হীরা মালিনী (পর্ব ২)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
অলঙ্করণ: শুভ্রনীল ঘোষ
অলঙ্করণ: শুভ্রনীল ঘোষ

কয়েক মাস পূর্বের ঘটনা, জলপথে সাগরদ্বীপ থেকে কুলপি হয়ে একখানি পানসি কলিকাতার দিকে চলেছে। ছ’জন মাঝি খুব জোরে দাঁড় বাইছে, হুগলী নদীর বুকে তরতর করে দক্ষিণে বয়ে চলছে নাও। ভাদ্র মাসের দ্বিপ্রহর, নদীর দুপাশে সবুজ কল্কাপেড়ে আঁচলখানি বিছিয়ে রেখেছে বঙ্গদেশ, যেন কোনও যুবতি স্নানান্তে রৌদ্রে একরাশ ভিজা এলোচুল শুকোতে বসেছে। রৌদ্র আর মেঘে ভরে রয়েছে আকাশ, মাঝে মাঝে কৃষ্ণবর্ণ মেঘ কাজলের মতো অভিমানী হয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলছে চরাচর, দু এক পশলা বৃষ্টি হচ্ছে, পরক্ষণেই আবার গাঢ় নীল আকাশ ফুটে উঠছে, দূরে নদীর চরায় চঞ্চল বালকের মতো মাথা দোলাচ্ছে কাশফুলের দল, দিকচক্রবাল রেখার কাছে ক্ষুদ্র জনপদ, গাছপালা এক আশ্চর্য আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

পানসির উপর বসে এই অপরূপ শরৎকালের দিকে অবাক চোখে চেয়ে আছেন উইলিয়ম হারউড। ভাদ্র মাসের খর রৌদ্রে তার মুখখানি লাল হয়ে উঠেছে, পরনের কোট ঘামে ভেজা, মাথার টুপি খুলে একপাশে রেখেছেন, একরাশ সোনালি চুল নদীর এলোমেলো বাতাসে আপনমনে উড়ছে। যুবক উইলিয়ম ইংল্যান্ডের ইষ্ট ইন্ডিয়া কলেজ থেকে সদ্য পাশ করে জুনিয়র মার্চেন্ট হিসাবে কোম্পানির কাজে যোগ দিতে কলিকাতা চলেছেন। চাকুরিটি মন্দ নয়, বেতন বছরে একশো কুড়ি পাউন্ড, এছাড়া দুইজন সাধারণ ভৃত্য একজন চাপরাসি, খানসামা ও বাবুর্চি সহ থাকার জন্য গৃহেরও বন্দোবস্ত করবে কোম্পানি!

উইলিয়ম ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ার প্রদেশের লোক, এদেশে আসার পূর্বে কলিকাতা সম্পর্কে নানাবিধ গালগল্প তিনি শুনেছেন, প্রায় সকলেই বলেছে কলিকাতার পরিবেশ ও জলবায়ু অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর, ম্যালেরিয়া ও কলেরা লেগেই থাকে, এছাড়াও প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরমে দিনের বেলায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে! কিন্তু সব শুনেও উইলিয়ম এদেশে আসতে রাজি হয়েছেন, কারণ অর্থ, তাঁর ধারণা কয়েকটি বছর এখানে কাটাতে পারলেই বিপুল ধনসম্পত্তি নিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে নিরাপদ ও সুখী জীবন যাপন করতে পারবেন। ইয়র্কশায়ারে তাঁর বাগদত্তাকে রেখে এসেছেন, নীলনয়না সেই তরুণীর নাম ডোনা ম্যাককার্থে! পানসি করে কলিকাতার দিকে যেতে যেতে এখন উইলিয়মের মনে বারবার করে ডোনার মুখখানি ভেসে উঠছে। স্থির করলেন টাউনে পৌঁছেই তাকে একটি চিঠি লিখবেন।

কলিকাতায় এসে ওয়েলেসলি প্লেসের স্পেন্সেস হোটেলে উঠেছেন উইলিয়ম। এসেছিলেন তিরিশে অগাস্ট আর আজ সাতাশে সেপ্টেম্বর, কোম্পানির বাড়ি পেতে এখনও মাস দুয়েক সময় লাগবে বলে শুনছেন। হোটেলটি নূতন, দু বৎসর আগেই হয়েছে, থাকা এবং খাওয়া দুটির ব্যবস্থাই যথেষ্ট ভালো। হোটেলের দোতলায় শোয়া-বসার আলাদা ঘরের তিন কামরার একটি ‘সুট’ তাঁকে দেওয়া হয়েছে, ভাড়া অবশ্য অনেকটাই বেশি, মাসে সাড়ে তিনশো টাকা। উইলিয়ম প্রতিদিন সকালে প্রাতরাশ সেরে গোলদীঘির কাছে আপিসে রওনা দেন, একটি ঘোড়ায় টানা ল্যান্ডো আসে তাঁর জন্য, দুপুরে ফিরে খাওয়া দাওয়া সেরে অল্পক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকালের দিকে আবার আপিস যেতে হয়, সন্ধ্যা ছটা অবধি কাজ চলে, তারপর হোটেলে ফিরে অনেক সময় ধরে স্নান করেন তিনি, কলিকাতা বড় উষ্ণ শহর।

কয়েক দিন আগে এক নেটিভ বাবুর সঙ্গে আলাপ হয়েছে উইলিয়ামের, হৌসে কী একটা কাজে এসেছিল, বাবুর নাম রাধামোহন সরকার। লোকটি বেশ আলাপী, অল্প অল্প ইংরাজিও বলতে পারে, আগামীকাল তার বাড়িতে যাওয়ার কথা, উইলিয়ম ও আরও কয়েকজন সাহেবকে নিমন্ত্রণ করেছে, সেখানে সন্ধ্যাবেলায় কী একটা আসর বসবে। কী যেন বলল, হ্যাঁ, যাত্রা, অনেকটা নাকি অপেরার মতো কোনও অনুষ্ঠান।

এইরকম সময় গরমে দম বন্ধ হয়ে আসে, অল্প বাতাস বইলেও তার শরীরে যেন আগুনের হলকা লেগে থাকে। সবচেয়ে অসহ্য হল ছারপোকা আর মাছি, ছারপোকাগুলির গায়ে উৎকট দুর্গন্ধ। সন্ধ্যার পর আর কিছুই করার থাকে না, কোনওদিনও ঘরের লাগোয়া বারান্দায় এসে বসেন, রাস্তায় লোকজন কমে আসে, মাঝে মাঝে দু একটি ছ্যাকরা গাড়ি কি ব্রুহাম বা ল্যান্ডো চলে যায় উত্তরের পথে, ওইদিকে নেটিভদের বাস। পালকিও চোখে পড়ে, চারজন কি ছ’জন বেহারা কাঁধে নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে চলেছে। সন্ধ্যার মুখে অনেক সময় তাজা ফুল নিয়ে ফিরিওয়ালারা ঘুরে বেড়ায়, সুর করে তারা কুসুম ফিরি করে। কখনও আবার কোনও মাতাল নেশা করে পথের উপরেই শুয়ে পড়ে, সেপাই এসে মারতে মারতে তুলে নিয়ে যায়। একদিন দেখা গেল বিচিত্র সব বাদ্যযন্ত্র নিয়ে মশাল জ্বেলে একদল লোক কোথায় যেন চলেছে, তাদের চিৎকারে কান পাতা দায়! পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিলেন ওরা উপাসনার জন্য দক্ষিণে কালীঘাট বলে একটি স্থানে যাচ্ছিল! এখানকার মানুষের উপাসনার ধরনও বড় অদ্ভুত। কোম্পানির তরফ থেকেও নাকি কালীঘাটে পূজা পাঠানো হয়!

কলিকাতায় আসা ইস্তক উইলিয়মের মদ্যপান ক্রমশ বেড়েই চলেছে, হোটেল থেকে প্রতি সন্ধ্যায় নগদ তিনটাকা দিয়ে একবোতল ক্ল্যারেট কি হুইস্কি কেনেন, মধ্যরাত্রির আগেই তা প্রায় নিঃশেষিত হয়। কাব্য ও সাহিত্যের তিনি যথেষ্ট অনুরাগী, বায়রন তাঁর প্রিয় কবি, অল্প কয়েকদিন আগেই কবি মারা গিয়েছেন, মাঝে মাঝে বায়রনের কবিতা আপনমনে আবৃত্তি করেন তরুণ উইলিয়ম। আজও তেমনই সুরা আর পানপাত্র নিয়ে বসেছেন বারান্দায়, ধীরে ধীরে সন্ধ্যার মলিন আলো মিশে যাচ্ছে অন্ধকারের গর্ভে, অল্পক্ষণ পূর্বে পশ্চিমে গঙ্গার উপরে আকাশ কী বিচিত্র বর্ণ ধারণ করেছিল যেন কোনও বারাঙ্গনা সকল প্রসাধন মুছে গোপন প্রেমাভিসারের পথে রওনা দিয়েছে, কতগুলি পাখি এইমাত্র দলবেঁধে উড়ে এল, হোটেলের সামনে উঁচু গাছটিতে তাদের বাসা, গৃহে ফেরার কলরবে মুখর হয়ে উঠেছে চরাচর।

পথে কোনও সাহেবের ফিটন পইস পইস শব্দ তুলে দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছে, দূরে গাঢ় অন্ধকারের বুকে একটি একটি করে জ্বলে উঠছে রেড়ির তেলের আলো, হোটেলের নিচের তলা থেকে ভেসে আসছে গান-বাজনার শব্দ, কারা যেন উঁচু গলায় হল্লা করছে খুব, ক্রমশ আড় ভাঙছে রাত্রির কলিকাতার! স্পেন্সেস হোটেলের মতোই গর্বনমেন্ট হাউস নাহয় টাউন হল বা কোনও ক্লাবে নাচগান আর পানভোজনের আসর বসেছে এখন, প্রায় সারা রাত্রি ধরে চলবে সাহেব ও মেমদের সুরাপান, তামাকের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হবে চারপাশ, তারপর সেই ভোরবেলায় অবসন্ন ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরবে সবাই, তখন গুপ গুপ করে শোনা যাবে কেল্লার তোপের শব্দ, আরও একটি নূতন কর্মচঞ্চল দিন শুরু হবে কলিকাতায়।

এই একমাসেই হতদরিদ্র শহরটির প্রতি উইলিয়মের কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে। শুধু এইরকম একাকী সন্ধ্যায় ডোনার কথা খুব মনে পড়ে, কতদূরে সে কেমন আছে কে জানে! একটি চিঠি লিখেছিল কিন্তু এখনও উত্তর এসে পৌঁছায়নি, হয়তো সেই চিঠি এখনও হাতে পায়নি ডোনা। চিঠি তো আর আলব্রাটস নয় যে সাগর পার হয়ে পাখা মেলে উড়ে যাবে! কয়েক দিন আগে এক নেটিভ বাবুর সঙ্গে আলাপ হয়েছে উইলিয়ামের, হৌসে কী একটা কাজে এসেছিল, বাবুর নাম রাধামোহন সরকার। লোকটি বেশ আলাপী, অল্প অল্প ইংরাজিও বলতে পারে, আগামীকাল তার বাড়িতে যাওয়ার কথা, উইলিয়ম ও আরও কয়েকজন সাহেবকে নিমন্ত্রণ করেছে, সেখানে সন্ধ্যাবেলায় কী একটা আসর বসবে। কী যেন বলল, হ্যাঁ, যাত্রা, অনেকটা নাকি অপেরার মতো কোনও অনুষ্ঠান।

পথে কোনও সাহেবের ফিটন পইস পইস শব্দ তুলে দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছে, দূরে গাঢ় অন্ধকারের বুকে একটি একটি করে জ্বলে উঠছে রেড়ির তেলের আলো, হোটেলের নিচের তলা থেকে ভেসে আসছে গান-বাজনার শব্দ, কারা যেন উঁচু গলায় হল্লা করছে খুব, ক্রমশ আড় ভাঙছে রাত্রির কলিকাতার!

অন্ধকার ঘন হয়েছে, শুনশান রাত্রি, প্রায় এগারোটা বাজে, ইতিমধ্যে হোটেলের গান বাজনার শব্দও অনেক কমে এসেছে। বারান্দায় প্রচণ্ড মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উইলিয়ম শোওয়ার ঘরে উঠে এলেন, ঘরটি বেশ বড়, মেঝেয় একখানি নরম গালিচা, ইংলিশ স্টাইলের পালঙ্ক পাতা রয়েছে ঘরের মাঝখানে, সামনে একটি বেলজিয়াম গ্লাসের বড় আয়না আর ড্রেসিং টুল, কড়ি-বরগার ছাদ থেকে ঝোলানো হয়েছে সুদৃশ্য ঝাড়বাতি, ঘরের প্রায় সব আসবাবপত্রই বিলিতি। লেখাপড়ার জন্য জানলার পাশে মেহগিনি কাঠের একটি ছোট টেবিল ও গদি আঁটা চেয়ারও রয়েছে। টেবিলের উপর কাঁচ দিয়ে ঢাকা বাতিদানে একটি দীপ জ্বলছে, ছায়াচ্ছন্ন মৃদু আলো রহস্যময়ীর মতো তাকিয়ে রয়েছে। ঘরটি গুমোট হয়ে রয়েছে, বন্ধ না রাখলে নানারকম পোকামাকড়ে ভরে যায়, তবুও আজ জানলাটি খুলে দিলেন উইলিয়ম, সহসা কী একটা ফুলের গন্ধে ভরে উঠল চারপাশ। গন্ধটি চেনা, অনেকটা ল্যাভেন্ডারের মতো সাদা ফুলটি রাস্তায় দেখেছেন উইলিয়ম, কিন্তু নাম জানেন না। ইয়র্কশায়ারের বাড়ির গার্ডেনে স্প্রিং সিজনে কেমন আলো করে ল্যাভেন্ডার ফোটে, জানলা দিয়ে মৃদু বাতাস বয়ে আসছে, শীতল নদী-বাতাসে জলের স্পর্শ যেন লেগে রয়েছে। দীপের আলোয় রাইটিং টেবিলে বসে সাদা কাগজের উপর উইলিয়ম লিখতে শুরু করলেন,

“প্রিয়তমা ডোনা,
পূর্বের চিঠিখানি কি পেয়েছ ? আমার শরীর ও স্বাস্থ্য একপ্রকার রয়েছে। কলিকাতা খুব উষ্ণ, প্রত্যহ দুইবার করে স্নান করতে হয়। আমি এখনও স্পেন্সেস হোটেলেই রয়েছি, খাদ্য যথেষ্ট সুস্বাদু যদিও দাম এদেশের তুলনায় অনেকটা বেশি। কি খাই জানো ? সুপ, মুর্গির রোস্ট,ভাত ও মাংসের ঝোল, ভালো চিজ, টাটকা মাখন, চমৎকার পাঁউরুটি, মাটন কিমার তরকারি, কচি ভেড়ার রাং, টার্ট এবং এর সঙ্গে উপাদেয় পানীয় মদিরা! বুঝতেই পারছো আমার ওজন বৃদ্ধি পেয়েছে! তবে ভেবো না প্রতিটি খাদ্য প্রত্যহ খাই। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এসব খাবারই থাকে তালিকায়। আরেকটি মজার কথা বলি, আমাকে এখানে সবাই গ্রিফিন বলে! আসলে ইয়োরোপ থেকে যখন কেউ ভারতবর্ষে প্রথম আসেন তখন এক বছরের জন্য সেই নবাগতকে গ্রিফিন বলা হয়! শুনলে অবাক হবে আমার হোটেলের ঘরে একখানি টানাপাখা রয়েছে। সে-কথা পরে একদিন লিখব।

শুনেছি নভেম্বর মাসে কোম্পানি বাড়ি দেবে আমাকে। এখানে দুশো তিনশো টাকায় অভিজাত পল্লীতে একটি বড় বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। আমার কাজ থেকে ফিরতে সন্ধ্যা হয়। এইসময়টা তোমার কথা খুব মনে পড়ে। একঘেয়ে লাগে, সময় কিছুতেই কাটতে চায় না। ডোনা, আমার প্রিয়তমা, তুমি কেমন আছ? আগামী কাল সন্ধ্যাবেলায় এক নেটিভ বাবুর বাড়িতে নিমন্ত্রণ রয়েছে। ফিরে এসে তোমাকে চিঠি লিখব। নববর্ষের সময় তুমি কি কলিকাতায় আসতে চাও ? চিঠির উত্তর দিও।
আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি।

তোমার অনুরক্ত
উইলিয়ম।
ডাব্লিউ. এইচ.
সাতাশে সেপ্টেম্বর, ১৮৩৬। কলিকাতা। ইন্ডিয়া।”

হীরা মালিনী পর্ব ১

Tags

শুভ্রনীল ঘোষ
শুভ্রনীল ঘোষ
কোনও প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই শুভ্রনীল অলঙ্করণের কাজ করে চলেছেন সেই ১৯৯৭ সাল থেকে। প্রিয় মাধ্যম জলরং। কলকাতার বহু নামী প্রকাশক ও বিজ্ঞাপন সংস্থার জন্য কাজ করেছেন।

Leave a Reply