(Child Labour In India)
“সার, আমায় আবার ভর্তি নেবেন স্কুলে?’, বছর খানেক স্কুলছুট থাকার পর আমারই এক ছাত্রী মায়ের সঙ্গে স্কুলে ফিরে এমন আব্দারটাই করল আমাকে।
আমি আশ্বস্ত করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “এই যে এক বছরের বেশি স্কুল ছেড়ে তামিলনাড়ুতে থাকলি, সেখানে ভর্তি হোসনি কেন স্কুলে?”
ওর মা মুখের আঁচল সরিয়ে আগেভাগেই বললেন, “ওখানের স্কুলে তামিলে পড়ায় সার। ভর্তি নিলে না। তাই বাড়িতেই রাখেছিলাম।”
আমি আবার আমার ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, “সবাই যখন স্কুলে যেত, তুই সারাদিন কী করতিস তখন?”
সে খানিক চুপ থেকে বলল, “ভাইরে দ্যাখতাম। খাওয়াতাম। ভাত ফুটাতাম!”
-“বিকেলে খেলতিস না?”, জিজ্ঞাসা করাতে যেন একটু অভিমানের সঙ্গেই বলল, “আমার তো ওখানে কোনও বন্ধু হয়নি সার! মা-বাবা দুজনেই কাজে যেত!”
সেই দিনই ভর্তি নিয়েছিলাম ছাত্রীটিকে!

সুন্দরবন অঞ্চলের এই ছবিটা, এই কথোপকথন একদমই নতুন নয়। পুরুলিয়া, দিনাজপুর, পাহাড়, চা-বাগান, নদী, সমুদ্র-উপকূলের বহু জেলার, বহু স্কুলের এমন ছবি আসলে অনেক এবং অনেকবারের। এক-দেড় বছর ড্রপ আউট হয়ে যাওয়া ছাত্রীরা কেউ কেউ ফিরে আসলেও, অনেকে তো স্কুলেই ফেরে না। ফোনে কিছুদিন কথা বলার পর, ওইসব পরিবারের সিম কার্ড পাল্টে যায়। ফলে, ছিন্ন হয় যোগাযোগ।
এই রাজ্যে, এই দেশে এমন অজস্র পরিযায়ী শ্রমিকের ছেলেমেয়েদের শৈশব এভাবেই ‘গুম’ হয়ে যায় সকলের অজান্তে। এই শিশুরা পরিবারের সদস্যদের দ্বারাই এক একটা গভীর ‘প্রচ্ছন্ন’ শিশুশ্রমে জুড়ে যায়। আর, হারিয়ে ফেলে তাদের অপূর্ব শৈশব-বসন্তগুলো!
কোভিড প্যান্ডেমিক বা নির্বাচন প্রাক্কালে, পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কথা হয়। তাঁদের ‘ভাতা’ নিয়ে চর্চা হয়। কিন্তু এই অজস্র পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের শিশুদের, শিশুশ্রমের ফাঁদে পড়ে, শৈশব চুরির কথাগুলো অনালোচিত আর উপেক্ষিত থেকে যায়।
পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও মধ্যপ্রদেশের গ্রামীণ এলাকায় বহু শিশুদের দিয়ে মাঝেমধ্যেই স্কুল বন্ধ করিয়ে বিড়ি বাঁধার কাজ করানো হয়। ফলে ক্ষতবিক্ষত হয় ওদের ফুসফুস। পাথর খাদানে, কয়লা খাদানে শৈশব হারানো শিশুদের ফুসফুসের মারণব্যাধি ‘সিলিকোসিস’-এ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটাও নেহাত কম নয়। সুতোর সূক্ষ্ম কাজ বা কার্পেট বোনার জন্য শিশুদের ছোট আঙুলকে এখনও কোথাও কোথাও ব্যবহার করা হয়। উত্তরপ্রদেশ বা তামিলনাড়ুর ছোট কাপড়ের কারখানায় এই শিশুদের অন্ধকার ঘরে দীর্ঘক্ষণ কাজ করানো হয়। জুতোয় আঠা লাগানো, পালিশ করা বা চামড়া কাটার কাজে কেমিকেলের মধ্যে শিশুরা কাজ করে। আজও গ্রামাঞ্চলে চাষের জমিতে কীটনাশক ছড়ানো এবং পটল খেতে বীজ পরাগায়নের কাজে কমবয়সি শিশুদের সস্তায় খাটানো হয়। চার দেওয়ালের আড়ালে, চুপিসাড়ে এমন অজস্র শিশুশ্রমের ঘটনা নাগরিক সমাজের চর্চার বাইরে থেকে যায়।
কোভিড প্যান্ডেমিক বা নির্বাচন প্রাক্কালে, পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কথা হয়। তাঁদের ‘ভাতা’ নিয়ে চর্চা হয়। কিন্তু এই অজস্র পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের শিশুদের, শিশুশ্রমের ফাঁদে পড়ে, শৈশব চুরির কথাগুলো অনালোচিত আর উপেক্ষিত থেকে যায়।

ভিনরাজ্য থেকে ফিরে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের শিশু সন্তানদের জন্য ক’টি ‘কমিউনিটি কোচিং সেন্টার’, ক’টি ভ্রাম্যমাণ-স্কুল সরকারি উদ্যোগে চালু হয়েছে? নির্মাণ শ্রমিকদের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য বার্ষিক ‘স্কলারশিপ’ দেওয়ার যে সরকারি ব্যবস্থা আছে, তার আবেদন কীভাবে হয়, কত টাকা পাওয়া যায়— এই নিয়ে প্রচারের সদিচ্ছা কারা দেখান?
কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, আমাদের দেশের ‘ই-শ্রম’ পোর্টালে ৩০ কোটিরও বেশি অসংগঠিত শ্রমিক নিবন্ধিত (রেজিস্টার্ড) আছেন। কোথায় পরিযায়ী শ্রমিকের কতটা ঘনত্ব রয়েছে, এই পোর্টালের এই তথ্য থেকে জানা যায় তা-ও।
রাজ্য সরকারের এই ২১.৫ লক্ষ ছাড়াও, কেন্দ্র সরকারের ই-শ্রম পোর্টালে পশ্চিমবঙ্গের মোট ২.৬৪ কোটিরও বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অসংগঠিত শ্রমিক রেজিস্টার্ড আছেন। তাদের একটি বড় অংশ আন্তঃরাজ্য ও অভ্যন্তরীণ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে গণ্য হন।
পূর্বতন সরকার থাকাকালীন পশ্চিমবঙ্গে শ্রম দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কর্মসাথী বা পরিযায়ী শ্রমিক পোর্টাল-এ নথিভুক্ত ছিলেন ২১.৫ লক্ষের বেশি মানুষ। রাজ্য সরকারের এই ২১.৫ লক্ষ ছাড়াও, কেন্দ্র সরকারের ই-শ্রম পোর্টালে পশ্চিমবঙ্গের মোট ২.৬৪ কোটিরও বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অসংগঠিত শ্রমিক রেজিস্টার্ড আছেন। তাদের একটি বড় অংশ আন্তঃরাজ্য ও অভ্যন্তরীণ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে গণ্য হন। এই সমস্ত পরিবারের শিশুদের কর্মস্থলে যাতায়ত ঘটছে মানে, শিশুশ্রমের প্রভূত সম্ভাবনাই ঘনাচ্ছে।
ভিন রাজ্যে দীর্ঘকালীন চিকিৎসা করতে যাওয়া পরিবারের শিশুরাও শিশুশ্রমে যে যুক্ত হচ্ছে— তা নানা খবরে উঠে আসছে। ভেলোর (তামিলনাড়ু), মুম্বই বা দিল্লির এইমসের মতো বড় হাসপাতালগুলোর বাইরে ফুটপাতে বা সস্তা ধর্মশালায় থাকা পরিবারের শিশুরা অনেকেই নিরাপদ নয়। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো যখন ক্যানসার, হার্টের অসুখ বা লিভারের জটিল চিকিৎসার জন্য ভিন রাজ্যে যাচ্ছেন, অনেকেই তখন জমানো টাকা শেষ হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন বা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন। এই সমস্ত পরিবারের এই রকম হঠাৎ আর্থিক দুর্যোগে ছোটদেরও উপার্জনের পথ খুঁজতে পথেও নামতে দেখা গেছে। শিশুশ্রমের হাত ধরেই শিশুদের যৌন নির্যাতন এবং শিশুপাচারের শত শত ঘটনা ঘটে চলেছে আজও।

একুশ বছরের আয়ু নিয়ে জন্মানো এক বাঙালি কবি লেখেন, “জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে/ চলে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব-”, কিন্তু যাবার আগে দৃঢ় অঙ্গীকার এই যে- “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি!”
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, দেশভাগের প্রেক্ষাপটে করা বাঙালি কবির সেই অঙ্গীকারটি, বা আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা বা জাতিসংঘের ‘শিশুশ্রম’-কে চিরতরে বিলুপ্ত করার অঙ্গীকারের মধ্যে অমিল তো নেই!
ভারতের ২০১১ সালের জনগণনা ও বিভিন্ন সরকারি বিশ্লেষণে ব্যবহৃত পরিসংখ্যান বলছে, এই দেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১ লক্ষ। অর্থাৎ, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ মোট শিশুশ্রমিকের মধ্যে ১ জন আজ ভারতীয় শিশু!
শুধু এতগুলো দশক পেরিয়ে, সেই অঙ্গীকার শুধুই কি কাব্যের পঙক্তিতে থেকে গেল? না, পৃথিবীর অন্যান্য মিথ্যা অঙ্গীকারগুচ্ছের মতোই রয়ে গেল আজও? “শিশুশ্রম বিরোধী আরেকটি দিবস” হয়েই সে জমা থাকবে ক্যলেন্ডারের পাতায়? “শিশুশ্রম” আজ কোথায় কতটা রয়ে গেল এই রাজ্যে, এই দেশে বা দেশান্তরে— সব রাষ্ট্রকে, সংবেদনশীল, উন্নত পৃথিবীর মানুষকে, তার উত্তর যে দিতেই হবে!
২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানের বৈশ্বিক সম্মেলনে ‘শিশুশ্রম’-কে শূন্যতে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতির পরেও, এই বিশ্বে, আইএলও এবং ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, শিশু শ্রমিকের সংখ্যা আজ ১৩ কোটি ৮০ লক্ষ। ভারতের ২০১১ সালের জনগণনা ও বিভিন্ন সরকারি বিশ্লেষণে ব্যবহৃত পরিসংখ্যান বলছে, এই দেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১ লক্ষ। অর্থাৎ, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ মোট শিশুশ্রমিকের মধ্যে ১ জন আজ ভারতীয় শিশু! সরকারি এই পরিসংখ্যানটাই সবটা নয়। তার বাইরেও, শিশুশ্রমের অদৃশ্য জালে কত শিশুর সোনালি ভবিষ্যৎ, কত ভয়ংকর অন্ধকারে যে মুড়ে আছে, তা এখনও অনেকের অজানা, অচেনা এবং খানিকটা হয়ত নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের ‘সিলেবাস বহির্ভূত’ বিষয়!

এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত অসমের গুয়াহাটির পাঞ্জাবাড়ি এলাকার একটি ঘটনায় জানা গেল, ১৩ বছরের এক নাবালিকা পরিচারিকাকে পুলিশি অভিযানের হাত থেকে লুকোতে মালিকপক্ষ তাকে খাটের ভিতরের বাক্সে ২৫ মিনিট আটকে রেখেছিলেন। এমন ঘটনায় গলা পাকিয়ে ওঠে যেকোনও সংবেদী মানুষের। কিন্তু সেই নাবালিকার শৈশব মূলস্রোতে ফিরল কি না সে খবর আজ অপ্রকাশিত!
ওএনজিসি-র বড় অফিসার দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের টাস্ক ফোর্স এক নাবালিকাকে উদ্ধার করেছিল, তাঁদের বাড়ির শৌচাগারের ভেতর থেকে। উদ্ধারের পরেই জানা যায়, সেই নাবালিকাকে দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কম মজুরিতে বা প্রায় বিনে পয়সায় পরিচারিকা বা গৃহকর্মী হিসেবে আটকে রেখেছিলেন তাঁরা।
ভারতের মোট শিশুশ্রমিকের অর্ধেকেরও বেশি বাস করে আমাদের দেশের মাত্র ৫টি রাজ্য— উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র-এ।
গোটা দেশ যখন বন্ডেড লেবার বা বন্ধক শ্রম প্রথা (বিলোপ) আইনের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছিল, এই পশ্চিমবঙ্গেই, গত ফেব্রুয়ারি মাসে, নদীয়া জেলার আড়ংঘাটার ‘মণি ইটভাটা’ থেকে চামরু মাঝি, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের বন্ধক শ্রম থেকে মুক্ত করা হয়। চামরু মাঝির সন্তানেরা মধ্যযুগীয় সেই দাসত্বের শিশুশ্রম থেকে আদৌ কি মুক্ত হতে পেরেছিল?
এই কিছুদিন আগেও, দক্ষিণ ২৪ পরগনার পোলেরহাট থানার রাজনৈতিক উত্তাপে কত মানুষ হাত সেঁকেছেন। সেই থানার অন্তর্গত টোনা গ্রামের দুটি ইটভাটায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ যৌথভাবে অতর্কিত হানা দিয়ে দেখতে পান, বিহার ও ওড়িশা থেকে পাচার করে আনা ২৮ জন শিশুকে চরম অমানবিক পরিস্থিতিতে খাটানো হচ্ছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের বয়স মাত্র ৩-৪ বছর! পুলিশ এই শিশুদের উদ্ধার করে হোম ও চাইল্ড লাইনের হেফাজতে পাঠান, এবং মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এই পর্যন্ত জানা যায়। তারপর?

আড়ালে থাকা এই অসংখ্য খবরগুলির ভিতর শিশুশ্রমিকের পরিসংখ্যানই শুধু বাড়ে, এবং বাড়তে বাড়তে আমাদের দিকে তাক করে প্রশ্ন তোলে, আর কত বার, কত দিন, আর কত দশক লাগবে?
ভারতের মোট শিশুশ্রমিকের অর্ধেকেরও বেশি বাস করে আমাদের দেশের মাত্র ৫টি রাজ্য— উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র-এ।
মাত্র এক মাসের ব্যবধানে, বিহারের ৩৮টি জেলার ২২২টি হোটেল, ধাবা, মোটরের গ্যারেজ এবং চায়ের দোকানে পুলিশ ও চাইল্ডলাইনের স্পেশাল টিম হানা দিয়ে মোট ১২২ জন শিশুকে উদ্ধার করেছে, এই বছরের মে মাসে। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের দরিদ্র পরিবার থেকে ‘গ্ল্যামার’ বা সিনেমার লোভ দেখিয়ে ১২-১৪ বছরের মেয়েদের পাচার করে বিভিন্ন অর্কেস্ট্রা দল এবং দিল্লির কিছু স্পা ও মাসাজ পার্লারে ১২-১৮ ঘণ্টা আটকে রেখে, উত্তেজক পোশাকে নাচতে ও অসামাজিক কাজ করতে বাধ্য করা হত!
সিএলপিআর আইন ১৯৮৬ সালে পাশ হলেও, শিশুদের সুরক্ষার্থে ২০১৬ সালে তাকে সংশোধন করে আরও কঠোর করা হয়েছে। তাকে মাঠে-ময়দানে, খাদানে, চা-বাগানে নামানোর একশো ভাগ নিশ্চয়তার সময় এসেছে আজ।
মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট এইসব বিনোদনের নাম করে, শিশু নিগ্রহ এবং শিশুশ্রমকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু যে শৈশবগুলির রঙিন বসন্তগুলো চুরি হয়ে গেল, ছিঁড়ে কুটিকুটি করে দেওয়া হল— তার মেরামত কীভাবে হবে? প্রশ্নগুলো যতটা কঠিন, উত্তরগুলোও ততটা অজানা!
২০১৯ সালে বিশ্বজোড়া প্যান্ডেমিকের সময় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার স্লোগান ছিল— শিশুদের মাঠে কাজ করা উচিত নয়, বরং স্বপ্নের পেছনে ছোটা উচিত। আর এ বছরের শিশুশ্রম বিরোধী দিবসের প্রাক্কালে, মারাক্কেশ সম্মেলন থেকে মূল স্লোগান ঠিক করা হয়েছে— শিশুশ্রমে লাল কার্ড: শিশুদের জন্য ন্যায্য সুযোগ, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শোভন কাজ!
আরও পড়ুন: শিশুদিবস ২০২২: দু-চার কথা
দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ও ভাতার ব্যবস্থা করা, সেই পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পর্যাপ্ত জীবিকা ও উপযুক্ত কাজের পরিবেশ তৈরি করা, যাতে তারা শিশুদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল না হয়, এবং শিশুশ্রম প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাই এই মুহূর্তের আশু কাজ।
সিএলপিআর আইন ১৯৮৬ সালে পাশ হলেও, শিশুদের সুরক্ষার্থে ২০১৬ সালে তাকে সংশোধন করে আরও কঠোর করা হয়েছে। তাকে মাঠে-ময়দানে, খাদানে, চা-বাগানে নামানোর একশো ভাগ নিশ্চয়তার সময় এসেছে আজ। ১৪ বছরের কমবয়সি শিশুদের যেকোনও ‘ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে’ যেকোনও ধরনের পেশায়, কারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে যেমন কাজ করানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তেমনই পারিবারিক ব্যবসা বা কৃষিকাজে সাহায্য করতে হলে, তা অবশ্যই স্কুল ছুটির পর বা ছুটির দিনে হতে হবে— এই নিশ্চয়তাকে কড়া চোখে দেখুক প্রতিটি স্কুল, স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় পঞ্চায়েত-পুরসভা, এবং নাগরিক সমাজ।
সাহেব-ই-আলম হোক, মুকেশ হোক, কিংবা “আমায় আবার ভর্তি নেবেন স্কুলে?”—বলা আমার সেই ছাত্রীটি; প্রত্যেকের শৈশব রক্ষা করাই মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব।
বিদ্যালয়ের অভিভাবকসভাতে অভিভাবকদের দায়িত্ব দেওয়া হোক। দায়িত্ব নিক প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি দফতর। বিনোদন জগত বা অডিওভিস্যুয়াল শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে, নিয়ম লঙ্ঘন হলে, কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতেই হবে আইনের পথ ধরে।
পেন্সিল পোর্টাল বা ‘প্ল্যাটফর্ম ফর এফেক্টিভ এনফোর্সমেন্ট ফর নো চাইল্ড লেবার’-কে কাগুজে বাঘ না বানিয়ে, সমস্ত স্তরের মানুষদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে আমাদের। ভারতের সাধারণ নাগরিক যদি কোনও দোকানে, কোনও কারখানায় বা কোনও বাড়িতে শিশুশ্রম ঘটতে দেখতে পান, তবে তিনি সরাসরি পেন্সিল পোর্টাল-এ অনলাইনে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন— এই অধিকারের কবচ সবাইকে তুলে নিতে হবে— এই অঙ্গীকারটুকুই আজ থেকে হোক। আনিস জং-এর লেখা ‘লস্ট স্প্রিং: স্টোরিজ অফ স্টোলেন চাইল্ডহুড’ গল্পগুলির প্রেক্ষাপটকে মুছে দিতে পারার মধ্যেই শিশুশ্রম বিরোধী দিবসের সার্থকতা। সাহেব-ই-আলম হোক, মুকেশ হোক, কিংবা “আমায় আবার ভর্তি নেবেন স্কুলে?”—বলা আমার সেই ছাত্রীটি; প্রত্যেকের শৈশব রক্ষা করাই মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
জোরালো লেখা। খুব দরকারি। পুলোকবাবু ও বাংলালাইভকে অভিনন্দন।