(Deshvikharir Jamijiret 1)
দিদি ছিল অনেক। পদ্মাদি, হিরণদি, অরুণদি, রঞ্জুদি, মালতীদি, শান্তাদি এবং আরও কয়েকজন, যাদের নাম কোনও গ্রীষ্মদুপুরে দেওদার জানালায় বসে ঠিক মনে করতে পারব। হিরণদি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় পড়িয়েছে এবং ইংরেজি ট্রান্সলেশন শেখাবার চেষ্টা করেছে। বাড়িতে মাছ হলে অরুণদি ডেকে নিত দুপুরে, এবং পাশে বসে খাওয়াত। রঞ্জুদি আর আমি মেঝেয় বসে একসঙ্গে পড়া করেছি। শান্তাদি রবীন্দ্রজয়ন্তী শিখিয়েছিল। পুলিশ যখন আমাকে খুঁজছে, মালতীদি লুকোনোর জায়গা ঠিক করে দিয়েছে, আমার ময়লা পাঞ্জাবি-পায়জামা কেচে শুকিয়ে গোপন জায়গায় রেখে এসেছে এবং খোঁচড়দের গতিবিধি জানিয়েছে।
এরা কেউ আপনদিদি নয়, হয়তো তারও বেশি। এদের ভালবাসা আমার রক্তকোষে সঞ্চিত আছে।
আরও পড়ুন: ক্যাম্পবস্তির বালকবেলা: অন্তিম পর্ব
এখন যে দিদির কথা বলব, তিনি অন্য দিদিদের চেয়ে বেশ বড়৷ অল্পবয়সে বিয়ে হয়ে তিন সন্তানের জননী৷ রিফিউজি বাপ-মা ঘরে মেয়ে রাখে কোন ভরসায়! তখন আমি তাঁকে ‘তুমি’ বলতাম, এখন বলতে কোথায় বাধছে৷ হয়তো দেখা হয়ে গেলে, সম্ভাবনা নেই, কমবেশি ষাট বছর পেরিয়ে গেছে, ‘তুমি’ই বলব, লেখায় ‘তিনি’৷ ‘সে’ তাঁকে মানায় না৷ তিনি পদ্মাদি৷
যাদবপুরে থাকতেন৷ কৃষ্ণা গ্লাস ফ্যাক্টরির কাছে কোনও কলোনিতে৷ বাবার বাড়ি আসতেন মাঝেসাঝে৷ আমাদের বস্তির লাগোয়া বস্তিতে তাঁর বাবার ঘর৷ এলে একদিন আমাদের ঘরে আসতেনই৷ আমার বাবাকে বলতেন, মামা, যাদবপুরে আসেন৷ আমি কই৷ রোজ নতুন নতুন লোক আইতাছে৷ যেমন-তেমন ঘর খাড়া করতাছে৷ কইতে পারেন, পানীয় জলের ব্যবস্থা খারাপ, উঠানের উপর নর্দমা, যাওন-আসনের সমস্যা৷ তবু কই৷ কষ্ট কইরা কয়দিন থাকেন৷ অল্পদিনের মধ্যে ঠিক হইয়া যাইব৷ মানুষই ঠিক কইরা নিব৷ অখনও কম দামে জমি পাইবেন একটু ভিতরে৷ উঁচা জমি৷ আপনেগো জামাইরে কই, তার লগে দালাল আর কলোনির মাতব্বরগো চেনাজানা আছে৷

ষাট দশকের গোড়া থেকে মাঝামাঝি সময়ে পদ্মাদি এভাবে বলতেন, মনে পড়ে৷ বাবা জবাবে বলতেন, আত্মীয়ের ম্যালে থাকুম না৷ মানে আত্মীয়দের মেলায়৷ যাদবপুরের অদূরে লক্ষ্মীনারায়ণ কলোনি, নাকতলায় কয়েক ঘর আত্মীয় ছিলেন৷ কখনও বলতেন, কলোনিতে থাকুম না৷ কখনও বলতেন, সন্ধ্যা হইলেই বাস বন্ধ, বাড়ি ফিরুম ক্যামনে? কাজকাম তো চুলায় উঠব! ইত্যাদি৷
আজ বলতে পারি, বাবার রোজগার ছিল যৎসামান্য৷ যে ব্যবসা ছিল, তাতে দুবেলা ডাল-ভাতের বেশি কিছু হত না৷ সেদিনের যাদবপুরে জমির দাম নামমাত্র হলেও বাবার সামর্থ্যের বাইরে ছিল৷ যাদবপুরে যাতায়াতের সমস্যা আছে বলে তিনি পদ্মাদির প্রস্তাব এড়িয়ে গেছেন৷ সেই তিনি হাওড়া স্টেশন থেকে ১০ স্টেশন পরে, রেলপথে ২৯ কিমি দূরে, আত্মীয়ের ‘ম্যালে’, এক কলোনিতে জমি কেনেন, যার আধখানা ডোবায় খাওয়া৷ বাবাকে যতটা বুঝেছি, তিনি নিজে যা বুঝতেন সেটাই সেরা এবং দ্বিমত এলে হঠাৎ দুর্বাসা৷ এই অদূরদর্শিতার পরিণাম নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছেন, এবং উত্তরপুরুষে চাপিয়ে দিয়ে গেছেন৷ অভিভাবক ভুল করলে সন্তানদের তার জের টানতে হয়৷
ছিটকে গেলাম জোড়াসাঁকো থেকে, একাডেমি অফ ফাইন আর্টস থেকে, উত্তর কলকাতার অলিগলি থেকে, চেতলা-হাজরা থেকে, কলেজ স্ট্রিট থেকে৷ আমি যে পৃথিবীতে বড় হয়েছি, তার বিপুল বিচিত্র বিভাময় পরিসর থেকে ছিটকে গেলাম৷
ভদ্রেশ্বরে ঘর হল৷ আধা-গ্রাম আধা-মফসসল৷ পুবে গঙ্গায় খেয়াপারের শব্দ৷ গঙ্গাপাড় ধরে জুটমিলের ভোঁ৷ পশ্চিমে ট্রেনের ঘাড়ুমঘুড়ুম৷ মাঝখানে থিকথিক করছে কলোনি৷ দারিদ্র্য আর অশিক্ষার পতাকা উড়ছে যেন৷ কলতলায় বালতি আর মানুষের গুঁতোগুঁতি৷ পথের ধারে জোড়া পায়খানায় লম্বা লাইন ভোরের আলোয়৷ চায়ের দোকানে বাঙাল চিল্লানি৷ মিউনিসিপালিটির চ্যারিটেবল ডিসপেনসারিতে একা মুরারী ডাক্তার আর জ্বর ডায়ারিয়া অম্বল চুলকানি ইত্যাদি৷ কালীদা ট্যারা চোখে চুল কাটে, গাল কামায়, ধারের খদ্দের৷ আমাদের ঘরের গায়ে পাশের বাড়ির গোয়াল৷ গোবরের গন্ধ, গরুর ধুপধাপ আর চাক চাক মশার ঝাঁক৷ ডোবায় সুপুরিগাছের ধাপে কাপড় কাচা, বাসন মাজা৷
এই জনপদে ভোরটাই ভাল, পাখিদের সৌজন্যে, বহুবচন জাগার আগে৷ বাকিটা বিষাদ আমার কাছে৷

ছিটকে গেলাম৷ ছিটকে গেলাম জোড়াসাঁকো থেকে, একাডেমি অফ ফাইন আর্টস থেকে, উত্তর কলকাতার অলিগলি থেকে, চেতলা-হাজরা থেকে, কলেজ স্ট্রিট থেকে৷ আমি যে পৃথিবীতে বড় হয়েছি, তার বিপুল বিচিত্র বিভাময় পরিসর থেকে ছিটকে গেলাম৷ এখন আমার চলাচলে গ্রাম-গ্রাম কলোনি আর পুরোনো বসতির ম্লানিমা, বিমর্ষ বাতাস৷ দ্বিতীয় দফায় আমার উদবাস্তু হওয়া৷ প্রথম দফাটি ঘটেছিল জ্ঞান হবার আগে, দ্বিতীয় দফা সজ্ঞানে৷
কেন ছিটকে গেলাম? বাবা-মা ভাই-বোন চলে এল ভদ্রেশ্বরে৷ আমি কেন থাকতে পারলাম না এন্টালি পাড়ায়? প্রশ্নটা এড়াতে পারি না৷ তার আগে আরেকটা প্রশ্নের উত্তর নিতে হয়৷ বাবা-মা কেন চলে এলেন? বিশ বছরের মোটামুটি নির্বিঘ্ন বসবাস ছেড়ে চলে আসতে কি বাধ্য হয়েছিলেন? বর্ষায় টালির ফাটল দিয়ে জল পড়ত ঘরে, ঘরের সামনে দিয়ে বয়ে যেত উপচানো পায়খানার মলমূত্র, জলের অভাব ছিল প্রত্যহ, রাস্তার কল-ভরসা ছিল আমাদের নিত্য জলযাপন, ছয় গেরস্থালির কোলাহলে লেখাপড়া বেশ কঠিন ছিল, এক ঘরে মারপিটের শেষে উঠোনে পড়ে থাকত মধ্যরাতের মাতাল ড্রাইভার, আমাদের ঘরের পেছনের গলিতে ভানি ধোপানির মাতলামি আর খেস্তাখেস্তি দু্র্বিষহ করে তুলত সন্ধ্যারাত৷
কংগ্রেস-করা বন্ধুরা শাসায়, স্রেফ একটা দানা, বডি হয়ে যাবি, বিপ্লব ঢুকে যাবে…৷ সিপিএম-করা বন্ধুরা গাল দেয়, সিআইয়ের দালাল৷ হঠকারী সমাজবিরোধী৷ তখন আমার রাত কাটে কানুদা-নীলুদা-রাঙাদা-ভটচাজদার বাড়িতে বা গোরস্থানে বা হাসপাতালে বা…৷
এরপরেও ভাল ছিল অনেক, যা আমাদের বস্তিজীবনকে একরকম সুখবাস করে রেখেছিল৷ ভোর হত বাড়িওলার মেয়ের গলা সাধায়, রাত্রি গভীর হত শৈলেন সরকারের রামপ্রসাদী গানে৷ দল বেঁধে সিনেমা দেখা এবং আরও নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ ছিল সেই বস্তিযাপনে৷ তবে কেন চলে আসা? পুলিশের বুটের লাথি, খুনের হুমকি, ভাঙা উনুন আর ছড়িয়ে পড়া ভাত-তরকারির মাঝখানে ভয়ে থরথর আমার মায়ের মুখ চিরজীবী উত্তর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই জিজ্ঞাসায়৷
পুলিশের এই হামলার লক্ষ্য আমার রাজনীতি৷ টার্গেট যখন হাতছাড়া, তখন পরিবেশকে সন্ত্রস্ত করে তোলা পুলিশের আদিম কায়দা৷ মা ঘুমোতে পারতেন না৷ বাড়ির অন্য ভাড়াটেরাও ভয়ে থাকত৷ বাড়িওলার ছেলে বাবাকে কয়েকবার ঘর ছাড়তে বলেছে করুণ গলায়৷ ফলে বাবা তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিলেন ভদ্রেশ্বরে চলে যাবার৷ কলোনির এক প্রান্তে প্রায়-পরিত্যক্ত ডোবায়-খাওয়া জমি সস্তা পড়েছিল সেদিন৷

একদিন অরুণদি বলেছিল, তুই যা করতাছস, যাগো লগে মিশস, মনে হয় বিপদে পড়বি৷
তখন আমি ঘরছাড়া৷ কংগ্রেস-করা বন্ধুরা শাসায়, স্রেফ একটা দানা, বডি হয়ে যাবি, বিপ্লব ঢুকে যাবে…৷ সিপিএম-করা বন্ধুরা গাল দেয়, সিআইয়ের দালাল৷ হঠকারী সমাজবিরোধী৷ তখন আমার রাত কাটে কানুদা-নীলুদা-রাঙাদা-ভটচাজদার বাড়িতে বা গোরস্থানে বা হাসপাতালে বা…৷ দুপুরে জুটে যায় কোনওক্রমে৷ কী যে বিপ্লব করছি জানি না, তবে বিপ্লবী ডায়ালগের মধ্যে আছি৷
পুলিশের বুট আর জোরালো পাঁচ-সাতটা টর্চ যখন আমাকে প্রায় পাকড়াও করে ফেলেছে, বাঁচায় অরুণদি৷ পাঁচিল বেয়ে বস্তির চালে চালে লাফাতে লাফাতে, অলিগলিতে আছাড় খেতে খেতে পালিয়েছিলাম৷
অরুণদিকে বলেছিলাম, আমাদের দেশ আধা-সামন্ততান্ত্রিক আধা-ঔপনিবেশিক৷ ঘরে বাইরে শোষণ ও নির্যাতন৷ সাম্রাজ্যবাদ আর সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দেশ লুট করছে৷ আমরা চাই মুক্ত স্বদেশ, স্বাধীন দেশবাসী, মানুষের অধিকার, কাজের অধিকার, সাম্যের সমাজ৷ যুগ যুগ ধরে শোষিত নিপীড়িত কৃষিজীবী শ্রমজীবী মানুষ আজ অস্ত্র হাতে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে চাইছে৷ হাজার ছাত্র-যুব তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে৷
অরুণদি বলেছিল, আমার মনে হয় তর উচিত বাবার পাশে দাঁড়ানো৷ মামায় সারাদিন খাটে৷ রোজগার তেমন হয় বইলা মনে হয় না৷ পাঁচটা পেট৷ মাইমা নিজের হাতে সব কাম করে৷ ভাই-বইন ছোট৷ তুই বড় হইছস৷ কাজের বয়স হইছে৷ আমি কইলাম৷ তুই যা ভাল বোঝোস৷ তর লেইগ্যাই অরা ভয়ে কোন দূরে ভদ্রেশ্বরে পলাইছে৷

অরুণদিকে দেশের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝাতে পারিনি৷ আমাদের মতাদর্শ বোঝাতে পারিনি৷ অরুণদির বিয়ে হয় না৷ গায়ের রং কালো বলে পাত্রপক্ষ মিষ্টি খেয়ে ফিরে যায়৷ হিরণদি পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফে কাজ করে৷ রঞ্জুদি নার্সিং পড়ে৷ তাদের বাবা একটা স্টেশনারি দোকান চালায়, আর এক বিধবার সঙ্গে থাকে৷ অরুণদির অনেক দুঃখ৷
পুলিশের বুট আর জোরালো পাঁচ-সাতটা টর্চ যখন আমাকে প্রায় পাকড়াও করে ফেলেছে, বাঁচায় অরুণদি৷ পাঁচিল বেয়ে বস্তির চালে চালে লাফাতে লাফাতে, অলিগলিতে আছাড় খেতে খেতে পালিয়েছিলাম৷ অরুণদি চিৎকার করে বলেছিল, পালা৷ পা লা৷ বাতাসে পুলিশের টর্চ উড়ছিল৷ দাপটে উড়ছিল ‘ঝেড়ে দে, ফেলে দে’৷
শেষ শেলটারও ভেঙে গেলে নিরুপায় আমাকে ভদ্রেশ্বরে চলে আসতে হয়৷ তবে থেকে যাব বলে আসিনি সেদিন৷
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত