(Museum of Broken Relationships)
শীত যত গাঢ় হয়, সূর্যাস্তের রঙও তত বেশি ঘন হয়ে আসে। মধ্য ইউরোপের শহরগুলো সম্বন্ধে কানাঘুঁষোয় এমনটাই শোনা। বিষয়টির হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেব শহরে সন্ধের আকাশ দেখে। কোনও এক অদৃশ্য তুলিতে কেউ যেন আকাশের গায়ে হালকা গোলাপি থেকে গাঢ় লাল, বিভিন্ন শেডের আবির ছড়িয়ে দিয়ে গেল একের পর এক।
পত্রহীন, সরু সরু ডালপালা মেলা নিঃস্ব গাছেদের মধ্য দিয়ে দিগন্তে কমলা রঙের ঘোর লেগে রইল অনেকক্ষণ, ঘোর লেগে রইল দর্শকদের চোখেও। অবশেষে, অন্ধকারের ঘটখানি উপুড় হতে হুঁশ ফিরল মোহগ্রস্তদের। একে একে যে যার সান্ধ্য মজলিশের ঠিকানায় পা বাড়াল। কারও ঠিকানা পূর্বনির্ধারিত, কেউ কেউ আবার খুঁজে নেবে পথচলতি। শহরের বুকে নীল ট্রামেরা সারাদিন কাটাকুটি করেছে নিঃশব্দে; শীতের সন্ধেয় তাদের চলাফেরা আরও সতর্ক, একেবারে পা টিপে টিপে।
খোঁজ পেয়েছি এক জাদুঘরের। জাদুঘর মানেই— সেই তো রানি/ সেই তো রাজা/ সেই তো একই কচকচি জ্ঞান/ সেই তো একই তথ্যপুরাণ/ অহর্নিশে/ দেখব না আর/ ওসব ক্লিশে— এমনটা মনে করে অনেকেই নাক সিঁটকোন বটে, কিন্তু এ জাদুঘর সে জাদুঘর নয়। তার নামও আজব। বিশুদ্ধ বাংলায় বলতে হলে ‘মিউজিয়াম অফ ব্রোকেন রিলেশনশিপস’— বিচ্ছেদের সালতামামি! যে সব প্রেমের কিংবা অ-প্রেমের সম্পর্কগুলো আর টিকে নেই, সেই সমস্ত একদা সম্পর্কের অস্তিত্বের উষ্ণতা, তাদের ভালমন্দ স্মৃতিগুলো জিইয়ে রাখার জন্য আস্ত একটা জাদুঘর। কনসেপ্টটা যেমন চমকপ্রদ, তেমন তার শুরুর ইতিহাসটাও কম অদ্ভুত নয়।
দুই প্রেমিক প্রেমিকা— ওলিংকা আর ড্রেজেন— দীর্ঘ চার বছরের সম্পর্কে চিড় ধরলে যে যার মতো আলাদা হয়ে গিয়েছিল। মুশকিল হল তাদের প্রেমের সাক্ষর বহন করা জিনিসগুলো নিয়ে। মজা করে ছেলেটি তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে বললে, “এসব দিয়ে একটা সংগ্রহশালা খুললে কেমন হয়?” তখনকার মতো কথাটা ওখানে চাপা পড়ে গেল ঠিকই, কিন্তু বেশ কয়েক বছর পর ছেলেটি ফিরে এল সেই পুরনো প্রস্তাব নিয়ে। এবার সে মনস্থির করেই এসেছে, শুধু অপর পক্ষের সম্মতি পাওয়ার অপেক্ষা। সেই থেকেই শুরু।

প্রথমে কোনও স্থায়ী আস্তানা ছিল না এই সংগ্রহের। একটি স্থানীয় প্রদর্শনীতে ফিতে কাটার পরে এই সংগ্রহ দেখানোর উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের মালিকরা বেরিয়ে পড়ল দুনিয়া ঘুরে ঘুরে আরও অনেক ভেঙে যাওয়া প্রেমের খোঁজে, প্রাক্তন প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা তাদের বন্ধুদের কাছে। প্রদর্শনীর সংখ্যা যত বাড়ল, সংগ্রহের আকার বাড়ল তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সংগ্রহ দেখতে আসা মানুষেরা স্বেচ্ছায় তাদের জীবনের প্রেম ও বিচ্ছেদের অংশীদার হয়ে থাকা স্মৃতিচিহ্ন একে একে তুলে দিল ওলিংকা আর ড্রেজেনের হাতে।
ইতিমধ্যে তারা ক্রোয়েশিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রকের কাছে একটা আবেদন জানিয়েছে, যাতে পাকাপাকিভাবে এই সংগ্রহকে একটা মিউজিয়ামের রূপ দেওয়া সম্ভব হয়। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শনী করার পর যখন তারা জাগরেবে ফিরে এল, তখনও কোনও সন্তোষজনক উত্তর আসেনি। আর দেরি করতে চাইছিল না তারা। নিজেরাই শহরের মধ্যে একটা জায়গা কিনে সেখানে এই প্রাইভেট মিউজিয়ামের গোড়াপত্তন করে ফেলল।
সংগ্রহে থাকা জিনিসগুলো আকারে ছোট বা বড় যাই হোক, প্রত্যেকটির সঙ্গে ছিল তাদের এককালীন মালিকের একটি ছোট্ট বয়ান, যেখানে ওই দ্রব্যের সঙ্গে জড়িত স্মৃতির কথা স্বীকৃত। সে হতে পারে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পাঠানো প্রেমিকের শেষ পোস্টকার্ড বা চিঠি, অথবা পঞ্চাশ বছর আগে টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করা স্বামীর কণ্ঠস্বর, যা তার স্ত্রী অতি যত্নে আগলে রেখেছিলেন।
সচরাচর কোনও মিউজিয়াম থেকে বেরোলেই আমাদের মন আর মগজ তথ্যভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে। কিন্তু এই জাদুঘরের জাদু এমনই যে, একবার এই স্পেসে ঢুকে পড়লে আর বেরোতে ইচ্ছে করে না। নানা ধরনের মানুষ ও তাদের প্রেমজীবনের অমূল্য, হয়তো বা সবথেকে মূল্যবান স্মৃতির গায়ে আলগা হাত বোলাতে বোলাতে যখন আমাদের সেই সফর শেষ হল, তখনও আমরা ওই আমেজ কাটিয়ে উঠতে পারিনি। বিচ্ছেদের জাদুঘরে কাটানো সেই দু’টি ঘণ্টার অভিজ্ঞতা আর অভিঘাত সত্যিই অতুলনীয় এবং অকল্পনীয় ছিল।
কী এমন আছে জনগণের স্মারক দিয়ে সাজানো এই সংগ্রহশালায়? সংগ্রহে থাকা জিনিসগুলো আকারে ছোট বা বড় যাই হোক, প্রত্যেকটির সঙ্গে ছিল তাদের এককালীন মালিকের একটি ছোট্ট বয়ান, যেখানে ওই দ্রব্যের সঙ্গে জড়িত স্মৃতির কথা স্বীকৃত। সে হতে পারে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পাঠানো প্রেমিকের শেষ পোস্টকার্ড বা চিঠি, অথবা পঞ্চাশ বছর আগে টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করা স্বামীর কণ্ঠস্বর, যা তার স্ত্রী অতি যত্নে আগলে রেখেছিলেন।

টেপ চালালে যদি কোনওভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কোনওভাবে সেই অমূল্য অন্তিম স্মৃতির টুকরো হারিয়ে যায়! সেই দুর্ভাবনায় পুত্রের নাগালের বাইরে খুব সাবধানে রেখে দিয়েছিলেন সেই টেপ। মায়ের এই অদ্ভুত আত্মত্যাগের একটা পরিণতি, একটা ‘ক্লোজার’-এর প্রয়োজন ছিল, স্মৃতির মুঠো আলগা করার সময়ও হয়ে এসেছিল, এই ভেবে তার ছেলে রেকর্ডার সমেত অডিও টেপটি স্বেচ্ছায় এখানে দিয়ে দেন।
মিউজিয়ামে রয়েছে একটি লম্বা আয়না। জমা করেছেন একজন ব্যক্তি, যার স্ত্রীর খুব পেয়ারের আসবাব ছিল এটি। প্রত্যেকদিন সেই আয়নার সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে সাজগোজ করতে ভালবাসতেন সেই নারী। হঠাৎই একদিন অন্য প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যান তিনি, রেখে যান তাঁর শখের মুকুর। যে আয়নায় প্রতিদিন এক বিশেষ কারোর ছায়া পড়ত, হুট করে একদিন সে জায়গায় জমা হল শূন্যতা। বুকে হাহাকার নিয়ে স্বামীর পক্ষে ওই আয়নার সামনে দাঁড়ানো আর সম্ভব হয়নি।
বিচ্ছেদের পরে কী পড়ে থাকে? শুধুই কি তিক্ততা আর আঘাতের চিহ্ন? ব্রেক-আপ পরবর্তী জীবন কি আবার আগের মতো সুন্দর ও স্বাভাবিক হতে পারে না? স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যদি আমরা সমস্ত কদর্যতা ছেঁকে নিয়ে সম্পর্কের দ্বিধাহীন অনিন্দ্যসুন্দর মুহূর্তগুলোর উপহার মাথা পেতে নিতে পারি!
একটি আলাদা বিভাগ রয়েছে শুধুই খেলনা পুতুলদের নিয়ে, যার শিরোনাম হল— ‘যদি পুতুলেরা কথা বলতে পারত’— আমাদের দূরাগত শৈশবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকা সেইসব খেলনাপুতুল, যারা এককালে আমাদের হাসি, কান্না, রাগ কিংবা মনখারাপের রাতের সঙ্গী ছিল। বড় হয়ে আমরা যে সমস্ত আবেগদের আর আলাদা করে চিনতে পারি না, সংক্ষেপে শুধু বলি ‘নস্টালজিয়া’, পুতুলেরা কিন্তু মনে রাখে তাদের প্রিয় বন্ধুর ভালবাসা, বিচ্ছেদ কিংবা গল্প শুরুর গল্প।
জীবনের বিভিন্ন বিমূর্ত মুহূর্তের মতোই বৈচিত্র্যে ঠাসা এই জাদুঘর। যে মান্যতাটুকু বিচ্ছেদের প্রাপ্র্য, তাকেই উদযাপন করার অঙ্গীকার এই সংগ্রহের প্রতিটি দ্রব্যে ও তাদের সঙ্গে জড়িত কাহিনিতে। যেমন, সাজানো আছে একটি প্রায় আনকোরা বিয়ের পোশাক— নিয়তির পরিহাসে যে বিয়ে আদৌ কোনওদিন হয়নি, তার আগেই হবু বরের মৃত্যু ঘনিয়ে আসে। দুর্ভাগা মেয়েটির কাছে সেই বহু আকাঙ্খিত অথচ লুপ্ত জীবনের একমাত্র প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে তার বিয়ের পোশাকটি। তার নিজের কথায়— “The Wedding dress is the best representation of the day I want to remember him by.”

যেমন, এক মহিলা এই জাদুঘরের অতীত, বর্তমান ও সমস্ত ভবিষ্যৎ দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন তার জীবনের সবচেয়ে দামি উপহারটি। A Spectrum of a star; একটি নক্ষত্রের বর্ণালী। এক্ষেত্রে এই জুটির দুজনেই ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। মেয়েটির ছাব্বিশ বছরের জন্মদিনে তার প্রেমিক তাকে উপহার দিয়েছিলেন তারই সমবয়সী একটি নক্ষত্রের বর্ণালী, পৃথিবী থেকে যার দূরত্ব ছাব্বিশ আলোকবর্ষ। প্রেমিকের আবেগের রেশ ধরে বললে— “তুমি যখন সদ্যোজাত, ঠিক তখনই ওই নির্দিষ্ট তারার প্রথম আলোকরেখাটি তার যাত্রা শুরু করেছিল। আর বিগত ছাব্বিশ বছর ধরে অগুনতি গ্রহ, তারকা, নীহারিকা আর ছায়াপথ পেরিয়ে আজ সে পৃথিবীতে এসেছে, তোমার সঙ্গে দেখা হবে বলে। Here you meet your starlight and I meet you!”
বিচ্ছেদের পরে কী পড়ে থাকে? শুধুই কি তিক্ততা আর আঘাতের চিহ্ন? ব্রেক-আপ পরবর্তী জীবন কি আবার আগের মতো সুন্দর ও স্বাভাবিক হতে পারে না? স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যদি আমরা সমস্ত কদর্যতা ছেঁকে নিয়ে সম্পর্কের দ্বিধাহীন অনিন্দ্যসুন্দর মুহূর্তগুলোর উপহার মাথা পেতে নিতে পারি! কিংবা, ভাগ করে নিতে পারি অন্যদের সঙ্গে! নিজের চোখে চোখ রেখে বলতে পারি— লেট্ ইট গো! এও কি একপ্রকার ক্যাথারসিস নয়?
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত