(Director Raja Sen)
মাতৃবিয়োগের ক্ষতে প্রলেপ পড়ার আগেই আবার বিনা মেঘে বজ্রাঘাত! আমাদের সকলের প্রিয় রাজাদা মানে চিত্রনির্মাতা রাজা সেন চলে গেলেন মাত্র ৭১ বছর বয়সে। শুনলাম বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু চলে যে যাবেন, তা ভাবিনি। রাজাদার কথা ঠিক কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না! একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করা, অনেক জায়গায় একসঙ্গে যাওয়া, নিয়মিত ফোনে কথা বলা, এই মুহূর্তে সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: স্মৃতির আকাশ থেকে (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯), (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮), (২৯), (৩০), (৩১), (৩২), (৩৩), (৩৪), (৩৫), (৩৬), (৩৭), (৩৮), (৩৯), (৪০), (৪১), (৪২), (৪৩), (৪৪), (৪৫)
তপন সিংহ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে নন্দনে আমরা একটা চলচ্চিত্র উৎসব করেছিলাম। সেখানে তপনদার পরিচালিত ছোটদের ছবিগুলো দেখানো হয়েছিল। অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সেদিন রাজাদাও উপস্থিত ছিলেন। তপন সিংহ ফাউন্ডেশন গঠন করেছি শুনে একদিন ওঁর শহীদনগরের বাড়িতে যেতে বললেন, যাওয়ার পরে ভিতরের ঘর থেকে একটা বড় ফাইল নিয়ে এলেন।

এ কথা সে কথার পরে যখন উঠে আসছি, তখন ফাইলটা আমার হাতে তুলে দিলেন। ফাইলের মধ্যে কী রয়েছে জানতে চাইলে বলেছিলেন, ‘ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তপনদাকে পুরস্কারের সঙ্গে দেওয়া শংসাপত্রগুলো এতে রয়েছে। আমি যখন তপনদাকে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলাম, সেই সময় তপনদাই আমাকে এগুলো দিয়েছিলেন, তুমি তো তপনদার স্মৃতি ধরে রাখতে ফাউন্ডেশন তৈরি করেছ, তাই এগুলো তোমার কাছেই রেখে দাও। কাজে লাগতে পারে।’

ওই জিনিসগুলো উনি ওঁর নিজের কাছেই রাখতে পারতেন, এবং অন্য কোনও সময় সেগুলো ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু সেটা না করে আমার হাতে তুলে দিয়ে রাজাদা নিজের উদার মনের পরিচয় দিয়েছিলেন। তপনদার মৃত্যুর পরে ওঁর পারিবারিক স্মরণ অনুষ্ঠানে রাজাদাকে নিমন্ত্রণ করার ভার আমার ওপরই দিয়েছিলেন তপনদার পুত্র রানাদা। রাজাদা এসেছিলেন, বক্তব্যও রেখেছিলেন।
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কমিটির সদস্য হওয়ার সুবাদে চলচ্চিত্র উৎসব চলাকালীন রাজাদার সঙ্গে প্রায়ই দেখা হত। সুচিত্রা মিত্র চলে যাওয়ার পরে ঠিক করেছিলাম জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির বিচিত্রা ভবনে সুচিত্রাদির স্মরণে একটা অনুষ্ঠান করব। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপচার্য প্রয়াত ডক্টর করুণাসিন্ধু দাসের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করেছিলাম, অনুষ্ঠানের একদম শেষ পর্যায়ে রাজাদা নির্মিত, ‘সুচিত্রা মিত্র’ তথ্যচিত্রটি দেখাব।

কিন্তু সেই মুহূর্তে তথ্যচিত্রটি পাই কোথায়? এখনকার মতো তখন ইউটিউবে সেটি সহজলভ্য ছিল না। আবার রাজাদার শরণাপন্ন হলাম। তথ্যচিত্রটির একটা কপি সিডিতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘ছবির অবস্থা খুব ভাল আছে, কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য অনেক অবাঞ্ছিত শব্দ বিরক্ত করতে পারে দর্শকদের।’
কথা ছিল ছবিটি শুরু করার আগে রাজাদা কিছু বলবেন, কিন্তু সেই সময় আর ওঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। চলচ্চিত্র উৎসব কমিটির তৎকালীন চেয়ারপার্সন গৌতম ঘোষও রাজাদাকে খুঁজতে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে এসে জানালেন, ‘রাজা নন্দন ১-এ বসে ছবি দেখছে।
শান্তিনিকেতনের বর্ষণমুখরিত প্রকৃতি আর সুচিত্রা মিত্রের গানের মধ্যে এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন রাজাদা এই তথ্যচিত্রে, যার জন্য যন্ত্রের যন্ত্রণা সেদিন জোড়াসাঁকোর দর্শকদের কোনও পীড়া দেয়নি। বরং মুগ্ধ করে রেখেছিল! তপনদাকে নিয়ে যে তথ্যচিত্র উনি তৈরি করেছিলেন, সেটাও দেখেছি এবং এখনও মাঝে মধ্যেই দেখি।

তপনদা যখন, ‘হুইল চেয়ার’ ছবির কাজ করছিলেন, মনে হয় সেই সময়ই রাজাদা তথ্যচিত্রটির জন্য শুটিং করেছিলেন। ২০২৪ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শেষ দিনে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী নন্দন ৩ প্রেক্ষাগৃহে এই তথ্যচিত্রটি দেখানো হয়।

কথা ছিল ছবিটি শুরু করার আগে রাজাদা কিছু বলবেন, কিন্তু সেই সময় আর ওঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। চলচ্চিত্র উৎসব কমিটির তৎকালীন চেয়ারপার্সন গৌতম ঘোষও রাজাদাকে খুঁজতে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে এসে জানালেন, ‘রাজা নন্দন ১-এ বসে ছবি দেখছে। ও বলল তোমাকে কিছু বলতে তথ্যচিত্র সম্পর্কে, আর তারপরে ছবিটা দেখাতে।’ সেইমতো আমরা কাজ করলাম। সমরেশ বসু বিষয়ক ডকুমেন্টারিটি এখনও আমার দেখার সুযোগ হয়নি।

অনেক অনুষ্ঠানে বহুবার মাতৃবিয়োগের ক্ষতে প্রলেপ পড়ার আগেই আবার বিনা মেঘে বজ্রাঘাত! আমাদের সকলের প্রিয় রাজাদা মানে চিত্রনির্মাতা রাজা সেন চলে গেলেন মাত্র ৭১ বছর বয়সে। শুনলাম বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু চলে যে যাবেন, তা ভাবিনি। রাজাদার কথা ঠিক কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না! একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করা, অনেক জায়গায় একসঙ্গে যাওয়া, নিয়মিত ফোনে কথা বলা, এই মুহূর্তে সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

রাজাদা আর আমি একসঙ্গে গিয়েছি আর তখন লক্ষ করেছি, উনি খুব খেতে ভালবাসতেন অর্থাৎ খাদ্যরসিক যাকে বলে একদম তাই। কোথাও যাওয়ার পথে রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়েও খাওয়াদাওয়া সারতেন। আমার জন্মদিনে অনেকবার এসেছেন, খুব মনোযোগ দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন কোনটা কী খাবার বা কোনটি বেশি সুস্বাদু। তপনদার জীবনের শেষ চিত্রনাট্য লিখেছিলেন ‘তিনমূর্তি’ নাম দিয়ে। ইচ্ছে ছিল নিজেই ছবিটা করবেন। ছবির জন্য মিউজিক রেকর্ডিং পর্যন্ত সেরে রেখেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শারীরিক কারণে আর ছবির কাজে হাত দিতে পারেননি।
বছর দু’য়েক আগে বালি সিনে গিল্ড আয়োজিত তপন সিংহ এবং অরুন্ধতী দেবীর শতবর্ষ স্মরণের উৎসবেও গেছেন আমার সঙ্গে। মনে পড়ে, সেদিন কলকাতায় আরজি কর সংক্রান্ত আন্দোলনের ফলে প্রচন্ড যানজট, আর অন্যদিকে বৃষ্টির জমা জলে একেবারে নাজেহাল অবস্থা।
এরপর একদিন রাজাদা আগ্রহ প্রকাশ করেন ছবিটা করবেন বলে। প্রযোজক স্থির হয়েই ছিল। তপনদার দীর্ঘদিনের পরিচিত আর.এ.জালানের সহযোগিতায় রাজাদা সফলভাবে ছবির কাজটা শেষ করেছিলেন। আমি তখন বাংলা স্টেটসম্যান কাগজের সঙ্গে যুক্ত। নন্দনে ছবির মুহরতে উপস্থিত থেকে ছবিটির রিভিউ করেছিলাম। পরে শুনেছিলাম, অনেকের নাকি ছবিটা ভাল লাগেনি, কিন্তু আমার খারাপ লাগেনি ছবিটা দেখে। ওঁর আরও একটি ছবি আমার ভাল লেগেছিল, সেটা হল ‘আত্মীয় স্বজন’।
অতীতের বাংলা ছবির বুকলেট সংগ্রহ করার বাতিক রয়েছে আমার, বিশেষ করে রবীন্দ্রকাহিনি ভিত্তিক ছবির। সেই কারণে রাজাদাকে ধরেছিলাম রবীন্দ্ররচনা অবলম্বনে ওঁর পরিচালিত ছবি, ‘ল্যাবরেটরি’-র বুকলেটটা জোগাড় করে দেওয়ার জন্য। ওঁর নিজের কাছে ছিল না, তাও খোঁজখবর করে জোগাড় করে দিয়েছিলেন। যোগেন চৌধুরী সেন্টার অব আর্টসের উপেন্দ্রকিশোর সভাঘরে একাধিকবার অনুষ্ঠানে এসেছেন। তপন সিংহের জন্মশতবর্ষে আমরা ফাউন্ডেশন থেকে একটা দিনপঞ্জী প্রকাশ করেছিলাম। ওঁকে সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে ভীষণভাবে আগ্রহ প্রকাশ করলেন এবং অনুষ্ঠানেও এলেন। রাজাদার মনে তপনদার প্রতি বরাবরই একটা শ্রদ্ধা ছিল। তাই তপনদা বিষয়ক যে কোনও অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বললেই উনি না করতেন না কখনও।

বছর দু’য়েক আগে বালি সিনে গিল্ড আয়োজিত তপন সিংহ এবং অরুন্ধতী দেবীর শতবর্ষ স্মরণের উৎসবেও গেছেন আমার সঙ্গে। মনে পড়ে, সেদিন কলকাতায় আরজি কর সংক্রান্ত আন্দোলনের ফলে প্রচন্ড যানজট, আর অন্যদিকে বৃষ্টির জমা জলে একেবারে নাজেহাল অবস্থা। মনে সংশয় ছিল, আদৌ সময় মতো আমরা বালিতে পৌঁছতে পারব কী না! তবুও রাজাদা হাল ছাড়লেন না।
বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে ঘুরে আমরা বালি রবীন্দ্রভবনের ‘রক্তকরবী’ মঞ্চে পৌঁছলাম। ততক্ষণে ছবি দেখানো শেষ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু রাজাদার কথা শোনার জন্য অনেকেই বসেছিলেন! অনুষ্ঠানের একদম শেষ পর্যায়ে রাজাদা বক্তব্য রেখেছিলেন। কয়েক মাস আগে চারুবাসনার চিত্তপ্রসাদ আর্ট গ্যালারিতে আয়োজিত একটা গ্ৰুপ প্রদর্শনী উদ্বোধন করতে এলেন হাসি মুখে, অনেকক্ষণ ছিলেনও। আজ সেইসব দিনের স্মৃতি যেন চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠছে! নিয়তি না সময়, কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ জানি না, কিন্তু যে কোনও একটির কারণেই হঠাৎ রাজাদার নামের আগে প্রয়াত শব্দটা যুক্ত হল।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত