(Bengali Detective Film)
বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্রের বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, টলিউড বর্তমানে মৌলিক গল্পের চেয়ে চেনা সাহিত্য এবং জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজির উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। বিগত সাড়ে পাঁচ বছরে (২০২১- ২০২৬) মে মাস পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশোর কাছাকাছি। এর মধ্যে বায়োপিক ছবি হয়েছে মাত্র ১৫ টা, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রয়াত পরিচালক অরুণ রায়ের ‘হীরালাল’ (২০২১), ‘৮/১২ বিনয় বাদল দীনেশ’ এবং বাঘাযতীন, অনীক দত্তের ‘অপরাজিত’ (২০২২), অঞ্জন দত্তের ‘চালচিত্র এখন’ এবং সৃজিত মুখার্জির ‘পদাতিক’।
অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যনির্ভর ছবির সংখ্যা মাত্র সাতাশটা হলেও, উদ্বেগের বিষয় এর মধ্যে সামাজিক গল্পের উপর ভিত্তি করে ছবি হয়েছে মাত্র দশ-বারোটা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রমাপদ চৌধুরী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং শরৎচন্দ্রের যথাক্রমে ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘আদর’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’, ‘রজনী’ ও ‘দত্তা’। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মায়ার জঞ্জাল’ এবং ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’। বুদ্ধদেব গুহের ‘প্রাপ্তি’ ও ‘বাবলি’ এবং সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’। এই সময়ের মধ্যে একমাত্র সাহিত্যনির্ভর সায়েন্স ফিকশন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘বনি’।
আরও পড়ুন: ‘স্বর্ণ যুগ’ পেরিয়ে বর্তমান বাংলা সিনেমা
একটা মজার বিষয় হল, এই সাড়ে পাঁচ বছরে প্রায় পঞ্চান্নটা মতো গোয়েন্দা ও থ্রিলারধর্মী ছবি হয়েছে যার মধ্যে মাত্র এক ডজন ছবি শুধুমাত্র সাহিত্যনির্ভর, বাদবাকি ছবিগুলো মৌলিক থ্রিলার হলেও, পর্দায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে বাঙালির প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র সেই ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কাকাবাবু, শবর, একেনবাবু এবং মিতিন মাসি।
বাংলা সিনেমাতে এই বারবার গোয়েন্দা চরিত্ররা ফিরে আশার এই প্রবণতার পিছনে মূলত দুটো প্রধান কারণ কাজ করছে বলে আমার ধারণা। প্রথমত, বাঙালির সাংস্কৃতিক ভিত্তি ও নস্টালজিয়া। বাঙালি মননে সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা, শরদিন্দুর ব্যোমকেশ বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবু শুধুমাত্র একটা চরিত্র নয়, বরং বলা যেতে পারে এঁরা প্রত্যেকেই বাঙালির আবেগ। এই ক্লাসিক চরিত্রগুলোর সঙ্গে বাঙালির ছোটবেলার স্মৃতি এবং গভীর নস্টালজিয়া জড়িয়ে আছে জেনে নতুন প্রজন্মও এই পরিচিত চরিত্রগুলোকে বড় পর্দায় দেখতে আগ্রহী হয়। ফলে নির্মাতারা সেই পুরনো গল্পকেই নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করে দর্শকদের সহজেই সিনেমা হলমুখী করতে পেরেছেন।

দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক নিরাপত্তা ও ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের জনপ্রিয়তা। এযাবৎ কালে সামাজিক বা পরীক্ষামূলক ছবির তুলনায় গোয়েন্দা ছবি ব্যবসায়িকভাবে অনেক বেশি সফল। কারণ রহস্য, রোমাঞ্চ এবং বিশ্লেষণের টানটান উত্তেজনা সব বয়সী দর্শককে আকর্ষণ করে। একবার একটা চরিত্র জনপ্রিয় হয়ে উঠলে তাকে কেন্দ্র করে সিরিজ বা ফ্র্যাঞ্চাইজি তৈরি করাটা অনেক সহজ, এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগের ঝুঁকিও অনেক কম। এই জনপ্রিয়তার কারণেই বড় পর্দার পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও গোয়েন্দা সিরিজের জয়জয়কার। পুরুষ গোয়েন্দাদের ভিড়ে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সৃষ্টি ‘মিতিন মাসি’র বড় পর্দায় উপস্থিতি এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মিতিন মহিলা দর্শকদের যেমন সংযুক্ত করছে, তেমনি বাংলা থ্রিলার ঘরানায় একঘেয়েমি কাটিয়ে এক নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে।
এরপর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের একটা চরিত্র আজ সফলভাবে বড় পর্দায় রাজত্ব করছে ‘একেনবাবু’। একেন এই সময়ের বাংলা সিনেমায় এক অদ্ভুত বৈপ্লবিক সংযোজন। গোয়েন্দা বলতেই আমাদের চোখে সাধারণত শার্লক হোমস বা ফেলুদার মতো দীর্ঘকায়, গম্ভীর এবং তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, সেখানে একেনবাবু সেই গণ্ডিটাকে পুরোপুরি ভেঙে নস্যাৎ করে দিয়ে সফল হওয়ার ফলে বাঙালির পরিচিত নানান গোয়েন্দা চরিত্রেদের সংমিশ্রণে বাংলা সিনেমায় এক নতুন গোয়েন্দা ‘সোনা দা’র আবির্ভাব হয়েছে।
তাঁরা এমন চরিত্রকেই পর্দায় দেখতে চায় যে, তাঁদের হয়ে পর্দায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। এটাও এক ধরনের ‘বুদ্ধিমত্তার আত্মসমর্পণ’ অর্থাৎ তুমি আমার হয়ে চিন্তা ভাবনা করবে, আর আমি ঠাণ্ডা ঘরে আরাম কেদারায় নিশ্চিন্তে গা এলিয়ে বসে সেটা শুধু দেখব।
একমাত্র দর্শকের পছন্দের কারণেই যে বাংলা বাজারে গোয়েন্দা গল্পের একচেটিয়া আধিপত্য, এমনটা ভাবা বোধহয় ভুল হবে। বিষয়ের গভীরে দৃষ্টিপাত করলে ধরা পড়ে এক অদ্ভুত সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমাপতন। আজকের দর্শক যখন বহুমূল্যের টিকিট কেটে মাল্টিপ্লেক্সে ছবি দেখতে যান, তখন তাঁরা ঠিক সেই ধরনের গল্প পছন্দ করবেন, যার শুরু ও শেষ তাঁদের কাছে আগে থেকেই স্পষ্ট থাকবে। আমরা জানি যে গোয়েন্দা গল্পের শুরুতে একটা সূত্র ধরে এগিয়ে গিয়ে, মাঝে কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে শেষ হয় এক বুদ্ধিদীপ্ত ও পরিচ্ছন্ন সমাধানে। এই সুনিশ্চিত সমাপ্তিই আধুনিক দর্শক মনে স্বস্তি দেয়।
এই মানসিকতার প্রধান কারণ হল আধুনিক প্রজন্মের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় গভীর মনোযোগের অভাব। একই সঙ্গে একই সময়ে একাধিক কাজে ব্যস্ত (মাল্টি-টাস্কিং) থাকায় তৈরি হয়েছে এক নতুন ‘পপকর্ন ব্রেন’ সম্প্রদায়। এই সম্প্রদায়ের মানসিকতায় গোয়েন্দা গল্পের নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা ফর্মুলা, অল্প সময়ের মধ্যে রহস্য উদ্ঘাটন এবং সমাধান, এই বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে খাপ খেয়ে যায়। ‘পপকর্ন ব্রেন’ চায় সিনেমার গল্পে গভীরতা থাকবে, কিন্তু সেটা আত্মস্থ করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মানসিক পরিশ্রম দিতে তাঁরা নারাজ। আবার ফেলুদা, ব্যোমকেশ বা মিতিন মাসি এরা সবাই দৃঢ়চেতা, এবং একক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁরা দ্বিধাহীন।

অন্যদিকে, আধুনিক প্রজন্মের প্রায় সব মানুষ প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। তাই তাঁরা এমন চরিত্রকেই পর্দায় দেখতে চায় যে, তাঁদের হয়ে পর্দায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। এটাও এক ধরনের ‘বুদ্ধিমত্তার আত্মসমর্পণ’ অর্থাৎ তুমি আমার হয়ে চিন্তা ভাবনা করবে, আর আমি ঠাণ্ডা ঘরে আরাম কেদারায় নিশ্চিন্তে গা এলিয়ে বসে সেটা শুধু দেখব।
আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল আজকের বাঙালি সমাজ রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত, অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত এবং নৈতিকতার দিক থেকে ধূসর। সম্পর্কের জটিলতা আর অনিশ্চয়তা এখন নিত্যসঙ্গী। বাস্তবে যেখানে কোনও সমস্যারই পরিষ্কার সমাধান নেই, সেই পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা গল্প অনেকটাই ‘সেফ জোন’-এর বিনোদন।
দর্শকের ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থাকলেও গোয়েন্দা গল্পের শেষে সব প্রশ্নের উত্তর মিলে যাবে। এটা আসলে বাস্তব থেকে এক ধরনের পলায়নবৃত্তি বা ‘এস্কেপিজম’।
সর্বক্ষণ মোবাইলসঙ্গী আজকের এই দর্শকরা জানে যে গোয়েন্দা গল্পে এক বা একাধিক অপরাধী থাকবে, সঙ্গে এটাও তাঁরা জানেন যে ছবির শেষ দৃশ্যে সত্যের জয় হবে। আসলে এটা এক ন্যায়বিচারের কল্পলোক, অনেকটা ‘মরীচিকা’র মতো, যা দর্শককে সাময়িক মানসিক প্রশান্তি দেয়। তাঁদের অন্তরে ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়, কিন্তু মানুষের সমাজ কখনই ত্রুটিমুক্ত নয় সুতরাং পূর্ণাঙ্গরূপে একে বাস্তবে ছোঁয়া প্রায় অসম্ভব। এ প্রসঙ্গে গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে এমন এক আদর্শ রাষ্ট্রের কথা বলেছেন, যেখানে ন্যায়বিচারই হবে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। তবে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, সেটা পার্থিব জগতে সম্ভব নয়, শুধুমাত্র মানুষের চিন্তায় বা স্বর্গেই একমাত্র উপলব্ধ হলেও হতে পারে।
আজকের সিনেমায় প্রেম, রাজনীতি বা সম্পর্কের সামাজিক গল্প প্রযোজকদের বড়ই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সামাজিক সিনেমা দর্শককে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে তাঁর মনে একটা ভিন্নবোধ তৈরি করে। আবার দর্শক মনে এমন কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন তোলে, যা সাময়িকভাবে তাঁদের বিচলিত করে। আধুনিক প্রজন্মের অধিকাংশ দর্শকই তাঁরা তাঁদের নিজের জীবনের অবক্ষয় বা অগোছালো বাস্তবকে নতুন করে সিনেমার পর্দায় দেখতে চায় না। দর্শকের ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থাকলেও গোয়েন্দা গল্পের শেষে সব প্রশ্নের উত্তর মিলে যাবে। এটা আসলে বাস্তব থেকে এক ধরনের পলায়নবৃত্তি বা ‘এস্কেপিজম’।

আজ সামাজিক ছবি হারিয়ে যাওয়ার পিছনে আরও একটা বড় কারণ হল সিনেমা প্রদর্শনে আধুনিক উদার অর্থনীতির প্রভাব। আগে সিঙ্গল স্ক্রিনে একটা ছবি দীর্ঘ সময় ধরে চলার সুযোগ পেত, এবং সেখানে আর্থিক ভাবে সব শ্রেণির দর্শকের যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ ছিল। এখন অভিজাত মাল্টিপ্লেক্সে নির্দিষ্ট দু-এক শ্রেণির মানুষ কানে ফোন আর হাতে এক গামলা পপকর্ন নিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় একটা ছবির ভাগ্য নির্ধারণ করেন। সামাজিক কাহিনি বা সাহিত্য অবলম্বনে সিনেমা থিতু হওয়ার জন্য সিনেমা হলে ছবির যে সময়টা প্রয়োজন হয়, বর্তমানে সেই সময়টাই দুর্লভ।
লকডাউনের সময় সুযোগ বুঝে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো গোয়েন্দা গল্পকে ‘সিরিজ ফ্রেন্ডলি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। কোনও বিকল্প না থাকায় দর্শকও বাধ্য হয়েই গোয়েন্দা গল্পে অভ্যস্ত হয়েছে। আবার বর্তমান নির্মাতারা ট্রোলিং বা রাজনৈতিক রোষানলে পড়ার ভয়ে ভীত। সামাজিক বা রাজনৈতিক সিনেমা করলে যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, গোয়েন্দা গল্পে সে দায় অনায়াসেই এড়িয়ে যাওয়া যায়।
গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলা সিনেমা ‘সেফ জোন’ দিয়ে হাঁটতে পছন্দ করছে। গোয়েন্দা ছবির জয়জয়কার থাকলেও সামাজিক ও মৌলিক সাহিত্যনির্ভর ছবির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম।
বাঙালির মানসিকতায় আরও একটা অদ্ভুত দিক হল, সে ঘরে বসে গণমাধ্যমের সমক্ষে নিজেদের জ্ঞান এবং সচেতনতাকে জাহির করে প্রশ্ন ছুঁড়তে ভালবাসে। চায়ের কাপে তুফান তুলে বিশ্বরাজনীতি বা দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে কাটাছেঁড়া করা সব শ্রেণির বাঙালির কাছে এক ধরনের ‘বৌদ্ধিক ব্যায়াম’। এতে তাঁদের বৌদ্ধিক অহং (Intellectual Ego) বোধ তৃপ্ত হয়। বাইরের জগতের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা অনেক সহজ, কারণ সেখানে আমাদের কোনও সরাসরি দায়িত্ব নিতে হয় না। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের সংকট অভাব-অনটন, সম্পর্কের তিক্ততা বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এবং যন্ত্রণাদায়ক।
আসলে ঘরের ভিতরে নিজের জীবনের উত্তরহীন প্রশ্ন থেকে বাঁচতেই বাঙালিরা বাইরের জগতে ‘বড় বড়’ সমস্যায় নিজেদের ডুবিয়ে রাখে। এটাকে বাঙালির মানসিক ‘সুরক্ষা কবচ’ বলা যেতে পারে। এক কথায়, বাঙালি আজও বিপ্লবী হতে ভালবাসে, কারণ সেখানে প্রশ্ন তোলাটাই একমাত্র কাজ। বাঙালি সমাজ বদলের প্রেসক্রিপশন দিতে যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষতগুলো সারাতে ততটাই দিশেহারা। চায়ের দোকানে বসে দেশের জিডিপি নিয়ে যে মানুষটা সরব, তিনি নিজেই নিজের মাসকাবারি খরচের হিসাব মেলাতে পারেন না। এই দ্বৈত সত্তাও আধুনিক বাঙালির মানসিক সংকটের অন্যতম কারণ।

গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলা সিনেমা ‘সেফ জোন’ দিয়ে হাঁটতে পছন্দ করছে। গোয়েন্দা ছবির জয়জয়কার থাকলেও সামাজিক ও মৌলিক সাহিত্যনির্ভর ছবির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে তাহলে আগামী দিনে কি বাংলায় সামাজিক সিনেমা চিরতরে হারিয়ে যাবে? ঋত্বিক ঘটকের মানসিক ধাক্কা বা মৃণাল সেনের সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হওয়ার সাহস আজ মধ্যবিত্ত বাঙালি হারিয়ে ফেলেছে। আজকের দর্শক চায় পরিচিত ‘চরিত্র’ কিন্তু সে তাঁর মতো রক্তমাংসের ‘মানুষ’ হবে না।
আজ সাহিত্যনির্ভর সামাজিক ছবি বা স্বাধীন চলচ্চিত্র মূলস্রোতে সংখ্যালঘু হলেও চলচ্চিত্র উৎসবের ভিড়ে বা শহরের কোনও নিভৃত কোণে আজও নীরব স্বীকৃতি আদায় করে চলেছে। বর্তমানে সামাজিক সিনেমার বিলুপ্তি না বলে ‘নির্বাসন’ বলাই শ্রেয়। যেদিন বাঙালি দর্শক আবার অনিশ্চয়তার সঙ্গে বসবাস করতে শিখবে, যেদিন সে নিজের ভেতরের ধূসর সত্তাটিকে মেনে নিতে পারবে, সেদিন হয়তো সে আবার প্রেম, রাজনীতি আর অসম্পূর্ণতার গল্পে ফিরে আসবে। সেদিন বাংলা সিনেমার ইতিহাস প্রমাণ করবে গোয়েন্দা গল্পের এই জয়জয়কার আসলে আজকের ‘সময়ের আলেখ্য’ মাত্র।
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত