Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

রিচার্ড ফাইনম্যান আর ‘চ্যালেঞ্জার’ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ

অর্পণ পাল

এপ্রিল ১৭, ২০২৬

Challenger Disaster
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Challenger Disaster)

১৯৮৬ সাল। জানুয়ারির আঠাশ তারিখ, মঙ্গলবার। অন্যদিনের চেয়ে এই দিনটা একটু অন্যরকম নিউ হ্যাম্পশায়ার-এর কনকর্ড হাই স্কুলের বাচ্চাদের কাছে। ওরা আজ দারুণ উত্তেজিত। আজ ক্লাসে পড়ার বদলে সদলবলে চোখ রেখে বসে আছে টিভির পর্দার দিকে। কারণ ওদের স্কুলের এক ম্যাডাম আজ আশ্চর্য এক কাণ্ড ঘটাতে চলেছেন। তাঁর নাম ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লিখিত হবে আজ। 

বেলা সাড়ে এগারোটা বাজল। অন্তহীন প্রতীক্ষার শেষ লগ্ন এসে গেল প্রায়। আরও কিছু সময় পর, আমেরিকার ঘড়িতে তখন এগারোটা আটত্রিশ, ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে আকাশের দিকে হুউউশ করে উড়তে শুরু করল প্রকাণ্ড রকেটটি। প্রত্যেকেই এবার উল্লসিত। ঘন নীল আকাশের বুক দিয়ে রকেটটা তাহলে ঠিকঠাকভাবেই যাত্রা শুরু করল! 


আরও পড়ুন: মনুষ্য বিকল্প: প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপট


কিন্তু না, সেই উল্লাস থেমে গেল রকেটটি রওনা দেওয়ার ঠিক তিয়াত্তর সেকেন্ড পর, প্রকাণ্ড এক বিস্ফোরণের মধ্যে দিয়ে। আকাশে দেখা গেল উজ্জ্বল আলোর এক ঝলকানি, আর নিমেষে সব শেষ! ঘন হয়ে থাকা মেঘের মতো ধোঁয়ার মধ্যে হারিয়ে গেল রকেটের শেষ চিহ্নটুকুও। এই ঘটনা ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিল এরপর, ‘চ্যালেঞ্জার দুর্ঘটনা’ নামে। 

যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য ঘটে যাওয়া ওই দুর্ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেন রকেটের সাতজন সদস্য, যাঁদের মধ্যে ছিলেন স্কুল-শিক্ষিকা ক্রিস্টা ম্যাকঅলিফ (Christa McAuliffe)। বাকি সদস্যরা হলেন ফ্রান্সিস স্কোবি (কমান্ডার), মাইকেল স্মিথ (পাইলট), জুডিথ রেজনিক, এলিসন অনিজুকা, রোনাল্ড ম্যাকনায়ার এবং গ্রেগরি জার্ভিস। এই অভিযান একটি বিশেষ কারণে স্পেশাল, কারণ এবারের অভিযানের আগে নাসা (NASA) চেয়েছিল সমাজের অন্য ক্ষেত্রের কোনও মানুষকে যদি মহাকাশ-অভিযানে সামিল করা যায়; আর সেই উদ্দেশ্যেই তারা খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়, ‘টিচার ইন স্পেস প্রোজেক্ট’ নামে দিয়ে। 

Challenger Disaster
নোবেলজয়ী মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফিলিপ্‌স ফাইনম্যান

এগারো হাজার শিক্ষকের আবেদন জমা পড়ে সেই বিজ্ঞাপনের উত্তরে। প্রত্যেকেই মহাকাশে পাড়ি দিতে আগ্রহী। এঁদের থেকেই বেছে নেওয়া হয় ক্রিস্টা-কে। সেই মতো অনেক ট্রেনিং পর্ব পেরিয়ে অবশেষে তিনি সামিল হয়েছিলেন এই মহাযজ্ঞে। এই স্পেস-শিপের অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশ থেকে হ্যালি-র ধূমকেতুকে খুঁটিয়ে দেখা। আর তাছাড়া মহাকাশ অভিযানকে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় করবার জন্য বেশ কিছু কর্মসূচিও ছিল। সেই জন্য গোটা দেশের নজর ছিল এই স্পেস-শিপের যাত্রার দিকে। 

ওই সময়টায় আমেরিকার আবহাওয়া ছিল দারুণ ঠাণ্ডা, মাত্র ২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ভোর বেলায় উষ্ণতা ছিল আরও কম, এতটাই কম যে উৎক্ষেপণ প্যাড-এর পাইপগুলোর মধ্যে বরফ জমে গিয়েছিল। আর ওইরকম ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণেই, রওনা দেওয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই রকেটের দু-পাশের দু’টো অংশের এক বিশেষ রাবারের রিং ঠিকঠাক কাজ করতে পারেনি (এই রিং-এর কাজ ছিল রকেটের ভেতরে থাকা প্রচণ্ড গরম গ্যাস যাতে বাইরে বেরিয়ে না যায়, সেটা দেখা) বলে খুলে যায় প্রচণ্ড চাপে রাখা গরম গ্যাসের সিলিন্ডারের মুখ, আর সেই গ্যাসই বাইরে বেরিয়ে ঘটিয়ে ফেলে বিস্ফোরণ। আর ওই বিস্ফোরণে মহাকাশযান টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে। 

রিচার্ড ফাইনম্যান (Richard Feynman, ১৯১৮ – ১৯৮৮) তখন অন্যতম পদার্থবিজ্ঞানীদের একজন। অনেক কাল আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার পরমাণু বোমা প্রকল্প ‘ম্যানহাটন প্রোজেক্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বছর চব্বিশের তরুণ ফাইনম্যান।

কিন্তু কাদের জন্য এই বিপর্যয়? সেটা কি আগে থেকে বুঝে ওঠা যায়নি? নাকি ছিল কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি? এরকম অনেক প্রশ্ন তখন সকলের মনে। এরকম প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতেই, ওই দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার ঠিক ন-দিন পর, ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে সরকারিভাবে, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগন-এর ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি হয় একটি কমিশন বা তদন্ত কমিটি, যার নাম ‘রজারস কমিশন’। আর এই কমিশনেই অন্যতম সদস্য হিসেবে যোগ দিলেন রিচার্ড ফাইনম্যান। 

দুই

রিচার্ড ফাইনম্যান (Richard Feynman, ১৯১৮ – ১৯৮৮) তখন অন্যতম পদার্থবিজ্ঞানীদের একজন। অনেক কাল আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার পরমাণু বোমা প্রকল্প ‘ম্যানহাটন প্রোজেক্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বছর চব্বিশের তরুণ ফাইনম্যান। যুদ্ধ-শেষে আবার ফিরে যান অধ্যাপনাজগতে, পরবর্তীকালে গড়ে তোলেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এক নতুন অধ্যায়— ‘কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স’। নোবেল পেয়েছেন একুশ বছর আগে, ১৯৬৫ সালে, ওই তত্ত্বের জন্যেই। 

Challenger Disaster
দুর্ঘটনার সেই দৃশ্য

এখন ইনি পড়ান আমেরিকার ক্যালটেকে। বয়স সত্তরের কাছে, পড়ানোর পাশাপাশি আরও নানা কাজে আগ্রহ তাঁর; অদ্ভুত সব শখও পূরণ করেন মাঝেমধ্যে— কখনও নাইট ক্লাবে গিয়ে বঙ্গো ড্রাম বাজান, আবার কখনও ছবি এঁকে চলেন একের পর এক, এক-একদিন বার-এ বসে ভিড়ভাট্টার মধ্যেই একাগ্রমনে জটিল সব গাণিতিক সমীকরণ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে চলেন। একবার তো প্রাচীন ভাষা নিয়ে আগ্রহী হয়ে পড়লেন, দিনের পর দিন নানা সাংকেতিক লিপি নিয়ে পড়ে রইলেন, চেষ্টা করলেন পাঠোদ্ধারের। অন্যদিকে, এক বিরল জাতের ক্যানসার বাসা বেঁধেছে তাঁর দেহে, সেই রোগের সঙ্গেই লড়াই করে যাচ্ছেন গত সাত-আট বছর ধরে। 

এহেন বর্ণময় বিজ্ঞানীর কাছে একদিন রাতের দিকে এল ফোন। ফোন করলেন ‘নাসা’-র দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিরেক্টর উইলিয়াম গ্রাহাম, যিনি আবার ক্যালটেক-এ ফাইনম্যানেরই ছাত্র ছিলেন এক কালে। কিন্তু তিনি ফোনে যে প্রস্তাব-দিলেন, সেটা শুনে ফাইনম্যান প্রথমে তো হেসেই উড়িয়ে দিলেন। মহাকাশ অভিযানের সঙ্গে তাঁর কোনওকালেই কোনও যোগাযোগ নেই, তিনি কী করে সেইরকম এক অভিযানের দুর্ঘটনা নিয়ে তৈরি হওয়া তদন্ত কমিটির সদস্য হতে পারেন? 

স্ত্রী গ্যানেথ সব শুনেটুনে তাঁকে বললেন এই প্রস্তাবে রাজি হতে। কারণ আর পাঁচজন যেভাবে অনুসন্ধান চালাবেন, তাঁর কর্মপদ্ধতি হবে তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। গ্যানেথ-এর মনে হয়েছিল, এই কাজের জন্য ফাইনম্যান-ই যোগ্যতম ব্যক্তি।

কিন্তু তাঁর স্ত্রী গ্যানেথ সব শুনেটুনে তাঁকে বললেন এই প্রস্তাবে রাজি হতে। কারণ আর পাঁচজন যেভাবে অনুসন্ধান চালাবেন, তাঁর কর্মপদ্ধতি হবে তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। গ্যানেথ-এর মনে হয়েছিল, এই কাজের জন্য ফাইনম্যান-ই যোগ্যতম ব্যক্তি। 

অবশেষে ফাইনম্যান রাজি হলেন, এবং এরপর তিনি এলেন ওয়াশিংটনে। এখানে এসে তাঁর সঙ্গে প্রথমবার সাক্ষাৎ হল নিল আর্মস্ট্রং-এর। সেই নিল, যিনি প্রায় দু-দশক আগে বিশ্বকে চমকে দিয়ে প্রথমবার নেমেছিলেন চাঁদের মাটিতে। এই কমিশনে অন্য যে সদস্যরা ছিলেন, তাঁদের কয়েকজনের নাম নভশ্চর স্যালি রাইড, দুই বিজ্ঞানী আর্থার ওয়াকার আর আলবার্ট হুইলঅন, দুই এয়ারফোর্স অফিসার, এক পত্রিকার সম্পাদক, এবং এই কমিশনের প্রধান হিসেবে যুক্ত হলেন উইলিয়াম রজারস, যাঁর নামেই এই কমিশন ‘রজারস কমিশন’ নামে পরিচিত হয়। শোনা যায়, আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধান রোনাল্ড রেগন নাকি এই রজারস-কে বলেছিলেন, আপনি (মানে তাঁর কমিশন) যা-ই করুন, ‘নাসা’-কে বিব্রত হতে হয়, এমন কিছু করবেন না। 

Challenger Disaster
কমিশনের প্রথম মিটিং-এই সকলকে বলা হয় নাসাকে বিপদে না ফেলতে

তিন

ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখে শুরু হল অনুসন্ধানের কাজ। রজারস নিজেও তাঁদের কমিশনের তদন্তে ‘নাসা’ বিপদে পড়ে, এমন কিছু করবেন না বলেই ভেবে রেখেছিলেন। আর তিনি সেটা কমিশনের প্রথম মিটিং-এই সকলকে বলে দিয়েছিলেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, দুর্ঘটনা ঘটে গেলেও ‘নাসা’ এই অভিযানের কাজটা সত্যিই অসাধারণভাবেই সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে, কী আর করা যাবে! এই দুর্ঘটনার কারণটুকু জানাই যথেষ্ট। 

কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দিলেন অনেকেই। যার শুরুটা হয় ওই উইলিয়াম গ্রাহাম-কে দিয়েই। তিনি শপথ নিয়ে বললেন যে, এখানে যা বলছেন সব সত্যই বলছেন। আর তাঁর সংস্থা এই তদন্তে সবরকমভাবেই সাহায্য করবে, কোনও তথ্যই যে লুকাবে না সে-ব্যাপারেও তিনি সকলকে নিশ্চিত করলেন।

কমিশনের সদস্যদের অনেকেই মহাকাশবিজ্ঞান বা স্পেসশিপের গঠন সম্বন্ধে অজ্ঞ, তাই প্রত্যেককে গোটা অভিযানের যাবতীয় তথ্য বেশ গুছিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ চলল কয়েকদিন ধরে, আর সদস্যরাও এই সুযোগে মহাকাশ-অভিযানের ব্যাপারে অনেক জ্ঞান অর্জন করে ফেললেন। 

কিন্তু সত্যিই কি ‘নাসা’ সব তথ্য প্রকাশ্যে এনেছিল? কোনও কারচুপিই কি করেনি? তদন্তের আরও গভীরে গেলে হয়তো উঠে আসবে এই প্রশ্নের উত্তর। 

এরপর ‘নাসা’-র তরফে একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিশনের সদস্যের সামনে এসে ব্যাখ্যা করলেন এই অভিযানের খুঁটিনাটি। যেহেতু কমিশনের সদস্যদের অনেকেই মহাকাশবিজ্ঞান বা স্পেসশিপের গঠন সম্বন্ধে অজ্ঞ, তাই প্রত্যেককে গোটা অভিযানের যাবতীয় তথ্য বেশ গুছিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ চলল কয়েকদিন ধরে, আর সদস্যরাও এই সুযোগে মহাকাশ-অভিযানের ব্যাপারে অনেক জ্ঞান অর্জন করে ফেললেন। 

Challenger Disaster
দুর্ঘটনার পেছনে আসল কারণ ওই বিশেষ O-রিং

অবশ্য এই গোটা ব্যাপারটায় বেশ বিরক্ত হচ্ছিলেন ফাইনম্যান নিজে। কমিশনের সদস্যদের অনেকেই সাক্ষ্যপর্ব চলাকালীন বোকা-বোকা প্রশ্ন করে যান, বা অনেক সময়েই তাঁর জানা অনেক বিষয়ই তাঁকে একাধিকবার শুনে যেতে হয়, বাধ্য হয়ে। এতে তাঁর সময় নষ্ট হচ্ছে, এই নিয়ে তিনি বারবার অনুযোগ শোনাতেন স্ত্রী-র কাছে। আবার অনেক সময় কমিশনের সাক্ষ্যগ্রহণপর্ব চলাকালীন তিনি বাইরে বেরিয়ে ‘নাসা’-র চত্বরে ঘুরে বেড়াতেন, কথা বলতেন অন্য কর্মীদের সঙ্গে।

তবে বেশিদিন লাগল না, ফাইনম্যান বুঝে ফেললেন এই দুর্ঘটনার আসল কারণ। কী ছিল সেই কারণ? 

আসলে কমিশনের সদস্যদের কাছে ‘নাসা’-র উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিরা বলেছিলেন যে, এই ধরনের অভিযানে মারাত্মক-রকমের দুর্ঘটনা (যাতে গোটা স্পেসশিপটাই সমস্ত সদস্যদের নিয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে) ঘটবার সম্ভাবনা এক লাখে এক। অথচ এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে ফাইনম্যান যখন কথা বললেন, তাঁরা জানালেন, না এই সম্ভাবনা একশোয় এক। এত বড় ফারাক কেন? 

ফাইনম্যানও তাঁর বক্তব্যে দুর্ঘটনার জন্য ‘নাসা’-র এই অসতর্ক আচরণকেই দায়ী করেন। ‘নাসা’-ও পরবর্তীকালে যে মহাকাশ-অভিযানের উদ্যোগ নেয়, সেখানে বিভিন্ন যন্ত্রাংশের নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে আরও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল। 

এর কারণ, ‘নাসা’-র ‘বিজ্ঞ’ এবং অতিমাত্রায় আত্ম-তৃপ্ত কর্তারা মনে করতেন যে খুব ছোটখাটো যান্ত্রিক ত্রুটি, যেগুলো ঘটলে স্পেসশিপের উড়ানে তক্ষুনি কোনও সমস্যার সৃষ্টি হয় না, সেগুলোকে উপেক্ষা করা যেতে পারে। আর এই মানসিকতা যখনই ফাইনম্যান ধরে ফেললেন, তারপরে তিনি একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে লাগলেন, মূল যন্ত্রের অভ্যন্তরীণ নানা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে। খুব সহজ কিছু বিষয়, যেমন স্ক্রু টাইট দেওয়ার ব্যাপার বা বিশেষ কিছু ধরনের রিং নিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতেই তিনি বুঝে ফেললেন এই দুর্ঘটনার আসল কারণ।  

এরই মধ্যে ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ প্রকাশিত হল একটি খবর; যেখানে লেখা হল যে ‘নাসা’-র এই দুর্ঘটনার পেছনে আসল কারণ ওই বিশেষ O-রিং, আর অনেকদিন ধরেই এই রিং নিয়ে সমস্যার কথা নাসা-কে নাকি জানানো হচ্ছিল সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে, নাসা কানে নেয়নি সেই সতর্কবাণী। এই খবর প্রকাশ পাওয়ার পর সকলে বুঝলেন, এবার কমিশনের কাজে আরও গতি আনা দরকার। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবার নির্ধারণ করে ফেলতেই হবে। 

ওইদিন সন্ধেবেলা গ্রাহাম সাহেব ফাইনম্যান-কে নিয়ে গেলেন সিনেমা দেখতে। না, কোনও কাহিনিচিত্র নয়, তাঁরা দেখলেন ‘নাসা’-রই বছর দু’য়েক আগেকার এক অভিযান নিয়ে সিনেমা ‘দ্য ড্রিম ইজ অ্যালাইভ’। এই সিনেমা দেখবার পর ফাইনম্যান আক্ষরিক অর্থেই কাঁদলেন, বুঝলেন ‘নাসা’ যে কাজগুলো করে, তাতে কত মানুষের কত দিনের পরিশ্রম আর নিষ্ঠার ছাপ থাকে। একটা বা দু’টো ব্যর্থতা দিয়ে সেই সত্যিটাকে চাপা দেওয়া যায় না, আর উচিতও নয়। এই সিনেমাটা দেখবার পরেই তাঁর মানসিকতা একশো আশি ডিগ্রি বদলে গেল। এখন তিনি আর নাসা-র ছিদ্রান্বেষী নন, তিনি নাসা-র সমর্থক। তিনি এবার স্থির করলেন, এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণটা খুঁজে বের করে নাসা-র সেই অগণিত কর্মীদের মানসিক স্বস্তি এনে দিতে হবে, যাতে তাঁরা আরও সতর্কভাবে পরবর্তী প্রোজেক্টগুলোর কাজ শুরু করতে পারেন।  

Challenger Disaster
ফাইনম্যান এই পরীক্ষাটি নিজেই হাতেকলমে করে দেখালেন

চার

এর দু-দিন পর, ১১ ফেব্রুয়ারি, টিভি চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে, রজার কমিশনের সদস্যরা জনসমক্ষে এলেন, আর সেই প্রোগ্রামেই ফাইনম্যান সকলের সামনে হাতেকলমে ব্যাখ্যা করে দেখালেন দুর্ঘটনার আসল কারণ। তিনি নিয়ে এলেন রকেটের বিশেষ ওই অংশের সঙ্গে যুক্ত থাকা সেই ‘O-রিং’-এর একটি মডেল (এগুলো O আকৃতির হত বলেই নাম ‘O-রিং’) এই রিং তিনি সি-ক্ল্যাম্প দিয়ে চেপে ধরে ডুবিয়ে দেন তাঁর সামনে রাখা একটি বরফের মতো ঠাণ্ডা জলের গ্লাসে। কিছু সময় পর তিনি সেই জল থেকে রিং-টি তুলে এনে ক্ল্যাম্প খুলে দেন। এবার দেখা যায়, রিংটি আগের মতো অবস্থায় ফিরে না গিয়ে রয়ে গেছে চ্যাপ্টা হয়েই। বোঝা গেল, খুব ঠাণ্ডা পরিবেশে এই রিং আর স্বাভাবিক চেহারায় থাকে না। 

ফাইনম্যান এই পরীক্ষাটি যে নিজেই হাতেকলমে করে দেখাবেন, এটা আগে থেকে কেউই জানতেন না! তিনি নিজেই ওইদিন ভোরবেলা গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে স্থানীয় একটি হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে এই ক্ল্যাম্প আর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কিনে নিয়ে এসেছিলেন। তবে পরীক্ষাটা করে দেখানোর পর কারও মনে আর কোনও সন্দেহই ছিল না দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্বন্ধে। 

ফাইনম্যানও তাঁর বক্তব্যে দুর্ঘটনার জন্য ‘নাসা’-র এই অসতর্ক আচরণকেই দায়ী করেন। ‘নাসা’-ও পরবর্তীকালে যে মহাকাশ-অভিযানের উদ্যোগ নেয়, সেখানে বিভিন্ন যন্ত্রাংশের নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে আরও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল। 

গোটা ব্যাপারটা তার মানে ঘটেছিল এইরকম: সেইদিন রওনা দেওয়ার মাত্র তিন সেকেন্ড পরে ওই স্পেস শাটল-এর ডান দিকের ‘সলিড রকেট বুস্টার’ (যাকে সংক্ষেপে বলে SRB) নামের একটি অংশের সঙ্গে যুক্ত থাকা O-আকারের ওই রিং, যেটা দুটো সিলিন্ডারকে জুড়ে রাখবার কথা, সেটা প্রচণ্ড ঠাণ্ডার জন্য ঠিকঠাক কাজ করেনি, আর অতিরিক্ত গরমে সেটা খুলে যায়। ফলে সিলিন্ডারের মুখও খুলে গিয়ে বেরিয়ে আসে গরম হাইড্রোজেন গ্যাস, যার উষ্ণতা পাঁচ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়েও বেশি। ওই প্রচণ্ড গরম গ্যাস আরও গলিয়ে দেয় O-রিংকে, আর কয়েক সেকেন্ড পরেই ঘটে যায় বিস্ফোরণ। শোনা যায়, পাইলট মাইকেল জে স্মিথ নাকি বিস্ফোরণের ঠিক আগে বলেছিলেন, ‘ওহ হো!’ 

জুন মাসে রজারস কমিশনের অফিসিয়াল রিপোর্ট জমা পড়ে। তাঁদের অনুসন্ধানে জানা গিয়েছিল যে ‘নাসা’-কে এই যন্ত্রাংশ যে খুব ঠাণ্ডায় কাজ না-ও করতে পারে, সে-ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল অভিযানের অনেক আগেই, কিন্তু তারা সেটাকে উপেক্ষা করে। ফাইনম্যানও তাঁর বক্তব্যে দুর্ঘটনার জন্য ‘নাসা’-র এই অসতর্ক আচরণকেই দায়ী করেন। ‘নাসা’-ও পরবর্তীকালে যে মহাকাশ-অভিযানের উদ্যোগ নেয়, সেখানে বিভিন্ন যন্ত্রাংশের নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে আরও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল। 

রিচার্ড ফাইনম্যান রজারস কমিশনের তদন্ত-রিপোর্টের শেষে আলাদাভাবে জুড়ে দিয়েছিলেন নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণ, আর সেখানে ছিল বিখ্যাত একটি বাক্য: ‘for a successful technology, reality must take precedence over public relations, for nature cannot be fooled’, সত্যিই, প্রকৃতিকে কখনও বোকা বানানো যায় না।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of অর্পণ পাল

অর্পণ পাল

দেড় দশক শিক্ষকতায় যুক্ত। বিজ্ঞান নিয়ে লেখালিখি পেরিয়েছে দশ বছরের সীমানা। প্রকাশিত বই নয়টি। পড়া আর লেখাই অবসরযাপনের মুখ্য সঙ্গী।
Picture of অর্পণ পাল

অর্পণ পাল

দেড় দশক শিক্ষকতায় যুক্ত। বিজ্ঞান নিয়ে লেখালিখি পেরিয়েছে দশ বছরের সীমানা। প্রকাশিত বই নয়টি। পড়া আর লেখাই অবসরযাপনের মুখ্য সঙ্গী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

বিতস্তা ঘোষাল
হেমেন্দ্রকুমার রায়
বিতস্তা ঘোষাল

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
ইন্দ্রনাথ রুদ্র
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com