(Raja Sen Obituary)
আমার কৈশোরে বাংলা টেলিভিশনে রাজায় রাজায় যুদ্ধ চলত। এক রাজা সিনেমা জগতের রাজা মিত্র, অন্য দুই রাজা হলেন টেলিভিশনের রাজা দাশগুপ্ত (কালবেলা, পদিপিসির বর্মি বাক্স, সোঁদা মাটি নোনা জল যাঁর পরিচালনা) এবং রাজা সেন (আদর্শ হিন্দু হোটেল, সুবর্ণলতা, আরোগ্য নিকেতন যাঁর পরিচালনা)। সৌভাগ্যক্রমে তিন রাজার সঙ্গেই আমার সুসম্পর্ক ছিল। তার প্রধান কারণ, আমি তিন রাজার সঙ্গেই কাজ করেছি।
রাজা মিত্রের ‘একটি জীবন’ ছবির পোস্ট প্রোডাকশন দিয়ে আমার চলচ্চিত্র জীবন শুরু, পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গে ‘বেহুলা’ এবং অন্যান্য তথ্যচিত্রের কাজ করেছি। রাজা দাশগুপ্তর সঙ্গে আমার প্রথম কাজ বাণী বসুর ‘একুশে পা’। তারপর থেকে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সুসম্পর্ক আজও বিদ্যমান। আমাদের দেখা হলে আজও রাজাদা সেখানে কিছু না কিছু খুনসুটি করবেনই। তাঁর সঙ্গে আউটডোর শুটিং মানেই এক অন্য অভিজ্ঞতা।
তবে আজ কলম ধরেছি রাজা সেনের উদ্দেশ্যে। সময়টা ১৯৯৩ সাল। একদিন আমার বন্ধু শম্পা ঘোষ, গৌতম ঘোষের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’-র নায়িকা হওয়ার সুবাদে তখন মোটামুটি সবাই তাঁকে চেনে, আমাকে ডেকে বলল যে একটা কাজ আছে। সেই কাজে আমায় তাঁর সঙ্গে থাকতে হবে, কোনও আপত্তি করা চলবে না।
পরের দিন বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে ওঁর বাড়িতে দেখা করলাম। ওই দিন দুপুরে বীনাদির সঙ্গে ওঁর দেখা করার কথা। বীনাদি মানে বীনা বটব্যাল, অভিনেতা প্রদীপ কুমারের কন্যা। মুম্বাইয়ের বাসিন্দা হলেও, ঢাকুরিয়া ব্রিজ থেকে নেমে গড়িয়াহাটের দিকে যেতেই প্রথম ডানদিকের গলিতে বীনাদির একটা বাড়ি ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে আমি আর শম্পা গিয়ে হাজির হলাম। রাস্তায় যেতে যেতে শম্পা ঠিক কী করতে চলেছে, সে সম্পর্কে আমায় একটা ব্রিফ দিয়েছিল। বীনাদির সঙ্গে কথাবার্তার শুরুতেই আমার পরিচয়টা এমনভাবে করে দিল যেন, আমি শুধু ওঁর বন্ধু নই, এই ছবির প্রোডাকশনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের রাত্রি’ অবলম্বনে দিল্লি দূরদর্শনের জন্য হিন্দিতে ছবি হবে ‘অন্তিম রাত্রি’। ছবির পরিচালক রাজা সেন, চিত্রনাট্য রশিদ ইকবালের, ডিওপি বিবেক ব্যানার্জী, আর্ট ডিরেকশনে অশোক বসু এবং সাউন্ড ডিজাইনার বিশ্বজিৎ সেনগুপ্ত। বিশুদা আমার চিত্রবাণীর সিনিয়র। সেই টিমে এবার আমি যুক্ত হলাম। সেখানে আমার দায়িত্ব কোনও একটা নির্দিষ্ট বিভাগে সীমাবদ্ধ নয়, সর্বঘটে কাঁঠালি কলার মতো সব বিষয়ে নাক গলানো ছিল অন্যতম প্রধান কাজ। সেখান থেকেই রাজাদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা শুরু।
ঠিক হল, কলকাতার স্টুডিওতে সেট ফেলে কিছুটা আর বাদবাকি অধিকাংশটাই শুটিং হবে ফলতায়, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর বাড়িতে। বিশুদা ফলতার বাড়িতে পা রেখেই জানালেন, লাইভ সাউন্ডের কাজ। সুতরাং তাঁর কাজের গুণমান বজায় রাখতে বাড়ির প্রতিটি ঘরের মেঝেতে কার্পেট বিছিয়ে দিতে হবে। সেই শুনে অশোকদার মাথায় হাত। ‘বিশু, তুমি কার্পেট চাইলেই তো হবে না, এ তো পিরিওডিক্যাল ছবি, এখানে আমাকেও সেকালের কার্পেট জোগাড় করে দিতে হবে। তুমি বিষয়টা আরেকবার ভেবে দেখো।’ বিশুদা নাছোড়বান্দা, লাগবে মানে লাগবেই।
দীর্ঘদিন প্রযোজক জং বাহাদুর রানা সাহেবের সঙ্গে কাজ করেছেন— অবসর পেলেই সেই অহংকার মুখে নিয়ে, পায়ের উপর পা তুলে রেলিশ করে সিগারেট টানতেন। নিশীতবাবুর দোষ না গুণ, কী বলব জানি না, সেটা হল, উনি কারও মুখের কথা শেষ করার আগেই নিজে লুফে নিতেন।
জুলাই মাসের শুরুতে অভিনেতা বিজয়েন্দ্র ঘাটকে (যতীন) এবং বীনা বটব্যালকে (মাসিমা) নিয়ে আমাদের ‘অন্তিম রাত্রি’-র শুটিং শুরু হল। তার ঠিক দিনকয়েক আগে, ৩০শে জুন, বিবেকদা বিয়ে করে কোনও মতে বৌভাত সামলে শুটিং-এ যোগ দিয়েছেন। এই অবস্থায় বিবেকদা সারাদিন ফলতায় শুটিং করে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য কলকাতার বাড়িতে কাটিয়ে, আবার পরের দিন ভোরবেলায় শুটিং-এ আসবেন— এই বিষয়টা রাজাদার ঠিক পছন্দ হল না। কিন্তু সমস্যা হল, তখন ওই অঞ্চলে উপযুক্ত কোনও হোটেল ছিল না, যেখানে এয়ারহোস্টেস নববধূর সঙ্গে বিবেকদা রাত্রিবাস করবেন।
ডাক পড়ল প্রোডাকশন ম্যানেজার নিশীতবাবুর। সেও এক ব্যক্তি বটে— রোগা টিংটিঙে, লম্বা নাকের উপর ভারী চশমা, সর্বক্ষণ বাঁ বগলে চেপে ধরে রাখেন একটা কালো চামড়ার ব্যাগ। সেই ব্যাগের মধ্যে নানা খুঁটিনাটি জিনিসের সঙ্গে অবশ্যই থাকত ট্রিপল ফাইভ সিগারেটের প্যাকেট। এই বিষয়ে নিশীতবাবু ভীষণ শৌখিন।

দীর্ঘদিন প্রযোজক জং বাহাদুর রানা সাহেবের সঙ্গে কাজ করেছেন— অবসর পেলেই সেই অহংকার মুখে নিয়ে, পায়ের উপর পা তুলে রেলিশ করে সিগারেট টানতেন। নিশীতবাবুর দোষ না গুণ, কী বলব জানি না, সেটা হল, উনি কারও মুখের কথা শেষ করার আগেই নিজে লুফে নিতেন। রাজাদার কথামতো বিবেকদার সমস্যার সমাধানে নিশীতবাবু ছুটলেন ডায়মন্ডহারবারের উদ্দেশ্যে। প্রযোজক শম্পা এবং স্বপন দাসের নির্দেশ— ‘সাগরিকা’র গঙ্গামুখী একটা ঘর যে করেই হোক বিবেকদা’র জন্য ব্যবস্থা করতেই হবে।
শুটিং সেরে বিবেকদা চলে যেতেন ডায়মন্ডহারবারে, আর আমরা ফিরে আসতাম কলকাতায়। হোটেল সাগরিকায় বিবেকদা তাঁর কর্মব্যস্ততার মধ্যেই মধুচন্দ্রিমা যাপন করেছিলেন। কথা প্রসঙ্গে, একদিনের ঘটনা মনে পড়ে গেল। সেদিন বিজয়েন্দ্র ফলতায় পৌঁছে টয়লেট আর বিছানা ছেড়ে অন্য কোথাও নড়ছেন না। কিছুক্ষণের মধ্যে বীনাদিও জানালেন, তাঁর পেটের অবস্থা খুব একটা ভাল নয়।
রাজাদা তখন তপন সিনহাকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি ছবি করবেন বলে ভেবেছেন। ছবিতে ক্যামেরাম্যান রায়বাবু (সৌমেন্দু রায়)। তিনি আবার তখন একই সঙ্গে তপনবাবুর ‘হুইল চেয়ার’ ছবিরও ক্যামেরাম্যান— দুটো কাজ একসঙ্গেই চলছে। সেই ডকুমেন্টারি ছবিতেও আমি কাজ করেছি।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাজাদা তাঁর প্রধান সহকারী বাদলকে নিয়ে বসে ঠিক করলেন, সেদিন শুধু বিজয়েন্দ্র (যতীন)-এর অসুস্থতার দৃশ্য শুট করা হবে। খবর পেয়ে রশিদ দোতলার বারান্দায় নতুন করে স্ক্রিপ্ট নিয়ে মাথা চুলকাতে শুরু করল। কিন্তু একসঙ্গে দু’জনের অসুস্থতার পিছনে আসল রহস্য কী? তদন্তে নেমে জানতে পারলাম, গতরাতে শুটিং শেষে দুই অভিনেতাকে নিশীতবাবু ব্যক্তিগতভাবে গোপনে ইলিশ মাছ আর মিষ্টি দই খাইয়েছেন। এই খবর জানার পর থেকে নিশীতবাবু হাওয়া— সেদিন শুটিংয়ের আশেপাশে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না।
রাজাদা তখন তপন সিনহাকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি ছবি করবেন বলে ভেবেছেন। ছবিতে ক্যামেরাম্যান রায়বাবু (সৌমেন্দু রায়)। তিনি আবার তখন একই সঙ্গে তপনবাবুর ‘হুইল চেয়ার’ ছবিরও ক্যামেরাম্যান— দুটো কাজ একসঙ্গেই চলছে। সেই ডকুমেন্টারি ছবিতেও আমি কাজ করেছি। ছবির টাইটেল কার্ডে আমার নাম নেই দেখে রাজাদাকে জানাতেই, সহকারী বাদলদাকে ডেকে তাঁর ভুলের জন্য মুণ্ডপাত করে ছেড়ে ছিলেন।

এরপর রাজাদা আমাকে ডেকে পাঠালেন যখন তারাশঙ্করের ছোট গল্প নিয়ে কলকাতা দূরদর্শনের জন্য একটা কাজ শুরু করলেন। সেখানে দিলীপদা (দিলীপ ব্যানার্জী) ক্যামেরাম্যান। দিলীপদা সবসময় ডাইরেক্ট লাইটে কাজ করতে পছন্দ করতেন। লাইট সফট করার জন্য অন্য মাধ্যম ব্যবহার করতেন না। ডাইরেক্ট হার্ড লাইটের ইনটেনসিটি কমানোর জন্য মরচে-ধরা আয়রন নেট ব্যবহার করতেন। সেই সময়ের অধিকাংশ ক্যামেরাম্যানই এইভাবে আলো করতেন, যদিও দিলীপদা হার্ড লাইটে যে কোনও দৃশ্যকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে পারতেন।
রাজাদা জানালেন, খুব টাইট শিডিউল, আমাকে এই কাজটায় সঙ্গে থাকতে হবে। এইভাবে রাজাদার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার শুরু। সময়-অসময়ে কখন কী ধরনের কাজ করছি, সেটা আমার কাছে নগণ্য বিষয় ছিল। রাজাদা ডাকলেই আমি হাজির হয়েছি। রাজাদা আমাকে শুটিং ফ্লোরে কোনওদিন আদেশ করেননি। জানি না অন্যদের আদেশ করতেন কি না, আমাকে বা আমার সামনে অন্য ক্যামেরাম্যান বা অভিনেতা-অভিনেত্রীকে কোনওদিন আদেশ করতে দেখিনি।
আমরা মাঝে মাঝেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেছি, নানা ফিল্ম ফেস্টিভালে একসঙ্গে বিচারকের আসনে বসেছি। প্রতিযোগিতার জন্য ছবি নির্বাচনে বসে নানা বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক লেগেই থাকত, কিন্তু সেই বিতর্ক কোনওদিন উত্তেজনার জায়গায় পৌঁছায়নি। সেই সবটাই ভীষণ রসিকতার মধ্য দিয়ে কেটেছে।
রাজাদা গাম্ভীর্যের আড়ালে একটা অদ্ভুত সারল্য লুকিয়ে রাখতেন। উনি ক্ষণিকের আলাপে মানুষকে ভীষণ আপন করে নিতেন, এবং তাঁকে বিশ্বাস করতেন। আরেকটা দুর্লভ গুণ হল, যে ধরনের মানুষই হোক না কেন, কেউ কিছু বললে রাজাদা তাঁর কথা শুনতেন। হাসিমুখে সকলকে অনুরোধ করতেন।
আমি যখন পরিচালক হয়ে কাজ শুরু করেছি, তখন এমনও হয়েছে— কোনও কর্পোরেট ছবির ক্ষেত্রে যেখানে আমি পিচ করব, সেখানে রাজাদাও আছেন। কিন্তু আমরা কোনওদিন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারিনি, আবার কেউ কাউকে ওয়াক ওভারও দিইনি; বরং কাজ ভাগ করে নিয়েছি। রাজাদা আমার পিচ শুনে বলতেন, ‘তুমি এত আধুনিক টেকনিক্যাল কথা বলছ, এগুলো তো আমি বলতে পারব না, তাহলে কী হবে?’ উত্তরে আমি তাঁকে বলেছি, ‘তিন-তিনটে রাষ্ট্রপতির পুরস্কার পেয়েও তারপর এত কথা বলবে কেন? আমার শূন্য কলসি— তাই বেশি বলছি।’
আমরা মাঝে মাঝেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেছি, নানা ফিল্ম ফেস্টিভালে একসঙ্গে বিচারকের আসনে বসেছি। প্রতিযোগিতার জন্য ছবি নির্বাচনে বসে নানা বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক লেগেই থাকত, কিন্তু সেই বিতর্ক কোনওদিন উত্তেজনার জায়গায় পৌঁছায়নি। সেই সবটাই ভীষণ রসিকতার মধ্য দিয়ে কেটেছে। প্রতিপক্ষের আক্রমণের বিরুদ্ধে রাজাদার প্রধান অস্ত্র ছিল— ঠোঁট আলগা করে গোঁফটা একদিকে একটু তুলে হালকা মুচকি হাসি।
এ ছাড়াও নতুন কোনও ছবি রিলিজ করলে সেটা নিয়ে আমাদের প্রায়ই কথা হত। ছবি দেখে রাজাদা আমায় ফোন করে জানতে চাইতেন, ছবিটা আমি দেখেছি কি না এবং কেমন লেগেছে। রাজাদার ভাল লেগেছে এমন ছবি আমার ভাল লাগেনি জেনেও আমাদের কথা হয়েছে, যুক্তি বিনিময় করেছি, অনেক সময় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সময় লেগেছে।
রাজাদা মাঝে মাঝেই আমাকে ‘তুমি’ বলতেন, আবার ‘তুই’ও বলতেন। কিন্তু কখন তুই আর কখন তুমি— তার কোনও নির্দিষ্ট সময়কাল বা আবেগের তারতম্য আলাদা করে কাজ করত কি না, সেটা সঠিক বলতে পারব না।
পরদিন সকালে ঘুম ভেঙেছে রাজাদার ফোনে— মানুষটা সারা রাত বিষয়টা নিয়ে ভেবেছেন। কখনও আমার ভুল উনি ভেঙেছেন, আবার কখনও ওঁর নিজের ভুল স্বীকার করেছেন। আধুনিক যুগের মেকি টেকনিক্যাল জাগলারির যুগে রাজাদার চিন্তাভাবনা ছিল খাঁটি, শুদ্ধ এবং সুস্থ। ছবিতে গল্প বলার জন্য তাঁর ভাষা ছিল অত্যন্ত সহজ, সরল তাঁর প্রতিটা ছবিতেই সেই প্রমাণ তিনি রেখে দিয়েছেন।
আমরা দু’জনেই দীর্ঘ সময় টেলিসিনে অ্যাওয়ার্ডের সঙ্গে যুক্ত, এবং রাজাদা এই সংস্থার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মাঝে মধ্যে আমাদের টেলিসিনে অফিস ছাড়াও নন্দনে আড্ডা হত, বিশেষ করে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আগে ও পরের সময়ে। কখনও নন্দনের কমিটি রুমে, আবার কখনও নন্দনের বাইরে শুকনো গাছতলায়। রাজাদার মতো কৃতী মানুষের যে অনুরাগী থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। নন্দনের বাইরে বসে আড্ডা দিলেই চারিদিক থেকে এ আসছে, ও আসছে, সে আসছে, আর রাজাদা সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। আমি আস্তে করে সরে পড়তাম।
এবার ফিরে এসে আমায় বলতেন, ‘এই তো মুশকিল। তুই নিয়ে গেলি আমাকে চা খাওয়াতে, তারপর পালিয়ে এলি, আমার এতটা সময় নষ্ট হল।’ এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি, রাজাদা মাঝে মাঝেই আমাকে ‘তুমি’ বলতেন, আবার ‘তুই’ও বলতেন। কিন্তু কখন তুই আর কখন তুমি— তার কোনও নির্দিষ্ট সময়কাল বা আবেগের তারতম্য আলাদা করে কাজ করত কি না, সেটা সঠিক বলতে পারব না। জানব ভেবেছিলাম, কিন্তু সেটা অজানাই রয়ে গেল। ইদানিং হরির দোকানে চা খাব বললেই একাডেমি অবধি হাঁটতে হবে ভেবে খুব আপত্তি করতেন।
কোনও একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর প্রতি একজন পরিচালকের কর্মসূত্রে বিশেষ আস্থা জন্মাবে, সেটাই স্বাভাবিক। সেরকমই ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর প্রতি রাজাদার আস্থা ছিল অগাধ। রাজাদার অধিকাংশ ছবিতে ঋতু অভিনয় করেছে। এমনকি রাজাদা নতুন ছবি করবেন বলে যে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছিলেন, ঋতুর সঙ্গে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, এবং গল্পটা শুনে ঋতু নিজেই রাজাদাকে একজন প্রডিউসারের সন্ধান দিয়েছিল বলে জানি। যাই হোক, সেই ছবি করার আকাঙ্ক্ষা রাজাদার অসম্পূর্ণই থাকল। সম্প্রতি একটা ডকুমেন্টারি ছবির কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন রাজাদা, সেটাও প্রায় শেষের দিকে এসে অসম্পূর্ণ রয়ে গেল।
ইদানীং রাজাদা একদম অপেক্ষা করতে পারতেন না, একটুতেই অধৈর্য হয়ে পড়তেন। ‘আমি বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারব না, আমার পর্বটা মিটিয়ে আমায় ছেড়ে দে।’ সত্যি বলছি, রাজাদা, তোমায় এত তাড়াতাড়ি ছাড়তে চাইনি। মিস ইউ, রাজাদা। উই অল মিস ইউ।
এই বছরের ১৪ই জুন নজরুল মঞ্চে রাজাদার সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ হয়, সেদিন ছিল টেলিসিনে অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান। মঞ্চে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের হাতে ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট’ তুলে দেবেন সংস্থার সভাপতি রাজা সেন। তার জন্য দু’দিন আগে থেকেই বারবার নিজের নির্ধারিত সময় জেনে নিয়ে সময় মতো হাজির হলেন। সেদিন আমি ‘শো রান’ করছিলাম, এবার ব্যাক স্টেজে বসে শুরু হল আমায় তাগাদা দেওয়া। ইদানীং রাজাদা একদম অপেক্ষা করতে পারতেন না, একটুতেই অধৈর্য হয়ে পড়তেন। ‘আমি বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারব না, আমার পর্বটা মিটিয়ে আমায় ছেড়ে দে।’ সত্যি বলছি, রাজাদা, তোমায় এত তাড়াতাড়ি ছাড়তে চাইনি। মিস ইউ, রাজাদা। উই অল মিস ইউ।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত