(CCTV Surveillance)
দিনে দিনে বিপদ বেড়েই চলেছে। বিপদের কোনও সীমা নেই, শেষও নেই। আর যত বিপদ বেড়ে চলেছে ততই সুরুক্ষিত বলয়ের বাইরে নির্বাসিত হচ্ছি আমরা। বেঁচে থাকার প্রতি পদক্ষেপে যেন জুজু আর একানড়ের বাস, কেউ পা কামড়ে ধরে তো কেউ কান। যে হারে আমাদের চারপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা ভিড় করেছে, তাতে মনে হয় এই বুঝি ঘটল কোনও অঘটন।
চলেছে রাতদিন সাতদিনের নজরদারি। কে এল, কে গেল, কে মুখ তুলে তাকাল, কে কার দিকে ঘুষি বাগিয়ে বা লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে গেল, কোন গাড়ি অন্য গাড়ির পাশ কাটাতে গিয়ে আলতো আদর করে গেল তাকে, বা আনমনা কোন পথচারীকে করে গেল জখম, কে কাজের সময় কাজ না করে মোবাইল নামক গুপীযন্ত্রের পর্দায় চোখ রাখল বা অলস দুপুরে কাজকম্ম শিকেয় তুলে রাজা উজির মেরে ঘুরে বেড়াল— এ সব অপলক দৃষ্টি নিয়ে দেখবার জন্য তাকিয়ে আছে হাজার হাজার ক্যামেরা।
কোথায় নেই তারা? তারা সর্বব্যাপী, ওমনিপ্রেসেন্ট। দৈব দৃষ্টিপথের চেয়েও তারা প্রখর। বিরামহীন নজরদারি! সেই কবে চার্লি চ্যাপলিনের ‘মডার্ন টাইমস’-এর কারখানা মালিককে চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শপ ফ্লোরের ছবি দেখে নির্দেশ দিতে দেখেছিলাম। তিনি হয়তো জানতেন একদিন পৃথিবী এমনই হবে। আমাদের নজরে রাখতে হবে প্রতিনিয়ত। মানুষের চেহারা হাত পা মাথা নাড়া ক্রীড়নক হয়ে ক্যামেরা সে ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়বে, ধরা পড়বে তার গতিবিধি।
গল্পটা কিন্তু খুব বেশি বছরের নয়। আততায়ীর আক্রমণে কেঁপে উঠেছে পাঞ্জাব, আসাম, কাশ্মীর এবং সুদূর দক্ষিণ। আশি-নব্বইয়ের দশক। তারপর একে একে মুম্বই, দিল্লি এমনকি কলকাতাও চলে এল সন্ত্রাসবাদীদের রাডারে। নানা ধরনের ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের সাজসজ্জায় সেজে তারা বেরিয়ে এল অন্ধকার গহবর থেকে, কেউ বা এল সীমানা পেরিয়ে। সন্ত্রাসবাদীদের মুখ নেই, আছে শুধু মুখোশ। সেই মুখ আর মুখোশের দেখা হল আঁধারের পথে, যা আমাদের কাছে অবগুণ্ঠনে ঢাকা।

মুখোশের আড়ালে এই মুখগুলো সাদা চোখের দৃষ্টিতে গোচর হয় না। শুরু হল যান্ত্রিক নয়নের অপলক নজরদারি। সময় আরও এগোল। বিপদআপদগুলো ক্রমশ এগিয়ে এল বাড়ির আরও কাছাকাছি। জীবনের অতিবাহনে, জীবিকার প্রয়োজনে আমরা উঠোন পেরিয়ে যখন হাত বাড়ালাম সীমানার বাইরে, তখন যেন আরও আঁকড়ে ধরল জুজুগুলো। ‘যে অসুখ ছিল চোরাবালি দিয়ে ঢাকা’ সে কবে যেন এক জিনের দৈত্য হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, যাকে ঘিরে ভয় আছে, বরাভয় নয়।
সময়ের সঙ্গে আমাদের চারপাশে তৈরি হয়েছে এক বৈদ্যুতিন বেড়াজাল, যা আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ক্যামেরার চোখ হয়ে উঠেছে আমাদের চোখ। যেখানে আমাদের নজর পৌঁছোয় না, সেখানে পৌঁছে যায় সিসিটিভির দৃষ্টি। ঘটনার চাক্ষুষ বিবরণী, tell tale সে ধরে রাখে ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডারের হার্ড ডিস্কে।
ফেলে আসা কয়েকটা দশকে মোবাইল আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে। ডারউইন সাহেবের তত্ত্বের নিরিখে একে এক বিবর্তন বললে ক্ষতি নেই। পৃথিবীটা যেন ছোট হতে হতে আজ বোকা বাক্সের চেয়েও ছোট মুঠোফোনে বন্দি।
মনে পড়ে ধৃতরাষ্ট্রের সারথি গবলগণপুত্র সঞ্জয়কে? তাঁরই দিব্যচক্ষু একদিন দৃষ্টিহীন ধৃতরাষ্ট্রকে দেখিয়েছিল কুরুপাণ্ডব যুদ্ধের বিবরণ। সে ছিল দ্বাপর শেষে কলির শুরু, আর আজ ঘোর কলি! সেই ঘোর কলিতেই লক্ষ কোটি ক্যামেরা তাকিয়ে জরিপ করছে আমাদের নিত্য যাতায়াত। রণে, বনে, জঙ্গলে দেবতার হাত নয়, সিসিটিভিই ভরসা।
ফেলে আসা কয়েকটা দশকে মোবাইল আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে। ডারউইন সাহেবের তত্ত্বের নিরিখে একে এক বিবর্তন বললে ক্ষতি নেই। পৃথিবীটা যেন ছোট হতে হতে আজ বোকা বাক্সের চেয়েও ছোট মুঠোফোনে বন্দি। আর সেই মুঠোফোনের পর্দায় চোখ আটকে থাকার কারণে আমাদের চারিদিকে কী ঘটে চলেছে, সেই সম্পর্কে আমরা অনবধান।

মেট্রো রেলের কামরায় একবার তাকিয়ে দেখুন, কাল সীমানার গণ্ডি ঘুচানো ওই একরত্তি যন্ত্রের কী দুর্নিবার আকর্ষণ! সুতরাং সেই অর্থে ‘বর্তমান সময়ে’ কেউ নেই আমরা। আমার পাশে দাঁড়ানো মানুষের চেহারা, বেশভূষা খেয়াল করছি না; পাশাপাশি বসা দু’জন পরিচিত মানুষ কেমন যেন আজ পরস্পরের কাছে অপরিচিত— ‘তোমার আমার কারও মুখে কথা নেই’, শুধু আছে মৃদু আঙুলের চাপে মুঠোফোনের পর্দায় বদলে যাওয়া ছবিরা। এ এক অদ্ভুত উদাসীনতা।
ধরা যাক, মোড়ের মাথায় এক চায়ের দোকানের ঠেক। খদ্দের আছেন বেশ কয়েকজন। সামনের রাস্তায় একটা গাড়ি কোন পথচারীকে ধাক্কা দিয়ে এক নিমেষে উধাও হয়ে যায়। উপস্থিত মানুষদের মধ্যে কে সেই জন যিনি সব্বনেশে গাড়ির নম্বর দেখেছেন সেই মুহূর্তে? কেউই দেখেননি, অথবা না দেখার সম্ভবনাই বেশি। কারণ সবাই ছিলেন তাদের আপন জগতে— মুঠোফোনের বদান্যতায়। সুতরাং প্রত্যক্ষদর্শী এখন মানুষ নয়, চারপাশে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরারা।
আসলে প্রযুক্তি দুজনেরই মন রেখে চলে। ক্যামেরার চোখ যা দেখে তাকে অসত্য বা অর্ধসত্য করে তোলার কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন হয় ওই প্রযুক্তির হাত ধরেই। আর ঠিক সেই কারণেই আইনের রক্ষকদের কাছে পৌঁছতে পারে না প্রয়োজনীয় সিসিটিভি ফুটেজ।
কিন্তু সিসিটিভি কি সত্যিই ভরসা? এত নজরদারির মধ্যেও কি আমরা সুরক্ষিত? নাকি এও এক মনগড়া ভাবনা, এক ধরনের বিপন্নতা থেকে পালানোর পথ খোঁজা? রাতের আঁধারে যে বিপদ অপেক্ষা করে শত সহস্র অভয়া, নির্ভয়া, সুজেট জর্ডনের মতো মেয়েদের জন্য, তার তো শেষ দেখতে পাওয়া যায় না। সেই অপরাধীরা তো থেকেই যায় অধরা বা সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে। তারা দিব্যি বেঁচে বর্তে থাকে এই সমাজের মধ্যেই, চলে ফিরে বেড়ায় ইতি উতি।
আসলে প্রযুক্তি দুজনেরই মন রেখে চলে। ক্যামেরার চোখ যা দেখে তাকে অসত্য বা অর্ধসত্য করে তোলার কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন হয় ওই প্রযুক্তির হাত ধরেই। আর ঠিক সেই কারণেই আইনের রক্ষকদের কাছে পৌঁছতে পারে না প্রয়োজনীয় সিসিটিভি ফুটেজ। ফলত কোথায় যেন হারিয়ে যায় ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা মেয়েটার আশে পাশের চেনামুখগুলো।

প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে যে প্রশ্ন বিতর্ক উসকে দিয়েছে, তা হ’ল নিরাপত্তা বনাম গোপনীয়তার প্রশ্ন। স্বেচ্ছায় গোপনীয়তার পরিধি শিথিল করে সমাজমাধ্যমের পাতায় আমাদের পরিচিতি এখন খোলা হাওয়ার মতো পাক খেয়ে ফেরে। তার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মেলবন্ধনে বাজার এখন খুব সহজেই জানতে পারে আমার পছন্দ, আমার মনের দিশা। ক্রেতা হিসেবে আমাকে একের পর এক আকর্ষণ দেখায় অনলাইনের ফেরিওয়ালা।
কিন্তু রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত নজরদারি? মুহূর্তে যখন ব্যক্তিজীবনের গোপনীয়তা উন্মুক্ত হয় রাষ্ট্রের কাছে, তখন তার সবটুকু কি আমার হিতার্থে? ক্যামেরার চোখ আমার মুখাবয়ব ধারণ করে, চলে এক জটিল অ্যালগরিদমের কাটাছেঁড়া, ভাষা, ধর্ম, জাতি, বর্ণ, পেশা, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে, তখনই তা আসলে হয়ে ওঠে এক পরোক্ষ সন্ত্রাসের অঙ্গ।
শেষ করি, সাম্প্রতিক ইরান ইসরায়েল সামরিক অভিযানের কথা দিয়ে। জানা গেছে, একটা দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের রাজধানী তেহরানের রাজপথ, গলিপথের নজরদারি ক্যামেরার উপরে নজর রেখেছে ইসরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা।
নীতিগতভাবে সব নজরদারিই কি আসলে একতরফা?
আসুন কল্পনা করা যাক, এমন একটি কারাগার যেখানে রক্ষীরা বন্দীদের দেখতে পেলেও, বন্দীদের কাছে রক্ষীরা অদৃশ্য। কেন্দ্রে একটি ওয়াচ টাওয়ার। তাকে ঘিরে আছে কারাগারের অসংখ্য কুঠুরি। ‘প্যানোপটিকন’ স্থাপত্য নকশা ঘিরে একদিন প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। বলা হয়, কারাগারের এই নকশা, বন্দীদের কারাগার জীবনের সামান্যতম গোপনীয়তাটুকুও আব্রুহীন করে, আসলে এক নৈতিক দ্বিধা সৃষ্টি করে।

অমানবিক, নিপীড়ক এবং সম্ভাব্য মানসিক ক্ষতির কারণ হওয়ার জন্য সমালোচিত হয়েছিল ‘প্যানোপটিকন’। আধুনিক ক্যামেরার বৈদ্যুতিন নজরদারি কৌশলের সঙ্গে ‘প্যানোপটিকন’-এর তুলনা করা সঙ্গত কী না জানি না, কিন্তু নিরাপত্তার নামে যে নজরদারি, এবং তাকে ঘিরে যে নেতিবাচকতা, তা বোধহয় এই দুইয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।
শেষ করি, সাম্প্রতিক ইরান ইসরায়েল সামরিক অভিযানের কথা দিয়ে। জানা গেছে, একটা দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের রাজধানী তেহরানের রাজপথ, গলিপথের নজরদারি ক্যামেরার উপরে নজর রেখেছে ইসরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা। প্রতি মুহূর্তে তারা সুলুকসন্ধান করেছে সে দেশের নেতৃত্বের। সিসিটিভি থেকে পাওয়া অসংখ্য ডেটা আর এক অ্যালগরিদম বাতলে দিয়েছে আক্রমণের অভিমুখ আর গতিপথ।
কিন্তু এখানেও সেই নীতির প্রশ্ন; কোনটা ভাল কোনটা খারাপ সেই বিতর্কের ‘শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে?’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত