(Onoisorgik Andaman 2)
৯টার সময় চললাম লক্ষ্মণপুর-২, গোটা আন্দামানের সেরা স্পট যদি জলিবয় হয়, তবে দ্বিতীয় নিঃসন্দেহে লক্ষ্মণপুর-২, প্রচলিত সৈকত নয়, পুরোটাই মরা কোরাল, যাকে পাথর বলে ভুল হতে পারে, ফলে ভয়ংকর এবড়ো খেবড়ো। ভাটার সময় না গেলে এর আসল মজা পাওয়া যাবে না। এখানেই রয়েছে বহুচর্চিত ন্যাচারাল ব্রিজ।
আরও পড়ুন: অনৈসর্গিক আন্দামান – ১ম পর্ব
সত্যি, প্রবালপ্রাচীরের কী অদ্ভুত রূপান্তর! জোয়ারের জল সরে গিয়ে কোরালের ফাঁকে জল জমে মিনি অ্যাকোরিয়াম তৈরি হয়েছে, সেখানে রয়েছে কিছু জীবন্ত কোরাল, খেলছে নানা রঙের মাছ, রয়েছে স্টার ফিশ।

কষ্ট করে আরেকটু এগোলে পাবেন আরেকটি ব্রিজ, তবে তার পিছন দিকে যেতে পারবেন না, ভাটার সময়ে সমুদ্র সেখানে তার দখল ছাড়তে নারাজ, তিনি পূর্ণ শক্তিতে সেখানে বিরাজমান। কোথা দিয়ে ঘণ্টা আড়াই কেটে যাবে, বোঝা যাবে না। এরপর ভরতপুর, আন্দামানের সৈকতের মধ্যে সবচেয়ে কম আকর্ষণীয়। এখানে লাঞ্চ সেরে এই ট্যুরের প্রথম বিশ্রামের সুযোগ কাজে লাগাতে হোটেলে ফিরলাম।

রাতে বিশ্রাম নিয়ে তরতাজা হয়ে পরদিন সকাল ১০টার ফেরিতে ফিরলাম পোর্ট ব্লেয়ার। হোটেলে পৌঁছে লাঞ্চ সেরে সেলুলার জেল। এক অনন্য অভিজ্ঞতা। গাইড যখন ইতিহাস বলছেন, তখন শিউরে উঠতে হয় অত্যাচারের ভয়াবহতা ভেবে। সযত্নে গাইড ব্যাখ্যা করলেন জেলের গঠন, সাতটি শাখার মাত্র দুটি এখন টিকে আছে। তিনতলা সারিবদ্ধ কুঠুরি, মোট ৬৯৩টি, এইরকম কোনও কুঠুরিতেই অত্যাচারে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন উল্লাসকর দত্ত, বন্দী ছিলেন কত স্বাধীনতা সংগ্রামী।

সাতটি শাখার মাঝে ওয়াচটাওয়ার, যা এখনও আছে, যাকে কাঠের সাঁকো তুলে নিয়ে কুঠুরিগুলো থেকে আলাদা করে ফেলা যেত, অর্থাৎ সামান্য কয়েকজন পাহারাদার নিয়েও এই জেল পাহারা দেওয়া যেত এমনই ছিল এর গঠন। এক শাখার সামনের দিকে থাকত অন্য শাখার পিছন দিক, জানালা মাটি থেকে আট ফুট উপরে, অর্থাৎ এক কুঠুরির বন্দি অন্যের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেতেন না।

রয়েছে লোহার খাঁচা (টিকটিকি নামে পরিচিত) যাতে বন্দিদের আটকে পিছনে চাবুক মারা হত সামান্য কাপড় রেখে, চাবুকের ঘায়ে রক্তাক্ত বন্দী ভাল করে বসতেও পারতেন না। রয়েছে লোহার বেড়ি, যা বন্দীদের পায়ে ঘা করে দিত, লোহার ঘানি যাতে নারকেল পিষে তেল বার করতে হত এতটাই যে পশুর পক্ষেও তা সম্ভব ছিল না, লক্ষ্যপূরণ না করতে পারলেই জুটত অকথ্য অত্যাচার। রয়েছে চটের পোষাক, যা পরে গরমে কাজ করতে গিয়ে গায়ে প্রবল চুলকানি হত।

এই নারকীয় অত্যাচারের কাহিনি শুনতে শুনতে ব্রিটিশ শাসকের উপর ঘৃণায় মন ভরে উঠল। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে চললাম করবাইন্স কোভ। সন্ধেটা কাটিয়ে এলাম। ফেরার পথে দেখলাম সেই জায়গা, যেখানে ১৯৪৩ সালে নেতাজি স্বাধীন ভারতের পতাকা তুলেছিলেন।

দ্রুত ফুরিয়ে আসছে আন্দামানের মেয়াদ। আজ সকাল ৬টায় বেরিয়ে পড়েছি জলিবয়ের দিকে। ওয়ান্ডুর থেকে বোটে জলিবয়। কিন্তু কোনও জেটি নেই, বোট থেকে ছোট ফাইবারের গ্লাস বটম বোটে দ্বীপে নামতে হয়। কোরাল দেখতে হলে মাথাপিছু ১৫০০ টাকা দিয়ে এই বোটেই যেতে হয়। অবশ্যই যাবেন, অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

এখন জলিবয়ে স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং সব বন্ধ, কারণ মানুষের অপরিণামদর্শী, অবিবেচক আচরণের ফলে ৯০% কোরাল নষ্ট হয়েছে, তবে যেটুকু টিকে আছে, তা বিস্ময় জাগানোর পক্ষে যথেষ্ট। কোরাল দেখা হলে আরও ঘণ্টা দেড়েক সময় পাবেন, যা এই ছোট্ট দ্বীপের এক মাথা থেকে আরেক মাথা নীল জলে পা ডুবিয়ে ঘুরে বেড়ানোর পক্ষে যথেষ্ট। চাইলে স্নানও করতে পারেন। অপূর্ব সুন্দর জলিবয় দেখে আবার মাথায় রবীন্দ্রনাথ, ‘নেব তরী পূর্ণ করে অপূর্ব ধন যত’। ফিরে ওয়ান্ডুর সৈকত বা ফিরতি পথে চিড়িয়াটাপ্পুও ঘুরে নিতে পারেন, তবে জলিবয়ে আপ্লুত আমরা সেই পথে হাঁটিনি। ফিরে সন্ধ্যা সাড়ে ছটার শো লাইট অ্যান্ড সাউন্ড, সেলুলার জেলে। চমকদার, তবে ইতিহাসবিচ্যুতির কারণে ভাল লাগেনি।

শেষদিন গেলাম বারাটাং। সকাল ৬টায় উঠে রওনা দিলাম। ঘণ্টাদেড়েক পর জিরকাটাং, এখান থেকে কনভয় করে যেতে হবে। আসলে এখান থেকে বারাটাং পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার রাস্তা জারোয়া রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে। ওদের থেকে আমাদের নয়, বরং মনে হল আমাদের থেকে ওদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যই এই ব্যবস্থা। সকাল ৬টা, ৯টা, ১২টা আর আড়াইটেয় জিরকাটাং থেকে কনভয় ছাড়ে। ফিরতি পথে ৬-৩০, ৯-৩০, ১২-৩০ ও ৩ টে-তে।
গাড়ি থেকে নেমে প্রায় ৫০০ মিটার চড়াই, সদ্য খেয়ে উঠেছি, প্রচন্ড তাড়া, হাঁচোড়পাঁচোড় করে পৌঁছলাম। অপূর্ব সৃষ্টি, গত অক্টোবরে প্রচুর মাটি উদ্গীরণ করেছে, টাটকা মাটির স্তুপে চাপা পড়ে গেছে দুটো বাদে বাকি মুখগুলো, মোট ছ’টা মুখ ছিল।
৯টার কনভয়ে বেরোলাম, পথে জারোয়াদের চোখেও পড়ল, কিন্তু ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তারা এখন দিব্বি সরকারের দেওয়া জামাকাপড় পরছে, তীরধনুকের সঙ্গে হাতে বাঁশের টুকরি, জলের বোতল রয়েছে। ড্রাইভার জানালেন সরকার থেকে ওদের বোতল দেওয়া হচ্ছে, যাতে ওরা জল রাখতে পারে। বারাটাং পৌঁছে গাড়ি রেখে ফেরিতে খাঁড়ি পেরোলাম। ওপারে গিয়ে ফাইবার বোটে মাথাপিছু ৯০০ টাকা দিয়ে লাইম স্টোন কেভ। ম্যানগ্রোভের ঘেরাটোপ থেকে নেমে পায়ে হেঁটে এক কিলোমিটার গিয়ে অদ্ভুত সুন্দর এই গুহা। গাইডের আলো ভরসা।

একই পথে ফিরে লাঞ্চ সেরে একটা গাড়ি নিয়ে ছুট মাড ভলক্যানো দেখতে, হাতে সময় বড্ড কম, ৩টের ফিরতি কনভয় ধরতে গেলে ২-৩০ এর ফেরি পেতে হবে, নাহলে ফেরা হবে না, কাল সকালেই কলকাতার উড়ান। গাড়ি থেকে নেমে প্রায় ৫০০ মিটার চড়াই, সদ্য খেয়ে উঠেছি, প্রচন্ড তাড়া, হাঁচোড়পাঁচোড় করে পৌঁছলাম। অপূর্ব সৃষ্টি, গত অক্টোবরে প্রচুর মাটি উদ্গীরণ করেছে, টাটকা মাটির স্তুপে চাপা পড়ে গেছে দুটো বাদে বাকি মুখগুলো, মোট ছ’টা মুখ ছিল। বড় মুখটা থেকে গ্যাস ভরা মাটির বুদবুদ উঠছে, হালকা কাদামাটি চুইয়ে আসছে। সময়ও ফুরিয়ে আসছে, তাই আবার দৌড়। যখন ফেরিঘাটে পৌঁছলাম, তখন ফেরি ভোঁ দিতে শুরু করেছে।
উড়ান সকাল ৮টায়। সাতদিনের ব্যস্ত দৌড় আদৌ ক্লান্ত করেনি, বরং মনে এক পরম প্রশান্তি, ভাল লাগা, ক্যামেরার কার্ড ভর্তি ছবি আর মাথায় আবার রবীন্দ্রনাথের গুনগুন, ‘ভিখারী মন ফিরবে যখন, ফিরবে রাজার মতন’
সমাপ্ত
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত