ইন্তিবিন্তি

দুম দুম দুম…অ্যাই ছুটকি, বাথরুমে এত ক্ষণ কী করছিস? তোর তো এত ক্ষণ লাগে না!
বাথরুমে কেউ কী করে মা? 
তোর অন্য দিন তো এত ক্ষণ লাগে না, আজ কেন লাগছে? শরীর খারাপ করছে?
না।
তা হলে? কাঁদছিস?
নাআআআআআআ…..
তা হলে কি নিজেই ওই সব লোমটোম তোলাতুলি করছ? 
আমি বেরোচ্ছি বাবা রে! বাথরুমে গেলেও পিছু ছাড়ো না…

চেঁচিয়ে উঠি আমরা। মানে যারা মধ্যবিত্ত জয়েন্ট ফ্যামিলির মেয়ে। যারা তিন কামরার বাড়িতে অন্তত ১২ জন বাড়ির লোক আর প্রায়শই থাকতে আসা আত্মীয়-পরিচিত মিলিয়ে অন্তত জনা ১৫-১৬ লোক নিয়ে সারা ক্ষণ বড় হয়ে উঠেছি। 
এই সব জয়েন্ট ফ্যামিলির মেয়েদের বিয়ের বাজারে খুব কদর ছিল এক সময়। মুখে রা কাড়ে না, নিজের জন্য কিছু প্রয়োজন হয় না, যে কোনও পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পারে। 
আসলে পারে না। পারতে বাধ্য হয়। ক্লাস নাইনের মেয়ে স্কুল থেকে এসে স্কুল-ড্রেস ছাড়ার জায়গা পায় না। ফলে তাকে তত ক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, যত ক্ষণ না ঘরের লোকজন রাত্রের খাবার খেতে যায় কিংবা ঘর থেকে বেরিয়ে অন্য ঘরে ডেরা বাঁধে। প্রশ্ন উঠবে, বাথরুমে ছেড়ে নিলেই তো হয়। কখনও মধ্যবিত্ত জয়েন্ট ফ্যামিলির একটা বাথরুম দেখেছেন? জল থইথই, ব্যাঁকা কাপড়টাঙানো ডান্ডা, কাপড় রাখার দড়িতে অলরেডি এত বাসি জামাকাপড় ডাঁই হয়ে রয়েছে যে সেখানে একটি হালকা স্কার্ট চাপালেও তখুনি সেটা বাথরুমের মেঝেতে পড়ে ভিজে নোংরা হয়ে যাবে। সুতরাং স্কুল ড্রেস পরেই রাত দশটা অবধি অপেক্ষা। 
জয়েন্ট ফ্যামিলিতে যা মজা হয় না, সব সময় হইহই, আড্ডা– একদম ঠিক কথা। কিন্তু জয়েন্ট ফ্যামিলির মেয়েরা যখন পরীক্ষার আগের দিন কোনও ঘরে জায়গা না পেয়ে রান্নাঘরে মলিন তেলচিটে ৪০ ওয়াটের বালবের আলোয় পড়তে বাধ্য হয়, তখন তার মনে হয, একটু নিরিবিলি দরকার! একটু প্রাইভেট স্পেস। যখন ১২ বছর বয়সে অপটু মেয়ের পিরিয়ড হয়, তখন নিজের শরীরের বদলের দিকে সে মন দিতে পারে না। তাকে দক্ষ হয়ে উঠতে হয়, বাড়ির এতগুলো লোকের মাঝে সে যেন কখনও না অসাবধান হয়ে পড়ে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় কোনও চিহ্ন যেন না থাকে। পেটব্যথা করলে বলতে হয়, মাথাটা একটু ধরেছে। দরকারে বাথরুম খালি না পেলে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। দাগ লেগে যাওয়ার ভয়। তখন তার একটু প্রাইভেট স্পেস-এর প্রয়োজন হয়। 
যখন সে বহু দিনের প্র্যাকটিসে প্রায় সবার সামনে কামিজ ছেড়ে বাড়ির জামা ফেলা আয়ত্ত করে নেয় কোনও আব্রু না সরিয়ে, তখন সে বিজয়ীর হাসি হাসে। প্রথমে হাত দুটো খুলে নিয়ে বুকের কাছে জামাটা জমিয়ে রাখতে হবে। তার পর যে জামাটা পরতে হবে সেটাকে মাথা দিয়ে গলিয়ে হাত দুটো পরে নিতে হবে। এ বার পরা জামাটার গলার মধ্যে দিয়ে আগের জামাটা টেনে বার করে নিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় শরীরের প্রায় কোনও অংশ আদুড় না করে জামা ছাড়া হয়ে যাবে। এটা কিন্তু একটা আর্ট। মধ্যবিত্ত জয়েন্ট ফ্যামিলির মেয়েরাই এটা পারে।  কিন্তু তখনও তো তার নিরন্তর মনে হয়, জামা ছাড়ার জন্য আসলে একটা প্রাইভেট স্পেস দরকার। 
এত কিছুর পরেও সে হঠাৎ অত্যন্ত ভাগ্যবানের মতো, বসন্তকালের পড়ন্ত রোদে জানলার ওপর খাটের পাশে কয়েক মিনিট একলা সময় পেয়ে যায়। তখন তার অনুভূতির লকার থেকে টুপটাপ বেরিয়ে পড়ে ঝুমকোলতা, জড়োয়ারা। কিন্তু তাদের নিয়ে যে খানিক নাড়াচাড়া করবে, তার প্রেমে তপতপ হৃদয় সে কাকে দেবে তা নিয়ে বিবেচনা করবে, অদেখা প্রেমাস্পদকে ভেবে শিউরে উঠবে, তা কি হওয়ার উপায় আছে? মিনিট কয়েকের মধ্যে হরে মুরারের মতো কেউ এসে জুটবে এবং প্রশ্নবাণ চালু। ‘অ্যাই তুই জানলার ধারে অমন মুখ করে বসে আছিস কেন রে? মন খারাপ? কী হয়েছে বল না। অ্যাই তুই প্রেম করছিস না কি?’ তখন উত্তর দিতে হয়, ‘না তো, এমনিই বসে আছি। আর চুপচাপ আনমনে বসে থাকা মানেই কি প্রেম করা? আশ্চর্য তোমাদের সব চিন্তাভাবনা।’ মধুর একাকিত্বে দাঁড়ি টেনে ফের লেগে পড়তে হয় দন্ত বিকশিত করার কাজে। “নিজের জন্য সময়” ছিনিয়ে নিয়ে যায় প্রিয়জনের ভালবাসা কিংবা উদ্বেগ কিংবা কৌতূহল। 
মনের এ সব আবেগকে প্রশ্রয় দিতে মেয়ে এক দিন শুরু করে ডায়রি লেখা। এক দিন-দুদিন কেবল নিঃশব্দ নজরদারি চলে, তার পর যেমন-তেমন কথা শুরু। “ও মা, তুই রোজ ডায়রি লিখছিস বুঝি? খুব ভাল অভ্যেস। রোজ যা যা হবে লিখে রাখবি, কে এসেছিল, স্কুলে কী হল, কে কী বলল। পরে যখন বড় হয়ে পড়বি, দেখবি কেমন ভাল লাগবে।” মেয়ে ভাবে, সে তো ভেবেছিল তার জমানো মনের কথা, আমির খানকে পাওয়ার স্বপ্ন, লাল রঙের প্রতি ঘন আকর্ষণ আর শরীরের উত্তেজনার কথা লিখবে। এ তো মহাবিপদে পড়া গেল। সে ভেবেছিল, তার উঠতি বয়সের মনটাকে সে ডায়রির পাতায় বন্দি করবে, জমিয়ে রাখবে আর বয়সকালে তা থেকেই দু-চামচ তুলে আচমন সারবে। মেয়ে বোঝে, কী লিখবে-র সাজেশন-এর মধ্যে আসলে লুকিয়ে আছে, কী লিখবে না-র চেতাবনি। ভুলেও প্রেমের কথা ভেবো না, প্রেম করা তো দূরের কথা। ভুলেও নিজের ভাললাগা, নিষিদ্ধ চাহিদাকে প্রশ্রয় দিয়ো না। কারণ পৃথিবীতে ফুচকা আর টকজল ছাড়া অন্য কোনও তামসিকতায় তোমার অধিকার নেই। তার ধারণা বিশ্বাসে পরিণত হয়, যখন বোঝে, তার অনুপস্থিতিতে, তার ডায়রি পড়া হয়ে গিয়েছে। তার গোপন আর গোপন নেই। মায়ের মুখ থমথমে। কথায় কথায় ঝাঁঝ। সাপ্তাহিক পরীক্ষার খাতায় দু-নম্বর কাটা গেলেই বকুনি উড়ে আসছে, “সব সময় কাব্যি না করে, একটু জীবনবিজ্ঞান পড়লেও তো পারো। কবিতা সবার দ্বারা হয় না। আর মনে রেখো তুমি কোন বাড়ির মেয়ে।” বুঝতে অসুবিধে হয় না, এ সব বাক্যের উৎস কোথায়। বন্ধ হয় ডায়রি লেখা। ডায়রি কেউ পড়বে না, এ গ্যারান্টি জয়েন্ট ফ্যামিলিতে কেউ দিতে পারে না। গোপনীয়তার নেই মালিকানা…
আর বিয়ের পর তো সবই জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট। লকার, ব্যাঙ্ক, ইমেল, ফেসবুক পাসওয়ার্ড, বেড়াতে যাওয়া, এসএমএস, সব, সঅঅঅব। আমার আশাপূর্ণা দেবীর সুবর্ণলতার কথা মনে পড়ে যায় বার বার, যে সুবর্ণলতা দক্ষিণের বারান্দার জন্য হেদিয়ে গিয়েছিল, আর নতুন বাড়িতে সেই বারান্দাটুকুই করে দেয়নি তার স্বামী। বারান্দা থেকে সে ছিল বঞ্চিত জীবনের দীর্ঘ কাল। 
এখন যারা ছোট মেয়ে, উঠতি মেয়ে, তরুণী কন্যা, তারা নিশ্চয়ই প্রাইভেসি পায়। তাদের কাছে এ সব ঘটনা নিশ্চয়ই অলীক ঠেকবে। আশা করি তারা দরজা বন্ধ করে স্বমেহনে মজে যেতে পারবে। যে সব মেয়েদের বাথরুমের সময় সাকুল্যে সাড়ে তিন মিনিট ছিল, তারা সেটুকুই বা পেল কই? 

Advertisements
Previous articleপ্রত্যেককে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক; কিন্তু কাউকে বিশ্বাস না করা আরও বেশি বিপজ্জনক–আব্রাহাম লিংকন
Next articleদূরবিনে চোখ রেখে দ্যাখো
সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়
সঞ্চারী মুখোপাধ্যায় হাসিখুশি, এমনকী যখন সেই মোড-এ থাকেন না, নিজেকে ঠেলে হিঁচড়ে হিহিহোহো’তেই ল্যান্ড করানোর চেষ্টা করেন। জাপটে ভালবাসেন আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সিরিয়াল, গান, রাস্তায় নেড়িবাচ্চার লটরপটর কান। পড়াশোনার সময় ফিল্ড করেছেন, হাতুড়ি দিয়ে পাথর ভেঙেছেন, গ্রামবাসীদের তাড়া খেয়েছেন, এক বার পাহাড় থেকে অনেকটা হড়কে পড়ে মুচ্ছো গেছিলেন, উঠে দেখেন, কবর! এক বার ম্যানেজমেন্ট কোর্সের অঙ্গ হিসেবে চিন গেছিলেন, রাত্তির দুটোয় সাংহাইয়ের রাস্তায় হারিয়ে গিয়েও কাঁদেননি। ফিউজ সারাতে পারেন, পাখার কার্বন বদলাতে পারেন, কাগজের চোঙ পাকিয়ে গাড়িতে পেট্রল ঢালতে পারেন, চিনেবাদাম ছুড়ে দিয়ে মুখে নিপুণ লুফতে পারেন। ব্যাডমিন্টন খেলার ইচ্ছে খুব, কিন্তু জায়গা ও র‌্যাকেট নেই। অরোরা বোরিয়ালিস যারা দেখেছে, তাদের একাগ্র ভাবে হিংসে করেন। দেশের বাড়িটা উনি বড় হওয়ার পর ছোট হয়ে গেছে বলে, আর আমির খান এক বার কার্টুন এঁকে দিয়েছিলেন— সে কাগজ হারিয়ে গেছে বলে, জেনুইন কষ্ট পান। এক বার ঈগলের রাজকীয় উড়ান আগাগোড়া খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন।

4 COMMENTS

  1. জয়েন্ট ফ্যামিলি কেন শুধু, ছোট্ট ২ বেডরুমের ফ্ল্যাটে কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে ৫-৬ জন বাইরের “আত্মীয়” এসে হাজির হয়ে পড়লেই এই প্রবলেমগুলো ছেলেদেরও হয় যথেষ্টই। তারা তো সব সময় আদুড় গায়ে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে না যার তার সামনে। অমনি চেহারা নিয়ে চোরা ফুট কাটা শুরু হয়ে যাবে। প্রাইভেট স্পেসের দরকার ছেলেদেরও লাগে। জয়েন্ট ফ্যামিলিতে যারা পড়াশুনো করে বড় হয়েছেন চকারিতে প্রতিষ্ঠিত, তাদের সত্যিই কুর্নিশ করি আমি। আমাকে সে উৎপাত পোয়াতে হয়নি সামগ্রিকভাবে, কিন্তু ওই, উৎসব অনুষ্ঠানে লোকের ভিড় হলেই টেরটি পেয়েছি। বাইরের লোকই সবই দেখে যাবে তোমার আগাপাস্তলা কিসে টাইম লাগে কী করো ইত্যাদি। আপনি মেয়ে বলে তাদের দিকটা থেকেই লিখলেন, কিন্তু খুবই রিলেট করলাম ছেলে হয়েও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.