(Jyotirmoy Datta)
গত বছর ২৮শে ডিসেম্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দত্ত। তার অনেক আগেই বিদায় নিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী মীনাক্ষী দত্ত। দু’জনের এই যুগপৎ অনুপস্থিতি বাংলা সাহিত্য জগতের এক স্থায়ী শূন্যতা তৈরি করেছে। আমাকে বিশেষত, গত কয়েক মাসে, বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে আটলান্টার এক বিশেষ সন্ধ্যার কথা। আটলান্টার বাসিন্দা প্রায় ২৬ বছর। খুব ভুল না বললে, ২০১৭ সাল নাগাদ সেখানেই আয়োজন হল সেই অনন্য সাহিত্য সন্ধ্যার। জ্যোতির্ময় দত্ত আর মীনাক্ষী বসু ছিলেন প্রধান অতিথি। দুজনের প্রাণবন্ত স্মৃতিচারণ সেদিন, আড্ডায় এনে দিয়েছিল ‘কবিতা ভবন’ থেকে কল্লোল যুগের একরাশ স্মৃতি।
জ্যোতির্ময় দত্তের নাম প্রথম শুনেছিলাম বাবার মুখে, খানিকটা আক্ষেপের সুরে। কবি-সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু ও প্রতিভা বসুর কন্যা মীনাক্ষী বসু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে আমার বাবার সহপাঠী ছিলেন। বাবা বলতেন, ‘জ্যোতির্ময় যে-ই আসতেন, অমনি মীনাক্ষী ক্লাসঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন।’ সাদামাটা সেই বাক্যটির ‘করুণ রস’ উদ্ধার করতে অসুবিধে হত না আমার বালিকা মনের। মীনাক্ষী বসু, অনিমেষ রায় আই.এ.এস, যিনি পরে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট-এর চেয়ারম্যান ছিলেন, সকলেই প্রেসিডেন্সি থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে পড়তে এসেছিলেন। তাবড় তাবড় পণ্ডিত অধ্যাপকেরা সেই সময় দর্শন বিভাগ রাজত্ব করছেন। তাঁরাই গড়েছিলেন এঁদের ভবিষ্যত। পড়া শেষে আমার বাবাও যোগ দেন অসম সিভিল সার্ভিসে।
সে যাই হোক, লেখক-সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দত্তের সঙ্গে আমার আলাপ হয় ‘আজকাল’, ‘স্টেটসম্যান’-এর পাতায়। খবরের কাগজ যখন পড়া শুরু করেছিলাম, তখন অশোক দাশগুপ্ত ‘আজকাল’ পত্রিকার সম্পাদক। ক্রীড়া সাংবাদিক মুকুল দত্তের পুত্র ধীমান দত্ত সেই সময় খেলার পাতাটি দেখতেন। ধীমান দত্তের বোন ছিলেন শিপ্রা মাসি, আমাদের পারিবারিক বন্ধু। তিনি ধীমান দত্তের ‘মেজদিভাই’, সম্বন্ধের সংক্ষিপ্তকরণে ‘মেন্নিভাই’। সেই ‘মেন্নিভাই’-য়ের সুপারিশেই ‘আনন্দবাজার’ ও ‘স্টেটসম্যান’-এর পাশাপাশি বাড়িতে ‘আজকাল’-এর ‘এন্ট্রি’।

