(Rajen Tarafdar)
প্রথিতযশা পরিচালক তরুণ মজুমদার একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘রাজেনবাবু যখন প্রথম ‘অন্তরীক্ষ’ছবিটি করেন, তখনই আমি তাঁকে দেখি। কমার্শিয়াল আর্টের জগৎ থেকে তখন সত্যজিৎ রায় এসেছেন, তাই ওই জগতেরই আর একজন খুব নামী আর্টিস্ট যখন ছবি করতে এলেন, তখন আমরা দু-একজন উৎসাহিত হয়ে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে তাঁর ছবির শুটিং দেখতে যাই। তারপর আস্তে আস্তে আলাপ হয়।’
ফিল্মের প্রতি তাঁর ভালবাসাও ধরা পড়েছিল পরিচালক তরুণ মজুমদারের স্মৃতিকথনে, ‘গঙ্গা’র যখন এডিটিং চলছে তখন পাশের ঘরে আমার ছবিরও এডিটিং চলছিল। সে সময়েই তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। উনি খুব আলাপী মানুষ ছিলেন, ফিল্ম সম্পর্কে কথা বলতে খুবই ভালবাসতেন। আমরাও খুব মন দিয়ে শুনতাম। কারণ ওঁর কাছ থেকে অনেক জানার ও শেখার ছিল। একজন মানুষ ফিল্মকে কতটা ভালবাসলে অত বড় চাকরির নিরাপত্তার আশ্বাস ছেড়ে ফিল্মে চলে আসতে পারেন, তখন তা উপলব্ধি করেছিলাম।
আরও পড়ুন: জন্মশতবর্ষে প্রবাদপ্রতিম মদনমোহন
‘আমার স্ত্রী সন্ধ্যাকে রাজেনবাবুই প্রথম ফিল্মে নিয়ে আসেন এবং তাৎপর্যময় রোল দেন, এক কথায়, সন্ধ্যা ওঁরই তৈরি আর্টিস্ট। এক সময় জানতে পারি, উনি ‘সংসার সীমান্তে’ নিয়ে ছবি করার চেষ্টা করছেন। এর আগে অবশ্য ঋত্বিকবাবুও এটা নিয়ে ছবি করার চেষ্টা করেছিলেন। রাজেনবাবু অনেক খেটে ‘সংসার সীমান্তে’-র চিত্রনাট্যটা তৈরি করেন। পরে বুঝেছিলেন ছবিটা ওঁর পক্ষে তোলা সম্ভব নয়। আমাকে অবশ্য উনি মূল চিত্রনাট্যে কিছু অদল বদল করার সুযোগ দিয়েছিলেন।
তাঁর শিল্পীমন নিয়ে পরিচালক তরুণ মজুমদারের স্বীকারোক্তি ছিল, ‘পরিচালক রাজেন তরফদারের যে দিকটা আমায় সবচেয়ে ইমপ্রেস করেছিল, তা হল তাঁর শিল্পী মনের পরিচয়। ফ্রেমসুদ্ধ কল্পনাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার পিছনে দিনে-রাতে উনি যেভাবে পরিশ্রম করতেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। এই উদ্যমের প্রশংসা করতেই হয়। এই ঘরানার ছবি ক্রমশ উঠে যাচ্ছে। একটা ছবি করার জন্য এত উদ্যম ব্যয় করার মতো ব্যাপার এখন আর নেই।’

বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশ-ষাটের দশকে যাঁরা উন্নতমানের ছবি করতে এসেছিলেন, রাজেন তরফদার নিঃসন্দেহে তাঁদের অন্যতম। রাজেনবাবু কমার্শিয়াল আর্টিস্ট ছিলেন, এবং সেহেতু তাঁর ছবিতে কম্পোজিশনের প্রতি একটা দুর্বলতা লক্ষ করা যায়। ভীষণভাবে সচেতন থাকতেন একটা ফ্রেম, তার কম্পোজিশন, ভিউ পয়েন্ট যথাযথ করার দিকে। এর বহু উদাহরণ ‘গঙ্গা’, ‘পালঙ্ক’ প্রভৃতি ছবিতে দেখতে পাওয়া গেছে। এমনকি ‘জীবন কাহিনি’র বেশিরভাগই সেটের মধ্যে তোলা হলেও ফোরগ্রাউন্ড, ব্যাকগ্রাউন্ড, ক্লোজ-আপের চমৎকার ব্যবহার এবং প্রতিটি শটের আলো-আঁধারি পরিবেশ সৃষ্টিতে অনবদ্য ভূমিকা পালন করতেন।
রাজেনবাবুর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, ক্যামেরা ও অভিনয়ের সম্পর্ক উনি খুবই ভাল বুঝতেন। ফলে ওঁর ছবিতে দেখা যায়, খুব উল্লেখযোগ্য বাস্তবসম্মত চরিত্র সৃষ্টি হতে। যেমন ‘গঙ্গা’ ছবির অনেক চরিত্রকে মাটির মানুষ বলে মনে হয়। পাশাপাশি পাওয়া যায় ‘পালঙ্ক’ ছবিতে উৎপল দত্ত’র অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয়।
১৯১৭ সালের ৭ জুলাই অবিভক্ত বাংলার রাজশাহীর বাগুটিপাড়ায় জন্ম। বাবা তৎকালীন পুলিশ অফিসার রামরাখাল তরফদার এবং মা প্রফুল্লময়ী। তিনি মহিলাসমিতির মাধ্যমে নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজে জড়িত ছিলেন। অনেকের মতে, তাঁর সাহিত্যনুরাগ এবং শিল্পনৈপুণ্য রাজেন তরফদারের মধ্যে বিকশিত হয়েছিল।
বিশ শতকের পাঁচের দশকে বাংলা ছায়াছবি পরিচালনার ক্ষেত্রে যাঁরা নিজস্ব প্রতিভার পরিচয় দিয়ে নতুন যুগের সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম পরিচালক রাজেন তরফদার। ১৯১৭ সালের ৭ জুলাই অবিভক্ত বাংলার রাজশাহীর বাগুটিপাড়ায় জন্ম। বাবা তৎকালীন পুলিশ অফিসার রামরাখাল তরফদার এবং মা প্রফুল্লময়ী। তিনি মহিলাসমিতির মাধ্যমে নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজে জড়িত ছিলেন। অনেকের মতে, তাঁর সাহিত্যনুরাগ এবং শিল্পনৈপুণ্য রাজেন তরফদারের মধ্যে বিকশিত হয়েছিল।
অল্প বয়স থেকে রাজেনবাবু দারুণ ছবি আঁকতে পারতেন। বাবার অমতে আর্ট কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে ছবি আঁকাকে জীবিকা করেন। প্রথম চাকরি হয় পাটনায়। জে ওয়াল্টার টমসন কোম্পানিতে নিজের দক্ষতায় কাজ পেয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানেই নিজের প্রতিভার গুণে খুব অল্প সময়ে আর্ট ডিরেক্টর হন। এরপর ১৯৪৩ সালে শ্রীমতী দীপ্তি সিংহকে বিবাহ করেন। সেকালের সামাজিক প্রথা অনুযায়ী এই বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। সুখী দাম্পত্য জীবনে তিনি ছিলেন দুই পুত্র ও এক কন্যার পিতা।

চাকরি জীবনে কর্মযোগী ছিলেন রাজেনবাবু, প্রতিটি কাজেই নীতি মেনে চলতেন। কখনও অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেননি। এই নীতিবোধ সারাজীবন রক্ষা করে গেছেন। চলচ্চিত্রের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ তাঁকে সেই পথে চালিত করে। পরিচালনার কাজ তাঁর বিশেষ পছন্দের ছিল, যদিও এক সময় শৌখিন নাটকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তার পরিচালিত প্রথম ছবি ‘অন্তরীক্ষ’, ১৯৫৭ সালে ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল।
এই ফিল্মের কাহিনিকার ছিলেন তুলসী লাহিড়ী এবং সংগীত পরিচালক ওস্তাদ আলি আকবর খাঁ। ছবি বিশ্বাস, পদ্মাদেবী, প্রবীরকুমার, প্রেমাংশু বসু, কালিপদ চক্রবর্তী প্রমুখ শিল্পীদের সঙ্গে ছিলেন নবাগতা সন্ধ্যা রায় এবং কাজল চট্টোপাধ্যায়। বেশ কিছু খণ্ড খণ্ড দৃশ্যের মাধ্যমে ছবির কাহিনিকে ধরে রাখার চেষ্টা হয়েছিল। রাজেনবাবু, ছবি বিশ্বাসকে‘Underplaying method of acting’–এর পরামর্শ দেন, যা সফলভাবে কার্যকরী হয়েছিল এই ছায়াছবিতে। অনেক নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রীকে চরিত্র অনুযায়ী অভিনয় করতে শিখিয়েছিলেন তিনি। এ কাজে তাঁর জুড়ি খুব কম ছিল।
জনপ্রিয় সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হয়েছিল– ‘এই ছবিটি যেন একটি উপেক্ষিত সম্প্রদায় এবং তাদের জীবনযাত্রার বিরাট পরিবেশকে রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শসহ পর্দায় উপস্থিত করেছে। রাজেনবাবু শিল্পী। তাই বাস্তবকে তিনি শুধু প্রামাণিকতা ও তথ্যের ভারে পিষ্ট করেননি, শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তাকে লাবণ্যময় করে তুলেছেন।’
রাজেনবাবুর দ্বিতীয় ছবি ‘গঙ্গা’(১৯৬০)। এই ফিল্মে পরিচালক হিসেবে তুলনাহীন দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। ছবিতে মৎস্যজীবীদের নানা সমস্যা, সংকট, বঞ্চনা, শোষণ প্রভৃতি, তাদের ব্যক্তিগত ভালবাসা, অনুরাগ এক অসাধারণ রূপ ধারণ করেছে। এই ছবির সম্পদ গুণী সুরকার সলিল চৌধুরীর সংগীতের প্রয়োগ, সঙ্গে কণ্ঠশিল্পীদের অবদান ছবিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। নেপথ্য কণ্ঠে ছিলেন মান্না দে, নির্মলেন্দু চৌধুরী, সবিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পঙ্কজ মিত্র, রত্না সরকার প্রমুখ। এই ফিল্ম ভারতীয় চলচ্চিত্রের জগতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে অচিরেই। ছবিতে উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নিরঞ্জন রায়, জ্ঞানেশ মুখার্জি, সন্ধ্যা রায়, রুমা গুহঠাকুরতা, মণি শ্রীমানী, সীতা মুখার্জি, তুলসী লাহিড়ী, সাধনা রায়চৌধুরী প্রভৃতি শিল্পী।
জনপ্রিয় সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হয়েছিল– ‘এই ছবিটি যেন একটি উপেক্ষিত সম্প্রদায় এবং তাদের জীবনযাত্রার বিরাট পরিবেশকে রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শসহ পর্দায় উপস্থিত করেছে। রাজেনবাবু শিল্পী। তাই বাস্তবকে তিনি শুধু প্রামাণিকতা ও তথ্যের ভারে পিষ্ট করেননি, শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তাকে লাবণ্যময় করে তুলেছেন। দীনেন গুপ্ত দৃশ্যরচনায় এবং চিত্রগ্রহণে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এই ছবির শিল্পীদের কেউ অভিনয় করেছে বলে মনে হয় না। লেখকের বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে পাত্রপাত্রীরা সাময়িকভাবে ছবিতে স্থান করে নিয়েছে বলেই যেন ভ্রম হয়।’

Amrita Bazar Patrika লিখেছিল, ‘Rajen Tarafder toured areas with large concentrations of fishermen. He lived with them, as one of them, observing their manners, culture, traditions. He went to Sunderbans to learn the art of seafishing from close observation. Such an initial desire for thoroughness must have presaged success for Tarafder as an outstanding observant director. It is an impressive continuation of highly artistic visualisation of situations in which characters behave with surprise and their breathtakingly captivating execution on celluloid. Thus ‘Ganga’ becomes an epoch making experimentation with filmcraft in every sense of the term’.
ইমেজের প্রতি একটা fascination, মানে ইমেজ যাতে ভাল হয়, দেখতে যাতে ভাল লাগে, এই ব্যাপারটা রাজেনবাবুর মধ্যে ছিল। ক্যামেরার ব্যাপারেও খুবই সজাগ থাকতেন। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ মহাশ্বেতা ভট্টাচার্যের কাহিনি অবলম্বনে তোলা ‘অগ্নিশিখা’ (১৯৬২) ছায়াছবিটি। চলচ্চিত্রটি বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলার জটিল সামাজিক গতিপ্রকৃতি, সম্পর্ক এবং নাটকীয় সাংস্কৃতিক পরিবর্তনসমূহ তুলে ধরেছিল। ফিল্মটিতে অসাধারণ অভিনয়ের সাক্ষর রেখেছিলেন বসন্ত চৌধুরী, কণিকা মজুমদার, ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ি সান্যাল, কমল মিত্র, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, ছায়া দেবী, জহর রায় প্রমুখ।
দীনেনবাবু বলেছিলেন, ‘বাংলা ছবির সামান্য যে কয়জন পরিচালক ক্যামেরার ব্যাপার বোঝেন রাজেনবাবু তাঁদের অন্যতম। ক্যামেরার লেন্স কীভাবে behave করবে, কোনটায় distortion আসবে বা আসবে না এসব উনি ভাল করেই জানতেন।’a
রাজেনবাবু কখনই নিজের জীবনবোধ থেকে সরে যাননি। ‘জীবন কাহিনি’ (১৯৬৪) ছবিতে লঘু ভঙ্গিতে জীবনের গুরুতর বিষয়ের অবতারণা তিনি সফলভাবেই করেছিলেন। বিকাশ রায়, অনুপকুমার এবং সন্ধ্যা রায়ের অভিনয় এই ছায়াছবিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। অনন্যসাধারণ এই ফিল্মে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ নিঃসৃত ডুয়েট ‘আমি তোমার মাঝে পেলাম খুঁজে’ (সুরকার, প্রবীর মজুমদার) বাংলা ছবির জগতে এক বিরল রত্ন হিসেবে বিবেচিত হবে নিঃসন্দেহে।
তাঁর ছবি ‘আকাশ ছোঁয়া’ (১৯৬৭) তৈরি হয়েছিল সার্কাসের পটভূমিকায়। ফিল্মের মূল থিম ছিল মানুষের জীবনের অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম। ছবির নায়ক মোটর সাইকেল চালাতেন সার্কাসের গ্লোবের মধ্যে। একটি অ্যাক্সিডেন্টের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবনে নেমে আসে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। সেই অন্ধকার থেকেই উত্তরণের অদম্য চেষ্টা ছিল নায়কের। ফিল্মে নায়কের ভূমিকায় চমকপ্রদ অভিনয় করেছিলেন দিলীপ মুখার্জি।

এই ফিল্মে মোটরবাইক জাম্প, জিপগাড়ি জাম্প ও মোটরবাইক রেসের দৃশ্য নিখুঁতভাবে তুলেছিলেন চিত্রগ্রাহক দীনেন গুপ্ত। দীনেনবাবু বলেছিলেন, ‘বাংলা ছবির সামান্য যে কয়জন পরিচালক ক্যামেরার ব্যাপার বোঝেন রাজেনবাবু তাঁদের অন্যতম। ক্যামেরার লেন্স কীভাবে behave করবে, কোনটায় distortion আসবে বা আসবে না এসব উনি ভাল করেই জানতেন। রাজেনবাবুর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি উনি mobile shot মানে ক্যামেরার চলাফেরা পছন্দ করতেন আর বড় বড় শট নিতেন। তাতে পরিশ্রম হত খুবই কিন্তু যখন প্রোজেকশন দেখতাম তখন আর খেদ থাকত না’।
১৯৭৫ সালের শেষের দিকে মুক্তি পেয়েছিল ‘পালঙ্ক’ ছবিটি। নরেন্দ্রনাথ মিত্র রচিত এই কাহিনি বিবর্তিত হয়েছে দেশবিভাগের পটভূমিকায়। মূল চরিত্র ধলাকর্তা পূর্ব বাংলাকেই নিজের দেশ বলে মনে করেন। তাঁর পরিবারের সবাই দেশ ছেড়ে কলকাতায় চলে যায়। একাই সব কিছু আগলে বসে থাকেন কর্তা। তিনি ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন গ্রামের বাসিন্দা মকবুলের ওপর। একসময় তাঁর পুত্রবধূর চিঠিতে অপমানিত হয়ে পুত্রবধূর পালঙ্কটি মকবুলকে দিয়ে দেন। পরে সেটি ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই বেঁকে বসে মকবুল। শেষে মকবুলের ছেলেমেয়েরা সেই পালঙ্কে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে দেখে কর্তা পরিতৃপ্ত হন এবং মকবুলের কাছেই তিনি পালঙ্কটি রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মোট সাতটি ছবি পরিচালনা ছাড়াও তিনি বেশ কিছু চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, যা থেকে ছবি করেছেন বিভিন্ন পরিচালক। রাজেনবাবু বাউলদের জীবনকে কেন্দ্র করে একটি কাহিনিচিত্র করতে চেয়েছিলেন।
এই ছায়াছবিতে কর্তার ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেছেন কিংবদন্তি শিল্পী উৎপল দত্ত। সঙ্গে পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশের শিল্পীরা যেমন সন্ধ্যা রায়, আনোয়ার হুসেন, আবদুল হক সরকার, ফরিদ আহমেদ প্রমুখ অসাধারণ অভিনয়কলার নিদর্শন রেখেছেন। গুণী সুরকার সুধীন দাশগুপ্তর সুরমূর্ছনায় ভরে উঠেছিল গোটা ছবিটি। নেপথ্য সঙ্গীতশিল্পীরা ছিলেন মান্না দে, দীনেন চৌধুরী এবং অংশুমান রায়।
রাজেনবাবুর সর্বশেষ ছবি ‘নাগপাশ’ (১৯৮৭)। সাধন চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত এই ছবির প্রযোজক পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এই ফিল্মে রাজেনবাবু মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং পারিপার্শ্বিক বিরুদ্ধতার সঙ্গে তার নিয়ত সংঘাত তুলে ধরেছেন। সন্ধ্যা রায়, নিরঞ্জন রায়, সুমন্ত্র মুখোপাধ্যায়, শাকিলা মজিদ, ভীষ্ম গুহঠাকুরতা, রঞ্জিত চক্রবর্তী অভিনীত এই ছায়াছবিতে সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন ভারতরত্ন ভূপেন হাজারিকা।
মোট সাতটি ছবি পরিচালনা ছাড়াও তিনি বেশ কিছু চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, যা থেকে ছবি করেছেন বিভিন্ন পরিচালক। রাজেনবাবু বাউলদের জীবনকে কেন্দ্র করে একটি কাহিনিচিত্র করতে চেয়েছিলেন। কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য,‘দ্যা ইনভিজিবল হ্যান্ড’, ‘সিলভার ফিলিগিরি’, ‘সানডে ইজ সানডে’, ‘নাইট ইন ক্যালকাটা’। জীবনের শেষদিকে ‘আকালের সন্ধানে’, ‘খণ্ডহর’, ‘আরোহণ’, ‘বসুন্ধরা’ প্রভৃতি ফিল্মে তিনি তাঁর অভিনয় দক্ষতার অনন্য সাক্ষর রেখে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর, সামাজিক ও রুচিশীল মানুষ।
শিল্পী রাজেন তরফদার নিজের ভাবনাকে কোনও প্রকার আপোষ না করে নিজের পরিচালিত ছবির মাধ্যমে সারাজীবন মানুষের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। পরিচালক রাজেনবাবুর যে দিকটা সকলকে ইমপ্রেস করেছিল, তা হল তাঁর শিল্পীমনের পরিচয়। তাঁর মনের কল্পনাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার পিছনে অসম্ভব পরিশ্রম করতেন। সেই উদ্যমের প্রশংসা করতেই হয়। রাজেনবাবু যে ঘরানার ছবি করতেন তা আজ বিলুপ্ত। তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই এই মহৎ শিল্পী বেঁচে থাকবেন চিরকাল।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত