(Jolke Chol 16)
সকালে মেয়ের সঙ্গে কথা বলার পর থেকে শিপ্রার মন ভাল নেই। আজকাল ফোন করে কিছু বলতে গেলেই সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী মত পোষণ করে। যেন বুঝিয়ে দিতে চায়, মা হিসেবে কখনও কোনও দায়িত্ব সে পালন করেনি তার প্রতি। স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা আজও যেখানেই দেখা হয় পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলে- দিদি আজ যেটুকু করে খাচ্ছি সব আপনার জন্য। আপনার মতো কোনও টিচার আমাদের এত ভালবাসত না।
শিপ্রার মন ভরে ওঠে আনন্দে তাদের কথা শুনে। অথচ নিজের মেয়েটাই কেমন পালটে যাচ্ছে। সেদিনও রাইকে নিয়ে কথা প্রসঙ্গে রেগে উঠল। আমাকে তো খালি মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিতে, নিজে ঝাড়া হাত-পা হয়ে ছাত্র পড়াবে বলে। ভেবেছিলে, কখনও যে তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমার কষ্ট হত কিনা!
আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪) (১৫)
– আমি তোকে পাঠাতাম? না, তুই দাদু দিদা এলেই চলে যাওয়ার জন্য বায়না করতিস?
– আমি যা বায়না করতাম তুমি শুনতে সব?
– শোনার মতো না হলে শুনব কেন?
– কোনও কিছুই শুনতে না মা। প্রত্যেকে শনি রবিবার পড়ার ছুটি পেত। আমাকে তুমি ছুটি দিতে?
– পড়ার কোনও ছুটি হয় না। এটা প্রতিদিনের রুটিন। তুই কি খাবার, স্নান, ঘুম এগুলো থেকে ছুটি চাইতিস? ওগুলো আমাদের রোজকারের অভ্যাস। ঠিক তেমনি নিয়ম করে পড়াটাও অভ্যাস। তাতে তোর খারাপ কি কিছু হয়েছে? কত ভাল রেজাল্ট করেছিলি সেটা ভেবে দেখ।

– রেজাল্ট ভাল করে কী হয়েছিল মা? সেই তো বিয়ে আর সংসার।
– ভুলে যাচ্ছিস বিদেশে গিয়ে সেই রেজাল্টের ওপরই এম.বি.এ পড়ার সুযোগ পেয়েছিলি।
– সে আমি এমনিও পেতাম।
– তুই যদি মনে করিস প্রতি পদে আমার ভুল ধরবি, তাহলে কিছু বলার নেই।
– তোমার সত্যিই কিছু বলার নেই। আমার মামার বাড়ি গিয়ে থাকতে কত কষ্ট হত। বড়মামি রোজ আলুভাজা আর রুটি করত, সকালেও সেই এক ভাজা ডাল মাছ আর ভাত। কেউ মনে রাখত না আমি মাছ খাই না। তুমি জানতে চেয়েছ কখনও?
– এমনভাবে কথা বলছিস যেন সারা বছর তুই শান্তিপুরেই থাকতিস! যেতিস তো বছরে দু-তিনবার। তাতেও যাবার চার-পাঁচদিনের মাথায় তোকে বাবা আনতে চলে যেত। সে তো থাকতেই পারত না তোকে ছেড়ে।
– বাবা আমাকে ভালবাসে মা। তুমি নিজের কথা বলো।
– তুই বুঝি সেই জন্য রাইকে আমাদের কাছে পাঠাস না? ভাবিস আলুভাজা আর রুটি খেতে দেব?
মা মেয়ের এই ঝগড়া মান অভিমান বাইরের ঘর থেকে শুনত ঋতম। উঠে এসে ফোনটা কেড়ে নিত শিপ্রার থেকে। তারপর মোহনাকে বলত- এবারের ‘সাগরিকা’ বেশ ভাল লাগল। তোর মা তো সম্পাদকীয় পড়েই মুগ্ধ। কতবার যে বলল- মেয়েটা বাংলাটা বড় ভাল লেখে।
– মা রাই ওর আম্মার সঙ্গে ভাল থাকে। তিনি রাইয়ের যত্ন নেন। তুমি তো রাই জন্মাবার পরে একদিনও স্কুল ছুটি নাওনি। সিজারিয়ান বেবি নিয়ে আমাকে চলে আসতে হল শ্বশুরবাড়ি। আর তারপর তো একেবারে দেশের বাইরে। অথচ সব বন্ধুদের দেখেছি সন্তানের বাচ্চা হলে মায়েরাই সামলাতে যায়।
– আমি তো কিছু তোর জন্য করিনি। তুই রাইয়ের জন্য কর। তাহলে আমার বয়সে এসে রাইয়ের থেকে তোকে এতগুলো কথা শুনতে হবে না।
মা মেয়ের এই ঝগড়া মান অভিমান বাইরের ঘর থেকে শুনত ঋতম। উঠে এসে ফোনটা কেড়ে নিত শিপ্রার থেকে। তারপর মোহনাকে বলত- এবারের ‘সাগরিকা’ বেশ ভাল লাগল। তোর মা তো সম্পাদকীয় পড়েই মুগ্ধ। কতবার যে বলল- মেয়েটা বাংলাটা বড় ভাল লেখে।
মোহনা বলল- বাংলা না পারলে মায়ের মারগুলো আজও ভুলিনি বাবা।
– তা যাই বল, তোর মায়ের মতো শিক্ষক পাওয়া চারটিখানি ব্যাপার নয়। আচ্ছা বল কবে আসছিস? রবিবার চলে আয়, মটন বিরিয়ানি আর রেজালা আনাব।
– তুমি আবার এসব খাচ্চ?
– খাই না তো! তাই তুই এলে খাব বলছি।
মোহনার সঙ্গে এসব কথা বলে প্রসঙ্গ বদলায় ঋতম।
কিন্তু শিপ্রার মন ভারাক্রান্ত লাগে। অভ্যাসের বশে মেয়েকে রোজ ফোন করে ঠিকই। তবু যেন একটা অভাব অনুভব করে।
তাছাড়া এই অঞ্চলে শিক্ষক হিসেবে তার যথেষ্ট সুনাম। ঋতম একটু আত্মভোলা হলেও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বেশ ভাল। ব্যাঙ্কে চাকরি করার সময় বহু বেকারের লোন, বাড়ির লোন, উচ্চ শিক্ষার লোন পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে। তাই সমাজের প্রতিপত্তিশালী কেউ না হলেও লোকজন তাকে সম্মান করেই চলে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসব কথাই ভাবছিল শিপ্রা। অন্য সময় এই রাস্তাটা লোকের ভিড়ে জমজমাট। প্রায় বাজারের মধ্যেই তাদের বাড়ি। আশেপাশের অনেক বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট গড়ে উঠলেও তাদের বাড়িটা এখনও প্রোমোটারের চোখে পড়েনি। হয়তো তার মেয়ের সঙ্গে সরকার পক্ষের বহু নেতা-মন্ত্রীর সম্পর্ক ভাল বলেই এখনও এ বাড়িটাকে ছাড় দিয়ে রেখেছে।
তাছাড়া এই অঞ্চলে শিক্ষক হিসেবে তার যথেষ্ট সুনাম। ঋতম একটু আত্মভোলা হলেও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বেশ ভাল। ব্যাঙ্কে চাকরি করার সময় বহু বেকারের লোন, বাড়ির লোন, উচ্চ শিক্ষার লোন পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে। তাই সমাজের প্রতিপত্তিশালী কেউ না হলেও লোকজন তাকে সম্মান করেই চলে।

কত বছর হয়ে গেল এখানে আসা। তখন মোহনা দু’মাস। তার আগেও অবশ্য এই অঞ্চলেই বাড়িভাড়া করে থাকত তারা। কীই বা বেতন ছিল ব্যাঙ্কের তখন! ভাগ্যিস স্কুলের চাকরিটা সে পেয়ে গিয়েছিল, তাই এই বাড়ি করা সম্ভব হল। প্রথমে একতলা, তারপর দোতলা উঠল। দোতলায় অবশ্য একটাই বড় হল ঘর, ছোটো একটা রান্নাঘর আর একটা বাথরুম।
মেয়েটাকে নিজের স্কুলেই ভরতি করেছিল সে, যদিও ঋতমের ইচ্ছে ছিল ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ানোর। কিন্তু এই অঞ্চলে তখন ভাল ইংরেজি মিডিয়াম কোথায়! সবচেয়ে কাছেরটাও প্রায় এক ঘণ্টার পথ। ওইটুকু বাচ্চাকে অতদূরে পাঠাতে মন চায়নি তার।
সে বিশ্বাস করত, কেউ যদি প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, তাতে মিডিয়ামটা কোনও বিষয় না। কতটা শিক্ষা সে আয়ত্ত করতে পারল সেটাই মূল। মেয়েটা এখন যতই বলুক, তার জন্য মা কিছুই করেনি, কিন্তু সে তো জানে প্রতিটি বিষয় তাকে ছোট থেকে কীভাবে পড়িয়েছে। শুধু সায়েন্সটা সে বাবার কাছে পড়ত।
একটা অতিমারি এসে কীভাবে বদলে দিল মানুষের জীবনটাকেই। প্রতিদিন কাগজ, টিভির পর্দায় মৃত্যুর প্রতিবেদন দেখতে দেখতে টিভি দেখাই বন্ধ করে দিয়েছিল সে। তখন থেকেই বরং সময় পেলে এসে দাঁড়ায় বারান্দায়। অথবা সদর দরজা খুলে ঘরে ঢোকার আগের জায়গাটায় লাগানো গাছেদের যত্ন করে। এদের সঙ্গে ভালই সময় কেটে যায় তার।
রাস্তার দিকে তার চোখ গেল। ত্রিফলা বাতিগুলো ঝলমল করছে। এই অঞ্চলটা সবসময় ব্যস্ত। অথচ ক’দিন আগেও সুনসান ছিল। কুকুরের ডাকও শোনা যেত না। ওরাই বা কী করবে? আগে মাংসের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, সেখান থেকে ছাট পেয়ে নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করত। মাঝখানে সেসব দোকানও খোলা হচ্ছিল শুধু কয়েক ঘণ্টার জন্য। এখন আবার সব খুলে গেছে। সব আগের মতো। কিন্তু একটা অতিমারি এসে কীভাবে বদলে দিল মানুষের জীবনটাকেই। প্রতিদিন কাগজ, টিভির পর্দায় মৃত্যুর প্রতিবেদন দেখতে দেখতে টিভি দেখাই বন্ধ করে দিয়েছিল সে। তখন থেকেই বরং সময় পেলে এসে দাঁড়ায় বারান্দায়। অথবা সদর দরজা খুলে ঘরে ঢোকার আগের জায়গাটায় লাগানো গাছেদের যত্ন করে। এদের সঙ্গে ভালই সময় কেটে যায় তার।
মেয়েটা কিছুতেই বুঝতে চায় না যে, মায়ের মন সারাক্ষণ চিন্তা করে। সে তাদের একমাত্র সন্তান। যখন দেশে ফিরে এল, তখন সে বলেছিল, এত দূরে থেকে তাদের দেখভাল করা সম্ভব হচ্ছে না বলে, ফিরে এসেছে। ক্রমশ বুঝতে পেরেছে এটা একটা অজুহাত ছিল। কিন্তু এই প্রসঙ্গে তারা নিজে থেকে কিছুই জানতে চায়নি। প্রমিতের বাবা মা-ও যে এই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেনি সেটাও বুঝেছিল। অবশ্য তাঁরা যথেষ্ট সজ্জন ব্যক্তি। মেয়ে আর নাতনিকে মাথায় করেই রেখেছেন। মোহনা যে তাদের পুত্রবধূ এটাই যেন তাঁরা ভুলে গেছেন। বরং মেয়ের থেকেও বেশি স্নেহ দিয়ে আগলে রেখেছেন। অমিতবাবু যতদিন বেঁচেছিলেন, বউমা অন্ত প্রাণ ছিলেন।
তবু তিনি তো মা। মাঝে মাঝে চিন্তা হয় মোহনার জন্য। অবশ্য মোহনা আদৌ এসব নিয়ে মাথা ঘামায় বলে তাঁর মনে হয় না। এসব ভাবতে ভাবতে নিজের মনেই শ্বাস নিয়ে ছাড়ল শিপ্রা।
মানুষের জীবনের কত পর্ব। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন, তারপর কখন যেন বার্ধক্য এসে যায়। গার্হস্থ জীবনের সূচনা থেকে, সংসারের দায় দায়িত্ব পালন করতে করতে এক সময় এসে দেখা যায় সংসার থেকে পাওয়ার ঝুলিটা শূন্য। অথচ তখন আর নতুন করে কিছু করার থাকে না। একটা সন্তান না হয়ে যদি আরও একটা থাকত, তবে হয়তো অন্য কিছু হতে পারত। আবার নাও পারত। তবু আজকাল বড় মনে হয়।
কোভিডকালীন বিপর্যয়ে আমাদের প্রকাশনা জগতের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন। অনেকের সঞ্চয় ফুরিয়ে গেছে, সব জমানো টাকা থেকে চালাতে গিয়ে। তাদের অনেকেই ডেইলি মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতেন। এখনও করেন। যেমন বাঁধাইখানা, ল্যামিনেশন, কাটাই, প্রুফ রিডিং প্রভৃতি। আমরা বইপাড়ার কিছু প্রকাশনা সংস্থা, ঠিক করেছি তাদের পাশে দাঁড়াব।
– শুনছ? কোথায় গেলে, একবার তাড়াতাড়ি এসো ড্রইংরুমে। স্বামীর ডাকে ঘোর ভাঙল শিপ্রার।
– কী হল?
– দেখো মোহনাকে টিভিতে দেখাচ্ছে।
শিপ্রা ধীর পায়ে বারান্দা থেকে ড্রয়িং রুমে এসে টিভির পর্দায় মন দিল। মোহনা বলছে- কোভিডকালীন বিপর্যয়ে আমাদের প্রকাশনা জগতের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন। অনেকের সঞ্চয় ফুরিয়ে গেছে, সব জমানো টাকা থেকে চালাতে গিয়ে। তাদের অনেকেই ডেইলি মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতেন। এখনও করেন। যেমন বাঁধাইখানা, ল্যামিনেশন, কাটাই, প্রুফ রিডিং প্রভৃতি। আমরা বইপাড়ার কিছু প্রকাশনা সংস্থা, ঠিক করেছি তাদের পাশে দাঁড়াব। তাদের পরিবার পিছু আপাতভাবে দশ হাজার টাকা করে দেব। এই মুহূর্তে আমরা এমন পঁচিশটি পরিবারকে প্রথম পর্যায়ে নির্বাচন করেছি। ও তাদের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছি। ধন্যবাদ সকলকে আমাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য।

সংবাদ পাঠক বললেন, “আমরা শুনলাম চৌধুরী সাহিত্য কুটিরের কর্ণধার মোহনা চৌধুরীর কথা। বই পাড়ার দুঃস্থ শ্রমিকদের বিপদের দিনে তাঁরা যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা এক কথায় নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। আমরা আশা রাখব তাদের পাশে অন্য সংস্থাগুলোয় এভাবেই দাঁড়াক। সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় কেটে যাবে অন্ধকার দিনগুলো। চোখ রাখছি পরবর্তী সংবাদে।”
এতটা শুনে ঋতম বলল- দেখো মেয়ে আমার কত অনুভূতিপ্রবণ হয়েছে। এইসব মানুষের কথা ক’জন ভাবছে! সে তো উদ্যোগ নিয়ে চেষ্টা করছে, সকলকে একটা ছাদের তলায় আনতে। এটাই তো চেয়েছিলাম, মেয়েটা মানুষের মতো মানুষ হোক।
প্রমিত যে তার সঙ্গে কোনও যোগাযোগই রাখে না, সেটা বুঝতে তো আর বাকি নেই কারোর। যতই সে মুখে না বলুক, তুমিও সেটা বোঝো। একা মেয়েকে মানুষ করছে। প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া একটা প্রতিষ্ঠানকে টেনে তুলছে। কাজটা কি অত সহজ? ওর দিকটাও ভেবো, রাগ দেখাবার জায়গা কোথায়? একমাত্র আমরাই তো আছি।
– হ্যাঁ। এর থেকে বেশি আর কীই বা চাওয়ার আছে আমাদের!
– ঠিক। তবে তুমি ওকে ছোট থেকে এত ভাল ট্রেনিং দিয়েছিলে যে, আজ এখানে পৌঁছাতে ওর কোনও অসুবিধা হচ্ছে না।
– তোমার মেয়ে সেটা অস্বীকার করে। বলে তার জীবনে আমার কোনও ভূমিকাই নেই।
– এইসব নিয়ে মন খারাপ করো না শিপ্রা। প্রমিত যে তার সঙ্গে কোনও যোগাযোগই রাখে না, সেটা বুঝতে তো আর বাকি নেই কারোর। যতই সে মুখে না বলুক, তুমিও সেটা বোঝো। একা মেয়েকে মানুষ করছে। প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া একটা প্রতিষ্ঠানকে টেনে তুলছে। কাজটা কি অত সহজ? ওর দিকটাও ভেবো, রাগ দেখাবার জায়গা কোথায়? একমাত্র আমরাই তো আছি।
– সেই। জন্ম দিয়ে মহা অন্যায় করে ফেলেছি। দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে শিপ্রা বললেন।
– মোবাইলটা দাও তো, মেয়েটার সঙ্গে একটু কথা বলি, আর সেই ফাঁকে যদি একটু চা দাও, বলে স্ত্রীর দিকে তাকাল ঋতম।
– এত রাতে আবার চা?
– খেতাম না। মেয়েটাকে টিভির পর্দায় দেখে খুব আনন্দ হল। তাই একটু চা খেয়ে সেলিব্রেট।
– পারোও বটে, বলে ঋতমের হাতে মোবাইল ধরিয়ে দিয়ে রান্না ঘরের দিকে গেল শিপ্রা। সেখান থেকেই সে শুনতে পেল ঋতম ফোনে বলছে- শোন মা, তোদের যদি আমার থেকে সাহায্য লাগে বলবি। আমিই বা এত টাকা রেখে করব কী? একটা ভাল কাজে লাগলে আমাদের ভাল লাগবে।… না না তোর মায়েরও তাই ইচ্ছে। যা পেনশন পাই দু’জনে মিলে তাতে ভালভাবেই তো সব চলছে। একটা মহৎ কাজে দান করলে বরং পূণ্য হবে কিছুটা।
তোর মা অবশ্য এখানে একটা কমিউনিটি কিচেন খুলেছে।… ও তোকে বলেনি? সেই যে লকডাউনে চালু করেছিল। এখন সেটা গরিবদের জন্য চলছে।… হ্যাঁ মনি তো ওর অ্যাসিসটেন্ট। মাকে তো জানিস, সে এসব নিয়েই থাকতে ভালবাসে। তার ছাত্র-ছাত্রীরাও সব জুটে গেছে এই ভেঞ্চার সফল করতে। দেখ, তুই যতই রাগ করিস না কেন মায়ের ওপর, মা না থাকলে আমি কি তোকে একা মানুষ করতে পারতাম?… তোর মনে আছে সেই যখন মায়ের টিউমার অপারেশন হল, তুই তো দিন রাত ঠাকুরের কাছে কাঁদতিস, আর বলতিস- ঠাকুর মা’কে ভাল করে দাও… আরে না, তোকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল কেন করব? তবে তোর মা কিন্তু তোকে নিয়ে খুব গর্ব করে। আসলে জানিসই তো, তোর মা একটু চাপা। স্কুলে পড়িয়েছে তো! তাই একটু গম্ভীর থাকার চেষ্টা করে।
মায়ের সঙ্গে কথা বলবি? ধর, দিচ্ছি, মা চা করতে গেছে।… রাত কোথায়? সবে তো নটা। টিভির পর্দায় তোকে দেখে মনটা ভাল হয়ে গেল, তাই একটু খেতে চাইলাম। না না সিগারেট খাচ্ছি না। তোর মাকে লুকিয়ে খাবার জো আছে? ঠিক বুঝে যায়, আর চিৎকার শুরু করে। এই বয়সে কী আর ভাল লাগে পাড়াপড়শি আমাদের চেঁচামেচি শুনুক! আচ্ছা নে, মা এসে গেছে। স্ত্রীর হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে মোবাইলটা ধরালো তার হাতে।
চিরকাল নিজে যা ভাল বুঝেছ, তাই করে এসেছ। কিছু দরকার হলে বলো। আর দেখি পারলে রবিবার যাব। রাই বলছিল অনেকদিন বাড়ি থেকে বেরোয়নি। অনলাইনের চক্করে সারাদিন হয় ল্যাপটপ, নয় মোবাইল। বুঝতেও পারি না কখন পড়ছে আর কখন খেলছে।
– বল। ঘরে ঢুকেছিস?
– হ্যাঁ। ইন্টারভিউটা শুনলে?
– হ্যাঁ। খুব আনন্দ হল দেখে।
– আচ্ছা তুমি আবার কমিউনিটি কিচেন শুরু করেছ, আমাকে এতদিন জানাওনি? অসুস্থ হয়ে পড়লে দেখবে কে?
– আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না। আমি তো কেবল নির্দেশ দিই। বাকি কাজগুলো রাজা, বাপী… ওরাই সব করে।
– তোমাকে তো বলে কোনও লাভ নেই। চিরকাল নিজে যা ভাল বুঝেছ, তাই করে এসেছ। কিছু দরকার হলে বলো। আর দেখি পারলে রবিবার যাব। রাই বলছিল অনেকদিন বাড়ি থেকে বেরোয়নি। অনলাইনের চক্করে সারাদিন হয় ল্যাপটপ, নয় মোবাইল। বুঝতেও পারি না কখন পড়ছে আর কখন খেলছে।
– কী খেলা?

– ওই সেই জঘন্য একটা খেলা। দু-চোখের বিষ আমার। একে মারা ওকে মারা… আর সবচেয়ে বিরক্ত লাগে খেলতে বসে জোরে জোরে চেঁচায়।
– কী করবে বল সারাদিন বাড়িতে। বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে দেখা হচ্ছে না। একটা কিছু নিয়ে তো থাকতে হবে।
– তা বলে অন্য কোনও কাজ করা যায় না? গল্পের বই তো পড়া যায়। ছুঁয়েও দেখে না।
– এটা তুই ঠিক বললি না। আমি ওর সঙ্গে কথা বলে দেখেছি শেক্সপিয়র থেকে আর্থার কোনান ডয়েল, ফেলুদা, এমনকি হ্যারি পটারও পড়ে রাই। তাছাড়া আমাকে বলেছে এখন রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প পড়ছে।
– এই তোমাদের আস্কারাতেই গেল মেয়েটা। একদিকে তুমি অন্য দিকে আমার শাশুড়ি মা।
– এতে আস্কারা দেবার কী দেখলি? তুই ছোট বেলায় বিস্তৃত খেলার মাঠ পেয়েছিস, স্কুল থেকে ফিরে খেলতে পারতিস বন্ধুদের সঙ্গে। ওর কথাটা ভাব! কী আছে চারপাশে! খালি ফ্ল্যাট আর কংক্রিটের জঙ্গল। শৈশব, কৈশোর কোনওটাই তো সেভাবে উপভোগ করতে পারল না। কোথায় সে?
– সে আছে নিজের মতো। সামনে প্রোজেক্ট জমা দেওয়ার আছে। তাই নিয়ে ব্যস্ত।
– আর তোর শাশুড়ি মা?
– তিনিও ব্যস্ত রবীন্দ্রনাথের লেখায় মেয়েদের চরিত্র বিশ্লেষণ করে নাতনিকে বোঝাতে।
চিকেনের স্টু আর রুটি। দু’টো মানুষের জন্য রাঁধতে কি ইচ্ছে করে? মনি আসে, সেই যা বানায় খেয়ে নিই। তোর বাবা তো একটা রুটি তরকারি দিয়ে আরেকটা দুধ দিয়ে খেয়ে নেয়।
– তাহলে তো ভালই।
মোহনা মায়ের কথা শুনে প্রসঙ্গ বদলাল। তা রাতে কী রান্না করলে?
– ওই চিকেনের স্টু আর রুটি। দু’টো মানুষের জন্য রাঁধতে কি ইচ্ছে করে? মনি আসে, সেই যা বানায় খেয়ে নিই। তোর বাবা তো একটা রুটি তরকারি দিয়ে আরেকটা দুধ দিয়ে খেয়ে নেয়।
– চিকেন স্টু! বা! আমি যেদিন যাব বানিও তো! অনেকদিন খাইনি তোমার হাতের স্টু।
– বেশ, তাই হবে।
– আচ্ছা এবার রাখি। আজকাল মোবাইল বেশিক্ষণ কানে ধরে রাখলে ব্যাটারিটা গরম হয়ে যায়।
– ইমিডিয়েট তাহলে মোবাইল পাল্টাও। শেষে কানে বাস্ট করবে। কালই বরং একটা কিনে নাও। আচ্ছা থাক আমি নিয়ে যাব। এবার রাখছি। সাবধানে থেকো। বলে ফোন রাখল মোহনা।
ঋতমের হাতে মোবাইল ফেরত দিয়ে হাসল শিপ্রা। তারপর প্রায় ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপে চুমুক দিল।
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বিতস্তা ঘোষাল ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। আধুনিক ইতিহাসে এম এ, লাইব্রেরি সায়েন্সে বিলিস। কলেজে সাময়িক অধ্যাপনা। প্রকাশনা সংস্থা ভাষা সংসদের কর্ণধার। ও অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা ‘অনুবাদ পত্রিকা’-র সম্পাদক।
'বাংলা আকাডেমি', 'সারস্বত সম্মান', 'বিবেকানন্দ যুব সম্মান', ‘একান্তর কথাসাহিত্যিক পুরস্কার', 'কেতকী' কবি সম্মান, ‘চলন্তিকা’, 'দুই বাংলা সেরা কবি সম্মান', 'বিজয়া সর্বজয়া', 'মদন মোহন তর্কালঙ্কার সম্মান', 'বই বন্ধু সেরা লেখক ২০২৪' সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান প্রাপ্ত।
বিতস্তার প্রকাশিত বই ৩৪টি। তাঁর কবিতা ও গল্প হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া ও ইংরেজি,ইতালি, গ্রীক ও স্প্যানিশে অনুবাদ হয়েছে। সম্প্রতি ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত তার গল্প সংকলন রূপকথার রাজকন্যারা।
দেশ বিদেশে কবিতা ও গল্প পড়ার ডাক পেয়েছেন একাধিকবার।বাংলা সবকটি জনপ্রিয় পত্রিকা ও সংবাদপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত।
নিজের কাজের গণ্ডীর বাইরে অফিস ও পরিবারেই স্বচ্ছন্দ বিতস্তা কাজের ফাঁকে অবসর সময় কাটান নানান সামাজিক কাজে।
ভালোবাসা ছাড়া বাকি সব কাজ গুরুত্বপূর্ণহীন। তার নিজের কথায় ভালোবাসা ছাড়া কেউ কি বাঁচে?
