(Jon Lennon Wall 3)
স্তানেক আর রেটের কাহিনি আমি যাচাই করতে পারিনি। কিন্তু সত্যি বলতে, আমাদের কাহিনিতে এ কাহিনির গুরুত্ব যৎকিঞ্চিৎ। গুরুত্বপূর্ণ হল, লেননের ছবি কেন চেক কমিউনিস্ট শাসকদের গালে বিরাশি সিক্কার চড়। সে জন্য আমাদের পড়ে নিতে হবে, ব্রিটেনের বিখ্যাত সঙ্গীত বল্গ ‘Right Chord Music’-এ প্রকাশিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখা একটা প্রবন্ধ— The geopolitical impact of Western music on capitalism and language in the Czech Republic1।
যেন তেন প্রকারেণ সোভিয়েত সাম্রাজ্যে ফাটল ধরাতে মরিয়া মার্কিন সাম্রাজ্যের প্রোপাগান্ডা-পাণ্ডারা মনে রেখেছিলেন যে, ১৯৪৪-৪৫ সালে রেডিও লুক্সেমবুর্গ থেকে প্রচারিত পশ্চিমী সঙ্গীতের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দেওয়া নাৎসি-বিরোধী খবর চেক মানুষের মধ্যে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। খুব গোপনে সে রেডিও বাজত ঘরে ঘরে। ঠিক সেই মডেলেই মার্কিন সরকার ১৯৪৯ সালে চালু করল Free Europe Radio, সেরা মার্কিন পপ গানের ফাঁকে ফাঁকে সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত-বিরোধী প্রোপাগান্ডা। কিন্তু কাজ হল না। চেকস্লোভাক সরকার সহজেই তার সিগন্যাল নিজেদের দেশে জ্যাম করে দিল। গান শোনা বন্ধ হল বটে, কিন্তু চেক মানুষ বুঝলেন তাঁদের সঙ্গীত শোনাতেও থাবা বসিয়েছে কমিউনিস্ট সরকার। এতে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভের পারা আর এক মাত্রা ওপরে চড়েছিল।
আরও পড়ুন: লেননোভা জ়েদ— হাহাকার থেকে প্রতিরোধ: এক দেওয়ালের কিসসা পর্ব ১, পর্ব ২
কিন্তু তাতে পশ্চিমী আধুনিক সঙ্গীতের কোনও জোয়ার চেকস্লোভাকিয়ায় আসেনি। যে ভাবে এল, তার কাহিনি পড়ে আমি সত্যিই স্তম্ভিত— ইতিহাস যে কখন কী বিচিত্র বাঁক নেয় কেউ বলতে পারে না। ১৯৬৪। প্রণম্য পিট সিগার এক চেক বন্ধুর জোর সুপারিশে, যে পিট সাহেব মোটেই মার্কিন প্রোপাগাণ্ডার অঙ্গ নন, ঠিক তার উল্টো, চেকস্লোভাকিয়া সঙ্গীত সফরের অনুমতি পেলেন। জনপ্রিয়তার ঝড় উঠল। তাঁর হাতের পাঁচ-তারের ব্যাঞ্জো চেক সঙ্গীতপ্রেমীদের একেবারে তাক লাগিয়ে দিল। এমন আশ্চর্য ‘ফোকসি ব্লুগ্রাস’ গান তাঁরা কখনও শোনেননি । প্রাহা শহরে পিটের এক জলসার লাইভ অ্যালবাম প্রকাশিত হল। পিট একা হাতে, একক কণ্ঠে একটা গোটা দেশের গান-ভালোবাসা মানুষের আধুনিক গান শোনার ধরনটাই পাল্টে দিলেন।

সারা চেকস্লোভাকিয়ার সঙ্গীত সমাজ যখন পিট সাহেবের গান-বাজনায় বুঁদ, ঠিক তখনই মার্কিন মুলুক থেকে সে দেশে হাজির হলেন আর এক কিংবদন্তি— অল স্টার ব্যান্ডসহ কৃষ্ণাঙ্গ লুই আর্মস্ট্রং। ১৯৬৫-র মার্চ মাসে প্রাহাতে কানায় কানায় ভরা লুসের্না সভা ঘরে ন’টি জলসা করলেন তিনি। চমকিত চেকস্লোভাকদের কানে ফের আর এক কিসিমের সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ সম্পদের জোয়ার আছড়ে পড়ল— জ্যাজ়।

দিকে দিকে ব্যান্ড গড়ে উঠল। চেক গাইয়ে-বাজিয়েরা তাঁদের শেখা পশ্চিমী সঙ্গীতের সুর আহরণ করে তাতে চেক কথা বসিয়ে দিতে লাগলেন। কিন্তু তাতে মন ভরছিল না ইংরেজি প্রায় না-জানা চেকস্লোভাক মানুষের। শিক্ষিত যুবকযুবতীরা আদাজল খেয়ে ইংরেজি শিখতে বসলেন— কী বলছেন পিট সিগার, লুই আর্মস্ট্রংয়েরা জানতে হবে না? ইতিহাসে এই প্রথম পশ্চিমী আধুনিক সঙ্গীত চেক হৃদয় ও মননে পাকাপাকি জায়গা করেনিল।
চার বছর গড়াতে না গড়াতেই ঘৃতাহুতি হল। জুন, ১৯৬৯। তখনও প্রাহা বসন্তের শেষ উষ্ণতার রেশ কিছু বাকি। প্রাহাতে এসে হাজির হলেন বীচ বয়েজ় ব্যান্ড! সেই লুসের্না হলে জলসা। শহরে মহাউৎসবের ধুম লেগে গেল। নিজেকে থামিয়ে, এর দু-লাইন বর্ণনা ইংরেজিতেই তুলে দিই সে ব্যান্ডের গায়ক মাইক লাভ-এর ২০১৯-এর একটা ফেসবুক পোস্ট থেকে— ‘‘I will never forget the concert at Lucerna Great Hall on June 17th, 1969. The audience response was thunderous, the hall was jam-packed and there was no air conditioning. The walls and pillars of the 1920’s hall were damp from the humidity of humanity. In our entire career, we’ve never had a more tumultuous reception.’’ রক সঙ্গীতের দুনিয়ায় ঢুকে পড়ল চেকস্লোভাকিয়া, যার থেকে ভয়ঙ্কর অকমিউনিস্ট সঙ্গীত কল্পনা করাও মুশকিল।

কমিউনিস্ট সাংস্কৃতিক চাবুক-চালানেওয়ালারা হতচকিত থেকে গেলেন। এ জোয়ার-তরঙ্গ জ্যাম করার মতো কোনও পন্থা তাঁদের জানা ছিল না। তবে চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি তাঁরা। পশ্চিমী রেডিও তরঙ্গের জ্যাম আর পশ্চিমী রেকর্ড বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা কঠোরতর হল। কিন্তু বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো। পশ্চিম জার্মানি থেকে স্থলপথে গণ্ডায় গণ্ডায় পপ-রকের রেকর্ড চেকস্লোভাকিয়ায় পাচার হয়ে প্রাহাতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মূলত প্রাহার লেস কার্চ নামের ঘন অরণ্যের মতো একটা পার্কে আর সেন্ট ওয়েনসাসলাস স্কোয়ারে গোপন আদান-প্রদান চলত এই সব রেকর্ডের। কমিউনিস্ট শাসকদের নাকের ডগায় ইওরোপীয় আর মার্কিন আধুনিক গান-বাজনা জাঁকিয়ে বসল চেক মনে। স্বাভাবিকভাবেই দিনে দিনে দুনিয়া জোড়া আলোড়ন তোলা বিটলস এবং জন লেনন তাঁদেরও আরাধ্য হয়ে উঠলেন। ২০০৩ সালে চেক বিটলস ফ্যান ক্লাবের প্রধান জিরি স্বাতেক প্রাহা রেডিওতে জানিয়েছেন, ‘‘১৯৬০-এর দশকে বিটলস এখানে জনপ্রিয় ছিল বিশেষ করে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকার জন্যেই’’3 ।
কাজেই নিতান্তই সঙ্গীতপ্রেম বা লেনন-ভক্তি নয়, সাংস্কৃতির প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেই এক মোক্ষম মঞ্চ হয়ে ‘হাহাকার দেওয়াল’ হয়ে গেল ‘লেননোভা জ়েদ’— লেনন দেওয়াল। মুখে মুখে সেই নামই ছড়িয়ে পড়ল। মনে রাখতে হবে, প্রভুদেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৯৬০-এর দশকে বিপ্লবের পরম রক্ষাকর্তাদের প্রথম সারিতে ছিল গুপ্তচর সংস্থা কেজিবি। এই কেজিবি মনে করত, বিটলস আসলে ঠাণ্ডা-যুদ্ধে পশ্চিমের এক গোপন অস্ত্র। এখানে বলে রাখতেই হবে, ঠিক সেই সময়েই ব্রিটিশ গুপ্তচর সংস্থা এমআই-ফাইভ লেননের ওপর কড়া নজর রাখছিল, কারণ তিনি ট্রটস্কিপন্থী ওয়ার্কার্স রিভলিউশনারি পার্টিকে তখনকার দিনের হিসেবে বিপুল ৪৬,০০০ পাউন্ড ডোনেশন দিয়ে ইংরেজ গোয়েন্দাদের পিলে চমকে দিয়েছিলেন। এই সংস্থা আরও জানতে পেরেছিল, তিনি বামপন্থী পত্রিকা ‘রেড মোল’-কেও গোপনে অর্থসাহায্য করেন4। স্রষ্টাদের, জাত স্রষ্টাদের, কখনও খড়ি দিয়ে দাগ কেটে ‘সঠিক পথে’ হাঁটাতে পারেনি কোনও রঙের ক্ষমতা। তাঁরা সুবোধ নন, তাঁদের জয় করা অসম্ভব।
রাতারাতি লেনন দেওয়াল হয়ে উঠল পর্যটকদের অতি জনপ্রিয় গন্তব্য, মায় লেননের স্ত্রী ইয়োকো ওনো স্বয়ং সেখানে এসে হাসি-হাসি মুখে দেওয়ালে সই করে গিয়েছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, পর্যটকদের অধিকাংশই এ দেওয়ালের ইতিহাসের কিছুই জানেন না, কাজেই শ্রদ্ধাও নেই— ফলে এন্তার বেলেল্লাপনা।
এই ভাবেই কখনও দীর্ঘশ্বাসের জগদ্দল, কখনও কিছুতেই বাগে না আনতে পারা প্রতিবাদের কাঁটা হয়ে চেকস্লোভাক কমিউনিস্ট জমানায় টিকে গেল জন লেনন দেওয়াল। তারপর তো ১৯৮৯-এর ১৭ থেকে ২৮ নভেম্বরের মখমল বিপ্লব ও কমিউনিস্ট শাসনের পতনের কথা আমরা সকলেই জানি। রাতারাতি লেনন দেওয়াল হয়ে উঠল পর্যটকদের অতি জনপ্রিয় গন্তব্য, মায় লেননের স্ত্রী ইয়োকো ওনো স্বয়ং সেখানে এসে হাসি-হাসি মুখে দেওয়ালে সই করে গিয়েছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, পর্যটকদের অধিকাংশই এ দেওয়ালের ইতিহাসের কিছুই জানেন না, কাজেই শ্রদ্ধাও নেই— ফলে এন্তার বেলেল্লাপনা।
এর পরে ২০১৪ সালে এক কাণ্ড হল— ১৭ নভেম্বর গভীর রাতে কারা যেন এসে গোটা দেওয়ালের সব লেখা মুছে সাদা রঙ করে তার ওপর গোটা গোটা হরফে লিখে দিয়ে গিয়েছে— WALL IS OVER। বুঝতে অসুবিধা হয় না এ বাক্য লেননেরই এক বিখ্যাত গানের নামের অনুকরণ— ১৯৭১-এ প্রকাশিত, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী গান Happy Xmas (The War is Over)। পরে জানা গেল, এ কাণ্ড ঘটিয়েছে প্রাজ়স্কা স্লুজ়বা নামের একটা অখ্যাত দল। তারা পথ-কলা আন্দোলনে বিশ্বাসী। দলের সদস্য ইয়ান ডট্রেল তাঁর ফেসবুকে জানিয়েছেন, লৌহ পর্দার রাজত্বের পতন উদযাপন করতেই দেওয়াল সাদা করে দেওয়া হয়েছে, মখমল বিপ্লবের ২৫ বছরের পূর্তিতে দেওয়ালটাকে একটা নতুন শুরুয়াত দিতে5।

এই অর্বাচীনেরা ভুল ভেবেছিল। কারণ পরের দিনই সেখানে ফের কে যেন এঁকে দিয়ে গেল লেননের প্রতিকৃতি। চেক মানুষের রুখে দাঁড়ানোর হিম্মতের মতোই এ দেওয়াল অফুরন্ত। নবীন সেই রিসেপশনিস্ট মেয়েটির মনে তা পবিত্র স্মৃতির প্রতীক। ষাট পার করা ড্রাইভার সাহেবের মনে তা জীবন্ত— সিসি-ক্যামেরার গোপন চোখ তাকে সারাক্ষণ দেখবে, এ তাঁর মনে ভিন্ন স্মৃতি ভিড় করে আনে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
- সূত্র — < https://www.rightchordmusic.co.uk/western-music-impact-czech-republic/> ↩︎
- সূত্র — <https://www.facebook.com/photo/?fbid=1895018407302064&set=a.309938080488466> ↩︎
- https://english.radio.cz/czech-beatles-fans-unveil-unusual-tribute-fab-four-8078784 ↩︎
- https://www.theguardian.com/uk/2000/feb/21/richardnortontaylor.johnezard ↩︎
- https://www.praguepost.com/the-big-story/42729-john-lennon-wall-vandalized ↩︎