বুড়ো ইস্ত্রিওয়ালা আর চঞ্চলচন্দ্রকে নিয়ে কথা চলতে লাগল। জানি বুড়োর ব্যবহার খুব খারাপ ছিল। ডাকু সেই কারণেও নতুন একটা কমবয়সী লোক পেয়ে ওকে জবাব দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু খারাপ ব্যবহারের কারণ তার শরীর। পরিশ্রম করার ক্ষমতা চলে গিয়েছিল। আহা রে, দুটো ভাত পাচ্ছে, তাও সহ্য করবে না নীলমাধব। আমি যে নীলমাধবের কথায় সায় দিইনি, এতে সে আমার উপর বিরক্ত। কোনওরকম বিরোধিতা সে পছন্দ করে না। মতের বিরুদ্ধে কথা ওর পছন্দ না। এই তো কিছুদিন আগে এক কবি জেলে ঢুকেছেন রাষ্ট্রবিরোধী কবিতা লেখার দায়ে। নীলমাধবের মতে একেবারে ঠিক কাজ, সরকারের খাবে পরবে, আবার তার নিন্দা করবে, এমন হতে পারে না। জামিন ফামিন কেন হবে, কবিতা দিয়ে দেশের কী হয়? ধান হয় না ইস্পাত হয়!
– সরকারের খাবে পরবে কেন? আমি মৃদু প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলাম।
– তাহলে কার খায় লোকে? তুমি যে পেনশন পাও অনুতোষ, সরকারই তো দেয়? না দিলে? দাপটের সঙ্গে বলল নীলমাধব।
– আমি ব্যবসা করে খাই। সরকারকে ট্যাক্স দিই। সরকার আমাকে খাওয়াচ্ছে কীভাবে? কার্তিক দত্ত বলেছিল।
– সরকার যদি ইচ্ছে করে দোকান তুলে দিতে পারে। সকলে সরকারের অধীন।
– যে লোকটা কুলির কাজ করে, ইস্তিরি টানে, রিকশা চালায়, কামারশাল চালায়, তাকে সরকার খাওয়ায় কী করে? জিজ্ঞেস করেছিল গুণেন সরকার।
কার্তিক দত্তও মাথা নেড়েছিল। মানেনি নীলমাধবের কথা। নীলমাধব বলেছিল:
– সরকার পারে। বিনা বিচারে বিশ বছর জেলে আটকে রেখে ছেড়ে দিতে পারে, সে ক্ষমতা আছে। কত লোক জেলে আছে বলুন! যারা সরকারের বিরোধিতা করবে, তাদের কেন ছেড়ে কথা বলবে? আমার খাবে পরবে, আমার বিরোধিতা করবে, আমি তোমাকে আদর করব? রিকশা চালাত সইফুদ্দিন, তাকে মেরে ঠ্যাঙ ভেঙে দিয়েছিল পুলিশ। এখন ভিক্ষে করে তা জানো? পুলিশ মানেই সরকার।
আরও পড়ুন: অর্ক পৈতণ্ডীর অনুবাদে: জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমাল ফার্ম: পর্ব ১
আমি এইসব অদ্ভুত যুক্তি থেকে দূরে থাকি। দরকার নেই। কার ভিতরে কী আছে জানি না। নীলমাধব কি আমার পেনশন বন্ধ করে দিতে পারে? জানি না। সফল না হলেও ঝামেলায় ফেলতে পারে। যদি ধরা যাক ব্যাঙ্কে রিপোর্ট করে, অনুতোষ চৌধুরী মারা গেছে, তখন আমাকে গিয়ে দরখাস্ত করে প্রমাণ করতে হবে আমি বেঁচে আছি। এমনি ঘটনা হয়েছিল নাকি কোথায় একটা। খবরের কাগজে পড়েছিলাম। তাঁরা স্বামী স্ত্রী বিদেশে মেয়ের কাছে গিয়েছিল। ঈর্ষান্বিত প্রতিবেশী বলেছিল স্বামী স্ত্রী দুজনেই রোড অ্যাক্সিডেন্টে…। কেউ যদি কারও ক্ষতি করতে চায়, তা করতে অসুবিধে খুব বিশেষ হয় না।
ক্ষতি করা খুব সহজ, উপকার করা কঠিন। সুতরাং চঞ্চলচন্দ্র নিয়ে যা বলব অন্যকে বলব, নীলমাধবকে নয়। বয়স হলে মানুষ অসহায় হয়ে কাউকে না কাউকে অবলম্বন করতে চায়। আমি কি নীলমাধবকেই ধরে আছি? তাহলে বাড়ি বসে জুড়ানের কথা শুনি কীভাবে? নীলমাধবের বিপক্ষে কথা বলতে কি ইচ্ছে হয় না? শুনতে ইচ্ছে হয় না? আমি যে পেনশন পাই তা আমার অধিকার। সরকার কে সেখানে? কাজ করেছি, রক্ত জল করেছি খেটে, তাই বেঁচে আছি। হ্যাঁ, বেঁচেই আছি মনে হয় জুড়ান, সুমিতাভ মৈত্র কিংবা গুণেন সরকারের সঙ্গে কথা বললে। বা তাঁদের কথা শুনলে।
একদিন সুমিতাভ মৈত্র নীলমাধবের মুখের উপর বললেন:
– ভাল কাজই করছেন চঞ্চলচন্দ্র।
– কিসের ভাল? লোকটাকে নিজের ঘরে ডেকে নেয় চঞ্চলচন্দ্র, নোংরা একটা ভিখিরি। নীলমাধব ক্ষুব্ধ গলায় বললেন:
– আপনি হলেন বুদ্ধিজীবী, লোকে যা বলবে তার বিপক্ষে আপনারা বলবেনই। সরকার এখন বুদ্ধিজীবীদের কেয়ারই করে না।
– চঞ্চলচন্দ্র যা করছেন তা ওঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। ওঁর যদি অসুবিধে না হয়, তাহলে কার কী বলার আছে? সুমিতাভ মৈত্র বললেন।
– আমি নিষেধ করেছি। নীলমাধব বললেন।
– আমাকে বলবে তো, আমি আবাসন সমবায়ের সেক্রেটারি। আমি অ্যাপ্রুভ না করলে এসব কাজ হতে পারে না।
সুমিতাভ মৈত্র চুপ করে থাকলেন। নীলমাধবের সঙ্গে তর্ক করবেন কেন, বরং ‘আচ্ছা আসি’ বলে নিষ্ক্রান্ত হলেন। যেদিকে চঞ্চলচন্দ্র গেছেন সেইদিকে হাঁটলেন। আমার মনে হচ্ছিল সুমিতাভ মৈত্রর সঙ্গে যাই। না। যেতে পারলাম না। নীলমাধব আমার যাওয়া পছন্দ করবে না। বরং নীলমাধবের পক্ষে কিন্তু চঞ্চলচন্দ্রের বিপক্ষে নয়, এমন একটি কথা গুছিয়ে বললাম:
– হাউজিংয়ে ভিখিরি প্রবেশ নিষিদ্ধ তো সব জায়গায়, উনি হয়তো জানেন না। আমি কি ওঁকে বলে আসব?
– আপনি বলবেন কেন? আপনি কি হাউজিংয়ে মেম্বার? জিজ্ঞেস করল নীলমাধব।
– না তা নয়। ওঁকে তো বলা দরকার। আমি বোঝাতে চাইলাম যে আমি নীলমাধবের পক্ষে।
– আপনার পেয়ারের লেখক তো, সাপোর্ট করলেন লোকটাকে। ক্ষুব্ধ গলায় বলল নীলমাধব।
কার ভিতরে কী আছে জানি না। নীলমাধব কি আমার পেনশন বন্ধ করে দিতে পারে? জানি না। সফল না হলেও ঝামেলায় ফেলতে পারে। যদি ধরা যাক ব্যাঙ্কে রিপোর্ট করে, অনুতোষ চৌধুরী মারা গেছে, তখন আমাকে গিয়ে দরখাস্ত করে প্রমাণ করতে হবে আমি বেঁচে আছি। এমনি ঘটনা হয়েছিল নাকি কোথায় একটা। খবরের কাগজে পড়েছিলাম।
এবার আমি চুপ করে থাকতে পারলাম না। বললাম:
– লেখকরা অন্য রকম হন, মানবিক।
– মানবিক আবার কী? আমরা কি অমানবিক? ওসব করতে হলে বস্তিবাড়িতে গিয়ে থাকুন।
ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে নীলমাধব।
– আসলে কী, লোকটা নিজেই সাসপিসিয়াস। জানেন তো ওইসব ভিখিরি টাইপ লোক চোর হয়, তবু গোপন কারণে ফ্ল্যাটে নিয়ে আসে চঞ্চলচন্দ্র? ও চুরি করত বিশ্বাস লন্ড্রিতে, কে না জানে? নীলমাধব বলল।
– বিশ্বাস লন্ড্রির ডাকু কি তাই বলেছে? আমি সাহস করে জিজ্ঞেস করি।
– ডাকুকে জিজ্ঞেস করে দেখুন। চুরি করুক না করুক, আমাদের একটা সিকিউরিটি আছে। আমি সিকিউরিটি গার্ডকে বলে দিয়েছিলাম না ঢুকতে দিতে। কিন্তু চঞ্চলচন্দ্র নিজে বলেছে তার পরিচিত, সে যদি তার গেস্ট নিয়ে আসে তবে কে কোন আইনে আটকাবে? অদ্ভুত ব্যাপার বলুন তো, লোকটাকে আমরা চিনি ভাল করে। আপনারাও সকলে চেনেন। কিন্তু বিশ্বাস নেই, যা চলছে চাদ্দিকে! ভিখিরি গেস্ট? পাগল নাকি! নীলমাধব গজগজ করতে লাগল।
হতে পারে না। বলতে গিয়েও আমি বললাম না। মনে মনে চঞ্চলচন্দ্রর সমর্থক হয়ে যাচ্ছি আমি। অথচ মানুষটা আমাকে চেনেন না। আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলিনি কোনওদিন। নীলমাধব বলতে লাগল, বাড়িটি মানে ওই হাউজিং কমপ্লেক্স তাদের। তার কথাই শেষ কথা। ভিখিরি অনুপ্রবেশ সে বন্ধ করবেই। বাড়ি যখন প্রোমোটারকে দেওয়া হয়েছিল, বলাই হয়েছিল মুসলমান চলবে না। অনুপ্রবেশকারী কিনা প্রমাণ হবে কী করে। আর গোরুর মাংস ঢুকবে মণিমালিকা আবাসনে, তাও মেনে নেওয়া হবে না। সেইমতোই চলছিল, মাঝখান থেকে ওই ভিখিরি এসে সব নিয়ম ভেঙে দিল। ও তো মুসলমান!
আরও পড়ুন: অর্ক পৈতণ্ডীর অনুবাদে: জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমাল ফার্ম: পর্ব ২
শুনতে শুনতে আমরা কোনও কথা বলি না। হ্যাঁ, মূল বাড়ি তাঁদের ছিল এ তো সকলে জানে। এখন নেই। তার আগে ও বাড়িটা ছিল কাকলি গানের বাড়ি। তার আগে…। শ্যামাশ্রী সেই কাকলি গানের বাড়িতে গানের খাতা আর স্বরলিপি নিয়ে যেত। শ্যামাশ্রী বড় গায়িকা হয়ে আবার ফিরে আসবে গ্রামের বাড়ি থেকে, তাও ভাবতাম আমি। কিন্তু তা হয়নি। মাঝেমধ্যে মনে পড়ে শ্যামাশ্রীর কথা। নীলমাধব শ্যামাশ্রীর স্মৃতি ধ্বংস করে দিয়েছে। গানের বাড়ি ভেঙে দিয়েছে। শ্যামাশ্রীর স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে। তা কি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব? পৃথিবী আগে যেমন ছিল, তেমন কি আর হতে পারে না? হতে পারে কল্পনায়। একটা গল্প পড়েছিলাম, অন্য এক গ্রহে সব আগের মতো সাজিয়ে দিয়েছে সেই গ্রহের মানুষ। তুমি গিয়ে কৈশোর কিংবা যৌবন খুঁজে পেলে। খুঁজে পেলে কাকলি গানের বাড়ি আর শ্যামাশ্রীকে। শ্যামাশ্রীর বাবা বেঁচে আছেন কিংবা নেই। শ্যামাশ্রীরা এখান থেকে চলে গেছে সেখানে। আমাদের আবার দেখা।
– শ্যামাশ্রী ঠিকানা দিয়ে যাও। আমি হাত বাড়িয়েছিলাম।
– না অনুতোষ। মনে কর আমি এক হাসপাতালে যাচ্ছি, রোগটা সারবে না। শ্যামাশ্রী মৃদু গলায় বলেছিল।
– ইস, তুমি ছুটি সিনেমার কথা বলছ! আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল।
শ্যামাশ্রী মাথা নিচু করে বিড়বিড়িয়ে বলেছিল:
– গ্রামে আমাদের শরিকি বাড়ি, চাষের জমি, মা সামান্য পেনশন পাবে। কলকাতায় বাড়িভাড়া দিয়ে থাকার উপায় নেই। আমাদের গ্রামে গানের ইস্কুল নেই, কাকলি গানের বাড়ি নেই, আমি তো স্যানেটোরিয়ামে যাচ্ছি অনুতোষ। আমার আর গান হবে না।
– কী যে বল শ্যামাশ্রী, গান নিয়েই তুমি কলকাতায় ফিরে আসবে।
সুমিতাভ মৈত্র চুপ করে থাকলেন। নীলমাধবের সঙ্গে তর্ক করবেন কেন, বরং ‘আচ্ছা আসি’ বলে নিষ্ক্রান্ত হলেন। যেদিকে চঞ্চলচন্দ্র গেছেন সেইদিকে হাঁটলেন। আমার মনে হচ্ছিল সুমিতাভ মৈত্রর সঙ্গে যাই। না। যেতে পারলাম না। নীলমাধব আমার যাওয়া পছন্দ করবে না। বরং নীলমাধবের পক্ষে কিন্তু চঞ্চলচন্দ্রের বিপক্ষে নয়, এমন একটি কথা গুছিয়ে বললাম: হাউজিংয়ে ভিখিরি প্রবেশ নিষিদ্ধ তো সব জায়গায়, উনি হয়তো জানেন না। আমি কি ওঁকে বলে আসব?
সন্ধ্যা নেমে আসছিল। আমরা রেডিও পার্ক যেখানে ছিল, রেডিও ট্রান্সমিশন টাওয়ার, তাকে ঘিরে হাঁটছিলাম। রাস্তায় আলো জ্বলে উঠছে। তখন ইলেকট্রিক বাল্বের পরিবর্তে বাতিদণ্ডে টিউবলাইট লেগেছে সবে। সাদা আলোয় রাস্তার অনেকটা দেখা যাচ্ছিল। শ্যামাশ্রীর সঙ্গে শেষ দেখা সেইদিন। আমরা হাঁটছিলাম। মনে মনে গাইছিলাম, ‘এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর।’ শ্যামাশ্রীর সঙ্গে আমি গলা মেলাচ্ছিলাম। বিধুর আলো ঘিরে রেখেছিল আমাদের। হেমন্তের শিশির ঝরছিল। শ্যামাশ্রী বলল:
– আমার ওই জায়গাটায় যেতে খুব ইচ্ছে করে। বাবা নিয়ে যাবে বলেছিল।
– কোন জায়গা? আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।
– ওই যে পশ্চিম, ছোট ছোট পাহাড়, ঢেউ খেলানো মাটি…।
– সিনেমায় যেমন ছিল? আমি বলেছিলাম।
– আমার আর কোথাও যাওয়া হবে না অনুতোষ। শ্যামাশ্রী বলেছিল।
সেই প্রথম আমার নাম উচ্চারণ করেছিল শ্যামাশ্রী। বহুতল হওয়ার আগে ওই বাড়ি যে গানের ইস্কুল ছিল, তা মনে রেখেছি আমি। আর সকলে ভুলে গেছে। এই তো সেদিন কার্তিক বলল, ভুলে গেছি। কত কী ছিল, কত কী নেই, এখন কিছুই বলার নেই। কিন্তু বাড়ি যে তাদের ছিল, তা ভুলতে পারে না নীলমাধব। আবাসনের প্রবেশপথে শ্বেতপাথরে তার বাবা, মা ও তার নাম লেখা আছে। তার অধিকার আছে প্রাক্তন হিসেবে। আমার মনে হল, নীলমাধব পালোধীরা সত্যিকারের অনুপ্রবেশকারী। গানের বাড়িতে ঢুকে স্বরলিপি তছনছ করে দিয়েছে। যদিও চঞ্চলচন্দ্র নামের ব্যক্তিটি ঠিক কাজ করছেন না। আবাসনের একটি নিয়ম থাকেই। সকলে একসঙ্গে থাকলে সকলের কথা ভাবতে হয়। কিন্তু আমার মনে হতে লাগল, ঠিক করছেন তিনি। কাকলি গানের বাড়ি ধ্বংসের শোধ নিচ্ছেন।