(Manna Dey Memoir)
সালটা সম্ভবত ১৯৮২, আমাদের স্কুল রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন-এর উন্নতিকল্পে অনুষ্ঠিত হবে এক সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। সেদিনই প্রথম কাছ থেকে দেখা জীবন্ত কিংবদন্তিকে। ঝড়বৃষ্টির রক্তচক্ষু অবজ্ঞা করে মোহাবিষ্ট করে গেলেন সকলকে। রামকৃষ্ণ মিশন বলে হিন্দি গান গাইলেন না একটিও। অনুরোধ করেছিলাম আমরা। উত্তরে বললেন ‘মিশনের বাইরে চলুন হিন্দিও হবে, হেমা মালিনীও নাচবেন।’
প্রবল ব্যক্তিত্ব আর জনমোহিনী ক্ষমতায় সেদিন শুধু বাংলা গান গেয়েই আসর মাত করলেন। সেই শুরু, তারপর থেকে উনি অশক্ত হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অনেক অনুষ্ঠানের মুগ্ধ শ্রোতা থেকেছি। বাঙালি চিরকাল তাঁর কণ্ঠে প্রেম, বিষাদ আর বিরহের অনুভূতি খুঁজে পেয়েছে। আজ গানের জগতের, বিশেষত বাংলা গানের জগতের, সেই ‘জীবনানন্দ’ মান্না দে’র শুভ আবির্ভাব দিবস।
আরও পড়ুন: প্রয়াণের এক যুগ পরেও মান্নার প্রেমের গান অমর
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এই কিংবদন্তি ছিলেন মজলিসি মেজাজের শিল্পী। সম্ভবত ১৯৯০-৯১ সাল। আমাদের একটি স্থানীয় উৎসবে গাইতে এলেন। মনে হল মেজাজ, গলা বা শরীর বশে নেই। খোলা মঞ্চে গাইছেন, মাঠে হাজার হাজার মানুষ, তিল ধারণের জায়গা নেই। প্রথম চার পাঁচটি গানে সেই অনুভূতি এল না, স্পর্শ করল না যেন। খোলা মাঠে, আলোর মেলায় পোকার উপদ্রব। বিরক্তির সুরে বললেন, অধিকাংশ আলোগুলো নিভিয়ে দিন। তারপর গান ধরলেন, ‘ভালবাসার আগুন জ্বালাও, ঝাড়বাতিটা নিভিয়ে দাও…’ একলহমায় ফোর্থ গিয়ারে! হৃদয় জয় করে মন্ত্রমুগ্ধ করে গেলেন বাংলার সঙ্গীতজগতের বিরহী সম্রাট।
ছবি বিশ্বাসের জন্য সেবার গাইবেন ঈষৎ চটুল নেশাতুর ‘এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয়’। কাকার অনুজপ্রতিম ছবিবাবু পর্দায় থাকবেন শুনে অস্বস্তিতে পড়লেন। একরকম পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এদিক ওদিক। কিন্তু গান তো সুপারহিট। পেলেন অগ্রজ ছবি বিশ্বাসের অকুণ্ঠ প্রশংসা।

পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় একবার একটি গান লিখে দেখালেন। বেশ পছন্দ হল তাঁর। কিন্তু বাধ সাধলেন স্ত্রী সুলোচনা দেবী। এ গান গাওয়া যাবে না। পরে সেই গান অমর করে দিলেন এক জিনিয়াস। গান শেষে তাঁকে বলে গেলেন ‘পোলাওবাবু, একেবারে আমার মরণ যাত্রা করে দিলেন?’ কাকতালীয়ভাবে কিছু মাস পরেই প্রয়াত হলেন অমরশিল্পী কিশোরকুমার। গানটি ছিল, ‘তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণযাত্রা যেদিন যাবে’।
প্রাণাধিক প্রিয় পঞ্চমের ডাক এল। রাগাশ্রয়ী গান প্রবীণ অভিনেতা ওমপ্রকাশের লিপে। ছবির নাম শুনে বিষণ্ণ হয়ে বললেন, শচীনদাও বুড়োদের গান গাওয়ালেন আজীবন, এখন তুমিও….। রেকর্ডিং-এর পর বুঝলেন কী অমরগীতি সৃষ্টি হল! ‘আয়ো কাঁহা সে ঘনশ্যাম’ গাওয়া শেষ হতেই বাষ্পরুদ্ধ চোখে পঞ্চমকে জড়িয়ে ধরে ঋণ স্বীকার করলেন।
এরপরেই গান ধরলেন, ‘সুর না সাজে, কেয়া গায়ু ম্যায়’। গাইতে গাইতে দু’চোখ ছাপিয়ে গেল নির্মল অশ্রুধারা। যেন সাধনরত এক নির্মোহ যোগীপুরুষ। ওই দৃশ্য যেন মান্যতা দেয় ভবা পাগলার সেই ঘোষণাকে— ‘গানই সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা’।
দূরদর্শনের আর্কাইভ-এ বোধহয় আজও আছে সেই ইন্টারভিউ। অশীতিপর শিল্পীকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়, এত প্রাপ্তির পরেও প্রতিদিন রেওয়াজের কী দরকার এই বয়সে? স্মিতহাস্যে তাঁর অমোঘ উক্তি ‘সিনেমায় গাওয়া বা নামযশ অর্জন বেঞ্চমার্ক ছিল না। শিখতে চেয়েছিলাম, কিছুই শেখা হয়নি।’ এরপরেই গান ধরলেন, ‘সুর না সাজে, কেয়া গায়ু ম্যায়’। গাইতে গাইতে দু’চোখ ছাপিয়ে গেল নির্মল অশ্রুধারা। যেন সাধনরত এক নির্মোহ যোগীপুরুষ। ওই দৃশ্য যেন মান্যতা দেয় ভবা পাগলার সেই ঘোষণাকে— ‘গানই সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা’।
ছবির নাম ‘তলাশ’, সুর করছেন শচীন কর্তা। প্রযোজক, পরিচালকদের আবদার রাগাশ্রয়ী বিশেষ গানটি গাইবেন রফি সাহেব। সাধারণত গায়কদের তালিম দিয়ে তৈরি করে দেন কর্তার সহকারী তথা বাঙালি গায়ক। এবার কর্তার ইচ্ছে গানটি ওই বাঙালি গায়কই রেকর্ড করেন। কিন্তু প্রযোজক-পরিচালক রাজি নন। কর্তা সাফ জানালেন, তাহলে অন্য কোনও সঙ্গীত পরিচালক খুঁজে নিতে, উনি কাজ করলে তাঁর সহকারী গায়কটিই গাইবেন। অগত্যা নিমরাজি হয়ে পিছু হঠলেন প্রযোজক। তৈরি হল এক অমলিন ইতিহাস, ‘তেরে নয়না তলাশ করে জিসে’।

প্রিয় বন্ধু তথা শিক্ষক ‘কাজীদা’র সুরের ছায়ায় গান বানাবেন বলে একবার মনস্থির করলেন শচীনদেব বর্মন। হাজারও বিতর্ক পাশ কাটিয়ে। বিদ্রোহী কবি তখন জীবিত, কিন্তু মর্মান্তিকভাবে প্রায় চেতনারহিত। নজরুলগীতি সেভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-নীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত নয়, অন্তত তখনও। কবির জ্যেষ্ঠপুত্র কাজী সব্যসাচীর সঙ্গে কথা বলে গান রেকর্ড করালেন তাঁর প্রিয়পাত্রকে দিয়ে। ‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারি’র ছায়ায় অশোককুমারের লিপে ‘পুছো না ক্যাইসে ম্যানে রেয়ন বিতাই’। ভেসে গেল সারা দেশ…।
বিমল রায়ের প্রযোজনায় হিন্দিতে শুট হচ্ছে কাবুলিওয়ালা। সুর করেছেন সলিল চৌধুরী। একটি বিশেষ গানে অ্যারাবিয়ান এসেন্স ঢেলেছেন রাবাবের সঙ্গতে। পটভূমির আবহে গলায় সেই আফগান রেন্ডিশানিং যেন কিছুতেই আসছে না। হতাশ কিংবদন্তি গায়কের চোখে জল। শেষ চেষ্টায় নিজের মেয়েকে নিজের থেকে বিযুক্ত করে ভাবলেন। এক বুক বিষাদ নিয়ে এক স্কেল নিচে ধরলেন ‘অ্যায় মেরে পেয়ারে ওয়াতন’। বাকি ইতিহাস…। টেকের পর বিমল রায় সজল নয়নে জোড়হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন!
নানা পাটেকর নাছোড়বান্দা। তিনি দরকারে ছবি বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু প্লেব্যাক তাঁকেই করতে হবে। সত্যি সত্যি ছবি করা বন্ধ থাকল কিছু দিন। অবশেষে বরফ গলল। নব্বইয়ের চার্টবাস্টারে জায়গা করে নিল, ‘হামারি হি মুঠঠি মে আকাশ সারা’। গায়কের বয়স তখন প্রায় আশির কাছাকাছি।
ছবি করবেন নানা পাটেকর। নিজেই পরিচালক, ভারতীয় সেনার উপর ভিত্তি করে ছবি। অভিনেতার একটাই আবদার— ছবিতে গান গাওয়াতে হবে তাঁর অন্যতম প্রিয় গায়ককে দিয়ে। এটি তাঁর স্বপ্ন। এই ড্রিম প্রোজেক্টের ইউএসপি। কিন্তু গায়ক তখন প্লে ব্যাক ছেড়ে দিয়েছেন প্রায়। বিশেষত হিন্দি জনপ্রিয় ছবিতে। মুম্বইতেও নিয়মিত থাকেন না, ব্যাঙ্গালোরে থাকেন। এদিকে নানা নাছোড়বান্দা। তিনি দরকারে ছবি বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু প্লেব্যাক তাঁকেই করতে হবে। সত্যি সত্যি ছবি করা বন্ধ থাকল কিছু দিন। অবশেষে বরফ গলল। নব্বইয়ের চার্টবাস্টারে জায়গা করে নিল, ‘হামারি হি মুঠঠি মে আকাশ সারা’। ছবির নাম ‘প্রহার’। গায়কের বয়স তখন প্রায় আশির কাছাকাছি। নানা অশ্রুজলে সংবাদমাধ্যমকে জানালেন, কীভাবে শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বপ্ন সত্যি হল!
জীবনসায়াহ্নে পৌঁছে একবার অনুষ্ঠান করতে এসেছিলেন কলকাতায়। সাক্ষী থাকার সৌভাগ্য হল। তখন গলা আর সাথ দেয় না। নিজ মুখেই স্বীকার করছেন সে কথা। বহু পুরনো মানুষের ভিড়ে খুঁজে চলেছেন ফেলে আসা সোনালি অতীত। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে সেসব। স্ত্রীকে হারিয়েছেন তখন কিছুকাল। কথার রেশ ধীরে ধীরে কাটিয়ে সাধক ভাবের উদয় হল। গান ধরলেন ‘আমি নিরালায় বসে, বেঁধেছি আমার স্মরণ বীন’।

আবেগে চোখ দিয়ে নামছে নিষ্পাপ ফল্গুধারা। দর্শকের চোখেও সেদিন অকাল শ্রাবণ। প্রেক্ষাগৃহে হিরন্ময় নীরবতা। সাধনার কোন পর্যায়ে গেলে এমন নির্মোহ দ্যোতনা তৈরি হয়! যেন রবি অস্তাচলে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। চোখের জলে এই মহানির্বাণ প্রত্যক্ষ করা, চিরকালীন সম্পদ হয়ে রয়ে গেল মনের মণিকোঠায়। সেদিন অনুষ্ঠান শেষে শূন্য প্রেক্ষাগৃহে অস্ফুটে ভেসে গিয়েছিল নীরব প্রতিধ্বনি— ‘মুকুটটা তো পড়ে আছে, রাজাই শুধু নেই’।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত