোহন সাঁতরার প্রয়াণ ঘটে। চরম অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ আঘাত পাবেন, সেই আশঙ্কায় মৃত্যুসংবাদটি গোপন রাখা হয়েছিল। কিন্তু কবির অন্তর্দৃষ্টি ছিল প্রখর। তিনি অনুভব করেছিলেন, তাঁর বিশ্বস্ত সহচর আর নেই। কিশোরীমোহনের প্রয়াণে রবীন্দ্র-গ্রন্থ প্রকাশনার একটি সুবর্ণ যুগের অবসান ঘটে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বই কেবল কিছু ভাবের আধার বা কালির আঁচড় ছিল না; তা ছিল এক সুপরিকল্পিত স্থাপত্য, যার ভিত্তি নির্মিত হত লেখকের মননে, আর চূড়া স্পর্শ করত প্রকাশনার নৈপুণ্য। কিশোরীমোহন সাঁতরাকে লেখা দীর্ঘ ১৫ বছরের পত্রাবলিতে স্পষ্ট, একজন মহৎ স্রষ্টা কীভাবে কালির অক্ষর, কাগজের মান, প্রচ্ছদের রং, বানানবিধির শৃঙ্খলা এবং পাঠকের আর্থিক সামর্থ্য— এই সমস্ত কিছু এক ঐকতানে বাঁধতে পারেন।
‘অক্ষরের নিজস্ব কৌনিক ছাঁচ’ দিয়ে বইয়ের প্রচ্ছদ নির্মাণ থেকে ‘লোকশিক্ষা’র আদর্শে সুলভ সংস্করণ প্রকাশ পর্যন্ত সর্বত্র তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক ও দূরদর্শী চেতনার ছাপ স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন তাঁর সৃষ্টি যেন ‘কাগজের কারাগারে’ বন্দি না থেকে, পরিচ্ছন্ন, নির্ভুল ও নিরাভরণ রূপ নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়। বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগের ইতিহাস কেবল তাই একটি প্রকাশনা সংস্থার ইতিহাস নয়; তা একজন কবির তাঁর নিজের সৃষ্টির সঙ্গে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে এবং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে নিরন্তর সংযোগ স্থাপনের অসামান্য দলিল। এই দলিলের প্রতি অক্ষরে মিশে আছে এক চিরজাগ্রত সম্পাদকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, বাংলা প্রকাশনা শিল্পকে যা আজও পথ দেখায়।
তথ্যসূত্র
আকাদেমি পত্রিকা ৫ – পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি
চিঠিপত্র – দ্বাদশ খণ্ড
রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর পরিবারবর্গকে লিখিত রবীন্দ্রনাথের পত্র ও রবীন্দ্রনাথকে লিখিত পত্রাবলী – বিশ্বভারতী
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত