(Girija Devi)
অফিসের কাজে একদিন বিকেলে চলেছি টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়ার দিকে। টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশন পার করে যখন আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমির সামনে এসেছি, তখন হঠাতই ট্যাক্সি ড্রাইভারকে অনুরোধ করলাম একাডেমির ৩ নম্বর গেটের সামনে একটু দাঁড়াতে। ট্যাক্সি থেকে নেমে একটু হেঁটে ডানদিকের একটা দোতলা বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দরজার বেল টিপলাম।
আরও পড়ুন: শান্তিনিকেতনের রাণী
একটু পরেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে দরজা খুলে দাঁড়ালেন গৃহকত্রী ভারতবিখ্যাত কণ্ঠসংগীত শিল্পী গিরিজা দেবী। হয়তো ভেবেছিলেন বলা কওয়া নেই, অচেনা এই আগন্তুকটি কে! তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা করে ফেললাম, ওঁর একটা সাক্ষাৎকার নিতে হবে। সেই মতো অনুরোধও করলাম। খুবই বিনীতভাবে বললেন, ‘আজ একটু ব্যস্ত রয়েছি, বাড়ি ভর্তি ছাত্রছাত্রী, গান শেখাবার ক্লাস চলছে।’ নিজে থেকেই ফোন নম্বর দিলেন, বললেন পরেরদিন ফোন করতে, সেইদিনই বলে দেবেন, কবে সাক্ষাৎকার পর্বটি করা সম্ভব। সেদিনের মতো বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এসে চলে গেলাম পূর্বনির্ধারিত কাজ করতে।

পরেরদিন গিরিজা দেবীর ল্যান্ডলাইনে ফোন করলাম, উনিই ধরলেন আর দু’দিন পরেই বাড়িতে ডাকলেন। আমার বন্ধু আর আমি ওঁর জন্য সামান্য ক’টি উপহার নিয়ে গেলাম সংগীত রিসার্চ একাডেমিতে ওঁর বাড়িতে। উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলাম! সঙ্গে ‘বেটা’ সম্বোধনের মধ্যে আন্তরিক ভালবাসা। এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার তো দিলেনই, তারপরে নিজে সামনে বসে থেকে যত্ন করে খাওয়ালেন।
আমরা যাব বলে নিজেই অনেক ধরনের খাবার তৈরি করে রেখেছিলেন! কথোপকথনের মাঝে ওঁর গাওয়া, ‘বরসন লাগি বাদারিয়া’ গানটির দু’টি লাইন খালি গলায় গাইলেন। বলাই বাহুল্য, আমাদের কথোপকথনের পুরোটাই হয়েছিল হিন্দিতে। ভারতের মার্গসঙ্গীতের একজন কিংবদন্তী শিল্পী হয়েও কত সাধারণ আচরণ, কী সৌজন্যতাবোধ ছিল তাঁর! সেই শুরু, তারপর থেকে যোগাযোগটা রয়েই গেছিল। ওঁর কন্যা সুধাদিও খুব স্নেহ করতেন। অনেকবার বলেছিলেন, ওঁদের বেনারসের বাড়িতে যেতে, কিন্তু হরেকরকম ব্যস্ততায় আর হয়ে ওঠেনি।

গিরিজা দেবীর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার বছরখানেকের মধ্যে পণ্ডিত রবিশঙ্কর চলে গেলেন। আমার সংস্থা তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নন্দনে ৭ দিনব্যাপী এক প্রদর্শনী, এবং শ্রদ্ধেয় রবিশঙ্করের সুরারোপিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করেছিলাম। সেই কথা ওঁকে জানাতে অনুষ্ঠানের স্মারক পত্রিকার জন্য একটি বড় লেখা লিখে দিয়েছিলেন।
ওইদিন আমার সঙ্গে গিরিজা দেবীর বাড়িতে গিয়েছিলেন বিশিষ্ট স্থিরচিত্রগ্রাহক অলক মিত্র। উনি সেদিন আপ্পাজি মানে গিরিজা দেবীর অনেক ছবি তুলেছিলেন। অলকদা শ্রদ্ধেয় রবিশঙ্করেরও খুব ঘনিষ্ট ছিলেন। ওইদিন সন্ধ্যায় গিরিজা দেবীর কাছে পন্ডিতজির অনেক অজানা গল্প শুনেছিলাম। মজা করে বলেছিলেন, ওঁদের দুজনের আইসক্রিম খাওয়ার কথা। মনে মনে ভেবেছিলাম গলা নিয়ে যাঁর কাজ, তিনি এত আইসক্রিম খান! কথাটা বলতে এক গাল হেসে বলেছিলেন, ‘যতই আইসক্রিম খাও না কেন, পরে এক গেলাস জল খেয়ে নেবে, তাহলে আর ঠান্ডা লাগবে না।’
আমার আবদার শুনে বলতেন, হলে গিয়ে ওঁর নাম করে ঢুকে যেতে। তারপরে ওঁর সঙ্গে দেখা করলে একদম সামনের সারিতে বসার ব্যবস্থা করে দিতেন।
আইটিসিতে থাকার সময়ই টালিগঞ্জ করুণাময়ী থেকে বেহালা চৌরাস্তার মাঝামাঝি একটি জায়গায় গিরিজা দেবী একটি বাড়ি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত সেই বাড়িতে আর তাঁর থাকা হয়নি। কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় ওঁর অনুষ্ঠান থাকলে ফোন করে জানতে চাইতাম, কীভাবে সেই অনুষ্ঠানে যেতে পারি? কোনও বিশেষ আমন্ত্রণপত্রর ব্যবস্থা আছে কি না ইত্যাদি। আমার আবদার শুনে বলতেন, হলে গিয়ে ওঁর নাম করে ঢুকে যেতে। তারপরে ওঁর সঙ্গে দেখা করলে একদম সামনের সারিতে বসার ব্যবস্থা করে দিতেন।
কথা প্রসঙ্গে একদিন বলেছিলেন, সত্যজিৎ রায় ওঁর একটি গান, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন! এই কথাটি উনি আরও অনেক জায়গায় একাধিক সাক্ষাৎকারেও বলেছেন। ওঁর সম্পর্কে একটি বড় লেখা আর কথোপকথনটি আমরা আমাদের সংবাদপত্রে ব্যবহার করেছিলাম। তবে পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি ওঁর কয়েকটি গান এবং কয়েকজন শিল্পীর বক্তব্য নিয়ে আপ্পাজির জীবনাবসানের পরে, ‘বিহান’ কোম্পানি থেকে প্রকাশ করার উদ্যোগ নিই। এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় অনুমতি দিয়েছিলেন ওঁর কন্যা সুধাদি। আর আর্থিক সাহায্য করেছিলেন হর্ষবর্ধন নেওটিয়া।

কিছুদিন পরে সিডিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দিয়েছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল এবং গিরিজা দেবীর গানের ভক্ত কেশরীনাথ ত্রিপাঠী এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাতে। ওঁর চলে যাওয়ার পরে নন্দনে একটি বিশেষ স্মরণ অনুষ্ঠানে সিডিটি প্রকাশ করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সাবির খান, শুভেন চট্টোপাধ্যায়, আপ্পাজির কন্যা সুধাদি প্রমুখেরা। ভারতের গঙ্গাতীরের প্রাচীনতম শহর বেনারসে জন্ম, আর সুরলোকে চলে যাওয়া আর এক গঙ্গাতীরের শহর কলকাতায়। দু’টি শহরই আজও তাঁর সঙ্গীতের স্মৃতি বহন করছে। এসব পুরনো কথা ভাবতে গিয়ে আজও মাঝে মাঝে মন বিষণ্ণ হয়ে যায়, আর নিজের অজান্তেই ক’টি ইংরেজি শব্দ মনের মধ্যে অনুরনিত হয়, ‘Those were my golden days’।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত