(Thamma Friends)
শোভনা ঠাম্মার বেড়ালের নাম মিস্টার বিসমার্ক। একী! অমন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছ কেন? কী ভাবছ, বেড়ালের নাম পুশি, মিনি, আহ্লাদী এমনকি ডাম্বেল হতে পারে তাই বলে মিস্টার বিসমার্ক! তোমাদের মতো সকলেই অবাক হয়, কিন্তু পুপুন শোভনা ঠাম্মাকে বলেছে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মোটাসোটা পার্সিয়ান বেড়ালের নাম ছিল মিস্টার বিসমার্ক। তাই ঠাম্মার কালো কুচকুচে গোলুমোলু বেড়ালের নাম ওটাই রাখতে হবে। কিন্তু মুশকিল হল শোভনা ঠাম্মা অত বড় নাম ধরে ডাকতে পারেন না, আবার এই নামে ডাকলে মিস্টার বিসমার্ক সাড়াও দেয় না। তাই ঠাম্মা আদর করে ওকে বিশু বলে ডাকেন।
ঠাম্মা যখন হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিওতে পুপুনের সঙ্গে গল্প করেন, বিশু তখন ঠাম্মার কোলের মধ্যে বসে চুপটি করে সব কথা শোনে। মাঝে মাঝে মিঁউ মিঁউ করে ওর ভাষায় কথাও বলে। মজা করে পুপুন মাছের ছবি দেখালে মাছটা ধরার জন্য থাবা বাড়ায়। পুপুন তো হেসে একেবারে গড়িয়ে পড়ে। বিশু বোকা বনে গিয়েছে বুঝতে পেরে মুখ নিচু করে বসে থাকে।
তোমাদের মনে একটা প্রশ্ন আসছে বুঝতে পারছি, প্রশ্নটা হল পুপুন কে আর সে কোথায় থাকে? তাহলে শোনো, পুপুন হল শোভনা ঠাম্মার নাতি, থাকে অনেক দূরে কানাডায়। পুপুনের বাবা ওখানে চাকরি করেন, তাই পুপুনকে যেতেই হয়েছে। কিন্তু, পুপুনের একটুও ইচ্ছা ছিল না ঠাম্মাকে এখানে একা একা রেখে যাওয়ার। কিন্তু ঠাম্মা তো যেতে চাইলেন না, এখানে যে ঠাম্মার বন্ধুরা আছে! বিশু কি একাই ঠাম্মার বন্ধু নাকি?
ভোলা আর কেল্টু আছে, তবে ওরা ঠাম্মার কোলে ওঠে না। খুব দরকার না পড়লে ঘরেও ঢোকে না। বারান্দায় ওদের জন্য বেশ নরম দেখে বড় বড় দুটো উলের আসন পাতা আছে, ওরা ওখানেই ঘুমিয়ে থাকে। এ ছাড়াও আছে চিকি, ও থাকে নারকেল গাছের কোটরে। সকালে ঠাম্মা যখন চাল, বিস্কুট ছড়িয়ে দেয় ছাদে, তখন পায়রা, শালিখদের সঙ্গে চিকিও আসে। চিকি ঘরেও আসে মাঝে মাঝে, ঠাম্মার ঘাড়ে চড়ে আদর খায়। কিন্তু বিশু আবার চিকিকে একদম সহ্য করতে পারে না। তাই বিশুকে দেখলেই জিভ ভাঙিয়ে চিড়িক চিড়িক শব্দ করে কাঠবেড়ালি চিকি পালিয়ে যায়।

তাহলে বুঝতে পারছ ঠাম্মার কত্ত বন্ধু! ওদের সঙ্গে গল্প করে, ওদের আদর করে খাবার খাইয়েই দিন কেটে যায়, আর রাত্রে পুপুন ফোন করে। যতই পড়াশোনার চাপ থাক, পুপুন ঠাম্মার সঙ্গে গল্প করবেই। দাদান আকাশের তারা হয়ে গিয়েছে, ছোট হলেও পুপুন বোঝে ঠাম্মার মনে খুব কষ্ট। তাই তো সকালে ভোলা, কেল্টু দোকান থেকে ফুলের মালা এনে দেওয়ার পর দাদানের ছবিতে মালা পরানোর সময় ঠাম্মা চশমার কাচ মোছে। ভোলা, কেল্টু কুকুর হলে কী হবে, ওরাও বোঝে ঠাম্মার কষ্ট। তাই তো ঠাম্মার গায়ে গা ঘষে, লেজ নেড়ে আদর করে ঠাম্মাকে। আগে দাদানের জন্যে ফুলের মালা বিনতা মাসি আনত, ভোলা আর কেল্টুও সঙ্গে যেত। এখন ওরা দোকান চিনে গিয়েছে, দোকানদারও ওদের চেনে, তাই একটা সাজির ভেতরে টাকা দিলে ওরাই মালা নিয়ে আসে।
ওরা সব পারে, ঠাম্মা কোথাও গেলে বিশু তো সঙ্গে যাবেই, ওদিকে ভোলা বা কেল্টু ওরাও কেউ না কেউ যাবে, আর একজন থেকে যায় বাড়ি পাহারা দিতে। এই কে যাবে ঠাম্মার সঙ্গে আর কে বাড়িতে থাকবে, এই ব্যাপারটা ওরাই ঠিক করে নেয়, শুধু মুখে বলতে পারে না। কিন্তু ওদের কাণ্ডকারখানা দেখলে তাজ্জব বনে যেতে হয়।
ঠাম্মা বাইরে গেলেই একজন সঙ্গে সঙ্গে যায়, কখনও আবার আঁচল টেনে ধরে। ঠাম্মা বুঝতে পারে ওরা যেতে দেবে না, তখন একটা লিস্ট, আর টাকা একটা প্যাকেটের মধ্যে দিয়ে দেয়।
যখন পুপুন বাবা-মার সঙ্গে কানাডা চলে যায় তখন বিশু, ভোলা, কেল্টু কেউ ছিল না। পুপুনের বাবার বন্ধু অনুভব আঙ্কেল খুব ভাল ডাক্তার। ঠাম্মাকে সপ্তাহে একদিন দেখতে আসতেন, আর প্রতিবারই অবাক হয়ে যেতেন খাবারদাবার ঠিকমতো খাওয়া সত্ত্বেও ঠাম্মার শরীর দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তারপর ঘটল সেই তাজ্জব কাণ্ড! বিশেষ কাজে ডক্টর অনুভব এক মাসের জন্যে বাইরে গিয়েছিলেন ফিরে এসে ঠাম্মাকে পরীক্ষা করে দেখলেন এই এক মাসে মিরাকেল ঘটে গিয়েছে। ঠাম্মার শরীর ভাল হয়েছে, সেই সঙ্গে খুব খুশি আর চনমনে হয়েছেন।
ডক্টর অনুভব যখন ভাবছেন এটা কী করে সম্ভব হল? তখনই একটা বেড়ালছানা ঠাম্মার কোলে এসে বসল। এইবার ডক্টর বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা। ঠাম্মার এই পরিবর্তনের মূলে বেড়াল, গবেষণায় দেখা গিয়েছে বেড়ালের মিঁউ মিঁউ ধ্বনি বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ধ্বনিগুলোর একটা। এই ধ্বনি অস্থি ও পেশির ব্যথা সারাতে থেরাপির কাজ করে। শুধু কি তাই? বেড়াল পুষলে ভাল ঘুম হয়, মন খুশি থাকে। ডক্টর চলে গেলে ঠাম্মা ছানাটাকে আদর করে বললেন, “বুঝলি বিশু, তুই কালো বলে যারা তোকে আমার বাড়িতে লুকিয়ে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল, তারা আমার উপকারই করেছে।”

মিস্টার বিসমার্ক আজকাল অনেক কিছু বুঝতে পারে, যেমন ঠাম্মা পুজো করে যখন পাঁচালি পড়ে, তখন চুপটি করে বসে বসে শোনে। পুপুন ঠাম্মার কাছে এই কথা শুনে বলেছিল, “ওরা তো বুঝতে পারে, তাই আমেরিকার একজন বিখ্যাত লেখক রেমন্ড চ্যান্ডলার নিজের লেখা উপন্যাস প্রথমে পড়ে শোনাতেন তাঁর বেড়াল টাকিকে।” পুপুন ভিডিও কলে ভোলা আর কেল্টুর সঙ্গেও কথা বলে। বলে ওরা যেন ঠাম্মার সঙ্গে সবসময় থাকে, ঠাম্মার যা যা লাগবে, সবকিছু দোকান থেকে এনে দেয়।
ওরা কী বোঝে কে জানে! তবে ঠাম্মা বাইরে গেলেই একজন সঙ্গে সঙ্গে যায়, কখনও আবার আঁচল টেনে ধরে। ঠাম্মা বুঝতে পারে ওরা যেতে দেবে না, তখন একটা লিস্ট, আর টাকা একটা প্যাকেটের মধ্যে দিয়ে দেয়। পাড়ার দোকানদারও বুঝে গিয়েছে তাই লিস্ট মিলিয়ে মুড়ি, বিস্কুট এইসব প্যাকেটের মধ্যে দিয়ে দেয়। পুপুন কিছুদিন আগে এসেছিল, ও বুদ্ধি দিয়েছে ভোলা আর কেল্টুর জন্য একটা ছোট্ট গাড়ি কিনে দিলে ওদের মুখে করে আনতে হবে না। গাড়ি করেই আনতে পারবে। পুপুনের বাবা বলেছে কানাডা থেকে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু ওদের ট্রেনিং কে দেবে?
ঠাম্মা ওদের ভাল করে বোঝান, ওরা যেন কখনও বড় রাস্তায় না যায়, মিস্টার বিসমার্ককেও বলেন তবে বিশু একটু ডানপিটে বেড়াল কি না, তাই কথা শোনে না। অন্য কোনও বেড়াল, কুকুর গেটের কাছে আসতে পর্যন্ত ভয় পায়।
ট্রেনিং নিয়ে ভাবনার কী আছে? ভিডিও কলে পুপুন ট্রেনিং দেবে। ভোলা আর কেল্টু যা স্মার্ট ডগ, ঠিক বুঝে নেবে। পুপুন যাই বলুক ঠাম্মা ঠিক করে রেখেছেন গাড়ি এলে ওরা বাড়ির মধ্যেই গাড়ি নিয়ে খেলা করবে। ওদের বড় রাস্তায় পাঠাবেন না। যা ভিড়! আর ওদের দিয়ে জিনিস আনার দরকার কী! সবই তো পুপুনের বাবা অনলাইন অর্ডার দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। আর টুকটাক বাজার বিনতা মাসি করে আনে। পুপুনের যে কী খেয়াল!
ঠাম্মা ওদের ভাল করে বোঝান, ওরা যেন কখনও বড় রাস্তায় না যায়, মিস্টার বিসমার্ককেও বলেন তবে বিশু একটু ডানপিটে বেড়াল কি না, তাই কথা শোনে না। অন্য কোনও বেড়াল, কুকুর গেটের কাছে আসতে পর্যন্ত ভয় পায়। বিশু এমন তাড়া করে যে, ওরা পালাবার পথ পায় না।

সকালে ঠাম্মা যখন ছাদে গিয়ে পাখিদের খাবার দেন, তখন অবশ্য পাখিদের তাড়া করে না। পাখিরা খাবার সময় ভোলা, কেল্টুও চলে আসে। সে অবশ্য ভালই করে, পাখিদের সঙ্গে ওদের ভাব হয়ে গিয়েছে। দু-একদিন শরীর খারাপ হলে ঠাম্মা না আসতে পারলে পাখিদের খাবার ওরাই দেয়। পাখিরা খাবার খেলেও ঠাম্মার ঘরের জানলায় এসে একবার দেখা করে যায়, ওদের ভাষায় কথাও বলে। ঠাম্মা বলে, “চিন্তা করিস না। আমি কাল সকালে ছাদে যাব।”
কিন্তু এবার ঠাম্মার শরীরটা সত্যিই খারাপ হয়েছে, এদিকে বিনতা মাসি নাতির মুখেভাতে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছে। মিস্টার বিসমার্ক ঠিক বুঝতে পেরেছে ঠাম্মি বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না। ভোলা, কেল্টু ওরা কেউ ঘরে ঢোকে না। ওরাও এসে ঠাম্মাকে দেখে গিয়েছে। কিন্তু ওরা তো ডক্টর অনুভবের ঠিকানা জানে না, তাই যেতে পারছে না। ঠাম্মা একবার চোখ মেলে তাকিয়ে বিশুকে বলল, “তোরা বিস্কুট খা।”
এবার না হয় ঠিক সময়ে মিস্টার বিসমার্ক খবর দিয়েছে তা না হলে যে কী হত! পুপুনের বাবা এসে বলল, “আর তোমাকে একা রাখব না। চলো, পার্মানেন্ট ভিসা পেয়ে যাব ঠিক।”
কিন্তু ওরা কি খেতে পারে? বিশুর মিস্টার বিসমার্ক নাম সার্থক, ফোন এনে নাম্বার টিপে টিপে একা একাই পুপুনকে ভিডিও কল করেছে। তারপর ঠাম্মার শুয়ে থাকার ছবি দেখাতে পুপুন যা বোঝার বুঝে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে পুপুনের বাবা ডক্টর বন্ধুকে ফোন করে সব বলেছে। তারপর ডক্টর এসে ঠাম্মাকে দেখে অ্যাম্বুলেন্সে করে হসপিটালে ভর্তি করে দিয়েছেন। ঠাম্মার জ্ঞান ফিরতেই প্রথম কথা হল “আমার বিশু, ভোলা, কেল্টু খেয়েছে?”
ঠাম্মা যেমন ওদের প্রাণ দিয়ে ভালবাসেন, ওরাও তাই। তাই তো ঠাম্মা বাড়ি না আসা পর্যন্ত ওরাও কিছু খায়নি। ঠাম্মা ভাল হতে পুপুন বলল, “দেখলে ঠাম্মা, আমি মিস্টার বিসমার্ককে কেমন ট্রেনিং দিয়েছি! ফোন করা শিখিয়ে দিয়েছিলাম, আর আমি মিস্টার বিসমার্ককে বলে দিয়েছিলাম ঠাম্মাকে দেখে রাখতে, আমাদের খবর দিতে। তাই তো আমরা খবর পেলাম। মিস্টার বিসমার্ক আমাদের মতো কথা বলতে না পারলেও সব বুঝতে পারে, ওর মত করে বোঝাতেও পারে।”

এবার না হয় ঠিক সময়ে মিস্টার বিসমার্ক খবর দিয়েছে তা না হলে যে কী হত! পুপুনের বাবা এসে বলল, “আর তোমাকে একা রাখব না। চলো, পার্মানেন্ট ভিসা পেয়ে যাব ঠিক।”
ঠাম্মার একই কথা, “আমার বিশু, ভোলা, কেল্টু, চিকি, পাখি ওদের ছেড়ে আমি কী করে যাব? ওদের কে দেখবে? ওরা তো আমার জন্যে মন খারাপ করবে, খাবে না। বিনতাও খুব কষ্ট পাবে। না-না আমার যাওয়া হবে না। ওদের ছেড়ে যেতে পারব না।”
পাখির কিচির-মিচির শুনে ঠাম্মা জানলায় তাকিয়ে দেখে পাখিরাও চলে এসেছে। ওরাও ওদের ভাষায় বলছে, “আমরাও তোমাকে ভালবাসি।”
ঠাম্মার চোখে জল দেখে বিশু, ভোলা, কেল্টু সবাই ঠাম্মার কোল ঘেঁষে বসে আছে, ভাবখানা এমন যেন বলতে চাইছে “তুমি কি একাই আমাদের ভালবাসো! আমরাও তোমাকে সবাই খুব খুব ভালবাসি।”

পাখির কিচির-মিচির শুনে ঠাম্মা জানলায় তাকিয়ে দেখে পাখিরাও চলে এসেছে। ওরাও ওদের ভাষায় বলছে, “আমরাও তোমাকে ভালবাসি।”
ঠাম্মা আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, “আমিও তোদের সবাইকে খুব ভালবাসি রে।”
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত