(Football World Cup)
সহোদর বলতে যেটুকু বুঝেছি আমরা, ভ্রাতৃত্বের যেটুকু বোধ আমাদের ছিল, তা মোটামুটি খতম হয়েছে। এই মুহূর্তে, আমরা একা এবং পাশবিক। এক ভাই, অন্য ভাইয়ের বুকে বুলডোজার চালিয়ে দিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক থাকতে শিখেছে। কখনও মিম শেয়ার করেছে। বিরিয়ানিও খেয়েছে দিব্যি। কিন্তু ঘুম ভেঙেছিল একসঙ্গেই। ঢিল মেরে আম পেড়েছিল। সাঁতার কেটেছিল। ফুটবল খেলেছিল ঘন ঘোর বর্ষায়। তারপরেও, এই লেখা নস্টালজিয়ায় চুপচুপে নয়। বলা যেতে পারে, সহোদর, পড়শি, দেশ— এই শব্দগুলোর গভীরে, প্রকৃত অর্থের অনুসন্ধান। আমাদের যে দেখাগুলো, বোধগুলো, অনুভূতিগুলো সংকুচিত হয়ে গেল, সেগুলো কিঞ্চিৎ সম্প্রসারণের ধান্দা। তবে, ফুটবলের ভাষ্যে। যেহেতু তিনদিন পরেই, ফিফা বিশ্বকাপের শুরুয়াৎ!
এক দেশের জার্সি এবং দুই সহোদর— ফুটবলের ইতিহাসে এহেন উদাহরণ অগুনতি। ১৯৩০। উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল যে বিশ্বকাপ। মেক্সিকো দলে ছিলেন দুই ভাই। ম্যানুয়েল রোজাস এবং ফিলিপে রোজাস। সেই প্রথম! মাঠে নেমেছিলেন। লড়াই করেছিলেন। দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। একসঙ্গে। একই মুহূর্তে। একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। তারপরে আমরা শুনেছি, ইংলিশ ফুটবলের দুই ভাইয়ের কথা— জ্যাক চার্লটন এবং ববি চার্লটন। ১৯৬৬ সালে, ইংল্যাণ্ডের জন্য বিশ্বকাপ জিতেছিলেন যাঁরা! কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। নিঃসন্দেহেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত! যা মূলত গৌরবের। অপরিসীম আহ্লাদের। কিংবদন্তি-সম।
যদি বলি, দুই সহোদর, ভিন্ন দেশ, ভিন্ন জার্সি? ৯০ মিনিটের জানকবুল লড়াই। উভয়েই প্রতিপক্ষ। উভয়ের মধ্যে একটা যুদ্ধ। তারপর ফের বুঁদ হয়ে যাওয়া আশ্চর্য কোনও সৌভ্রাতৃত্বে!

ফ্রান্সের লিগ ওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্লাব, রেন এফসি। ক্লাবের অ্যাকাডেমিতে, অনুর্ধ্ব ৯ দলের ট্রায়াল চলছে। সেখানেই এসেছিলেন, গেহলা ডুয়ে। আর মাঠের সাইডলাইনে, অনেকগুলো ফুটবল নিয়ে ইচ্ছেমতো টুকিটাকি ড্রিবলিং করছিল ছোট ভাই দেজিরে ডুয়ে। দুই ভাইয়ের ফুটবল স্কিলে সেদিনের মতো মুগ্ধ অ্যাকাডেমির কোচ এবং সকল কর্মকর্তা! তারপর থেকে রেন এফসির অ্যাকাডেমির জলহাওয়ায় বেড়ে উঠছিল দু’জনেই। গেহলা এবং দেজিরে। দুই সহোদরের শরীরে দুই দেশের রক্ত। আইভরি কোস্ট এবং ফ্রান্স। বাবা, মাহো ডুয়ে, একজন অভিবাসী। ফ্রান্সে পালিয়ে এসেছিলেন যখন, তখন আইভরি কোস্ট দারিদ্রের চরম সীমায়! তারপরে আলাপ হয়েছিল ইসাবেলের সঙ্গে।

ফুটবল আবহেই জন্মেছিলেন ডুয়ে-ব্রাদার্স। কাকা, নোমান্দিয়াজ ডুয়ে ফিফা অনুমোদিত একজন রেফারি। বর্তমানে আফ্রিকান ফুটবল ফেডারেশানের রেফারিং ডিরেক্টার। অন্যান্য ভাইবোনেরা প্রত্যেকেই ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবের ফুটবলার। স্বাভাবিক। অভিবাসী রক্ত কি না!
এই বিশ্বকাপে, ফ্রান্সের জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন ছোট ভাই দেজিরে ডুয়ে। একুশ বছর বয়সের মারকাটারি উইঙ্গার। ক্লাব প্যারিস সাঁ জঁরমে-র প্রথম একাদশে নিয়মিত। গত বছর চ্যাম্পিয়ান্স লিগ ফাইনালে, ইন্টার মিলানের বিরুদ্ধে দুটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট। প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ! আর বড় ভাই গেহলা ডুয়ে? খেলবেন আইভরি কোস্টের জাতীয় দলে। ভীষণ নির্ভরযোগ্য একজন রাইট-ব্যাক। রেন এফসির একাডেমি থেকে, স্ট্র্যাসবুর্গ ক্লাবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ২০২৪ সালে। পরিসংখ্যান বলছে, ডিফেন্সিভ কন্ট্রিবিউশান চমৎকার। ইতিমধ্যেই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট ক্লাব, চেলসি, আগামী মরশুমে গেহলা-কে সই করাতে আগ্রহী।

দেশের প্রতিনিধিত্বের প্রসঙ্গে, এক ভাই বেছে নিয়েছিলেন আইভরি কোস্ট। অপরজন ফ্রান্স। এরপরই দেশ কিংবা দেশপ্রেমের যাবতীয় ধারণা ভেঙেচুরে যায়। মনে পড়ে, ক্যামেরুনের ফুটবল সুপারস্টার রজার মিল্লার একটি উক্তি: ‘হেয়ার ইন ক্যামেরুন, ফুটবল ইজ আওয়ার লিডিং পলিটিক্যাল পার্টি। ইটস ফুটবল অ্যালোন দ্যাট ইউনাইটস আস…’ যে কারণেই দেজিরের প্রতি কী অকৃত্রিম স্নেহ! গেহলা বলছিলেন, ‘ফুটবলের যে ম্যাজিকাল পথের হদিশ দিয়েছিলাম আমি, তৈরিও করেছিলাম ভাইয়ের জন্য, দেজিরে সেই পথই অনুসরণ করেছে। আমার ভাইয়ের জন্য আমি গর্বিত!’ অপরদিকে দেজিরে প্রবল উচ্ছ্বসিত, ‘আমাদের বয়সের পার্থক্য চার বছর। তবু গেহলা যেন আমার যমজ ভাই। আমার সাপোর্ট সিস্টেম। জীবনের খুঁটিনাটি সমস্ত নিয়েই আমাদের প্রতিদিনের কথাবার্তা। কোনও গোপনীয়তা নেই।’

নেই কোনও বিদ্বেষ। ঘেন্না। ক্ষোভের আঁতুড়। আরও দুই সহোদরের কথা বলি। ইনাকি এবং নিকো উইলিয়ামস। ওদের শরীরেও অভিবাসনের রক্ত। নব্বইয়ের দশকে, ঘানা থেকে পালিয়েছিল ফেলিক্স এবং মারিয়া। সাহারা মরুভূমি পেরিয়েছিল খালি পায়ে। উদ্দেশ্য, স্পেন। বড়ভাই ইনাকি, জন্মেছিল বিলবাও শহরে। সেই থেকেই অ্যাতলেটিক বিলবাও ক্লাবের একটা জার্সি বহন করছে শরীরে। ছোটভাই নিকো-র জন্ম-মুহূর্তে, উপহার দিয়েছিল সেই জার্সিটাই। তারপর থেকে এক ক্লাব। এক জার্সি। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াই। অবলম্বন শুধু ফুটবল।
আমরা দেখেছি, অ্যাতলেটিক বিলবাও ক্লাবের লেফট উইং ধরে ডজ আর ড্রিবল করেন নিকো। আর ইনাকি রাইট উইং-এ। কী অপূর্ব সে দৃশ্য! ভ্রাতৃত্ববোধ। গোলের পরে দুই ভাইয়ের অমলিন সেলিব্রেশন। কিন্তু দেশের প্রশ্নে? দুজনে পৃথক। বিশ্বকাপে, ইনাকি উইলিয়ামস খেলবেন ঘানার হয়ে। সে দেখেছে, তাদের বাবা ফেলিক্স খুঁড়িয়ে হাঁটেন। সে বুঝেছে, দেশত্যাগের যন্ত্রণা। খিদে। এবং নিজের মাটির টান। আর নিকো? স্পেনের জাতীয় দলে। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অন্যতম ভরসাস্থল। এও তো একধরনের দেশপ্রেমই।

প্রশ্ন হল, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের এহেন ঘটনা প্রথম? দুই ভাই, দুই দেশ, দুই জার্সি? আজ্ঞে না। ২০১০। সাউথ আফ্রিকা বিশ্বকাপ। কেভিন-প্রিন্স বোয়াতেং এবং জেরোম বোয়াতেং। ফুটবল ইতিহাসে দুই ভাই প্রথম, মাঠে নেমেছিলেন একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয়ে। কেভিন বোয়াতেং ছিলেন ঘানার ফুটবল শিবিরে। বিপক্ষে জেরোম। জার্মানির দুরন্ত ডিফেন্ডার। আসলে, দুই ভাইয়ের শৈশব কেটেছিল একসঙ্গেই। একই মাটিতে। তারপরে শুরু হয়েছিল পারিবারিক জটিলতা। অবশেষে, বিচ্ছিন্ন হতে হয়। পৃথক পৃথক মায়ের কাছে বেড়ে উঠেছে দু’জনে, যে কারণে তারা সহোদর নয়, যে কারণে ভ্রাতৃত্ববোধও উভয়ের প্রায় শূন্য।
তবু তো এক ভাই অপরকে বলেনি, দেশ থেকে তাড়িয়ে দেব! উচ্ছেদ করে দেব। তারপর মস্তি হবে! কী করেছে? ভালবেসে জড়িয়ে ধরেছে ম্যাচ শেষে।
বরং শেষ করি, স্কটল্যাণ্ডের হ্যারি সুটার এবং জন সুটার— দুই সহোদরের কথা বলে। জন সুটার, স্কটল্যান্ডের স্কোয়াডে সুযোগ পেয়েছেন আসন্ন বিশ্বকাপে। ছোট থেকেই স্কটল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কিন্তু হ্যারি বেছে নিয়েছেন মায়ের দেশ। অস্ট্রেলিয়া। শেষ রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে এই বছরের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা দখল করেছেন। জন বলছেন, ‘দেশ হিসেবে আমরা আলাদা। কিন্তু ফুটবলের প্রতি যে ভালবাসা, যে নিরন্তর প্রচেষ্টা এবং যে মানসিক দৃঢ়তা— সেখানে আমাদের কোনও খুঁত নেই। আমরা এক এবং একশো শতাংশ। আমরা দুজনেই গর্বিত!’

ফুটবল এভাবেই বহুমাত্রিক। চাইলেও, চার দেওয়ালে বন্দি করা যায় না। সমস্তরকম প্যারামিটার ভেঙে সে বারংবার বেরিয়ে যায়। সৃষ্টি করে অকল্পনীয় দৃশ্য। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচেই, মুখোমুখি হয়েছিল আইভরি কোস্ট বনাম ফ্রান্স। গেহলা ডুয়ের গোলে আইভরি ২-১ গোলে জিতল। তবু তো এক ভাই অপরকে বলেনি, দেশ থেকে তাড়িয়ে দেব! উচ্ছেদ করে দেব। তারপর মস্তি হবে! কী করেছে? ভালবেসে জড়িয়ে ধরেছে ম্যাচ শেষে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত