(Hemanta Mukhopadhyay)
অসিত সেন ছবি করবেন হিন্দিতে, নিজের বাংলা ছবির রিমেক। ব্যক্তিগত ইচ্ছা, সুরকার বিশেষ গানটি নিজেই গান, বিশেষত বাংলা ছবিতে যেখানে আবেদনের ভিত্তিতে, স্বর্গীয় কণ্ঠমাধুর্যের অভিঘাতে সেই গানটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছিল। গীতিকারের ব্যক্তিগত ইচ্ছেও কতকটা তাই, কিন্তু জীবন্ত কিংবদন্তি মানুষটিকে বলতে ইতস্তত করছেন নবীন গীতিকার।
সুরকার বললেন, ‘আমি টোনাল কোয়ালিটি বুঝি, এক্সপ্রেশনের ডেলিভারি বুঝি, আর হিরোর ভোকাল পিচ ম্যাচিং বুঝি। এ গান কিশোর গাইবে, আমি নয়। আমি জানি কিশোর কী করতে পারে, আমি বললে ও সব কাজ ফেলে গানটা তুলবে। অসিত কে বোলো কিশোর গাইবে, সারা দেশ শুনবে, যারা ভাবে কিশোর সিরিয়াস, একটু অন্য ধারার গান গাইতে স্বচ্ছন্দ নয়, তারা এবার দেখবে!’ ছবির নাম ‘খামোশি’, বাংলা ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর হিন্দি ভার্শন। গীতিকার গুলজার, গানটি ‘উহ শাম কুছ আজিব থি’।
সাধারণভাবে সকলের জানা ‘আরাধনা’ ছবির সূত্রে রাজেশ খান্নার কণ্ঠ হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি কিশোরকুমার। কিন্তু এই যাত্রা শুরুর জুহুরির নাম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শুধু গায়ক-সুরকার নন, একজন এমন হৃদয়বান মানুষ, যিনি ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে উঠে আজীবন প্রচুর নতুন প্রতিভা অথবা প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের অন্য একটি আঙ্গিক খুঁজে তাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন।
আজ এই কিংবদন্তি মানুষটির শুভ আবির্ভাব দিবস।
গ্যারেজ থেকে গুলজার
বিমল রায়ের ছবিতে সুর করছেন শচীন কর্তা। ছবির নাম ‘বন্দিনী’। ছবির মধ্যেই গীতিকার শৈলেন্দ্রর সঙ্গে কর্তার বিবাদ। হেমন্ত পরামর্শ দিলেন, ‘শচীনদা একটি ছেলের সঙ্গে ইদানীং পরিচয় হয়েছে, ভিতরে আগুন আছে, পাঞ্জাবি, কিন্তু বাংলা সংস্কৃতির অনুরক্ত। গ্যারেজে মোটর মেকানিক্সের কাজ করে, যদি বলেন তো কথা বলি।’

কর্তা বললেন, ‘আমার গীতিকার গ্যারেজে কাজ করে, তুমি তো রসিকতা করনের মানুষ না, এইটা কী কও!’ আশ্বস্ত করলেন হেমন্ত, তৈরি হল নূতনের লিপে লতার ‘মোরা গোরা অঙ্গ লেই লে, মোহে শাম অঙ্গ দেই দে’। বোম্বেতে জন্ম নিলেন এক কিংবদন্তি সম্পুরন সিং কালরা, যাঁকে আজ পৃথিবী গুলজার নামে জানে।
‘বম্বে-কলকাতা, ছবি, প্রোডাকশন করে করে আর প্রেম-বিরহের নরম একঘেয়ে গান গেয়ে গেয়ে হাঁপিয়ে গেছি নচিবাবু, একটা গান করুন তো অন্যরকম।’ নচিকেতা ঘোষ বললেন, ‘হেমন্তদা সে তো আপনিই করতে পারেন, আমি কেন?’ বললেন, ‘আমি জানি আপনিই পারবেন, আমাদের মিটার আপনার হাতের তালুতে’। ডাক পড়ল গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের… তৈরি হল অমর এপিটাফ, ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’।
একে একে বাংলায় নিয়ে এলেন ভুবনজয়ী দুই মারাঠি কন্যাকে… লতাকে দিয়ে ‘কুহেলি’ ছবিতে নিজের সঙ্গে প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ালেন… ‘তুমি রবে নীরবে’, আশাকেও প্রতিষ্ঠা দিলেন।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের কিংবদন্তি
‘এ আমার দ্বারা হবে না হেমন্তদা, আপনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের বেঞ্চমার্ক, আপনি গান, আমি লিপসিঙ্ক করব ছবিতে, রুমা না হয় গাইল’…‘আমি জানি কাকে দিয়ে কী হয়, আমি শেখাব, তুই-ই গাইবি’, অগত্যা রাজি হলেন কিশোরকুমার, ‘লুকোচুরি’ ছবিতে প্রথম গাইলেন রবীন্দ্রনাথের গান ‘মায়াবন বিহারিণী হরিণী’…ভয় ভাঙল, পরে আরও ছবিতে গাইলেন। আশির শুরুতে নিজের রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রথম অ্যালবাম, পরিচালক সেই হেমন্তদা।
একে একে বাংলায় নিয়ে এলেন ভুবনজয়ী দুই মারাঠি কন্যাকে… লতাকে দিয়ে ‘কুহেলি’ ছবিতে নিজের সঙ্গে প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ালেন… ‘তুমি রবে নীরবে’, আশাকেও প্রতিষ্ঠা দিলেন। আশা নিজের প্রথম সন্তানের নামকরণ করেন গানের রাজার নামে, এতটাই প্রভাবিত ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ঐশ্বরিক কণ্ঠের জাদুতে! আর এই ঘটনা তো চোখে দেখা, সম্ভবত নজরুল মঞ্চে আশির দশকের শেষ ভাগে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীতজীবনের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে লতা মঙ্গেশকরের স্টেজের উপর সাষ্টাঙ্গে প্রণাম!

জর্জ যখন ব্রাত্য
‘এখনও আপনার গানের বিক্রি সব থেকে বেশি’ স্মিতহাস্যে বললেন, ‘ছবি বা আধুনিকে হয়তো তাই, কিন্তু রবীন্দ্রসংগীতে জর্জ অনেক বেশি জনপ্রিয়’। ভাবা যায়! রবীন্দ্রসঙ্গীতকে যিনি রান্নাঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন, বিশ্বভারতীর সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও রবি ঠাকুরের গানে যাঁর আবিশ্ব পদচারণা, দুই আশ্রম কন্যা, কণিকা-সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গে শ্যামা-চণ্ডালিকা, বিশেষ সখ্য… তাঁর এমন স্বীকারোক্তি! হৃদয়বত্তা কতটা মহত্তম হলে সাধারণ অহং-এর এই বেড়া এত সহজেই লঙ্ঘন করা যায়! সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘অগ্রপথিকেরা’ স্মরণগ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন।
ভালবেসে কাকা বলে সম্বোধন করতেন দেবব্রত বিশ্বাসকে। উত্তমকুমার ও হেমন্তের বিশেষ উদ্যোগে জীবন সায়াহ্নে রবীন্দ্রসদনে জর্জ বিশ্বাসের সম্মানে এক বিশেষ সঙ্গীতসন্ধ্যার আয়োজন হয়, মহানায়ক নিজে বাড়ি গিয়ে তাঁকে অনেক অনুরোধের পর আমন্ত্রণ করতে সক্ষম হন। জর্জ বিশ্বাস তখন গানের জগতে ব্রাত্য, হেমন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বিরোধিতা করতে পারেন না, যেহেতু বিশ্বভারতীতে তাঁর কোনও প্রত্যক্ষ সংযোগ নেই, কিন্তু নিজের মতো করে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে গেলেন এভাবেই, এই উদারতা দুর্লভ। সরকারি রোষে যখন ব্যান, তখন কিশোর কুমারও পাশে পেয়েছিলেন তাঁর হেমন্তদাকে। বাধ্য করেছিলেন সরকারকে দু’বছর বাদে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে।
ওস্তাদ আমির খানকে বলেছিলেন, ‘কিছুই তো শিখতে পারলাম না’… উত্তরে উস্তাদজি বলেছিলেন, ‘উপরওয়ালা শেখার কাজটা আমাদের জন্য রেখেছেন যাদের অমন স্বর্ণকণ্ঠ দিয়ে পাঠাননি। আপনি কথা বললেই মিষ্টি গান হয়ে যায়, আর কী দরকার!’
ওস্তাদ আমির খানের কথায়
‘কবিতা কে গান বানাবে সলিল? বলছ কী?’, ‘হেমন্তদা আপনার স্বর্ণকণ্ঠটা ধার দিন শুধু, বাকি দায়িত্ব আমার, তাছাড়া গণনাট্যে তো একাজ আমরা করি!’, ‘তবে তাই হোক’… বাকিটা ইতিহাস… রানার, গাঁয়ের বধূ, অবাক পৃথিবী আজও রেকর্ড বিক্রি হওয়া অ্যালবাম। বাল্যবন্ধু পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে সহাস্যে বলেছিলেন, যা লিখবি গেয়ে দিতে পারব বোধহয়, শুধু নামতা বাদে… ওটা বোধহয় একমাত্র কিশোর পারবে! ওস্তাদ আমির খানকে বলেছিলেন, ‘কিছুই তো শিখতে পারলাম না’… উত্তরে উস্তাদজি বলেছিলেন, ‘উপরওয়ালা শেখার কাজটা আমাদের জন্য রেখেছেন যাদের অমন স্বর্ণকণ্ঠ দিয়ে পাঠাননি। আপনি কথা বললেই মিষ্টি গান হয়ে যায়, আর কী দরকার!’
উত্তম কণ্ঠ

তখন বম্বেতে স্থায়ীভাবে কাজ করছেন। ‘শাপমোচন’ সব তোলপাড় করে দিয়ে গেল… সুর আর কণ্ঠসম্পদ সম্পৃক্ত হয়ে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল… ইন্দ্রাণী, পথে হলো দেরি, হারানো সুর, দুই ভাই… বাঙালি ভেসে গেল… আগামী প্রায় দু’দশক উত্তমের মহত্তম হয়ে ওঠার অনুঘটকের কাজ করলেন হেমন্ত। শুরু হয়েছিল কলকাতা-বম্বে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি। এতই কাছাকাছি গলার আওয়াজ, কিছু ডায়ালগও বলে দিলেন ছবিতে, মানুষ ধরতে পারল না। পরে আরও অনেক কিংবদন্তি কণ্ঠদান করলেও উত্তমের কণ্ঠে তিনি অদ্বিতীয় রয়ে গেলেন।
মান্না দে এবং…
স্বয়ং মান্না দে’র স্বীকারোক্তি, ‘…যখন বাংলা গানে আসি তখন হেমন্তবাবু মধ্যগগনে, ওঁর মতো স্বর্ণকণ্ঠ আমার ছিল না, সা নিলেই গান মধুর হয়ে যায়, নায়কোচিত কণ্ঠস্বর। আমাকে তাই নিজের মতো অন্য রাস্তা নিতে হয়েছিল, একটু রাগাশ্রয়ী, ফ্ল্যাট সুরের বদলে একটু কালোয়াতি, একটু অন্যরকম স্বরক্ষেপণ… না হলে জমি পাওয়া যেত না।’
নচিকেতা ঘোষ সুর করলেন ‘সন্ন্যাসী রাজা’য়… সব গান গাইলেন মান্না দে, কিন্তু ‘কা তব কান্তা’ কালিদাসের স্তোত্রটি কোনও ঐশ্বরিক কণ্ঠ ছাড়া অসম্পূর্ণ ছিল… হেমন্তকণ্ঠ এক অপার্থিব আবহ তৈরি করল… এমন কণ্ঠমাধুর্য, যা ভূ-ভারতে বিরল।
সুরকার হেমন্ত অনেক কাজ করেছেন গায়ক মান্না দে-কে নিয়ে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা অটুট ছিল আজীবন। নচিকেতা ঘোষ সুর করলেন ‘সন্ন্যাসী রাজা’য়… সব গান গাইলেন মান্না দে, কিন্তু ‘কা তব কান্তা’ কালিদাসের স্তোত্রটি কোনও ঐশ্বরিক কণ্ঠ ছাড়া অসম্পূর্ণ ছিল… হেমন্তকণ্ঠ এক অপার্থিব আবহ তৈরি করল… এমন কণ্ঠমাধুর্য, যা ভূ-ভারতে বিরল।
বম্বে, গীতাঞ্জলি স্টুডিও, রাজ্যপাট, এবং….
হিন্দি ছবিতে গান গাওয়া, সুর করা, ছবি প্রযোজনা— হেমন্ত রাজত্ব করেছিলেন, এবং কার্যত এক আকর্ষক জ্যোতির্বলয় তৈরি করেছিলেন। গুলজার বলছেন, ‘হুড খোলা মার্সিডিজ-এ সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, হাতা গোটানো জামা পরে দীর্ঘদেহী, সুপুরুষ মানুষটি হাতে 555-এর ধোঁয়া উড়িয়ে যখন জুহুর রাস্তায় উড়ে যেতেন, আমরা ত্রস্ত নয়নে চেয়ে দেখতাম… অরা কাকে বলে!’ গণনাট্যের সুহৃদ মৃণাল সেনকে দিয়ে করালেন ‘নীল আকাশের নিচে’… পেলেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। দু’টি গানে মাতিয়ে দিয়ে গেলেন গায়ক আর সুরকারের দ্বৈত সত্তা। আবার জনপ্রিয় ধারায় করলেন নাগিন, বিশ সাল বাদ… ভূ-ভারতে গণ হিস্টিরিয়া তৈরি হল, বম্বেতে প্রতিষ্ঠিত হলেন বাংলার নায়ক বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জী।

নবাগতদের বিপত্তারণ
হেমন্ত নিজে হাতে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন অসংখ্য গুণী শিল্পীকে। প্রতিমা, গীতা দত্ত, নির্মলা, বনশ্রী, হৈমন্তী, শিবাজী, আরতি, অরুন্ধতী… তালিকা শেষ হওয়ার নয়… বাংলায় এনেছেন লতা, আশা, কিশোর… কাকে নয়? ছবির গানের পাশাপাশি আধুনিক গান ও গাইয়েছেন… ভরসা জুগিয়েছেন। সেরা শিল্পী বলতেন প্রতিমাকে, বলতেন, ‘ও তো মানুষ নয়, পাখি।’
সকল শিল্পীমহলে কি বাংলা, কি বম্বে, শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন আজীবন। এমন একটা জগৎ, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নগ্ন রূপে প্রতিভাত হয় সবসময়, সব যুগে, এই মানুষটি ছিলেন প্রতিভার পূজারী, ব্যক্তিগত ইগোকে দূরে সরিয়ে শিল্পের সাধনা করে গেছেন, প্রতিভাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন অহংবোধশূন্য হয়ে, এমন মানুষ সব যুগেই বিরল।
কিশোরকুমার ছবি করছেন, নিজের প্রযোজনায়, সব থেকে প্রিয় ছবি, টাইটেল সং গাইবেন তাঁর প্রিয় হেমন্তদা, সুর করলেন সেই স্বর্ণকণ্ঠকে ভেবে… কী ঐশ্বরিক, অমোঘ অভিঘাত… ‘রাহী তু রুক মত যা না’… ছবির নাম ‘দূর গগন কি ছাওঁ মে’।
কিশোরকুমার ছবি করছেন, নিজের প্রযোজনায়, সব থেকে প্রিয় ছবি, টাইটেল সং গাইবেন তাঁর প্রিয় হেমন্তদা, সুর করলেন সেই স্বর্ণকণ্ঠকে ভেবে… কী ঐশ্বরিক, অমোঘ অভিঘাত… ‘রাহী তু রুক মত যা না’… ছবির নাম ‘দূর গগন কি ছাওঁ মে’।
দীনেন গুপ্ত ছবি করছেন ‘প্রক্সি’। রঞ্জিত মল্লিক ও অপর্ণা সেন। সুরকার হেমন্ত। একটি গানে ডামি ওয়ার্ড, সুর করা শক্ত, অসাধ্য যদি বা সাধন হয়, গাওয়া সম্ভব নয়… সেই সত্তরের দশকে। জুহুরির চোখ, প্রযোজককে বললেন কিশোরকে ডাকো, টাকার ব্যবস্থা করো, আমি জানি বর্ণপরিচয়ে সুর করে দিলেও কিশোর গেয়ে দিতে পারবে… তৈরি হল এক অসম্ভব গান ‘কি করে বোঝাই তোদের গানের গ জানি না’।

তরুণ মজুমদার ছবি করছেন, ভি শান্তারাম প্রযোজক, সব শর্ত মেনে নিয়ে একটি শর্ত দিয়েছেন ছবির গান এবং সিন যেন ইতিহাস সৃষ্টি করে, এদিকে তরুণবাবুর হেমন্তদা অসুস্থ। হাসপাতালের শয্যায় তৈরি হল ইতিহাস… জীবনপুরের পথিক রে ভাই… ‘পলাতক’ কাল্ট হয়ে রয়ে গেল বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে। তরুণ মজুমদারকে আমৃত্যু দু’হাত ভরে উজাড় করে দিয়ে এসেছেন তাঁর হেমন্তদা।
ডুয়েট গাইছেন আরতি, নিজের অংশ হয়ে যাওয়ার পর সিগারেট ধরিয়েছেন হেমন্ত, আরতি অবাক হয়ে বলছেন, ‘এরপরের অংশ আপনি গাইবেন কীভাবে হেমন্তদা? হেমন্তর উত্তর, ‘সিগারেটটা টানলে আমার গলা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়, তখন দেখবি গলা আরও খুলে যাবে’… এমন কাণ্ড কেউ শুনেছে কখনও? কী প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন এই মানুষটি! ভাগ্যিস যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তে সুহৃদ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের তাগিদে আকাশবাণীতে গিয়েছিলেন, না হলে! আসলে সবই নিয়তি নির্ধারিত, কারণ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়রা তৈরি হন না, জন্মান।
পুজোর প্রাক্কালে ’৮৯-এর সেপ্টেম্বরে যেদিন একগোছা রজনীগন্ধা হাতে নিয়ে বললেন ‘চললাম’, একটি জনপ্রিয় সান্ধ্য দৈনিক হেডলাইন করেছিল ‘এই শরতে, হেমন্ত নেই’… সত্যি তারপর থেকে বাঙালিয়ানার যাপনে ঋতুচক্রে আর কোনওদিন ‘হেমন্ত’ আসেনি।
ঋতুপর্ণ ঘোষের তৈরি বোরোলিন-র ক্যাচলাইনের কথা ধার করে বলতে হয় হেমন্ত ছিলেন ‘বঙ্গজীবনের অঙ্গ’। দুর্গাপুজো, মহালয়া, রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র, বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ, সত্যজিৎ, মৃণাল, ঋত্বিক, উত্তম, সৌমিত্র, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের মতোই বাংলার চিরকালীন আইডেন্টিটির মতো থেকে যাবেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধ্রুবতারা হয়ে।
পুজোর প্রাক্কালে ’৮৯-এর সেপ্টেম্বরে যেদিন একগোছা রজনীগন্ধা হাতে নিয়ে বললেন ‘চললাম’, একটি জনপ্রিয় সান্ধ্য দৈনিক হেডলাইন করেছিল ‘এই শরতে, হেমন্ত নেই’… সত্যি তারপর থেকে বাঙালিয়ানার যাপনে ঋতুচক্রে আর কোনওদিন ‘হেমন্ত’ আসেনি।
তথ্যসূত্র
পান্তাভাতে- গুলজার
অগ্রপথিকেরা- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
সিনেমাপাড়া দিয়ে- তরুণ মজুমদার
আনন্দলোক, দেশ, টেলিভিশন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বিশেষ সংখ্যা
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত