(Pramatha Nath Bishi)
বইবাজারে শ্রেষ্ঠ গল্পের যখন বেজায় কাটতি, তখনই প্রকাশিত হল ‘প্র না বি-র নিকৃষ্ট গল্প’। ১২৫ বছরে প্রমথনাথ বিশীকে ফিরে দেখতে গেলে অচেনা পথে হাঁটার এমন সব প্রবণতাই মুখ্য হয়ে ওঠে। সে বই প্রমথনাথ উৎসর্গ করেছিলেন প্রয়াত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে। উৎসর্গপত্রে লিখে দিয়েছিলেন, ‘উৎকৃষ্ট গল্পের লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতির উদ্দেশে এই নিকৃষ্ট গল্পগুলি উৎসর্গীকৃত হইল।’
‘প্র না বি-র নিকৃষ্ট গল্প’ তাঁর মৌলিক সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বমূলক বই নয়। সে তালিকায় জ্বলজ্বল করছে ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’, ‘লালকেল্লা’, ‘সিন্ধুনদের প্রহরী’ বা ‘বঙ্গভঙ্গ’। ওই সমালোচনা-টুকরিও তাঁর সমালোচনা সাহিত্যে কিছুই নয়। দৃষ্টিকোণ আজ কিছুটা সেকেলে হলেও, রবীন্দ্র-সরণী, রবীন্দ্রকাব্যপ্রবাহ, রবীন্দ্রনাট্যপ্রবাহ, বাংলা সাহিত্যের নরনারী বা বঙ্কিম সরণী আজও লুপ্ত হয়ে যায়নি। তবু যে তাঁর জন্মদিনে প্রথমেই মনে এল ওই নিকৃষ্ট গল্পের কথা, তার কারণ আজ লুপ্তপ্রায় এক বাঙালিমনের পরিচয় আছে সে বইয়ে।
আরও পড়ুন: অ্যালেনের চোখে ভারতবর্ষ
সে বাঙালি নিজেকে নিয়ে হাসতে জানত। সদাই সে ত্রাসে মরত না। সোজা কথার তিরটা ছুঁড়তে পারত সোজা করেই, নিজের দিকে হলেও। সেই অর্জুনরা আজ নেই। কী সাহিত্যে, কী রাজনীতিতে। প্রনাবি-রা তাই আজ প্রায় প্রাগৈতিহাসিক। খোপবন্দি ছিলেন না তাঁরা। প্রমথনাথ বিশী (১৯০১-১৯৮৫) একইসঙ্গে ছিলেন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, এবং রাজনীতিক। গদ্যের দীপ্তি, প্রখর রসবোধ, গভীর পাণ্ডিত্য এবং ইতিহাস-সাহিত্যের অনায়াস বিচরণ আজও তাঁর সৃজনজীবনে জীবন যোগ করে।
নিজে সমালোচক ছিলেন। কিন্তু সে-কালে পত্রপত্রিকায় বইয়ের সমালোচনা যেভাবে হত, তা নিয়ে প্রখর ব্যঙ্গ করতে ছাড়েননি। ভূমিকার বদলে ওই নিকৃষ্ট গল্পের বইয়ের গোড়াতেই থাকল ‘সংক্ষিপ্ত আলোচনার আদর্শ’। সেখানে সরাসরি লিখে দিলেন, ‘কংগ্রেস ভলান্টিয়ার যেমন কিছুদিন পরে কংগ্রেস সমিতির সেক্রেটারি, এবং তারপরে নির্বাচনপ্রার্থী দেশসেবক, সংক্ষিপ্ত সমালোচকের বিবর্তন ঠিক সেইরূপ। প্রথমে সংক্ষিপ্ত সমালোচক, তারপরে বিস্তৃত গল্প লেখক, তারপরে একেবারে গ্রন্থকার। নিন্দা করিতেছি ভাবিও না— আমিও ঐ বিবর্তন ধরিয়া চলিয়াছি। কাজেই তোমার দুঃখ ও সমস্যা আমি না বুঝিব তো কে বুঝিবে?’

প্রমথনাথ বিশীর জন্ম ১৯০১ সালের ১১ জুন (২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৮ বঙ্গাব্দ) ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত তৎকালীন রাজশাহি জেলার (এখন বাংলাদেশের নাটোর) জোয়াড়ি গ্রামে। বিশী পরিবার ছিল সে কালের রাজশাহির অন্যতম সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত পরিবার। পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকেই নলিনীনাথ-সরোজবাসিনীর পুত্র প্রমথনাথ সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন। তবে নলিনীনাথ আসলে ছিলেন রায়। বাড়ি ছিল নাটোরের কাছে করচমাড়িয়া গ্রামে। জোয়াড়ির বিশী বংশের ন’তরফের জমিদার কেশবনাথ বিশী ছিলেন অপুত্রক। নলিনীনাথকে তাঁরা দত্তক পুত্র করেন। তখন থেকে নলিনীনাথ এবং তাঁর উত্তরপুরুষেরা রায় থেকে হলেন বিশী।
প্রমথনাথের জীবনে সবচেয়ে বড় বাঁক আসে যখন নলিনীনাথ তাঁকে শান্তিনিকেতনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯১০ সালে, শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৭ বছরের সেই আশ্রমজীবন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রত্যক্ষ শিষ্যত্ব তাঁর মনে এনে দিয়েছিল খোলা মাঠের খেলা। কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, তখন থেকেই তাঁর মধ্যে উন্মেষ ঘটেছিল স্বাধীন চিন্তাশক্তির। তারই জোরে রবীন্দ্রনাথের সস্নেহ প্রশ্রয়ে অঙ্কে শূন্য পেয়েও উতরে গিয়েছিলেন একবার। ভারি মজার সে ঘটনা। ১২ বছর বয়সে একবার এক অঙ্কের পরীক্ষার খাতায় সবকটি অঙ্কের ভুল উত্তর দিয়েও কবিতা লিখে এসেছিলেন, ‘হে হরি, হে দয়াময়,/ কিছু মার্ক দিয়ো আমায়,/ তোমার শরণাগত,/ নহি সতত,/ শুধু এই পরীক্ষার সময়’।
সময়, সমাজ এবং চাহিদা-জোগানের খেলা আজও তো এই দুই পেশাতেই নিরন্তর নিজের সঙ্গে আপোস দাবি করে। আর সেই অসঙ্গতি থেকে জন্ম হয় হাসির, প্র. না. বি. যার এক অদ্বিতীয় রূপকার।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা শেষ করে প্রমথনাথ উচ্চশিক্ষার জন্য এলেন কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এমএ পাশ করে গেলেন শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু তিনি শান্তিনিকেতনেও আটকে থাকেননি কোনওদিন। সেখানে পড়তে পড়তেই লিখেছেন যাত্রাপালা ‘বিরাটরাজার গোগৃহ’, লিখে শান্তিনিকেতন প্রেসে নিজের খরচে ছাপিয়ে বিশ্বভারতীর ছাত্রদের নিয়ে অভিনয় করেছেন। সে যাত্রার বিষয় কী? শান্তিনিকেতন আশ্রমই যেন বিরাট রাজার গোগৃহ। রাজা বিরাট, তাঁর গোশালা বিরাট, কিন্তু ভাল গরুর অভাব। তার দু-একটি গান তখন আশ্রমে মুখে মুখে ফিরত।
এ হেন প্রমথনাথ শান্তিনিকেতনে থেকে অধ্যাপনার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। এলেন কলকাতায়। তারপরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রামতনু লাহিড়ী বৃত্তি নিয়ে গবেষক, পরিভাষা কমিটির সহ-সম্পাদক, রিপন কলেজের অধ্যাপক। পাশাপাশি ‘যুগান্তর’-এ আংশিক সময়ের সহযোগী সম্পাদক। এরই মধ্যে কলেজের চাকরি ছেড়ে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে চলে এলেন। বছর চারেক পরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগ্রহে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসাবে যোগ দিলেন। অবশ্য খবরের কাগজের লেখালেখিও চলছিল, ‘কমলাকান্ত শর্মা’ নামে দপ্তর লিখেছেন ১৯৭১ পর্যন্ত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র অধ্যাপকও হয়েছিলেন। জীবনের রঙ্গমঞ্চে এই দুই ভূমিকা নিয়ে মজা করে বলেছিলেন, সাংবাদিকতা মূর্খের পাণ্ডিত্য, অধ্যাপনা পণ্ডিতের মূর্খামি।

মজা করেই বলা, তবু কথাটা ভেবে দেখার মতো। এর মধ্যে কোথাও হয়তো লুকিয়ে আছে দুই পেশাতেই যা করতে চান, তা করতে না-পারার হতাশা। সময়, সমাজ এবং চাহিদা-জোগানের খেলা আজও তো এই দুই পেশাতেই নিরন্তর নিজের সঙ্গে আপোস দাবি করে। আর সেই অসঙ্গতি থেকে জন্ম হয় হাসির, প্র. না. বি. যার এক অদ্বিতীয় রূপকার। ওই ছদ্মনামে লেখা তাঁর বইগুলোর নামেই আছেন সেই আর এক প্রমথনাথ— ‘গালি ও গল্প’, ‘হনুমানের স্বপ্ন’, ‘মৌচাকে ঢিল’, ‘প্রনাবির পঞ্চক’। তাঁর বিষাদ-মধুর কবিতাগুলিতেও কি সেই অসঙ্গতিরই আর এক সম্প্রসারণ? যেমন, ‘শয্যা-বল্লভ’, ‘জ্যোৎস্নাঢালা শয্যাপরে/ শুভ্র নীলিমার/ একটি পাশে একলা শুয়ে চাঁদ;/ তারার পাখী ধরার লাগি/ পাতা সে নির্জনে/ সুধায় মাখা ক্ষুধায় ভরা ফাঁদ। / তেমনি তুমি পড়েছ শুয়ে/ এলায়ে দেহভার/ ব্যাকুল-বাহু অগাধ বিছানায়,/ বন্ধু সম বিশ্বাসেতে/ রেখেছ তব গাল/ হংস-শাদা বালিশটিতে হায়।’
নাটকও লিখেছিলেন তিনি। সে সবে ছায়া পড়েছিল জর্জ বার্নার্ড শ-র। জর্জ বার্নার্ড শ জি. বি. এস., তিনি প্র. না. বি.। তবে কবিতার মতো নাটকেও তাঁর হাতেখড়ি রবীন্দ্রনাথে। রবীন্দ্রনাথের ‘রথযাত্রা’, যা পরে ‘কালের যাত্রা’ এবং ‘রথের রশি’ হবে, তার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘আমার স্নেহাস্পদ ছাত্র শ্রীমান প্রমথনাথ বিশীর কোনও রচনা হইতে এই নাট্যদৃশ্যের ভাবটি আমার মনে আসিয়াছিল’।
প্রমথনাথ লিখছেন, ‘ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করিয়া যখন আমি বিশ্বভারতীর ছাত্ররূপে পুরাতন রঙ্গমঞ্চে নূতনভাবে অবতীর্ণ হইলাম তখন রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পাইবার সৌভাগ্য ঘটিল। আমি নাটক লিখি জানিয়া আমাকে নাটক লিখিয়া আনিবার একটি গল্প বলিয়া দিলেন।
আর প্রমথনাথ লিখছেন, ‘ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করিয়া যখন আমি বিশ্বভারতীর ছাত্ররূপে পুরাতন রঙ্গমঞ্চে নূতনভাবে অবতীর্ণ হইলাম তখন রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পাইবার সৌভাগ্য ঘটিল। আমি নাটক লিখি জানিয়া আমাকে নাটক লিখিয়া আনিবার একটি গল্প বলিয়া দিলেন। আমি খুব দ্রুত লিখিতে পারিতাম, তিন চারদিনের মধ্যে একখানা নাটক লিখিয়া তাঁহাকে দেখাইলাম। পড়িয়া তিনি মুখে মুখে পরিবর্তন করিয়া দিলেন এবং খাতাখানা নিজের কাছে রাখিয়া দিয়া পুনরায় লিখিয়া আনিতে বলিলেন। পুনরায় লিখিয়া দেখাইলাম। আবার কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়া তৃতীয়বার লিখিতে বলিলেন। তৃতীয়বার লিখিয়া দেখাইলাম, এবার স্বহস্তে কাটাকুটি আরম্ভ করিলেন। কাটিয়া পরিবর্তন করিয়া স্বয়ং কিছু লিখিয়া একরূপ দাঁড় করাইলেন। নাটক-রচনা শিক্ষার ইহাই আমার একমাত্র শিক্ষানবিশি। ইহাতে আমার চোখ খুলিয়া গেল’।
হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোনওখানে…প্রমথনাথ বিশীর মন বোধহয় এই অস্থিরতায় বেঁচে থেকেছে আজীবন। তাই কেবল সাহিত্যিক বা শিক্ষাবিদই নয়, যুক্ত হলেন প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গেও। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৮ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ রাজ্যসভার সদস্য। তখনও সাহিত্যিকের রসবোধ হারিয়ে ফেলেননি, সভায় তাঁর বক্তব্যগুলিই তার প্রমাণ।

প্রমথনাথ বিশী আসলে এক নন, অনেক। নিয়েছিলেন ১৪টি ছদ্মনাম— নীহারিকা, শ্রী বিষ্ণু শর্মা, প্র. না. বি., স্কট টমসন, শ্রী অমিত রায়, কস্যচিৎ, কমলাকান্ত শর্মা, তিব্বতীবাবা, শ্রী মর্কট, হাতুড়ী, শ্রী মূর্খোত্তম, মাধব্য, রামকহল শর্মা, শ্রী নীলকণ্ঠ শর্মা। সেই অনেক প্রমথনাথ নানা সময়ে প্রকাশিত হতেন বিবিধ ছদ্মনামে। নিজের নামের আদ্যক্ষর সাজিয়ে গড়েছিলেন সেই বিখ্যাত স্বাক্ষর ‘প্র. না. বি.’। সম্ভবত জর্জ বার্নার্ড শ-র ‘জি. বি. এস.’ অনুকরণেই। যদিও বাংলা সাহিত্যে রঙ্গলাল বা রবীন্দ্রনাথের হাতে এমন সংক্ষেপণের ইতিহাস বিরল নয়। আশাপূর্ণা দেবী এই বিচিত্রনামার দারুণ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন প্রমথনাথ প্রকৃষ্ট নামে বিশারদ, প্রচ্ছন্ন নামে বিখ্যাত, প্রত্যক্ষ নামে বিদ্বেষী।
উপন্যাস বা গবেষণামূলক গভীর রচনার বদলে ব্যঙ্গাত্মক নাটক, ছোটগল্প ও বিচিত্র প্রবন্ধের জন্যই তিনি তুলে রেখেছিলেন ওই ছদ্মনামটি। প্রমথনাথের বিশ্বাস ছিল, মানুষকে অশ্রুসজল করা সহজ, কিন্তু নিখাদ হাসির জোগান দেওয়া বড় কঠিন কাজ। বাঙালির জীবনে সেই সুপ্ত কৌতুক জাগাতেই তাঁর ওই আড়াল নেওয়া। ব্যঙ্গের কষাঘাতে মানুষের অসঙ্গতি ও দুর্বলতাকে চিহ্নিত করলেও তাঁর সেই হাসির গভীরে থাকত এক শাণিত জীবনদর্শন।
কোথাও গোপাল ভাঁড়, কোথাও নারদ, কোথাও ফলস্টাফ, কোথাও ডন কুইকসোট তিনি। নন্দগোপাল সেনগুপ্ত যেমন বলেন, ‘মিষ্ট কথা, ইষ্ট কথা, শিষ্ট কথা সব তিনি বলেন হাসির ছিটে দিয়ে। বাঁকা কথা চোখা কথাতেও বাদ পড়ে না এটা।’
লর্ড বায়রনের ‘ডন জুয়ান’-এর রেশ ধরে তিনি একটি বিদেশি ঢঙের ছদ্মনাম বেছে নিয়েছিলেন। এই আড়ালেই আট খণ্ডে জন্ম নেয় তাঁর শাণিত ব্যঙ্গ-কাব্য ‘মনজুয়ান’। তৎকালীন গতানুগতিক আধুনিকতা ও জনপ্রিয়তার ফ্যাশনকে বিঁধেছিলেন। যে সব সাহিত্যিক কেবল লোকরঞ্জনের নেশায় নিজেদের মৌলিকত্ব বিসর্জন দিতেন, তাঁদের প্রতি ছিল তাঁর এই তির্যক কাব্য। বিশেষত সে সময়ের আধুনিক গদ্য কবিতার নিরাবেগ ও তথ্যভারাক্রান্ত রূপটিকে কঠোর আক্রমণ করেছিলেন।

এই একশো পঁচিশ বছরে জি.বি.এস. (জর্জ বার্নার্ড শ)-এর অনুসরণে ছদ্মনাম নেওয়া প্র. না. বি.র কোন পরিচয়টা আজও দীপ্তিমান হয়ে থাকবে? সরস, বিচিত্র বাঙালির উৎকৃষ্ট পরিচয়। যে বাঙালি ছাত্রবৎসল, ‘উইটি’ বক্তা ও মজলিশি। বাউপস্থিতবুদ্ধি, কৌতুক ও ব্যঙ্গে মেশানো যাঁর আশ্চর্য কথালাপ যে কোনও আসরকে জমিয়ে দেয়। সেই সব জমজমাট আসরের লুপ্ত দিনের সুপ্ত স্মৃতি ঘুমিয়ে আছে এ কলকাতায়— শনিবারের চিঠি ও বঙ্গশ্রীর আপিসে, মিত্র-ঘোষের দোকানে, পুলিন সেনের জিলেপি ক্লাবে বা রবিবাসরে। কোথাও গোপাল ভাঁড়, কোথাও নারদ, কোথাও ফলস্টাফ, কোথাও ডন কুইকসোট তিনি। নন্দগোপাল সেনগুপ্ত যেমন বলেন, ‘মিষ্ট কথা, ইষ্ট কথা, শিষ্ট কথা সব তিনি বলেন হাসির ছিটে দিয়ে। বাঁকা কথা চোখা কথাতেও বাদ পড়ে না এটা।’
বাঙালির এই নিকৃষ্ট গল্পে ভরা সময়ে তার ছায়া আজ আর পড়ে কি!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত