(Samaresh Basu)
তাঁর ভবঘুরে যাপনের মতোই সমরেশ বসুর পড়াশোনাও কখনোই বইয়ের পাতায় আটকে থাকেনি। ক্লাসরুমে বসে যখন অন্য ছাত্ররা অঙ্কের নিয়ম বুঝতে ব্যস্ত, তখন তিনি পালিয়ে যেতেন বাইরের সেই জগতে, যে জগৎকে কোনও গণ্ডিতে বাঁধা যায় না। ভাইকে নিয়মে ফেরানোর জন্য, দাদাকে নানা ফন্দি ফিকির করতে হত প্রায়ই!
১১ ডিসেম্বর, ১৯২৪ বিক্রমপুরের রাজনগরে তাঁর জন্ম। গানের গলা ছিল অপূর্ব। বাঁশির ঘর ভোলানো তান তাঁকে টানত, আর আঁকার হাত ছিল অনায়াস, সাবলীল। চারপাশের সবুজ, কাদা-গন্ধ, ফসলের মাঠ, বন্ধুদের দল— এসবই তাঁর প্রথম ইশকুল।
মন বেঁধে রাখতে না-পারার গল্পে যেমন নতুন নতুন অধ্যায় আসে, এখানেও এল। দাদা তাঁকে নৈহাটিতে নিয়ে গেলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মস্থান, জ্ঞানচর্চার প্রাচীন ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ সেই নৈহাটি। পড়াশোনার পর আশপাশের কলকারখানায় কাজ জুটে যাওয়ার আশ্বাসও আছে। এত শেকল দড়ির আয়োজন সত্ত্বেও, তাঁর মনকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অনুশাসনে বাঁধা গেল না।
অষ্টম, তারপর নবম— শ্রেণি বদলাল, কিন্তু মন বারবার খাঁচা ভেঙে উড়াল দেয়। তিনি বুঝেছিলেন— গণ্ডিবদ্ধ পাঠ তাঁর জন্য নয়। আর তখনই জীবনের অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকরা এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। বদলাল জীবনের গতিপথ। বন্ধুরা দশ ক্লাসের পড়াশোনা নিয়ে যখন মশগুল বা নাজেহাল, জীবনের একটি জটিল বাঁকে, ঢুকে পড়লেন সমরেশ একটু আগেভাগেই, গৌরীর হাত ধরে। বাড়ির নিশ্চিন্ত পরিবেশ থেকে অজানা, কঠিন এক পথে তাঁর হাত ধরে বেরিয়ে পড়া এই কিশোরীকে নিয়ে দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব, আট আনার কাজ, সেলাইয়ের টাকার ওপর সংসার— এই জটিল দিনগুলো তাঁকে সত্যিকারের জীবন-পাঠ শিখিয়েছিল।
ভিডিও: বাংলা কথাসাহিত্যের হীরে-‘মানিক’ – জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
ইছাপুর বন্দুক কারখানা, হাতুড়ি-নেহাইয়ে তাঁকে গড়েপিটে নিল। কারখানার কাজ, শ্রমিক-নেতা সত্যপ্রসন্ন দাশগুপ্তের সংস্পর্শ, শ্রমিকদের দাবিদাওয়ার পোস্টার লেখা— এই-সবই তাঁকে শ্রমজীবী মানুষের খুব কাছে নিয়ে গেল। তাদের ঘাম ঝরানো, খিদে, আশঙ্কা, প্রতিবাদ— এসবই দেখলেন তাদের জীবনের নাড়ির স্পন্দন শুনতে শুনতে।
এই অভিজ্ঞতা সিঞ্চিত হল তাঁর লেখায়। ‘আদাব’ থেকে ‘পাড়ি’, ‘নয়নপুরের মাটি’ থেকে ‘শ্রীমতী কাফে’— সেই জীবনানুভব চারিয়ে গেল তাঁর অসংখ্য গল্প-উপন্যাসে। অভাব, শোষণ, গ্লানি আর বঞ্চনার চাকায় ঘুরতে থাকা শ্রমজীবীদের জীবন আর তার বিরুদ্ধে তাদের নাছোড় লড়াই, প্রতিবাদ— এসব তাঁর কলমে হয়ে উঠল সময়ের ইতিহাস।
সমরেশ বসুর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে সীমা অতিক্রমের গল্প— মহিমের জমিদারবাড়ির অনুগ্রহ প্রত্যাখ্যান, তেঁতলে-বিলাসের সমুদ্রমুখী নৌকা, আর লছমনের ‘দু’পয়সার আন্দোলন’। গণ্ডি তাঁর কাছে যেন, কখনোই অলংঘ্য পাঁচিল নয়, নিজেকে পেরিয়ে যাওয়ার হাতছানি।
পরাজয় যে নতুন উত্থানের সূচনা তিনি তা বিশ্বাস করতেন। রুহিতন বা অন্য চরিত্ররা হয়তো লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হেরে যায়, তবু তাঁদের স্বপ্নের বীজ পড়ে থাকে পরবর্তী প্রজন্মের চেতনায়। সমরেশ বসুর কলম সেই সবুজ সম্ভাবনার বীজতলা দেখিয়েছে আমাদের।
ভিডিও: মুক্তারামের রামকথা – জন্মদিনে শিবরাম
লোকজীবনের গভীরে পৌঁছোনোর তীর্থপথে আত্মপ্রকাশ করল তাঁর আর এক সত্তা—কালকূট। বাহ্যত ঈশ্বর কিন্তু আসলে নিজের খোঁজে বেরিয়ে পড়া মানুষগুলোর বিশ্বাস, ভক্তি, আর্তি, প্রশান্তি আবার তাদের ক্ষুদ্রতা, ব্যর্থতা— এ সবকিছুর ওপরেই যেন এক আশ্চর্য মায়াময় হাত রাখেন তিনি। বাইরের আর ভেতরের অসংখ্য ভ্রমণ কী আশ্চর্য মেলবন্ধনে মিশে যেতে থাকে কালকূটের আখ্যানে।
কালকূট ধর্মবিশ্বাসী নন, মানবধর্মে দীক্ষিত। পথচলার ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দেওয়া অমৃত তিনি খুঁজে পান, জীবনের নানা বিচিত্র জটিল কঠিন পথে পাড়ি দেওয়া মানুষের পদচিহ্নে, পায়ে জল ঢালা নিঃসঙ্গ অবলা বাগদিনীর প্রণামে।
প্রাণপাত পরিশ্রম করেছিলেন তাঁর শেষ উপন্যাসটির জন্য। রামকিঙ্কর বেজকে কেন্দ্র করে তাঁর শেষ উপন্যাস শেষ করে যেতে পারেননি। অনন্ত জীবনকে ছোঁয়ার তীব্র আকুতি আর স্রষ্টার সীমায়িত জীবনের সংঘাতেই তো তৈরি হয় সময় অতিক্রম করে যাওয়া শিল্পসৃষ্টি।
ধুলোপথের পথিক মানুষের সহযাত্রী এবং সেই পথের এই আশ্চর্য ক্ষমতাবান কথকের জীবনাবসান হয় ১৯৮৮’র ১২ মার্চ। আজ তাঁর জন্মদিনে আমাদের বিনম্র প্রণাম।
বাংলালাইভ একটি সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ওয়েবপত্রিকা। তবে পত্রিকা প্রকাশনা ছাড়াও আরও নানাবিধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকে বাংলালাইভ। বহু অনুষ্ঠানে ওয়েব পার্টনার হিসেবে কাজ করে। সেই ভিডিও পাঠক-দর্শকরা দেখতে পান বাংলালাইভের পোর্টালে,ফেসবুক পাতায় বা বাংলালাইভ ইউটিউব চ্যানেলে।