‘সাগিনা মাহাতো’-র লেখক সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ তখন ‘রূপদর্শী’ ছদ্মনামে লিখছেন। জরুরি অবস্থার সময় জেল খাটা সাংবাদিক, পেয়েছেন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড। তিনিই ‘আজকাল’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক। সম্পাদক হওয়ার পরেই ১৯৮১ সালে চাকরির প্রস্তাব দেন জ্যোতির্ময় দত্তকে। জ্যোতির্ময়ের পাশাপাশি তাঁর শ্যালিকা দময়ন্তী বসু সিং এবং স্ত্রী মীনাক্ষী বসুর কলমেও সেই সময় নানা লেখা প্রকাশিত হত। আশির দশকে, এঁদের কলাম মারফতই জেনেছিলাম, ডোভার লেন মিউজিকের ভোরের সুর ইথারবাহিত হয়ে ‘কবিতা ভবন’-এ প্রতিভা বসুর কাছে পৌঁছোত। প্রতিভা বসু তাঁর কলম-জীবনের মতোই তানপুরা জীবনেও ছিলেন সমান স্বয়ংসিদ্ধা।
তখন সংবাদপত্র সম্পাদকীয় পাতার পাঠোদ্ধারের ক্ষমতা আমার তত ছিল না। প্রায়ই ‘নিহত’ ও ‘আহত’-র মানে গুলিয়ে যাচ্ছে। একই প্রশ্ন বারবার করলে বাড়ির লোক রেগেও যেতেন। বলতে দ্বিধা নেই, চুরি, ডাকাতি, দুর্ঘটনা এসব খবর দিয়েই আমার সংবাদ পাঠে হাতেখড়ি। সুরূপা গুহ হত্যা, বিল্লা-রঙ্গার গীতা ও সঞ্জয়কে অপহরণ, দেবযানী হত্যাকাণ্ড, চার্লস শোভরাজ ইত্যাদি তখন খবরের কাগজের মূল আকর্ষণ।
জ্যোতির্ময় দত্তের বিশ্লেষণাত্মক লেখা পড়েই স্টেটসম্যানের খুশবন্ত সিং, মিনু মাসানি ও সম্পাদকীয় কলাম অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠেছিল।
এমন প্রেক্ষাপটে জ্যোতির্ময় দত্তের গতিময় কলামগুলি আস্তে আস্তে কাগজের সব ক’টি পাতায় পৌঁছে যেতে সাহায্য করল। আজিজুল হক-কে নিয়ে তাঁর জেলখানার প্রতিবেদন পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে বসে থাকতাম। একটা রাজনৈতিক চেতনাও দলা পাকাত মাথায়। ইংরেজি ও বাংলায় সমদক্ষ সব্যসাচী পরম্পরার লেখকদের শেষ উদাহরণ ছিলেন মৈত্রেয়ী দেবী, জ্যোতির্ময় দত্তের মতো কিছু কলম-অধিপতি। জ্যোতির্ময় দত্তের বিশ্লেষণাত্মক লেখা পড়েই স্টেটসম্যানের খুশবন্ত সিং, মিনু মাসানি ও সম্পাদকীয় কলাম অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠেছিল।
জীবনের পড়ন্তবেলায় আটলান্টায় বসে সেই মীনাক্ষী বসু ও জ্যোতির্ময় দত্তের সঙ্গে এক আলোচনা সভা পরিচালনা করব, তা কেই বা জানত। সেই আড্ডায় কখনও চোখের সামনে ভাসছিল সদ্য লেখা কবিতা হাতে হঠাৎ ঢুকে পরা উদভ্রান্ত অস্থির জীবনানন্দ দাশ, কখনও গোটা এক জীবন্ত ‘কল্লোল যুগ’।

জ্যোতির্ময় সেদিন বলছিলেন বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকার যাত্রারম্ভের কাহিনি। বলছিলেন, ‘বুদ্ধদেব বসু কল্লোলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কলকাতা আসার আগেই। তখন তিনি ‘প্রগতি’-পত্রিকার সঙ্গে জড়িত। ‘কবিতা’ পত্রিকা আবার মীনাক্ষীর সমবয়সী। একই বছরে দুজনের জন্ম। কবিতার জন্য যে একটি কাগজ হতে পারে, তা এক ছকভাঙা ভাবনা ছিল। কারণ তখন কবিতার সেভাবে বাজার ছিল না। সমর সেন বলেছিলেন— আমরা ঘরে ঘরে ঘুরে আধুলি জোগাড় করেছি, কিছু টাকা জোগাড় করেছিলাম, কিন্তু তুমি ভবিষ্যত। প্রথম সংখ্যা ৮০ কপি বিক্রি হয়েছিল। পঁচিশ বছর টানা প্রকাশিত হয়েছিল ‘কবিতা’ পত্রিকা।’
‘বিচিত্রা’য় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ‘বঙ্গদর্শন’-এ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুখ্য হলেও, বুদ্ধদেব বসু কবিতা পত্রিকা একা করেন নি। জীবনান্দ দাশ, সমর সেন ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে আবিষ্কার ও লালন করেছেন। রবীন্দ্রছায়া থেকে বেরিয়ে ‘কবিতা’ পত্রিকা ঘিরে প্রথম বিদ্রোহী বুদ্ধিজীবীরা একীভূত হবার একটা জায়গা হল। পরবর্তীকালে প্রবল রবীন্দ্রপক্ষ বুদ্ধদেব বসু-কেও আমরা দেখেছি, ‘সব পেয়েছির দেশঃ শান্তিনিকেতন’-এ।’
মীনাক্ষী একদিন ভোরবেলা আমার লেখা দুটি কবিতা তাঁর টেবিলে রেখে আসেন। গম্ভীর মুখে তিনি বলেছিলেন— কবিতাটি ভাল, আমি ছাপব।’
ভাবী জামাতার সঙ্গে কীভাবে আলাপ হয়েছিল বুদ্ধদেব বসুর, সেই কাহিনিও বলেছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। ‘বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৫৪ সালে। আমেরিকা থেকে ফেরার পর মীনাক্ষী ও আমি একসঙ্গে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তাম। ‘কবিতা ভবন’-এ খুব একটা সম্মানিত অতিথি ছিলাম না। তবে বিবাহ অবধি পৌঁছেছিলাম কবিতা দিয়েই। মীনাক্ষী একদিন ভোরবেলা আমার লেখা দুটি কবিতা তাঁর টেবিলে রেখে আসেন। গম্ভীর মুখে তিনি বলেছিলেন— কবিতাটি ভাল, আমি ছাপব।’
তবে মীনাক্ষী বসু কথায় উঠে এসেছিল তাঁর মা প্রতিভা বসুর নানা স্মৃতি। ‘সেই সময় দার্জিলিং-এ রবীন্দ্রনাথ। মা দেখা করার অনুমতি চাইলেন। সকলে বাধা দিয়ে বললেন, ভিড় হবে তাই না যেতে। এর কিছুদিন পর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের ‘খাম’ এল। মা দেখা করতে গেলেন। গানও গাইলেন। গুরুদেব চায়ের নেমন্তন্ন করে অনেক গান শিখিয়েছেন। তার মধ্যে একটি ছিল, ‘তবু মনে রেখো’। মা খুব গাইতেন। পরেও আরেকবার শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখেন, কবি ভক্ত পরিবৃত। খুব একটা প্রতিভা দেবীর দিকে তাকাচ্ছেন না গুরুদেব। সেবার ফিরে এসে তাই মা আর যোগাযোগ করেননি।’

এরপর কবির গাড়ি একদিন বাড়িতে আসে। সঙ্গে একটা খাম। তার মধ্যে র.ঠা. লেখা একটি চিঠি। চিঠিতে লেখা— কপি করে দিলে, পাণ্ডুলিপিটি রাখতে পারো। সম্ভবত ‘দুই বোন’ বা ‘মালঞ্চ’-এর পাণ্ডুলিপি পাঠিয়েছিলেন কবি। কিন্তু মা লিখে পাঠালেন— আমার হাতের লেখা ভাল নয়, তাছাড়া আমার সময় নেই।’ নিজের জন্মের পরের একটি ঘটনাও বললেন মীনাক্ষী। ‘আমার জন্মের পর বুদ্ধদেব বসু একবার দেখা করতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। স্ত্রী-ও সঙ্গে গিয়েছেন। কবি তখন প্রতিভা বসুকে দেখিয়ে বললেন, ‘আমি তো ওঁকে চিনি।’ বুদ্ধদেব বিস্মিত হয়ে বলেন প্রতিভাকে— তুমি তো আমায় বলোনি?’
মীনাক্ষী দত্তের নামকরণ নিয়েও ঘটেছিল এক মজার কাণ্ড। সে কথাও উঠে এল তাঁর স্মৃতিচারণে ‘কবি আমার নামকরণ করেছিলেন ‘মীনাক্ষী’। মায়ের সেই নামটি পছন্দ হয়নি বলে আর রাখেননি। বহুদিন পর কবিকে চিঠি লিখে ফের অনুরোধ— মেয়ের একটা নাম দিন। মা ভেবেছিলেন, অনেকদিন আগের কথা, কবি নিশ্চিত ভুলেই গিয়েছেন। কিন্তু উত্তরে একটি স্নেহাশীর্বাদ জানিয়ে চিঠি লেখেন রবীন্দ্রনাথ। চিঠির শেষে ‘পুনশ্চ’ দিয়ে লেখেন— মীনাক্ষীমাতা-কে’। এভাবেই বুদ্ধদেব ও প্রতিভা বসুর কন্যার নাম ‘মীনাক্ষী’ কায়েম হল!’
প্রতিভা বসুর লেখায় তাই বারবার ফিরে এসেছে হিন্দু মেয়ে ও মুসলমান ছেলে নিয়ে ‘সুমিত্রার মৃত্যু’, ‘আয়না’-র আর ‘সমুদ্রহৃদয়’-এর মতো একাধিক গল্প-উপন্যাস।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাজী নজরুল ইসলাম দুজনের কাছেই গান শিখেছেন প্রতিভা বসু। তবে নজরুল গান শেখাতে যেতেন রাণু সোম তথা প্রতিভা বসুর বাড়ি। এই রাণুর বাড়িতেই জন্ম নিয়েছে বহু কালজয়ী নজরুলগীতি। রাণুর বনগ্রামের বাড়ি থেকে বেরোবার সময় জনগণের কাছে কবিকে হেনস্তা হতে হয়েছিল এক সময়। প্রতিভা বসুর লেখায় তাই বারবার ফিরে এসেছে হিন্দু মেয়ে ও মুসলমান ছেলে নিয়ে ‘সুমিত্রার মৃত্যু’, ‘আয়না’-র আর ‘সমুদ্রহৃদয়’-এর মতো একাধিক গল্প-উপন্যাস।
শুধু সাহিত্যসম্ভার নয়, সে সন্ধ্যায় উঠে এসেছিল পারিবারিক মধুর কিছু মুহূর্তও। একবারের জ্বর হওয়ার কথা বললেন মীনাক্ষী। ‘মা বেশ কয়েকদিন ধরে আমাদের জ্বর হওয়ার দরুণ যত্ন করছেন। এদিকে জ্যোতির কাছে তেমন যান না। তখন জ্যোতি লিখল—
‘ওরে মুটকী, আমি জামাই। পরের ছেলে বলে আমায় কি দেখতে নেই?
ইতি
তোর শুটকী!’
দুজনেই তো কলমজীবী। হয়তো এতদিনে সেইসব গল্প কোথাও না কোথাও গ্রন্থিত ও মুদ্রিত হয়ে গিয়েছে। তবু ওই দিনটির একটি বিশেষত্ব ছিল। প্রবাসের মাটিতে ‘সেবা’ বাংলা লাইব্রেরি-তে চার হাজার বাংলা বইয়ের মাঝে এক অনন্য সন্ধ্যায় ‘কবিতা ভবন’ যেন ‘সময়হারা’ রূপে ‘জাগ্রত’ হয়ে উঠেছিল। ‘জাগ্রত’ হয়ে উঠেছিল সে বাড়িরই দুটি চরিত্রের প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাসের বিবরণে— যা নিশ্চিত কোনও রোজনামচার ঘটনা নয়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত