(Tiranga Barfi)
ভোরের আলো সবে ফুটেছে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও মদনলাল গুপ্তা, ঠঠেরি বাজারে নিজের বাড়ি থেকে বেরিয়ে, দশাশ্বমেধ ঘাটে আসেন। স্নান সেরে, ভিজে কাপড়ে ঘাটের সিঁড়িতে উঠে তিনি একটু থমকে দাঁড়ালেন। অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ ঘাটে লোক সমাগম যেন একটু বেশি মনে হচ্ছে? সাধারণত এত ভোরে স্নানার্থীদেরই বেশি দেখা যায়, কিন্তু আজ বেশ কিছু স্থানীয় মানুষজন এবং বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির কিছু ছাত্ররাও জড়ো হয়েছে। ছোট ছোট জটলা করে তারা নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় কোনও কিছু নিয়ে কথা বলছে।
ওই জটলার মধ্যে মদনলাল একটি চেনা মুখ দেখতে পেলেন- ইউনিভার্সিটিরই এক ছাত্র রাজনারায়ণ, ইউনিভার্সিটি হোস্টেলেই থাকে। মাঝেমধ্যে ছেলেটা ঠঠেরি বাজারে মদনলালের দোকানে আসে নাস্তা করতে।
আরও পড়ুন: চিরকিশোর এক সিরিয়াসলি জিনিয়াস
“অরে রাজা, অতনে সবেরে এ কা চলত হও!’’, মদনলাল হাত নেড়ে রাজনারায়ণকে ডাকলেন।
“প্রণাম চাচা! ঘোর অনর্থ ভইল…অর্ধি রাতি পছিল গান্ধিজি গিরিফতার কর লিহল গইল বা… শুধু গান্ধিজি নয়, দেশের তাবোড় তাবোড় নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
“কী বলছো!” খবরটা শুনে চমকে উঠলেন মদনলাল, “এটা কেন হল?”
“কাল বম্বেতে মিটিং ছিল। গান্ধিজি সেই মিটিং-এ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। আর দেশের জনতাকে ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ স্লোগান হাতিয়ার করে পথে নামতে বলেছেন।”, রাজনারায়ণ জানাল।

“তাহলে এবার উপায় কী?”, চিন্তিত মদনলাল প্রশ্ন করলেন।
“সেটাই তো কথা। নেতৃত্ব দেবার মতো কেউ নেই এই মুহূর্তে। সবাই জেলে। এদিকে খবর পেয়েছি, আমাদের ইউনিভার্সিটিতে পুলিশি রেইড হতে পারে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ছাত্ররা একটা প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলব। বেনারসের জনতাকে একত্র করব। হরতালেরও ডাক দেব”, তারপর গলার স্বর নামিয়ে রাজনারায়ণ বলল, “সেই জন্যই আমরা আজ ঘাটে একটা মিটিং করব ঠিক করেছি। ইউনিভার্সিটিতে এই মুহূর্তে কিছু করা বিপজ্জনক।”
“হুম…”
“আরেকটা কথা বলি”, মদনলালের খুব কাছে গিয়ে ফিসফিস করে রাজনারায়ণ বলল, “ইংরেজ সরকার ‘তিরঙ্গা ঝান্ডা’ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। শুধু তিরঙ্গা কেন– কোনও ঝান্ডা নিয়েই রাস্তায় বের হওয়া যাবে না।”
দেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের কিছু আগে, ১৮৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত, ৯২ বছরের পুরনো এক বিখ্যাত মিষ্টির দোকান রাম ভান্ডার। আর কিছু বছর পরেই দেশ স্বাধীনতার সাক্ষী হবে। আর শহরের খুব নামকরা এই দোকানের মালিক এখন শ্রী মদনলাল গুপ্তা।
মদনলাল সমস্তটা শুনে বললেন, “ঠিক আছে, তোমরা তোমাদের কাজ করে যাও। ভারতমাতার আশীর্বাদ তোমাদের ওপর আছে। মনে রেখো, আমিও তোমাদের সঙ্গে আছি। আমাকে কী করতে হবে বোলো।”
এই বলে তিনি তাঁর বাড়ির পথে হাঁটা দিলেন। যেতে যেতে রাজনারায়ণের কথাগুলো কানে বাজছিল। অনেক কিছুই তিনি ভাবতে ভাবতে হাঁটছিলেন। তিনি কোনও মতেই মেনে নিতে পারছিলেন না যে অধিকার দমনের পথে ইংরেজ সরকার এতটা নিচে নামবে! ‘তিরঙ্গা ঝান্ডা’ নিয়ে বের হতে দেবে না? কেন? এটা যে কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। একটা কিছু করতেই হবে– এমন কিছু করতে হবে যাতে ইংরেজ সরকারের চোখে ভাল করে ধুলো দেওয়া যায়। চোখের সামনে তিরঙ্গা থাকবে, অথচ পুলিশ কিছু করতে পারবে না।
দেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের কিছু আগে, ১৮৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত, ৯২ বছরের পুরনো এক বিখ্যাত মিষ্টির দোকান রাম ভান্ডার। আর কিছু বছর পরেই দেশ স্বাধীনতার সাক্ষী হবে। আর শহরের খুব নামকরা এই দোকানের মালিক এখন শ্রী মদনলাল গুপ্তা।
ঘাট থেকে বাড়ি ফিরে, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বেরোবার প্রস্তুতি নিলেন মদনলাল। আজ তাঁর অনেক কাজ। রবিবার বলে এই দিন তাঁর দোকানে খদ্দেরের ভিড় অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশি থাকে। গোটা অঞ্চলে এই রাম ভান্ডারের মিষ্টি আর জলখাবার বিখ্যাত। শুধু সাধারণ খদ্দের নয়, ঠঠেরি বাজার আর আশেপাশের অঞ্চলের বহু নামজাদা মানুষই তাঁর মিষ্টির ভক্ত। রসুলন বাঈ, পণ্ডিত কিষণ মহারাজ, সিদ্ধেশ্বরী দেবীর নামও সেই তালিকায় আছে। রাম ভান্ডারের খুব কাছেই থাকেন সিদ্ধেশ্বরী দেবী। তিনি সকালে স্নান আর পুজো সেরে নাস্তা করেন ‘কচৌরি আর জলেবি’ দিয়ে, যা প্রতিদিন কেনা হত রাম ভান্ডার থেকেই। মদনলালের দোকানের বাঁধা খদ্দেরদের মধ্যে তিনিও একজন।
“আরে আপনার এই ‘জলেবি’, আর ‘রাবড়ি’র সঙ্গে যদি একটা সবুজ রঙের মিষ্টি রাখেন তাহলেই বাজিমাৎ! কেসরি রঙের জলেবি আর সাদা রবড়ি-র সঙ্গে একটা সবুজ পিস্তার বরফি কিনে খেয়ে নিলেই পেটা গিয়ে এক হয়ে ওগুলো নারা দেবে ‘ভারত মাতা কি জয়’…
ভোরবেলায় ঘাটে রাজনারায়ণের কাছে যা শুনলেন, সেটা শুনে মদনলালের দুর্ভাবনাই হচ্ছিল। আজকালের মধ্যেই গন্ডগোল লাগবে। যে কোনও সময় কিছু ঘটে যেতে পারে। তাছাড়া আজই হরতাল শুরু হলে খদ্দেরদের কী হবে? অন্তত এই মুহূর্তে যারা দোকানে এসেছে, তাদের প্রয়োজনগুলো মিটিয়ে দিতে পারলে শান্তি। কেউ যেন অভুক্ত না ফিরে যায়।
সকাল সকাল কর্মচারীদের কাজকর্ম বুঝিয়ে দিয়ে দোকানের সামনের কাউন্টারে এসে বসলেন মদনলাল। একটু একটু করে দোকানে ভিড় বাড়ছিল। কাউন্টারে বসে খদ্দেরদের হিসেব বুঝে টাকা নিচ্ছেন, খুচরো ফেরত দিচ্ছেন, খাবারের প্যাকেট খদ্দেরদের দিচ্ছেন আর সেই কাজের মাঝেও তাঁর মন ছিল একটাই ভাবনা- কী করে ইংরেজদের ‘মুঁহতোড় জবাব’ দেওয়া যায়।

“গুরুজি, এক বাত কহিয়ে”, এক চেনা খদ্দেরের কথায় মুখ তুলে তাকালেন মদনলাল, “এই ইংরেজরা ঝান্ডা হাতে নিতে দেবে না বুঝলাম, কিন্তু পেটে নিলে কে বাধা দেবে?”
কথাটা শুনে মদনলাল একটু চমকালেন। কিছুক্ষণ সেই খদ্দেরের দিকে তাকিয়ে বললেন- “বুঝলাম না।”
“আরে আপনার এই ‘জলেবি’, আর ‘রাবড়ি’র সঙ্গে যদি একটা সবুজ রঙের মিষ্টি রাখেন তাহলেই বাজিমাৎ! কেসরি রঙের জলেবি আর সাদা রবড়ি-র সঙ্গে একটা সবুজ পিস্তার বরফি কিনে খেয়ে নিলেই পেটা গিয়ে এক হয়ে ওগুলো নারা দেবে ‘ভারত মাতা কি জয়’…যাই হোক, ঠাট্টা করছিলাম। চলি, জয় শম্ভু!”
কিন্তু মদনলাল বিষয়টা ঠাট্টা হিসেবে নিলেন না। মাথায় যেন এক বিদ্যুৎ ঝিলিক দিল। দারুণ এক পরিকল্পনা মাথায় এল। ওই খদ্দের নিজেও জানে না সে কতটা উপকার করে গেল। মদনলাল মনে মনে হাসলেন। ভাবলেন, “কাপড়ের পতাকা তো আটকাবে, কিন্তু মিষ্টির পাতের পতাকা আটকাবে কীভাবে?”, তিনি স্থির করে ফেললেন কী করবেন।
নাঃ… সময় এসে গিয়েছে এবার কাজে নামার। তাঁর পরিকল্পনার এবার রূপ দেওয়ার এই তো সময়। এখনই না করলে আর কখন হবে। তিনি ঠিক করলেন এক অভিনব পতাকা তিনি আবিষ্কার করবেন, যা মানুষের হাতে হাতে চতুর্দিকে ছড়িয়ে যাবে। তাঁর ব্যবসার মাধ্যমেই দেশের জন্য সেই কাজ করবেন।
কয়েদিনের মধ্যেই এল সেই দিন। ১৯৪২ সালের ১৩ই আগস্ট। দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। সকাল থেকে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ছাত্র আর সাধারণ নাগরিকদের একটা জমায়েত হয়েছিল দশাশ্বমেধ ঘাট আর গদোলিয়া চৌকের মধ্যিখানের অঞ্চলে। পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি বিশাল মিছিল এখান থেকে হেঁটে টাউন হল এবং অন্যান্য সরকারি ভবনে তেরঙা পতাকা উত্তোলনের উদ্দেশ্যে রওনা হবে।
ব্রিটিশ পুলিশ গদোলিয়া-দশাশ্বমেধ সড়কটি খবর পেয়ে ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে দেয়। কিন্তু যে উত্তেজনা আর রোষ মিছিলে দেখা গিয়েছিল এবং ক্রমশ বাড়ছিল, সেটা আটকানো যে সম্ভব ছিল না, ইংরেজ সরকারের পুলিশ বুঝেছিল। ফলে ঘটে গেল সেই অঘটন- পুলিশ ওই মিছিল আটকাতে, নিরস্ত্র জনতার উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করল। গদোলিয়া চৌক সেদিন রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেল।
এই গুলিবর্ষণে ঘটনাস্থলেই চারজন স্বাধীনতা সংগ্রামী শহিদ হন। স্থানীয় স্মৃতিসৌধগুলিতে তাদের নাম প্রায়শই সম্মিলিতভাবে “১৩ই আগস্টের শহিদ” হিসেবে সম্মান জানানো হলেও, তারা ছিলেন সেই সাধারণ নাগরিক ও ছাত্র, যারা শীর্ষস্থানীয় নেতারা জেলে থাকার সময় আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন। আর সে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল চারপাশে।
মদনলাল সেদিন নিজে হয়তো পতাকা হাতে মিছিলে নামেননি, কিন্তু তাঁর বুকের ভিতরটা স্বদেশের প্রতি ভালবাসায় তোলপাড় হচ্ছিল। এ যন্ত্রণা তাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল।
নাঃ… সময় এসে গিয়েছে এবার কাজে নামার। তাঁর পরিকল্পনার এবার রূপ দেওয়ার এই তো সময়। এখনই না করলে আর কখন হবে। তিনি ঠিক করলেন এক অভিনব পতাকা তিনি আবিষ্কার করবেন, যা মানুষের হাতে হাতে চতুর্দিকে ছড়িয়ে যাবে। তাঁর ব্যবসার মাধ্যমেই দেশের জন্য সেই কাজ করবেন।
কটা সময় ছিল, বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিরর ছাত্র বা বিপ্লবী যুবকেরা ক্রেতা সেজে দোকানে আসতেন। রাম ভান্ডার ছিল আন্দোলনের ঘাঁটি। বরফির ঠোঙায় বা বাক্সের আড়ালে আদানপ্রদান হত গোপন রাজনৈতিক চিঠি আর বার্তা।
দেরি না করে সেই দিনই তাঁর দোকানের কর্মচারীদের নিয়ে আলোচনায় বসলেন এবং সবাইকে বোঝালেন কী করতে হবে। মদনলাল ঠিক করলেন, কোনও কৃত্রিম রং ছাড়া দোকানের হেঁশেলে, গোটা বেনারসের জন্য একটি ‘তিরঙ্গা বরফি’ নামের মিষ্টি গড়বেন। যে বরফির মাধ্যমে সবার মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলবেন। তিনটি স্তরের এই বরফিতে থাকবে তিনটি রঙ- সবচেয়ে ওপরে থাকবে খাঁটি মেওয়া আর কেশর মেশানো গেরুয়া রঙের মিশ্রণ; মাঝে থাকবে কাজু আর খোয়ার সাদা স্তর; আর তার নিচে পালং বাটা আর পেস্তা মেশানো সবুজ রঙের আরেকটা স্তর।
পরীক্ষা সফল হল আর মদনলাল গুপ্তার ‘রাম ভান্ডার’ ইতিহাস রচনা করল- তৈরি হল ভারতের প্রথম ‘তিরঙ্গা বরফি’! মদনলাল একবার ভেবেছিলেন এটির নাম রাখবেন ‘রাষ্ট্রীয় বরফি’ কিন্তু পরে তাঁর মনে হল এই মিষ্টির নাম ‘তিরঙ্গা বরফি’ রাখাই ঠিক হবে।

১৫ আগস্ট ১৯৪২ সাল- গুলি চলার ঠিক দু-দিন পরের ঘটনা। সকাল থেকেই ঠাঠেরি বাজারের রাম ভান্ডারে, থালায় থালায় সার দিয়ে সাজিয়ে বিক্রি শুরু হল সেই ‘তিরঙ্গা বরফি’! সে এক দারুণ উত্তেজনার মুহূর্ত। আগুনের মতো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল এই মিষ্টির কথা। ওদিকে, ইংরেজ সরকারের পুলিশ গোটা শহরজুড়ে ঘুরে ঘুরে টহল দিচ্ছিল। বাজারে এসেও ওরা টহল দিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু চোখের সামনে সাজানো জাতীয় পতাকার মতো মিষ্টি দেখেও কিচ্ছু করতে পারছিল না। কারণ, সরকারের কোনও আইনেই মিষ্টি বিক্রি নিষিদ্ধ তো ছিল না! সাধারণ মানুষ জনে জনে এসে সে মিষ্টি কিনে নিয়ে যাচ্ছে- নিজেদের জন্য কিনেছে আবার বিতরণও করছে। কিছু মানুষ আবার পুলিশদেরও সেই মিষ্টি দিচ্ছিল আর ওরাও হাত বাড়িয়ে সেই মিষ্টি নিয়ে নিচ্ছিল। এইভাবেই মিষ্টির আড়ালে শুরু হল বিপ্লবের নীরব জয়গান।
এই সময় রাম ভান্ডার শুধুমাত্র মিষ্টির দোকান নয়, এটি হয়ে উঠেছিল ‘আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবীদের সেফ হাউস’।
একটা সময় ছিল, বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিরর ছাত্র বা বিপ্লবী যুবকেরা ক্রেতা সেজে দোকানে আসতেন। রাম ভান্ডার ছিল আন্দোলনের ঘাঁটি। বরফির ঠোঙায় বা বাক্সের আড়ালে আদানপ্রদান হত গোপন রাজনৈতিক চিঠি আর বার্তা। মদনলাল গুপ্ত প্রত্যক্ষ কোনও রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতা বা পদাধিকারী রাজনীতিক ছিলেন না; কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে পরোক্ষ ও গভীরভাবে যুক্ত, একজন স্বদেশী ও দেশপ্রেমী ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
গুপ্তা পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম বা রাম ভান্ডারের বর্তমান পরিচালকদের সংগ্রহে ব্রিটিশ আমলের কিছু পুরনো রসিদ, হাতে লেখা নথিপত্র এবং পারিবারিক স্মারক সংরক্ষিত রয়েছে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ১৯৪২-৪৫ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় রাম ভান্ডার ছিল একটি গোপন বা আন্ডারগ্রাউন্ড আস্তানা।
মদনলাল এই বরফি বিক্রির লভ্যাংশের একটা বড় অংশ গোপনে নিয়মিত পাঠিয়ে দিতেন আত্মগোপন করে থাকা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ফান্ডে। মজার কথা হল শুধুই তিরঙ্গা বরফি নয়- স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত বহু নেতাদের নামেও মিষ্টি তৈরি করা আরম্ভ হল। গান্ধিজি, নেহরুজি বা নেতাজির মতো জাতীয় নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মদনলাল আরও কিছু দারুণ মিষ্টি বানিয়েছিলেন— তাদের অভিনব নামও দিয়েছিলেন, যেমন ‘গান্ধী গৌরব’, ‘জওহর লাড্ডু’, কিংবা ‘সুভাষ ভোগ’! যখনই কোনও জাতীয় নেতা বেনারসে আসতেন, অন্তত একবার রাম ভান্ডারে পদার্পণ করতেন।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এটা হয়তো বেনারসের কোনও স্থানীয় গল্প যা বেনারসের মানুষে রসিয়ে বলতে ভালবাসে। কিন্তু না! এই বরফির ঐতিহাসিক মহত্ত্ব এতটাই খাঁটি যে, ২০২৪ সালে ভারত সরকার ‘বেনারসী তিরঙ্গা বরফি’-কে আনুষ্ঠানিকভাবে জিআই ট্যাগ (GI Tag) দিয়েছে। সরকারি নথিতেই লেখা আছে, কীভাবে ১৯৪২-৪৫ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে এই মিষ্টি স্বদেশী মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার ভাবাবেগ জাগিয়ে তুলেছিল।
গুপ্তা পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম বা রাম ভান্ডারের বর্তমান পরিচালকদের সংগ্রহে ব্রিটিশ আমলের কিছু পুরনো রসিদ, হাতে লেখা নথিপত্র এবং পারিবারিক স্মারক সংরক্ষিত রয়েছে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ১৯৪২-৪৫ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় রাম ভান্ডার ছিল একটি গোপন বা আন্ডারগ্রাউন্ড আস্তানা। ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে বিপ্লবী বা শীর্ষ নেতাদের গোপন যাতায়াতের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ‘লগবুক’ বা সরকারি রেজিস্টার রাখা তখন সম্ভব ছিল না; ফলে নেহেরু বা জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো নেতাদের উপস্থিতির অধিকাংশ বিবরণই জি.আই. আবেদনপত্র, স্থানীয় সংবাদপত্রের আর্কাইভ এবং কাশীর বিশিষ্টজনদের স্মৃতিকথার মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।
আজও বেনারসের ঠাঠেরি বাজারের সেই পুরনো মিষ্টির দোকানে, প্রতিদিন বহু মানুষের ভিড় জড়ো হয়। আধুনিকতার জাঁকজমক, ইতিহাসের অবহেলার মাঝে আজও ঠঠেরি বাজারের গলিতে নিশ্বাস ফেলে এক টুকরো সেই স্বাধীনতার ইতিহাস। রাম ভান্ডারেই শুধু নয়, বেনারস শহরের নানান মিষ্টির দোকানের শো-কেসে, বিক্রির জন্য থরে থরে আজ ‘তিরঙ্গা বরফি’ সাজানো থাকে। এই মিষ্টি শুধু বরফি নয়, নজিরবিহীন ইতিহাসের এ এক আশ্চর্য দলিল, যা ইংরেজদের কালা আইন আর অত্যাচারের মুখে দেশের পতাকাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
বেনারস এই কাহিনি আজও ভোলেনি। ভুলতে দেয়নি।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত