(Rangoli Art)
আলপনার সঙ্গে আমাদের সকলেরই পরিচয় বহু দিনের, সেই ছোটবেলায় মা-বোনেদের দেওয়া বাড়ির আলপনার দৌলতে, যা প্রধানত পুজোপার্বণেই দেওয়া হত। আসলে রঙ্গোলি মানে তো আলপনাই, শুধু এক এক জায়গার এক এক নাম। আগেকার কালে আলপনা প্রধানত দেওয়া হত চালবাটা দিয়ে, তাই তার রং হত সাদা, আর সেটি দেওয়া হত আঙুল দিয়ে, পরে তাতে রঙের ছোঁয়া লাগে এবং নানা ধরনের পেইন্ট এবং ব্রাশের ব্যবহার শুরু হয়।
আরও পড়ুন: আন্ডার ক্রিয়েটিভ কনস্ট্রাকশন: পর্ব ২
আসলে তাই হয়, সবকিছুই প্রথমে শুরু হয় একভাবে, পরে তাতে আর্ট আসে, সাড়ে আর্ট (ব্যবসা) আসে, তখন তা সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়। একসময় যে সুতোর কাজ বাচ্চার কাঁথাতে করা হত, সেই সুতোর কাজ কাঁথাস্টিচ হয়ে এখন শাড়ি-ব্লাউজ, পাজামা-পাঞ্জাবি থেকে সবরকম ড্রেস-মেটিরিয়েলেই শোভাবর্ধন করছে। মজার ব্যাপার, এই কাজ যেখান থেকে শুরু হয়েছিল অর্থাৎ বাচ্চার কাঁথা, সেই কাঁথাই আজ প্রায় লুপ্তপ্রায়, কিন্তু কাঁথা-স্টিচ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, ঠিক তেমনভাবেই এই আলপনা বা রঙ্গোলি যা একসময় শুধু পূজা-পার্বণের মধ্যেই সীমিত থাকত, তা আজ শিল্প হয়ে নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

বাংলার আলপনা বা বাংলার বাইরের রঙ্গোলির উদ্দেশ্য এক হলেও বানাবার পদ্ধতি বা উপাদান কিন্তু এক ছিল না। বাংলাতে যা প্রধানত চালবাটা, রঙ্গোলিতে তা চালের গুঁড়ো, আটার গুঁড়ো আর নানান রঙের মিহি বালি-পাউডার, যা বানানো হত খুব মিহি বালি ও পাথরের মিশ্রণ দিয়ে। বাংলাতে এই গুঁড়ো রঙের প্রচলন তেমন ছিল না বা এখনও নেই, তবে সেই চালবাটায় দেওয়া সাদা আলপনার চলও আর নেই, তার পরিবর্তে এসেছে নানা ধরনের তরল রঙের ব্যবহার, যার বাহার ও বৈচিত্র্যে তাক লেগে যায়।

বাংলার বাইরে বিশেষ করে মহারাষ্ট্র, গুজরাটে ওই শুকনো বালি-পাউডার দিয়ে লতাপাতার ডিজাইনের বদলে উঠে এসেছে ফিগার বা পোর্ট্রেট আঁকার ঝোঁক এবং তা অদ্ভুতভাবে সফলও হয়েছে, তাই এখন ওই রঙ্গোলি আর শুধু রঙ্গোলি নয়, রঙ্গোলি আর্ট হিসেবেই পরিগণিত।

হঠাৎ এই রঙ্গোলি আর্ট নিয়ে লিখতে বসেছি বলে ভাববেন না যে আমি এই শিল্প সম্বন্ধে অনেক কিছু জানি। আসলে চাকরির সুবাদে এই জিনিস প্রথম দেখার সৌভাগ্য হয় ১৯৯২ সালে। আমি তখন বরোদাতে পোস্টেড। গুজরাটের দিওয়ালি এবং নতুন বছর যা দিওয়ালির ঠিক পরের দিনেই আসে, দুয়ে মিলিয়ে এক মহোৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বরোদাতে ওই সময় রঙ্গোলি আর্টের এক্সিবিশন হয়, প্রায় ৭-১০ দিন ধরে চলে, আগে মাত্র এক জায়গায় অর্থাৎ কীর্তি মন্দিরেই হত, এখন আরও অনেক জায়গায় হয়, তবে ওই কীর্তি মন্দিরেরটাই প্রধান।
প্রায় ২৫ বছর আগে প্রথম যেদিন ওই রঙ্গোলি আর্ট আমি দেখেছিলাম, সেদিন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করে উঠতে পারিনি, এটা কী করে সম্ভব, শুধুমাত্র নানা ধরনের রঙিন মিহি বালি দিয়ে এমন ছবি কী করে আঁকা যায়, এই প্রশ্নগুলোই বারবার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেত।
কীর্তি মন্দির কোনও মন্দির নয়, এক স্মারক সৌধ, বরোদার রাজা সায়াজীরাও গায়কোয়াড় তার পূর্বপুরুষদের স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে মন্দিরের ধাঁচে একটি চূড়াবিশিষ্ট দোতলা হলঘর ও তার সঙ্গে যুক্ত একটি অ্যানেক্স ঘর তৈরি করেছিলেন, যেখানে তাঁদের পূর্বপুরুষদের মূর্তি রাখা আছে।

কীর্তি মন্দিরের নিচের তলার বড় হলঘরেই ওই রঙ্গোলি আর্টের এক্সিবিশন হয়। এই কীর্তি মন্দিরের আরও একটি বৈশিষ্ট্য আছে বিশেষত বাঙালিদের কাছে। এই কীর্তি মন্দিরের হলঘরের দোতলায় চার দেওয়ালেই আছে নন্দলাল বসুর আঁকা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দেওয়াল চিত্র (ফ্রেস্কো)। বরোদার রাজার অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ নন্দলালবাবুকেই পাঠিয়েছিলেন ওই দেওয়াল চিত্র আঁকার জন্য, সালটা সম্ভবত ১৯৩৬-৩৭।

প্রায় ২৫ বছর আগে প্রথম যেদিন ওই রঙ্গোলি আর্ট আমি দেখেছিলাম, সেদিন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করে উঠতে পারিনি, এটা কী করে সম্ভব, শুধুমাত্র নানা ধরনের রঙিন মিহি বালি দিয়ে এমন ছবি কী করে আঁকা যায়, এই প্রশ্নগুলোই বারবার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেত। সেই তখন থেকে আমি এই রঙ্গোলি আর্ট এক্সিবিশন প্রায় প্রতি বছর দেখে আসছি, তবে মজার ব্যাপার, আজ ২৫ বছর পরও ওই একই বিস্ময়ে ছবিগুলো দেখি আর ভাবি কী করে এই ধরনের আঁকা সম্ভব।

প্রথম দিকে অর্থাৎ সেই বছর পঁচিশ আগে ছবিগুলি হলঘরের মেঝেতেই আঁকা হত, এবং তাদের সাইজও ছিল বিশাল, প্রায় ১০x৮ ফুট, ৮x৬ ফুট বা ৬x৪ ফুটের মতো। সেইসব আঁকা বানাতে একটানা দু থেকে তিনদিন লাগত অর্থাৎ একটি ছবির জন্য একনাগাড়ে প্রায় ৭০-৮০ ঘণ্টা কাজ করতে হত, যা খুবই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। রঙ্গোলি আর্ট প্রধানত মহারাষ্ট্রেই বেশি প্রচলিত, তবে গুজরাট যেহেতু পার্শ্ববর্তী রাজ্য তাই এখানেও এর বহুল প্রচলন রয়েছে এবং অনেক সংস্থাও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে এই আর্ট শেখাবার জন্য।

রঙ্গোলি আর্ট দেখার জন্য উঁচু মাচা অর্থাৎ ব্রিজের মতো বানানো হয়, তার দুটো কারণ থাকে প্রথম কারণ- দর্শকের হাত থেকে আঁকাকে বাঁচানো, একটু হাওয়াতেও যা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, আর দ্বিতীয় কারণ- দর্শক যাতে বড় আঁকাগুলির টপ-ভিউ পেতে পারে। তবে এখন সাইজ অনেক ছোট করে দেওয়া হয়েছে, বেশিরভাগই চার ফুট বাই তিন ফুট ফ্রেমেই বানানো হয়।
এই রঙ্গোলি আঁকার পদ্ধতি একটু অদ্ভুত, চক বা পেনসিল দিয়ে আগে এঁকে নেওয়ার তেমন কোনও সুযোগ নেই। মেঝের এক প্রান্ত থেকে আঁকা শুরু করে নীচের দিকে নামতে হয়, অনেকটা কার্পেট খোলার মতো করে।
শুধু তাই নয় এখন আর মেঝেতে বানানো হয় না, প্লাইউডের বোর্ডের উপরই করা হয়, যাতে সামান্য এদিক ওদিক করার স্কোপ থাকে। আগে এই প্রদর্শনী চলাকালীন কোনও ফ্যান চালান যেত না, কারণ ফ্যানের হাওয়াতে আঁকা ঘেঁটে যেত, এখন আঁকা হয়ে যাওয়ার পর একধরনের লিকুইড গ্লু স্প্রে করে দেওয়া হয়, তাই আঁকাগুলি সাময়িকভাবে নষ্ট হয় না। গত তিন-চার বছর আবার নতুন এক আর্টের সংযোজন হয়েছে, যার নাম ‘ওয়াটার রঙ্গোলি’, যা করা হয় জলের উপর পাউডার ভাসিয়ে।

এই রঙ্গোলি আঁকার পদ্ধতি একটু অদ্ভুত, চক বা পেনসিল দিয়ে আগে এঁকে নেওয়ার তেমন কোনও সুযোগ নেই। মেঝের এক প্রান্ত থেকে আঁকা শুরু করে নীচের দিকে নামতে হয়, অনেকটা কার্পেট খোলার মতো করে, আর পুরো আঁকাই করতে হয় আঙুলের ফাঁকে ধরা গুঁড়ো রং মাটিতে ফেলে, ভুল হলে মোছার তেমন কোনও স্কোপ থাকে না। এইভাবে কী করে যে এত রিয়েল লাইফের রং এবং শেডিং করা যায়, তা আজও আমার বোঝা হল না।

এই আঁকার আবার দুটি ভাগ আছে, ১) রঙ্গোলি ডিজাইন বা আলপনা ড্রয়িং, ২) ফিগার ড্রয়িং। এর মধ্যে ফিগার ড্রয়িংটাই সবচেয়ে কঠিন আমার মনে হয়। তাই বলে ডিজাইন ড্রয়িংও সোজা নয়, কারণ পুরো ব্যাপারটাই শুধু হাত আর আঙুলের কারসাজি।
ওই ডিজাইন ড্রয়িং এর আবার দু-একটি আলাদা ঘরানা আছে, তার একটিকে বলে পুনাবালি রঙ্গোলি, ওই রঙ্গোলিতে একটু থ্রি-ডি এফেক্ট থাকে, পাউডারগুলো একটু উপরদিকে উঁচু করে দেওয়া হয় আর সাধারণ ড্রয়িংয়ে ফ্ল্যাটভাবে রং ভরা। ওই পুনাবালি রঙ্গোলি বানাতে হয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, নইলে আঁকার সিমেট্রিও থাকে না বা থ্রি-ডি এফেক্টটা ঠিক বোঝা যায় না। এই রঙ্গোলি আর্টের বেশিরভাগ আঁকাই ফ্রি হ্যান্ডে করতে হয়, মোছার স্কোপ কম থাকে, তাই খুবই কঠিন কাজ।

পরিশেষে বলি, রঙ্গোলি আর্ট দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেনো, এর একটি ড্র-ব্যাক অর্থাৎ খামতি আছে। এই আর্ট কোনওভাবেই সংরক্ষণ করা যায় না। তাই এই আর্ট বিশেষ প্রচার পায়নি বা দেশ বিদেশে ছড়িয়েও পড়তে পারেনি। কলকাতা তথা বাংলায় এই ধরনের রঙ্গোলি আর্টের কোনও প্রদর্শনী হয়েছে কি না আমার জানা নেই। তাই পাঠকদের অনুরোধ, যদি কখনও এই আর্ট দেখার সুযোগ আসে, সেই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।
বি: দ্র: লেখাটি লেখকের চোখে দেখা অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমিত, বই কিম্বা নেট-বই এর সঙ্গে মিল না-ও থাকতে পারে!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত