(Boikuntho Mallick)
নামটা চেনা চেনা ঠেকছে? এই বঙ্গেরই কবি তিনি, যাকে বলে খাঁটি বাঙালি। ছদ্মনাম? মনে হয় না। অবশ্য যিনি করেছেন কবি বৈকুণ্ঠের অবতারণা, তিনি নিজেই তো ছদ্মনামের আড়ালে নয় নয় করে পাঁচ ডজন বা তার বেশি রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের বই লিখে ফেলেছিলেন সত্তর আশির দশক জুড়ে, যার নায়ক প্রখর রুদ্র নামে এক অতিনাটকীয় চরিত্র। “শার্দূল সাহিত্য কুটির”-এর হেমবাবু ছিলেন তাঁর এই হেন বাজার কাঁপানো বইয়ের প্রকাশক।
তাঁর সময়ে রহস্য রোমাঞ্চ বইয়ের বাজার কাঁপাচ্ছেন আরও দুই মহারথী। ক্যাপ্টেন স্পার্কের স্রষ্টা অক্রুর নন্দী আর ‘নিশাচর’ ছদ্মনামের লেখক ক্ষিতীশ চাকলাদার। হলে হবে কী? অনুপ্রাস অনুপ্রাণিত বইয়ের নামকরণ এবং তার কাটতির ঘাড়ে চেপে অপ্রতিরুদ্ধ তাঁর গতি। সংখ্যাতত্ত্বের হিসেবে তিনিই এগিয়ে— “ভ্যাঙ্কুভারের ভ্যাম্পায়ার” তিন হপ্তায় দু-হাজার কপি, “অতলান্তিক আতঙ্ক” পয়লা বোশেখে বার হয়ে পাঁচ তারিখের মধ্যে সাড়ে চার হাজার কপি আর “লন্ডনে লণ্ডভণ্ড” পুজোয় বেরিয়ে তিন মাসে সাড়ে চার হাজার কপি বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের অন্যতম বেস্টসেলার করে তুলেছে তাঁকে।
আরও পড়ুন: বদলে যাওয়া সংলাপের ভাষা
সত্তর দশকের শুরুতেই তাঁর ঝুলিতে একুশখানা রোমাঞ্চ উপন্যাস, যার কমপক্ষে পাঁচটা করে এডিশন, আর তাঁর কল্যাণে কলকাতায় তিনখানা বাড়ি, একখানা অ্যাম্বাসাডর গাড়ির মালিক তিনি। খরচের ভয় তিনি পান না, কারণ “যা লিখব তাই গিলবে, আর যত গিলবে ততই আমার লাভ। আমার লাভের রাস্তা আটকায়, এমন কার সাধ্যি আছে মশাই?”

আসলে তিনি নিজেই নিজেকে চ্যালেঞ্জ করেছেন বারংবার। “জটায়ু” ছদ্মনামের আড়ালে থাকা লালমোহন গাঙ্গুলিকে তাঁর পাঠককূল আবিষ্কার করেছেন সত্যজিতের কলমে, তুলিতে এবং অবশ্যই সিনেমার পর্দার চরিত্রায়নে।
এ হেন দরাজ দিল মানুষটির সঙ্গে পরিচয়ের পর্বের শুরু ১৯৭২ সালের সোনার কেল্লা সফরের এক রেলযাত্রায়। কিন্তু, তাঁর পূর্বপুরুষদের সম্বন্ধে জানতে কেটে গিয়েছে প্রায় এক যুগের বেশি সময়। কেদারনাথে ফেলুদার সঙ্গে সোনার বালগোপালের লকেট রহস্য সমাধানের সূত্রে, যার ক্লাইম্যাক্সে তাঁর নিখোঁজ ছোটকাকা দুর্গামোহনের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ। লালমোহনবাবুর প্রপিতামহ পেপার মার্চেন্ট ললিতমোহন বাড়ি বানিয়েছিলেন উত্তর কলকাতার গড়পারে। তাঁর মৃত্যুর পর ঠাকুরদা আর লালমোহন বাবুর বাবা ব্যবসার হাল ধরেন। তবে সেই ব্যবসা ১৯৫২ সালের পর আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায়।

হুগলির ভদ্রেশ্বর থেকে কোনও এক সময়ে গড়পারের বাসিন্দা হয়ে যায় লালমোহনের পরিবার। এথিনিয়াম ইন্সটিটিউশনে কেটেছে তাঁর স্কুল জীবন। আর এখানেই তাঁর পরিচয় বাংলার মাস্টারমশাই বৈকুণ্ঠ মল্লিক এবং অঙ্ক ও ভূগোলের মাস্টারমশাই তুলসীচরণ দাশগুপ্তের সঙ্গে। তুলসীচরণের সঙ্গে গোঁসাইপুরে একসময় দেখা হয়েছিল বটে। কিন্তু বৈকুণ্ঠ মল্লিক ছিলেন লালমোহনবাবুর মানসসঙ্গী। বিভিন্ন পরিবেশ পরিস্থিতিতে তাঁর মুখে শোনা যেত বৈকুণ্ঠ বিরচিত কবিতার অংশ বিশেষ। সে যতই গুরুচণ্ডালি দোষে দুষ্ট হোক না কেন— যতই থাক ছন্দমিল বা অন্ত্যমিলের প্রয়োজনে বিকট শব্দচয়ন, কবি হিসেবে চুঁচড়োজাত বৈকুণ্ঠ মল্লিক ছিলেন লালমোহনের শ্রদ্ধার পাত্র, আমাদের সমীহের!
ক্লাস সেভেনে যে কবিতা আবৃত্তি করে লালমোহন প্রাইজ পেয়েছিলেন, তার শেষ দু-লাইন দিয়েই শুরু করা যাক। জীবনে প্রথমবার পুরীর সাগর সৈকতে দাঁড়িয়ে তাঁর বিস্ময় অপার, আবৃত্তি করলেন অশ্রুতপূর্ব সেই কবিতা।
তাঁর কথা উঠলেই লালমোহন যেমন ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েন, তেমনই এতটুকু সমালোচনায় তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। তাঁর বিশ্বাস, আসলে কবি বৈকুণ্ঠ একজন জিনিয়াস, যাঁর উপর মাইকেল মধুসূদনের দস্তুর মতো প্রভাব ছিল। ফেলুদা বা শ্রীমান তপেশরঞ্জন সেসব কবিতার লাইন নিয়ে মাঝে মাঝে খানিক খুনসুটি করলেও, সেগুলোর মধ্যে আসলে লুকিয়ে আছে এক কৌতুক রস, যা এক হিসেবে স্রষ্টা সত্যজিতের অন্তরের বোধ এবং অবশ্যই বাবা সুকুমার রায়ের খেয়ালরসের সিঞ্চিত ভাগ।
ক্লাস সেভেনে যে কবিতা আবৃত্তি করে লালমোহন প্রাইজ পেয়েছিলেন, তার শেষ দু-লাইন দিয়েই শুরু করা যাক। জীবনে প্রথমবার পুরীর সাগর সৈকতে দাঁড়িয়ে তাঁর বিস্ময় অপার, আবৃত্তি করলেন অশ্রুতপূর্ব সেই কবিতা যার শেষের দু’লাইন— “অসীমের ডাক শুনি কল্লোল মর্মরে/ এক পায়ে খাড়া থাকি একা বালুচরে”

ফেলুদার তাৎক্ষণিক মন্তব্য, “কবি এখানে নিশ্চয়ই নিজেকে সারসের সঙ্গে আইডেন্টিফাই করছেন, কারণ এই ঝোড়ো বাতাসে বালির উপর মানুষের পক্ষে এক পায়ে খাড়া থাকা চাট্টিখানি কথা নয়!” সেবারেই তো যাওয়া হয়েছিল ভুবনেশ্বর, ভারতের টেম্পেল সিটি বলে যার খ্যাতি। সেখানে হাজারও মন্দির দেখার অনুপ্রেরণাও লালমোহনবাবু পেয়েছিলেন বৈকুণ্ঠ মল্লিকের কবিতায়। মুক্তেশ্বরের চাতালে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে আবৃত্তি করলেন—
“কত শত অজ্ঞাত মাইকেল এঞ্জেলো/ একদা এই ভারতবর্ষে ছেলো-/ নীরবে ঘোষিছে তাহা ভাস্কর্যে ভাস্বর/ ভুবনেশ্বর!”
অবিশ্যি “এঞ্জেলো” এর সঙ্গে “ছেলো”-র ছন্দমিল একজন গ্রেট পোয়েটের লক্ষ্মণ কি না, এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলায় তোপসের উপরে তিনি বেশ রেগেই গিয়েছিলেন, বলেছিলেন “পোয়েটের ব্যাকগ্রাউন্ড না জেনে ভার্স ক্রিটিসাইজ করার বদভ্যাসটা কোথায় পেলে, তপেশ?”
মজার ব্যাপার হল লালমোহন যখন শান্তিনিকেতনে গিয়ে পৌঁছলেন শেষ অবধি, তখন কিন্তু মানসলোকে ভর করল তাঁর মাস্টারমশাইয়ের লেখা কয়েক লাইন পদ্য যা থেকে গিয়েছিল স্মৃতি ভাণ্ডারে
রবীন্দ্র কবিতা অথবা গানের প্রতি লালমোহনবাবুর ভক্তিশ্রদ্ধা ছিল কি না, এ-কথা জানা না গেলেও ঘরের পাশে “শান্তিনিকেতন-টেতন”–কে তিনি তেমন পাত্তা দেননি কখনও। আর দেবেনই বা কেন, “হনলুলুতে হুলস্থুল” যিনি লিখছেন, তিনি কবিগুরুর কাছে কী প্রেরণাই বা পেতে পারেন? ফলত, দু’একবার রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে গিয়ে হয় অমাবস্যার রাতে “জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে” গেয়ে উঠেছেন, অথবা ত্রয়োদশীর চাঁদ দেখে “চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে ‘উপচে’ পড়ে আলো” গেয়ে ফেলুদার সামনে পড়েছেন ফ্যাসাদে। শেষ অবধি চাঁদের মহিমা কীর্তনের বিষয়ে নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের খোঁজে আবার ফিরেছেন তাঁর প্রিয় কবি ও গুরু বৈকুণ্ঠের কাছে— “আহা, দেখ চাঁদের মহিমা,/ কভু বা সুগোল রৌপ্যথালি/ কভু আধা কভু সিকি কভু একফালি/ যেন সদ্য কাটা নখ পড়ে আছে নভে-/ সেটুকুও নাহি থাকে, যবে/ আসে অমাবস্যা –/ সেই রাতে তুমি তাই/ অচন্দ্রমপশ্যা!”

খেদোক্তি করেছেন “এই পোড়া দেশে লোকটা রেকগনিশন পেলে না!”
মজার ব্যাপার হল লালমোহন যখন শান্তিনিকেতনে গিয়ে পৌঁছলেন শেষ অবধি, তখন কিন্তু মানসলোকে ভর করল তাঁর মাস্টারমশাইয়ের লেখা কয়েক লাইন পদ্য যা থেকে গিয়েছিল স্মৃতি ভাণ্ডারে— “জীর্ণ কোপাই সর্পিল গতি/ মন বলে দেখে— মনোরম অতি/ দুই পাশে ধান/ প্রকৃতির দান/ দুলে ওঠে সমীরণে, বলে দেবে কবি/ আঁকা রবে ছবি/ চিরতরে মোর মনে”!
মাদ্রাজ-বিষয়ক কবিতায়, মাদ্রাজ শহরের মুণ্ডপাত করেছেন কবি বৈকুণ্ঠ-
“বড়ই হতাশ হয়েছি আজ/ তোমারে হেরিয়ে মাদ্রাজ!/ ভাষা হেথা দুর্বোধ্য তামিল/ অন্য ভাষার সাথে নেই কোন মিল-/ ‘ইডলি আর দোসা খেয়ে তৃপ্তিবে রসনা?/ ওরে বাবা এ শহরে কেউ কভু এসো না।”
ফেলুদা যখন মুখে মুখে জটায়ুকে নিয়ে লিমেরিক বানায় সেখানেও এই অন্ত্যমিলের ব্যাপারটা ঝকমকিয়ে ওঠে; ‘বুঝে দ্যাখো জটায়ুর কলমের জোর/ ঘুরে গেছে রহস্য কাহিনির মোড়/ থোড় বড়ি খাড়া/ লিখে তাড়াতাড়া/ এইবারে লিখেছেন খাড়া বড়ি থোড়।’
ছন্দমিলের খাতিরে “হেরিয়ে”, “তৃপ্তিবে” এর এমন ব্যবহার আসলে যে মাইকেল মধুসুদনের প্রভাব, তা জানাতে ভোলেননি তাঁর সুযোগ্য ছাত্র।
ছন্দের ব্যাপারে অন্ত্যমিলের পক্ষপাতী তো সত্যজিৎও। ফেলুদা যখন মুখে মুখে জটায়ুকে নিয়ে লিমেরিক বানায় সেখানেও এই অন্ত্যমিলের ব্যাপারটা ঝকমকিয়ে ওঠে; ‘বুঝে দ্যাখো জটায়ুর কলমের জোর/ ঘুরে গেছে রহস্য কাহিনির মোড়/ থোড় বড়ি খাড়া/ লিখে তাড়াতাড়া/ এইবারে লিখেছেন খাড়া বড়ি থোড়।’
এর কাছে বৈকুণ্ঠ মল্লিকের সেকেলে শব্দে-বাঁধা পুরোনো গতের কবিতা ম্রিয়মাণ। ফেলুদা আর তোপসের পছন্দ শব্দের সপ্রতিভতা আর খেলায় নতুন ধরনের বাক্যবন্ধের গঠন— যা বৈকুণ্ঠ-রচনার বিপরীতধর্মী। বৈকুণ্ঠের অন্ত্যমিল নিয়ে নানা চরণের মাত্রাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা একটু সেকেলে ধরনের। পুরোনো-গন্ধী তৎসম শব্দে মূল যে-কথাটা গদ্যে বলা যায়, সেটাই কবিতার ভাষায় বলার একটা চেষ্টা আছে, আর ঠিক সেখানেই ফেলু-তোপসের কাব্যরুচি থেকে লালমোহনের কাব্যরুচির তফাত।

আসলে “বৈকুণ্ঠ মল্লিক” এক অর্থে ছদ্মনাম! কারণ এই নামের পিছনে যিনি, তিনি স্বয়ং সত্যজিৎ। তাঁর কলম অন্ত্যমিলের নানা খেলায় কতখানি পটু, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বিশ্বের সেরা দুই খেয়ালরসিক এডওয়ার্ড লিয়র আর লুই ক্যারলের হিসাবহারা আজগুবি জগতের অনুবাদ ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ বই আর ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমাটি।
যে সত্যজিৎ ‘দেবী’ ছবির জন্য নিজে রামপ্রসাদী ভাষা ব্যবহার করে শ্যামাসংগীত লিখতে পারেন, ‘চিড়িয়াখানা’ ছবির জন্য পুরোনো সিনেমার ভাষা আর সুর ব্যবহার করে সেকেলে গান লিখতে পারেন, সেই স্রষ্টাই নিজের কলমে বানাতে পারেন বৈকুণ্ঠ মল্লিকের কবিতা। এই যে অন্যের ভাষা আর অন্যের ধরনটাকে নিজের লেখায় চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলার একটি অসামান্য প্রচেষ্টা— সে-ও কি সত্যজিৎ প্রতিভার একটা নতুন দিক নয়?
তথ্যঋণ:
ফেলুদাসমগ্র – সত্যজিৎ রায়
বৈকুণ্ঠ মল্লিক: কবি আর মাস্টারমশাই – শুভেন্দু দাশমুন্সী
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত