(India Partition)
মায়ের কাছে গল্প শুনেছি, সেই ছোট্ট শিশু বয়সে, যখন খাওয়ার সময় কেবল বায়না করতাম, আমার এক কাকিঠাম্মা একবার আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসে ভাতের গ্রাস মুখের সামনে ধরে ভুলিয়েভালিয়ে হরেক ছেলেভোলানো গল্প-ছড়া শুনিয়ে, বিস্তর সাধ্যসাধনায় খাওয়াতে চেষ্টা করতেন। তখন অন্যান্য ছড়ার সঙ্গে তিনি নাকি এই ছড়াটিও শোনাতেন,
“তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো
তার বেলা? তার বেলা?”
আরও পড়ুন: নদীঘাটে কলকাতার ইতিহাস
স্বাভাবিকভাবে অতটুকু বয়সে অন্নদাশঙ্কর রায়ের ওই কথাগুলির জোরালো ইঙ্গিত না বুঝলেও ছড়াটি শুনে ফোকলা দাঁতে মজা পেতাম। আর বারবার শুনতে চাইতাম। স্রেফ মজা লাগত বলেই।
এই দেখো, ‘ধান ভাঙতে শিবের গীত’-এর মতোই ১৫ আগস্ট নিয়ে লেখার আগেই ব্যক্তিগত আত্মকথনে উপক্রমণিকা হয়ে গেল। আমাদের প্রায় দু-আড়াই প্রজন্ম আগের বীরগাথা কেবল সিনেমা, ওটিটি, তথ্যচিত্র, বই, ইতিহাসেই জেনে এসেছি। এও বহুবার আলোচনায় শুনেছি যে, সে সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় মাথারা যদি ভারতকে নির্ভেজাল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ার জন্য নিরপেক্ষভাবে সচেষ্ট থাকতেন, তা হলে কাঁচি দিয়ে রাতারাতি দেশটা টুকরো করা হত না। কিন্তু এই ব্যাখ্যা দিয়ে যদিও তদানীন্তন রাষ্ট্রনায়কদের দায়বদ্ধতাকে স্পষ্ট করে বলা হয় না।

ইতিহাস-অজ্ঞ মন ১৯৪৭-এর ভারত ভাগ বা বঙ্গভঙ্গের প্যাঁচপয়জার বোঝার চেষ্টাই করেনি কখনও। প্রতি বছর স্কুলের ১৫ আগস্টের কুচকাওয়াজে মার্চপাস্ট ও প্যারেড শেষে সমবেতকণ্ঠে ছাত্রীরা গেয়েছি ‘ও আমার দেশের মাটি’ অথবা ‘সারে জাঁহা সে অচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হমারা’। অনুষ্ঠানশেষে স্কুল থেকে দেওয়া স্ন্যাক্সের প্যাকেট খুলে কেক, আপেল, লাড্ডু, খাস্তা কচুরিতে মন বসিয়েছি। মাধ্যমিকে ইতিহাস বই মুখস্থ করে উগরে এসেছি। তবে এত বছর পরেও ধর্মের নামে দ্বিখণ্ডিত দেশে কখনও ভাষা, কখনও ধর্ম আবার কখনও প্রাদেশিকতার লেজুড় জুড়ে অশুদ্ধ ভাবনার উস্কানি দেওয়া হয়। নেপথ্যে থাকে উগ্র ভাবাবেগ।
আজাদি পেলেও ফেলে আসা দেশভাগের ক্ষত এক কালখণ্ডের বুনিয়াদ তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে সাহিত্যে, শিল্পে, চলচ্চিত্রে ৪৭-এর উদ্বাস্তুদের জীবনযন্ত্রণা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বারবার নানাভাবে ফুটে উঠেছে। সেই ছেদ-বিচ্ছেদের দ্বন্দ্ব যা বারবার সত্য হয়ে উঠেছিল, তাকে উপজীব্য করে ভারতীয় সিনেমা, গল্প, সাহিত্য, শিল্প ও হালের ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করতে চেয়েছেন আধুনিক ভারতের কথাসাহিত্যিক ও নানা রূপকারের দল। সর্বভারতীয় সাহিত্যের সূচারু মেধাদের হাতে উঠে এসেছে সে সময়কার দলিল।
অমলেন্দু চক্রবর্তীর ‘অধিরথ সূতপুত্র’ গল্পে সদ্য রিফিউজি হয়ে কলকাতায় আসা সনাতন ঘোষ ওপার বাংলার আবদুলকে লেখেন ‘আরও একটি নতুন সার্টিফিকেট জুটিয়াছে ‘রিফিউজি’। নতুন সার্টিফিকেটে বেশ করুণা ভিক্ষা করা যায়।’
‘ড্রেসিং টেবিল’ গল্পে যেমন সলিল চৌধুরীর মুন্সিয়ানায় ফুটে ওঠে এক শোকবিহ্বল পরিণতির চালচিত্র। রহিমুদ্দিন বাল্যবন্ধু অমল ও তার স্ত্রীকে সদ্যবিভক্ত পাকিস্তান থেকে কলকাতার দিকে রওনা হওয়ার তোড়জোড় করতে দেখে বলে, ‘তোমরাও শেষকালে চললে বৌদি?’ বৌদি তখন অসীম খেদের সঙ্গে বলে, ‘তোমাদের দেশে তো আর আমাদের জায়গা হবে না গো ঠাকুরপো। আজকাল মোছলমানের দেশ পাকিস্তান আর হিন্দুদের দেশ হিন্দুস্থান’। নিলামে সস্তায় কেনা ড্রেসিং টেবিলের দেরাজে পাওয়া চারটে চিঠির পরতে পরতে থাকে সব হারানোর নিঃসীম যন্ত্রণা।
লাহোর থেকে আগত নরকজাত উদ্বাস্তু পরিবেশের হাহাকার মেলে ধরে ঋত্বিক ঘটকের ‘স্ফটিকপাত্র’ গল্পে উত্তমপুরুষের বিবৃতি। ‘এই সেই নতুন জাতের ভিক্ষুকদের দেখতে রিফিউজি ক্যাম্পে চলে গেলাম। জীবনে ভুলতে পারবো না সে পরিবেশ। একটা মাঠের মধ্যে উৎখাত বাস্তুহারা শরণাগতের দল।’

অমলেন্দু চক্রবর্তীর ‘অধিরথ সূতপুত্র’ গল্পে সদ্য রিফিউজি হয়ে কলকাতায় আসা সনাতন ঘোষ ওপার বাংলার আবদুলকে লেখেন ‘আরও একটি নতুন সার্টিফিকেট জুটিয়াছে ‘রিফিউজি’। নতুন সার্টিফিকেটে বেশ করুণা ভিক্ষা করা যায়।’
প্রফুল্ল রায়ের ‘রাজা আসে রাজা যায়’ গল্পে বড়লোক বৈকুণ্ঠ সাহা দেশভাগের পর তার জমিজিরেত দেখভাল করত যে গরিব রাজেক, তাকে দিয়ে যান। রাজেক নিজেকে প্রবোধ দিতে থাকে ‘দ্যাশখান দু’ভাগ হয়, দ্যাশের এক রাজা আসে, এক রাজা যায়। তাতে তর কী রে? তর কী?’
গল্পকার বা চিত্রপরিচালকেরা দেশভাগের পরবর্তী ঘাত-প্রতিঘাতের যন্ত্রণা নিজের মনন ও লেখনীর সংমিশ্রণে, ক্যামেরায় গল্প বলার মুনশিয়ানায় সেই মর্মান্তিক সময়ের নিদারুণ কঠিন বাস্তবকে নিজস্ব উপস্থাপনার রূপকল্পে এক অন্য মাত্রা দিয়েছেন।
উর্দু সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত সাহিত্যিক সাদাত হাসান মান্টো ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও দেশভাগের পর পাকিস্তানে চলে যান। তাঁর বিখ্যাত ‘টোবা টেক সিং’ গল্পে এক উন্মাদ গাছে চড়ে একনাগাড়ে পাকিস্তান ভার্সেস হিন্দুস্তান’ নিয়ে চিৎকার করতে, গার্ডদের তাড়া খেয়ে আরও উঁচু ডালে উঠে আর চিল্লাতে থাকে, ‘আমি পাকিস্তানেও থাকতে চাই না হিন্দুস্তানেও না। আমি এই গাছেই বাকি জীবন থাকবো।’
ভারতীয় সাহিত্যে দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা ও সর্বহারাদের জীবনযন্ত্রণা নিয়ে নানা গল্প লেখা হয়েছে। এই সব গল্পের মর্ম দেখতে পাই, সেই সময় সমাজ কী প্রবল উত্তেজনা, দাঙ্গাফ্যাসাদ, উগ্রতা ও হিংস্রতার মধ্য দিয়ে চলছিল। কত গল্প তো পড়াও হয়ে ওঠেনি। পার্টিশনের উপর লেখা নির্বাচিত গল্পসংগ্রহ ‘ক্রসিং ওভার’-এ রাজিন্দর সিং বেদির ‘লাজবন্তী’, গুলজারের ‘হুজ স্টোরি’, কমলেশ্বরের ‘কিতনে পাকিস্তান’, খুশবন্ত সিং-এর ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’, রাহি মাসুম রাজার ‘আধা গাঁও’, ভীষ্ম সাহানির ‘দ্য ট্রেন হ্যাজ রিচড অমৃতসর’, বাপসি সিদ্ধার ‘দ্য আইসক্যান্ডি ম্যান’, ইত্যাদি যেন সেই সময়কার জীবন্ত দলিল।

চলচ্চিত্রেও দেশ বিভাজন নানাভাবে প্রতিফলিত হয়ে সেলুলয়েডের পর্দায় এসেছে। শ্যাম বেনেগালের ‘মাম্মো’, যশ চোপড়ার ‘বীরজারা’, ‘ধর্মপুত্র’, দীপা মেহেতার ‘আর্থ’, জে.পি. দত্তের ‘রিফিউজি’, চন্দ্রপ্রকাশ দ্বিবেদীর ‘পিঞ্জর’, এম.এস. সথ্যুর ‘গরম হাওয়া’, অনিল শর্মার ‘গদর এক প্রেমকথা’, সাবিনা সুমর ‘খামোশ পানি’ ইত্যাদি ছাড়াও হালেও ওটিটি এবং সিনেমায় বহু ছিন্নমূল পরিবারের গল্প পরিবেশিত হচ্ছে। এদিকে বাংলা চলচ্চিত্রে, ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘নাগরিক’, ‘সুবর্ণরেখা’, নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’। আর এই বিষয় নিয়েই একসময় দূরদর্শনের পর্দায় হাজির হত বিখ্যাত পাঞ্জাবি লেখক ভীষ্ম সহানির তমস কাহিনিটির অপূর্ব চিত্রায়ন।
কোটি কোটি মানুষের ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পালিয়ে আসার ঘটনা নিয়ে দেশভাগের উপর এমনই কত ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক ছড়িয়ে আছে সাহিত্যে। গল্পকার বা চিত্রপরিচালকেরা দেশভাগের পরবর্তী ঘাত-প্রতিঘাতের যন্ত্রণা নিজের মনন ও লেখনীর সংমিশ্রণে, ক্যামেরায় গল্প বলার মুনশিয়ানায় সেই মর্মান্তিক সময়ের নিদারুণ কঠিন বাস্তবকে নিজস্ব উপস্থাপনার রূপকল্পে এক অন্য মাত্রা দিয়েছেন।
স্বাধীনতা দিবস নাকি শপথের দিন। নতুন ভারত গড়ার শপথ। জাতীয় গর্বের চেতনাকে উদ্ধুদ্ধ করে এই দিনটি। ৮০তম বছরে এবারেও লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কুচকাওয়াজ ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ।
দু’শো বছরের বর্বরতাকে পর্যুদস্ত করে সাধের স্বাধীনতা পাওয়ার পর কয়েক দশক অতিক্রান্ত। আমরা উত্তরসূরি হয়েও সেই সময়কার ভয়াবহ অতীতের কথা গল্প উপন্যাসে পড়ে বা সিনেমায় দেখে কেমন স্তম্ভিত হয়ে যাই। অতীতের জাতীয় নেতাদের ভুলের মাশুল কী সাংঘাতিকভাবে চোকাতে হয়েছিল উদ্বাস্তু হয়ে আসা শরণার্থী মানুষজনদের!
স্বাধীনতা দিবস নাকি শপথের দিন। নতুন ভারত গড়ার শপথ। জাতীয় গর্বের চেতনাকে উদ্ধুদ্ধ করে এই দিনটি। ৮০তম বছরে এবারেও লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কুচকাওয়াজ ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। প্রতিটি কর্মস্থলে সবেতন ছুটি উপভোগ করেন সবাই। আগে-পিছে শনি-রবিবার জুটে গেলে তো কথাই নেই। কাছেপিঠেই একটা আয়েসি ট্যুর হয়ে যায়।

সাতসকাল থেকেই পাড়ার ক্লাব ও মোড়ে মোড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি সাজিয়ে ফুল-মালা দিয়ে পতাকা উত্তোলন। তারপর হারমোনিয়াম ও তবলার সঙ্গতে সমবেত কণ্ঠে ‘কারার এই লৌহকপাট’, ‘একই সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন’ বা ‘ও আমার দেশের মাটি’। সাদা ধোপদুরস্ত পোশাকে স্থানীয় নেতা-মন্ত্রীদের কিছু মুখস্থ করা বুলি আউড়িয়ে পতাকা উত্তোলন আর লাড্ডু বিতরণ। মাইক্রোফোনে বেজে চলে ‘অ্যায় মেরে ওতন কে লোগো, জরা আঁখো মে ভর লো পানি’, অথবা ‘আও বাচ্চো তুমহে শুনায় ধরতি কি বলিদান কী’। বাস্তবিক অর্থেই স্বাধীনতা দিবস আসে। এ বছর। আবার পরের বছর। আবার তার পরের বছর।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
2 Responses
Hi Madhuchanda,
The subject of partition of India is close to my heart. Very nice that you have written this book and gone through.. A very good presentation of this event of the sad divisive story of the country. Well written with apt visual impact of picture. . Well fone
As my ancestor was connected with the event and people have looked forward to their roots always , it would surely be an interesting read.
Particularly the messing up of Radcliffe line and pain of millions of families disastrous uprooting and loss of life and properties and uprising again are both extremely sad and fascinating stories indeed.
One can see in the recent movie ‘Main Wapas Aunga’ directed by Imtiaz Ali of the psychological impact of partition of the families on either side of the divided territory.
Maybe there are several such stories of partition in circulation.
The partition museum at Amritsar near Jaliwanabaug was visited by me a couple of years ago . It was a good collection of social, political and geographical photo essays depicting the impact of partition mostly about the Punjab side.
Always wished similar historical museums should be established in Kolkata about the partition stories of the Bengal side .
As far as the Bengal partition is concerned and a common language of either sides , always believe the literary community of both sides like you people can bridge the cultural integrity beyond religion. Really this is happening too and hope it continues to happen.
Best wishes
Ashokda
Ashok Adhikary
+91 9820190336
Mumbai
Beautifully written . Liked it.