(Bengal Hilsa Fish)
“আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে, আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে”
“মশাই, নাকের কি মাথা খেয়েচেন? বলি বৃষ্টির সুবাস বলতে কী পাচ্ছেন, আমাকে বোঝাতে আসবেন না। থাকেন তো সেই মজে যাওয়া, কেদো জলে ভরা, মশা ভ্যান ভ্যানানো দু’শো বছরের পুরনো, দুঃস্থ একটা নালার পারে…আপনি সুবাসের কী বোঝেন শুনি?”
“ওটা আদি গঙ্গা।”
“আর হাসাবেন না হরিদা। গঙ্গা নামেই কি গঙ্গা জল নাকি? আর নামের আগে ‘আদি’ লাগালেই কি বনেদি হয়ে গেল? এ কি শাড়ি না মিষ্টির দোকান না তালমিছরির কৌটো?”
আরও পড়ুন: শেয়ার বাজারে বাঙালি
হরিদা ছাড়বার পাত্র নন।
“গুরুদেব ওই যে গানখানা লিখেছেন, তার ভাবটা কিন্তু আপনি মিস করছেন। রুক্ষ মাটিতে বৃষ্টির জলের যে সোঁদা গন্ধ, ভাবুন তো… তার যে রোমাঞ্চ, তার যে উচ্ছাস, তার যে…তার যে একটা ইয়ে…”
“শুনুন হরিদা, আষাঢ়-শ্রাবণের আসল সুবাস যদি পেতে চান, চলে যান সাগরে বা নিদেনপক্ষে ডায়মন্ডে। সুবাসের সঙ্গে সুখবাস করে পেট আর প্যাকেট ভরে নিয়ে আসুন।”
“কীসের কথা বললেন ঠিক ধরতে পারলাম না!”

“আরে মশাই, এবার তো আপনার বাঙালিয়ানা নিয়েই সন্দেহ জাগছে মনে। এমন বর্ষাকালে নদী, সাগরের পারে বসে ইলিশি গন্ধ শুঁকে ছোঁক ছোঁক করে বাঙালি, আর আপনি সেদিকে না গিয়ে চলে গেলেন গুরুদেবের পথ ধরে! জানেন তো এ ব্যাপারে গুরুদেব কী বলেছেন? তিনি বলেছেন সব ‘বাসনার সেরা বাসা রসনায়’।
হরিদা এবারে খানিক দমে যান। খানিক আকাশপাতাল ভেবে কাগজের কাপ থেকে তলানি চা-টুকু সুরুত করে খেয়ে ফেলেন।
“তা ভায়া, এবার কি ইলিশ সেরকম উঠছে? আমি তো বাজারে গোপালের কাছে তেমন কিছু দেখি না।”
“শুনুন, যে পথে ইলিশ আসবার কথা গঙ্গা বেয়ে, তার করুণ অবস্থা। সাগরে মোহনাটারও তো সাড়ে বারোটা বেজেছে। তাকিয়ে দেখুন প্রতিবেশীর দিকে; পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ধলেশ্বরী কর্ণফুলি বেয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে রাশি রাশি ইলিশ। বর্ষাকালে রীতিমতো নার্সারি বানিয়ে ফেলেছে।”
এবার সত্যি সত্যি হরিদাকে খুব চিন্তিত দেখায়। নিজের ভিতরের বাঙালিয়ানা তাঁকে টান দেয়, মনে পড়ে যায় নিজের শৈশব। ঝিরঝিরে বৃষ্টি, আকাশ জুড়ে কালো মেঘ পরতে পরতে। বাজারের থলেতে লটকে আছে চিকন, রূপোলি, পৈতে আঁকা সেই ইলিশ। যেই না গায়ে লেগেছে মধু গুলগুলি বৃষ্টির ফোঁটা, সাগরের শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে সে পাড়ি দিয়েছিল বাপের বাড়ি গঙ্গার দিকে। ডিমগুলো সযত্নে রেখে ফিরে যাবে কয়েক হপ্তা পরে। ফেরা হয়নি। ধরা পড়েছে কোনও এক পরান বাগদির জালে।
হুসেন মাঝি হাঁক দ্যায় “ঈশান কনে ম্যাঘ ডাকে রে, কইশা টান দ্যা রে মাসুদ।” খানিক দূরে দেখা যায় কয়েকটা মাছ ধরা ডিঙি। পদ্মার বুকে এখন ইলিশের মরসুম। মাসুদ তাদের দিকে চেয়ে জানতে চায় “ও জেলের পো, মাছ কিবা?” হাওয়ার বুকে জবাব আসে “জব্বর, জব্বর, লিবা নাকি?”
তারপর নিক্তি মেপে, লবণ আর বরফে মাখামাখি হয়ে এসে পৌঁছেছে এই নগরে। তারপর সে-ও সেই মোরগের কাহিনি। গায়ে হলুদ মেখে, লঙ্কা, তেল, কালো জিরে ফোড়ন অথবা সর্ষে বাটার আস্তরণে নিজেকে অগ্নি সমর্পণ। ছোটবেলায় কোথায় যেন শুনেছিলেন, এক লাইনের এক ছোট্ট ছড়া; কাঁচা লঙ্কা ইলিশকে বলছে, “তুমি থাক জলে, আমি থাকি ডালে, দেখা হবে দুজনায়, মরণের কালে!” আহা!
হরিদা এবার স্মৃতির ভেলায় ভাসতে থাকেন। মুহূর্তে পিছিয়ে যান অনেকগুলো দশক আগে বাবা রমণীমোহনের বলা গল্পের সূত্র ধরে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালের কথা…
পদ্মার জল উথালপাথাল। আষাঢ়ের প্রায় শেষ। সার সার নৌকা এসে লেগেছে রাজশাহী শহরের অদূরে তালাইমারির ঘাটে। বেশ কয়েক জোড়া একমালাই আর খানকতক মাছ ধরা পানশি তো আছেই। একটু দূরে বাঁধা ইস্পাহানি কোম্পানির ম্যানেজারবাবু খোন্দকার সাহেবের সাজানো গোছানো বজরাখানা। এর মাঝে এসে নোঙর ফেলে রমণীমোহনের বাবা দারোগাবাবু বিধুভূষণের গয়না নৌকো। হুসেন সে নৌকার মাঝি। পার দিতে হবে বহুদূর। পশ্চিমে নদিয়ার মহেশকুন্ডি। বিয়েশাদির ব্যাপার। দারোগা সাহেবের শালির বিয়ে।

বিয়ে বাড়ির যাবতীয় জিনিস— কাপড়, গয়না, তৈজসপত্র, সব কেনা হয়েছে রাজশাহী থেকে। বামুন ঠাকুরের দেওয়া ফর্দ মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে আচারের খুঁটিনাটি সরঞ্জাম। আত্মীয় কুটুমের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাদের প্রায় এক হপ্তার জন্য দরকার চাল, ডাল, চা, চিনি, মশলাপাতি। জোগাড়যন্ত্র করে নিয়েছেন দারোগা বাবুর গিন্নি, হরিদার ঠাম্মা। স্টিমার ঘাটে একটা ছোটখাটো ভিড়। মালপত্র বোঝাই হয় নৌকায়। ছেলেপুলে, লোকলস্কর চড়ে। এক সান্ত্রী আরেক আর্দালি নিয়ে, বন্দুক হাতে দারোগা সাহেব চড়েন সব শেষে।
দুপুর গড়িয়ে বেলা হতে কালো করে আসে আকাশ। সমুদ্র থেকে হাওয়া ছোটে, পাগলা নদীর ঢেউয়ের বুকে নাচে গয়না নৌকো। মাঝিমাল্লাসমেত জনা কুড়ি লোক। হুসেন মাঝি হাঁক দ্যায় “ঈশান কনে ম্যাঘ ডাকে রে, কইশা টান দ্যা রে মাসুদ।” খানিক দূরে দেখা যায় কয়েকটা মাছ ধরা ডিঙি। পদ্মার বুকে এখন ইলিশের মরসুম। মাসুদ তাদের দিকে চেয়ে জানতে চায় “ও জেলের পো, মাছ কিবা?” হাওয়ার বুকে জবাব আসে “জব্বর, জব্বর, লিবা নাকি?”
হরিদা তাঁর যৌবনে রূপনারানের পারে দেখেছিলেন তাকে। ভৃগু বাগদী ডিঙা বেয়ে যেত রাতের প্রথম প্রহরে। ফিরত যখন, তখন তার ভাঙা রুক্ষ মুখ হাসিতে টইটুম্বুর! ডিঙির কাঠের পাটাতনের নিচে রুপোলি ইলিশ ঝকমকিয়ে উঠেছে সূয্যির আলোয়! মিশকালো দাঁতের হাসি নিয়ে বাড়ি এসে সে দিয়ে যায় ইলিশ।
দারোগা সাহেবের আর্দালি বসে ছিল গলুইয়ের একপাশে। সে লাফিয়ে ওঠে। নাওয়ের রশি ধরে পৌঁছে যায় গিন্নিমার সামনে। “আইজ্ঞে, ইলিশ মাছ নিবেন মা?” চকচক করে ওঠে গিন্নিমার চোখ! ওবেলা বেলে হাঁস শিকার করেছিলেন কত্তা, তারই ঝোল রেঁধেছিল উড়ে ঠাকুর বৃন্দাবন। পদ্মার ইলিশ তায় আবার পদ্মার মাঝে, নৌকায়! কালো জিরে, লঙ্কা, হলুদ আর লম্বা বেগুনের ফালি চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায় তাঁর।
খবর পৌঁছায় দারোগাবাবুর কানে। তাঁর নির্দেশে একটা ডিঙি এগিয়ে আসে নৌকার দিকে। পদ্মার ঢেউয়ের মাতন ছিটকে দিতে চায় তাকে। আর্দালির মুখ ঘুরে নির্দেশ পৌঁছায় ডিঙি নৌকার বুড়ো জেলের কাছে। কাঠের পাটাতনের নিচ থেকে এক জোড়া রুপোলি মাছ তুলে ধরে সে দু’হাতে— তার পর ছুঁড়ে দেয় নৌকার দিকে। কালো আকাশে খানিক বিদ্যুৎ রেখা জ্বেলে মাছ দুটো এসে আছড়ে পড়ে এ নৌকার সামনের গলুইতে। হেসে ওঠে চারদিক। চার আনা চার আনা, মোট আট আনা নিয়ে বিদেয় হয় জেলে নৌকা।

রাত আসে। নোঙর ফেলা নৌকায় গরম ভাত আর ইলিশের গন্ধ ম ম করে। পদ্মার ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ আর হ্যারিকেনের হলদেটে কাঁপা আলোর মাঝে মানুষগুলোর পরিতৃপ্ত মুখ দেখা যায়।
এ গল্পের চরিত্র আর তাদের ইলিশ পিরিতি হরিদার চেনা। তারপর দেশভাগ। একদিন সেই মানুষগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যায়। দেশের মাটির সঙ্গে পদ্মা-গঙ্গার জলও ভাগাভাগি হয়, কিন্তু থেকে যায় রুপোলি ইলিশের ঝাঁক। ‘জলের ঈশ্বর’ হয়ে তারা বেঁচে থাকে। যে বাঙালি ঈশ্বর মানেন না, তিনিও ইলিশকে ঈশ্বর জ্ঞানে স্থান দিতে এক পায়ে খাড়া!
হরিদা তাঁর যৌবনে রূপনারানের পারে দেখেছিলেন তাকে। ভৃগু বাগদী ডিঙা বেয়ে যেত রাতের প্রথম প্রহরে। ফিরত যখন, তখন তার ভাঙা রুক্ষ মুখ হাসিতে টইটুম্বুর! ডিঙির কাঠের পাটাতনের নিচে রুপোলি ইলিশ ঝকমকিয়ে উঠেছে সূয্যির আলোয়! মিশকালো দাঁতের হাসি নিয়ে বাড়ি এসে সে দিয়ে যায় ইলিশ।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি, রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে যে ৩১টি মাছের লিস্টি দিয়েছেন তার মধ্যেও ইলিশের বিচরণ। রাজার অপর পারিষদ গোপাল ভাঁড়ের গল্প আরও সরেস। সেবার নাকি ইলিশ প্রচুর উঠেছে জালে। রাজা যেখানেই যাচ্ছেন, যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, সবাই কেবল ইলিশের গল্প করছে। রাজা চরম বিরক্ত।
কখনওবা ভৃগু গল্প শোনায় শহরের বাবুকে। “গেরামের লোক তো ভূত পেত্নির ভয়ে মরে বুইলে, বলে কি না, ইলশে নাকি ভূতের সব চেইয়ে প্রিয়; যখুনি সাঁঝের কালে ইলশে নিয়ে যাবে, মরা মাসের মুখে, কানকোয় গুঁজে দেবে তুলসী পাতা। “তুলসী গাছের নিচে ইলিশের কাঁটা রেখে দিলে তা নাকি রুপো হয়ে যায়— এই লোককথাও বাদ পড়ে না!
কথায় বলে, ইলিশের শ্বশুরবাড়ি হল সাগর, আর বাপের বাড়ি হল সেই সাগরে মেশা নদী। ফি বছর, বর্ষা আর শীতে, ইলিশের ঝাঁক রওনা হয় সাগরের লোনা জল থেকে মিষ্টি জলের নদী উজিয়ে বংশবৃদ্ধির তাগিদে; গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনা, তাপ্তি, কৃষ্ণা, কাবেরী, মহানদী, গোদাবরী, ধলেশ্বরী, কর্ণফুলি, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, রূপনারায়ণ, মেকং, যমুনা প্রভৃতি নদীতে ঝাঁক বেঁধে আসে তারা। নদীর জল আঁশটে গন্ধে ভরে ওঠে। বাংলার জেলেরা বলে ‘গন্ধ ঝাঁক’। ফ্রানসিস হামিল্টন সাহেব ভারতের মৎস্যকুলের ঠিকুজি কুষ্ঠী নিয়ে বহু কাজ করেছিলেন। তিনি নাকি ওদিকে আগ্রা, কানপুর, পাটনা আর এদিকে গোয়ালপাড়ায় নদীতে ইলিশ মাছ দেখেছিলেন। তবে হ্যাঁ, সে মাছ তাঁর মতে কলকাতা আর ঢাকাইয়া ইলিশের কাছে নেহাতই ম্রিয়মাণ!

অবশ্য ইলিশের হালহাকিকত জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে সেই সিন্ধু সভ্যতার যুগে বা তারও আগে। সে সময়ের যে সব সীল পাওয়া গেছে, তার গায়ে যে মাছের ছবি, তা দেখে ইলিশের কথাই মনে হবে। দশম শতকে সিন্ধ প্রদেশের হিন্দু দেবতা ‘ঝুলেলাল’, যিনি মুসলিমদের আরাধ্য ‘জিন্দা পীর’, তাঁর বাহন হল ‘পাল্লা’, যা ইলিশের স্থানীয় নাম। দুই ধর্মের মানুষজন, বিশেষত সিন্ধু নদ এবং আরব সাগরের মাঝি ও ধীবরদের, অগাধ বিশ্বাস ছিল এই দেবতার উপর।
বাংলায় ইলিশ মাছের আদি উল্লেখ পাওয়া যায় দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতকে লেখা জীমূতবাহন রচিত ‘কালবিবেক’-এর পাতায়। প্রাণিজ তেলের তালিকায় ইলিশ মাছের তেল ও তার ব্যবহারের বিবরণ সেখানে লিপিবদ্ধ রয়েছে। ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে তারকা অর্থাৎ বেহুলার বৌদি বিয়ের দিনে আঁচল বেঁধে নেমেছে নন্দাই লখিন্দরের জন্য রান্নাবান্না করতে। সেখানেও নানা রকম মাছের সঙ্গে ইলিশ।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি, রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে যে ৩১টি মাছের লিস্টি দিয়েছেন তার মধ্যেও ইলিশের বিচরণ। রাজার অপর পারিষদ গোপাল ভাঁড়ের গল্প আরও সরেস। সেবার নাকি ইলিশ প্রচুর উঠেছে জালে। রাজা যেখানেই যাচ্ছেন, যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, সবাই কেবল ইলিশের গল্প করছে। রাজা চরম বিরক্ত।
‘ওয়াল মৎস দিয়া রান্ধিলেক ঝাঁটি/ মরিচ সুকত রান্ধ্যে করি পরিপাটি।।
তেতৈল দিয়া অম্বল রান্ধিলো খলিসা/ না না বস্তু ভাজিয়া কথ তুলিল ইলিসা।।’
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি, রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে যে ৩১টি মাছের লিস্টি দিয়েছেন তার মধ্যেও ইলিশের বিচরণ। রাজার অপর পারিষদ গোপাল ভাঁড়ের গল্প আরও সরেস। সেবার নাকি ইলিশ প্রচুর উঠেছে জালে। রাজা যেখানেই যাচ্ছেন, যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, সবাই কেবল ইলিশের গল্প করছে। রাজা চরম বিরক্ত।
গোপাল বলল, ‘এটা তো স্বাভাবিক রাজামশাই। ইলিশের সময়, সবাই তো ইলিশের কথাই বলবে।’ রাজা বললেন, ‘না, আমি ইলিশের কথা শুনতে শুনতে বিরক্ত। ইলিশ নিয়ে এই কথাবার্তা তোমাকে বন্ধ করতেই হবে অন্তত একটা সকালের জন্য।’

পরের দিন শাড়ি পরিহিতা এক মহিলা একহাত ঘোমটা টেনে উপস্থিত রাজ সভায়; সে কোনও প্রশ্নের উত্তর দেয় না। খালি থেকে থেকে মাথা নাড়ে আর ঘোমটা টানে। হতাশ রাজা শেষমেশ বললেন, ‘ওহে, আমি ক্লান্ত, তুমি বরং কাল এসো। তুমি আমার সারা সকালটাই নষ্ট করে দিলে।’ ‘কিন্তু আমার তো সকালটা নষ্ট হয়নি’, হঠাৎ কথা বলে উঠল মহিলাটি। রাজা অবাক হয়ে দেখলেন, মহিলাটি আর কেউ নয়, গোপাল ভাঁড়।
গোপাল বলল, ‘আমি আমার কথা রেখেছি। এই সকালটাতে আমি সবার মনোযোগ এমন ঘুরিয়ে দিয়েছি যে কেউ একবারের জন্যও ইলিশের কথা বলেনি।’ এবার আরও অ্যান্টিক্লাইমেক্স! রাজা খুশি হয়ে যে-ই বলেছেন গোপালকে পুরস্কার দেবেন, গোপাল হাত জোড় করে বলল, ‘কিন্তু পুরস্কার হিসেবে আমাকে দয়া করে ইলিশ মাছ দেবেন না, হুজুর।’
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দেখলে ভারত উপমহাদেশের দক্ষিণ উপকূল জুড়ে ইলিশের বাসভুমি। সারা পৃথিবীতে যত ইলিশ ধরা হয়, তার ৫০-৬০ শতাংশ ধরা হয় বাংলাদেশে, ১৫-২০ শতাংশ ভারত ও পাকিস্তানে, অবশিষ্টাংশ বাকি বিশ্ব জুড়ে, যা কি না ইলিশের রকমফের হিসেবে ছড়িয়ে আছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দেখলে ভারত উপমহাদেশের দক্ষিণ উপকূল জুড়ে ইলিশের বাসভুমি। সারা পৃথিবীতে যত ইলিশ ধরা হয়, তার ৫০-৬০ শতাংশ ধরা হয় বাংলাদেশে, ১৫-২০ শতাংশ ভারত ও পাকিস্তানে, অবশিষ্টাংশ বাকি বিশ্ব জুড়ে, যা কি না ইলিশের রকমফের হিসেবে ছড়িয়ে আছে।
ইলিশকে আইকন বানানোর পিছনে বাঙালির হাত যে সবচেয়ে বেশি, তা তর্কাতীত। নদীমাতৃক এই বঙ্গভূমির জলের রং দেখে জেলে বোঝে সে জল চখা না চেরটা; চেরটা জলে মিশে থাকে শেওলা, যা ইলিশের চারণভূমি। মাছের নামেরও কত না বাহার— খ্যাপ্তা, ফেশা, খোকা (জাটকা), চন্দনা, সকড়ি, গুরতা এমন কত কী! রসনা তৃপ্তির রকমফেরে গিন্নিমা বলতে পারতেন গঙ্গার কোন ঘাট থেকে ধরা সে মাছ; তক্তা ঘাট, বাবু ঘাট, বাগবাজারের ঘাট না বিচালি ঘাট নাকি মাঝ গঙ্গা!

ঠিক এখানেই সূত্রপাত পশ্চিম বনাম পুব, বাঙাল বনাম ঘটির মেছো টাগ অফ ওয়ার! চিংড়ি-ইলিশের চেয়েও পুরনো গঙ্গা বনাম পদ্মা ইলিশের কৌলিন্য বিতর্ক। স্বামী বিবেকানন্দ স্বয়ং মজেছিলেন গঙ্গা ইলিশের স্বাদে। ওপারের ভোজন রসিক সেই গঙ্গার ইলিশকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে তর্কে বসেন পদ্মা-মেঘনার ইলিশের তুল্যমূল্য বিচারে। পদ্মা-মেঘনার সঙ্গমের কাছে চাঁদপুর তাই হয়ে ওঠে তাদের ‘ইলিশের বাড়ি’! স্বাধীন বাংলাদেশের ইলিশ পিরিতি তাদের মুদ্রা, ডাকটিকিটে ছাপ রেখে যায়; ‘৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে মুজিবর রহমানের রাঙা পোস্টারে জ্বলজ্বল করে কবিতার পঙক্তি—
“ইলিশ মাছের তিরিশ কাঁটা, বুয়াল মাছের দারি, ইয়াহিয়া খান ভিক্ষা করে মুজিবের বাড়ি।”
কলকাত্তাইয়াসহ এপারের মানুষজনের স্বাদ মেটে গঙ্গা, রূপনারায়ণ আর সাগরের ইলিশে, যে ইলিশ ‘একশো দেড়শো বছর ধরে কোম্পানির তেল খেয়েছে’ বলে কমলকুমার মজুমদার খেদোক্তি করেছিলেন। সাগরের ইলিশ আগে স্রোতের বিপরীতে পাড়ি দিত এলাহাবাদ অবধি।
কলকাত্তাইয়াসহ এপারের মানুষজনের স্বাদ মেটে গঙ্গা, রূপনারায়ণ আর সাগরের ইলিশে, যে ইলিশ ‘একশো দেড়শো বছর ধরে কোম্পানির তেল খেয়েছে’ বলে কমলকুমার মজুমদার খেদোক্তি করেছিলেন। সাগরের ইলিশ আগে স্রোতের বিপরীতে পাড়ি দিত এলাহাবাদ অবধি। এখন সে গঙ্গাবিমুখ।
এখন সে গঙ্গাবিমুখ। বঙ্গোপসাগরে গঙ্গার মোহনা বেয়ে ইলিশ করিডোর দিনে দিনে ব্যাহত। তবু সে ফিরে ফিরে আসে মধুগুলগুলি বৃষ্টির ফোঁটায়, রাত জাগা ডিঙি নৌকোর গলুই ভরে, কোনও এক পূর্ণিমা রাতের জ্যোৎস্না গায়ে মেখে। উৎসবে, পার্বণে, লঙ্কা, হলুদ, সরষে, কালো জিরে, তেলের পরশে সেজে ওঠে তার বুকের মাঝে জমে থাকা স্বাদের ভালবাসা।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত