(WB Political History 2)
দেশভাগে বাংলায় বামপন্থী রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ প্রভাব
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়টা ছিল কলকাতার ইতিহাসের এক অগ্নিগর্ভ অধ্যায়। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত এই শহর ছিল দেশভাগের ক্ষত বয়ে আনা লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর আশ্রয়স্থল, সঙ্গে তাঁদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সোচ্চার এক রণক্ষেত্র। খাদ্য সংকট, বাসস্থানের অভাব এবং ন্যায্য মজুরির দাবিতে ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের মিছিলে কলকাতার রাজপথ বারংবার প্রকম্পিত হয়েছে। এই তিন দশকের আন্দোলনগুলো সমকালীন রাজনীতিকে যেমন প্রভাবিত করেছিল, আবার বাঙালির সামাজিক ও মানসিক মানচিত্রে এক গভীর ছাপও রেখে গিয়েছিল।
১৯৫১ সালে ‘দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অফ ডিসপ্লেসড পারসনস অ্যান্ড এভিকশন অ্যাক্ট’ প্রবর্তন করা হয়। তখন থেকেই কলকাতায় শরণার্থী আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা। উচ্ছেদ আতঙ্কে থাকা উদ্বাস্তুদের সংগঠিত করতে এগিয়ে আসে বামপন্থী দলগুলো, বিশেষ করে ইউনাইটেড সেন্ট্রাল রিফিউজি কাউন্সিল (UCRC), রেভোলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি (RSP) এবং শরণার্থী কেন্দ্রীয় পুনর্বাসন কাউন্সিল (RCRC)। নিজেদের বাসভূমির স্বীকৃতি এবং ভোটাধিকারের দাবিতে শরণার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সরকারকে বিল সংশোধনে বাধ্য করে। এটিই ছিল কলকাতার বুকে বৃহত্তর বামপন্থী রাজনীতির ভিত্তিপ্রস্তর।
আরও পড়ুন:পশ্চিমবাংলার ক্ষমতা বদলের প্রাক সুবর্ণ জয়ন্তী
জুলাই ১৯৫৩। বাংলায় বিধান চন্দ্র রায়ের সরকার। ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি লিমিটেড (তখনও ব্রিটিশ সংস্থা)-এর পক্ষ থেকে ট্রামের দ্বিতীয় শ্রেণির ভাড়া এক পয়সা বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শরণার্থীরা ছাড়াও, কলেজের ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক এবং শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অপ্রতিরোধ্য সহানুভূতি আন্দোলনকে সফল করে।
জনসাধারণের স্মৃতিতে এই আন্দোলন “এক পয়সার লড়াই” হিসেবে পরিচিত। এক পয়সার ট্রাম আন্দোলনে কলকাতা শহর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়ে উঠেছিল, রাতে পাড়ায় পাড়ায় লাইট নিভিয়ে অন্ধকারের মধ্যে পুলিশকে লক্ষ্য করে শুরু হত ইটবৃষ্টি। আতঙ্কিত রাজ্য সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে শহরে মিছিল সমাবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়। বিধান রায় তাঁর নিজের চোখের চিকিৎসার জন্য তখন বিদেশে ছিলেন, কিন্তু কলকাতার উত্তাল পরিস্থিতির খবর কানে পৌঁছাতেই তিনি চিকিৎসা স্থগিত রেখে শহরে ফিরে আসেন।

১৬ই জুলাই কলকাতার রাস্তায় মিলিটারি নামে। এই আন্দোলনে প্রায় ৪,০০০ মানুষকে আটক করা হলেও শেষ পর্যন্ত জনজোয়ারের কাছে নতি স্বীকার করে ট্রাম কোম্পানি বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
ট্রাম আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই পরের বছর ১৯৫৪ সালে বর্ধিত বেতন এবং মহার্ঘ্য ভাতার দাবিতে “অল বেঙ্গল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন”(এবিটিএ)-এর ছত্রছায়ায় হাজার হাজার শিক্ষক কর্মবিরতি ঘোষণা করে ১০ দিনের অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন। এই ধর্মঘট বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নগর পুলিশ সহিংস সংঘর্ষের ফলে পাঁচজন শিক্ষক নিহত এবং বহু শিক্ষক আহত হন। এই আত্মত্যাগ ও শিক্ষক সমাজের দৃঢ়তা সরকারকে তাঁদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করে, যা পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
১৮৮৬ সাল থেকে বার্মা ছিল ব্রিটিশশাসিত ভারতের অঙ্গ প্রদেশ। সেই সুবাদে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় তখন বার্মাতে বসবাস করে, ক্রমশ তাঁরা বার্মিজ অর্থনীতির একটা বড় অংশীদার হয়ে ওঠে। স্থানীয় জমি, ব্যবসা এমনকি সরকারি চাকরি নিয়ন্ত্রণ তাঁদের অধীনস্থ হওয়ায়, বার্মিজদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়।
একদম কাছাকাছি সময়ের মধ্যে শরণার্থী আন্দোলন, ট্রাম আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক ত্রাণ সরবরাহের মধ্যে দিয়েই পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি একত্র হয়, যার ফলে পরবর্তীতে ঐক্যবদ্ধ বাম বিরোধী দল গড়ে ওঠা অনেকটা সহজ হয়েছিল।
১৯৫৭ সাল থেকেই বাংলায় খাদ্য সংকট দেখা দেয়। তখনকার সরকারি হিসেব অনুযায়ী এ রাজ্যে শুধু চালের ঘাটতি ছিল তিন লক্ষ টন। ১৯৫৮ সালে সেই ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ১২ লক্ষ টন। ১৯৫৯ সালে খোলা বাজার থেকে চাল, গম উধাও হয়ে গ্রাম বাংলায় দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তৈরি করে। খাদ্যের সন্ধানে দলে দলে কৃষকরা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসতে থাকে। ১৫ই জুন বামপন্থী দলেরা কলকাতায় কেন্দ্রীয় সমাবেশের মাধ্যমে রাজ্যের কংগ্রেস সরকারের খাদ্য নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলে। এটাই ছিল ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলনের অন্যতম প্রারম্ভিক পর্যায়।

এই সমাবেশের রেশ ধরে ২৫শে জুন রাজ্যব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট, হরতালের ডাক দেওয়া হয় এবং ১৩ই জুলাই শুরু হয় ‘জেল ভরো’ আন্দোলন। এই আন্দোলনে গ্রেফতার হয় ১৬৩৪ জন। ২৩ আগস্ট থেকে খাদ্যের দাবিতে রাজ্যজুড়ে গণ আন্দোলন শুরু হলেই, শুরু হয় সরকারি দমনপীড়ন। মাত্র তিন দিনে গ্রেফতার করা হয় সাত হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে। বাম নেতৃত্বে ১৯৫৯ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতার সমাবেশে প্রায় তিন লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। সেদিন পুলিশের লাঠিচার্জ ও গুলিতে সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৮০ জন আন্দোলনকারী নিহত এবং তিন হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন। এই সংখ্যা থেকেই আমরা সেদিনের আন্দোলনের তীব্রতা সম্পর্কে একটা আন্দাজ করতে পারি।
এবার আসি বার্মা থেকে আগত বাঙালি রিফিউজিদের প্রসঙ্গে। ১৮৮৬ সাল থেকে বার্মা ছিল ব্রিটিশশাসিত ভারতের অঙ্গ প্রদেশ। সেই সুবাদে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় তখন বার্মাতে বসবাস করে, ক্রমশ তাঁরা বার্মিজ অর্থনীতির একটা বড় অংশীদার হয়ে ওঠে। স্থানীয় জমি, ব্যবসা এমনকি সরকারি চাকরি নিয়ন্ত্রণ তাঁদের অধীনস্থ হওয়ায়, বার্মিজদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। ১৯৩০-এর দশক থেকে বার্মায় শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থান ঘটে। ১৯৩৭ সালের ১লা এপ্রিল, ব্রিটিশ অধীনস্থ ভারত থেকে বার্মা আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক উপনিবেশ হওয়ার পর এই মনোভাব আরও তীব্র হয়, এবং বার্মিজরা ভারতীয়দের “বিদেশি” এবং “শোষক” হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে।
দেশভাগের সময় আসা পূর্ব পাকিস্তানি শরণার্থীদের জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন ছিল, বার্মা-ফেরত এই স্বল্পসংখ্যক বাঙালির জন্য তুলনামূলকভাবে প্রায় কিছু ছিল না বললেই চলে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা বার্মা আক্রমণ করলে, ব্রিটিশরা তখন জাহাজ স্টিমার এবং বিমান মূলত শ্বেতাঙ্গদের জন্য বরাদ্দ রাখতে বাধ্য হয়। কয়েক লক্ষ প্রবাসী ভারতীয় তখন দুর্গম স্থলপথ দিয়ে ভারতে ফিরে আসার চেষ্টা করে। এই যাত্রাপথে প্রায় লক্ষাধিক ভারতীয় অনাহার, কলেরা এবং ক্লান্তিতে মারা যায়। ইতিহাসের পাতায় এই পথকে বর্ণিত করা হয় ‘ডেথ ভ্যালি’ বা ‘মৃত্যু উপত্যকা’ নামে।
১৯৬২ সালে বার্মায় সামরিক শাসনে জেনারেল নে উইন ক্ষমতায় এসে সকল ভারতীয়দের ব্যবসা, সম্পত্তি রাতারাতি কেড়ে নেয়। তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং পরবর্তীতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ভারতীয়দের দেশে ফেরানর জন্য জাহাজ ও বিমান পাঠালে, জাহাজ এবং বিমানে ওঠার আগে প্রত্যেক ভারতীয়দের কঠোর তল্লাশি চালিয়ে কাপড়ে, শরীরে লুকানো গয়না, টাকা সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। অনেকেই তাদের জীবনের সমস্ত উপার্জনও সঞ্চয় স্থানীয়দের কাছে ফেলে রেখে চোখে জল নিয়ে জাহাজে উঠেছিলেন।
তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার বার্মার বাঙালি শরণার্থীদের জন্য উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাত, হাসনাবাদ, বনগাঁ পেট্রাপোল এবং কামারহাটি এই চার জায়গায় ক্যাম্প তৈরি করেছিল। কিন্তু বাংলায় ফিরে আসার পর এই পরিবারগুলো এক বিচিত্র সংকটে পড়েন। স্থানীয়রা এদের “বার্মিজ” বলে মনে করে, অথচ জাতিগতভাবে তারা বাঙালি। দেশভাগের সময় আসা পূর্ব পাকিস্তানি শরণার্থীদের জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন ছিল, বার্মা-ফেরত এই স্বল্পসংখ্যক বাঙালির জন্য তুলনামূলকভাবে প্রায় কিছু ছিল না বললেই চলে।
১৯৬৬ সালের গোড়ার থেকে বাংলার জেলায় জেলায় খাদ্য সংকট শুরু হতেই আবারও নতুন করে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। সাধারণ মানুষ খোলা বাজার থেকে চাল কেনার সামর্থ্য হারিয়ে দিনের পর দিন সরকারি রেশন দোকানের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ রেশন দোকানেও চাল বেপাত্তা।
অজয় মুখোপাধ্যায়ের মতো সিনিয়র কংগ্রেস নেতা দল ত্যাগ করে “বাংলা কংগ্রেস” গঠন করে। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে তিনি বামফ্রন্টকে সমর্থন করে সাতটা আসনে জয়ী হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে কংগ্রেস সরকারের পরাজয়ের জন্যে সরাসরি খাদ্য সংকট, গণবন্টন (পিডিএস) ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এবং আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের প্রতি সরকারের উদাসীনতা ভীষণভাবে দায়ী ছিল।
একমুঠো ভাতের জন্য মানুষ তখন মরিয়া। খাদ্যাভাবের সঙ্গে গ্রামীণ বাংলায় পরীক্ষার মরসুমে কেরোসিন তেলের অভাবে ছাত্রছাত্রীরা দিশেহারা হয়ে ওঠে। ক্ষুধার্ত জনতার মিছিল, বিক্ষোভ, অশান্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে আন্দোলন বন্ধ করার চেষ্টা করলে শুরু হয় পুলিশি জুলুমের বিরুদ্ধে অনাহারীদের লড়াই।
১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২৪ পরগনার বসিরহাটের স্বরূপনগরে রেশন ও কেরোসিনের অভাবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত ছাত্রদের উপর পুলিশ গুলি চালালে, ষষ্ঠ শ্রেণির স্কুল ছাত্র নুরুল ইসলাম এবং মণীন্দ্র বিশ্বাস নিহত হয়। এটাই রাজ্যব্যাপী খাদ্য আন্দোলনের সূত্রপাত। বসিরহাট থেকে দক্ষিণ বাংলা জুড়ে কলকাতাকে গ্রাস করে আন্দোলন আরও সহিংস হয়ে উঠে। প্রায় দেড় মাসের এই আন্দোলনে সব থেকে বেশি সংখ্যায় অংশগ্রহণ করেছিল শরণার্থী উপনিবেশের তরুণরা। পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে ছাত্রদের ব্যাপক প্রতিরোধে কলেজ স্ট্রিট যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। শহরের বুদ্ধিজীবীরা, কলকাতার চলচ্চিত্র জগৎ, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নাট্যব্যক্তিত্ব এবং নাগরিক সমাজের অনেক বিশিষ্ট জন এই আন্দোলকে সমর্থন জানায়।

অজয় মুখোপাধ্যায়ের মতো সিনিয়র কংগ্রেস নেতা দল ত্যাগ করে “বাংলা কংগ্রেস” গঠন করে। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে তিনি বামফ্রন্টকে সমর্থন করে সাতটা আসনে জয়ী হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে কংগ্রেস সরকারের পরাজয়ের জন্যে সরাসরি খাদ্য সংকট, গণবন্টন (পিডিএস) ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এবং আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের প্রতি সরকারের উদাসীনতা ভীষণভাবে দায়ী ছিল।
১৯৫০ থেকে ১৯৭০ এই দুই দশক জুড়ে রচনা হয়েছে শহর কলকাতার টিকে থাকার লড়াইয়ের ইতিহাস। এই শহর শরণার্থী বা আন্দোলনকারীদের যেমন আশ্রয় দিয়েছে আবার তাঁদের সাহস ও সংহতিকে আগলে রেখেছিল। ট্রাম আন্দোলন থেকে খাদ্য আন্দোলন এই প্রতিটা সংগ্রামই ছিল সাধারণ মানুষের মর্যাদা রক্ষার লড়াই। এই স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আজও বাঙালির মননে অধিকার সচেতনতার এক অনন্য ঐতিহ্য হিসেবে জীবন্ত হয়ে আছে। এই অস্থিরতা থেকেই পরবর্তীতে জন্ম নিয়েছিল আরও সুদূরপ্রসারী ও উগ্র রাজনৈতিক মতাদর্শ, যা বাংলার ইতিহাসের গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
জমি সংস্কার ও গ্রামীণ বাংলায় রাজনীতির প্রভাব
বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশক ছিল ভারতীয় রাজনীতির এক সন্ধিক্ষণ। একদিকে কেন্দ্রের শাসক দল জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ভাঙন, আর অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের উত্থান, এই দুই ধারা মিলে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ১৯৭৭ সালের ক্ষমতা বদল এবং পরবর্তী ভূমি সংস্কার পশ্চিমবঙ্গের আর্থ-সামাজিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেয়।
কংগ্রেসের এই ভরাডুবির পর দলের ভেতর নতুন করে অসন্তোষ দেখা দেয়। ১৯৭৮ সালের ২ জানুয়ারি ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সমর্থকদের নিয়ে তিনি এক নতুন দল কংগ্রেস (ইন্দিরা) বা সংক্ষেপে কংগ্রেস (আই) গঠন করেন। ১৯৮১ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশন এই ইন্দিরা কংগ্রেসকেই মূল বা ‘আসল’ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে কংগ্রেস দলের প্রবীণ নেতাগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর আদর্শগত সংঘাত শুরু হয়। সেই সময় ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্তকরণ এবং রাজভাতা বাতিলের মতো প্রগতিশীল সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল প্রবীণ নেতাগোষ্ঠী। এছাড়াও ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কংগ্রেসের অফিশিয়াল প্রার্থী নীলম সঞ্জীব রেড্ডির পরিবর্তে ইন্দিরা গান্ধী স্বতন্ত্র প্রার্থী ভি.ভি. গিরিকে সমর্থন করেন। ভি.ভি. গিরি জয়ী হলে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ইন্দিরা গান্ধীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং কংগ্রেস পার্টি দু’ভাগে ভাগ হয়ে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস (আর) ‘রিকুইজিশনিস্ট’ এবং প্রবীণ নেতা গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের কংগ্রেস (ও) ‘অর্গানাইজেশন’।
১৯৬০–৭০ এই দশকের মধ্যে বাংলায় বামপন্থী রাজনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৭৫-৭৭ সালে কেন্দ্রের জরুরি অবস্থার পর ৭৭-এর লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং কেন্দ্রে জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসে। কংগ্রেসের এই ভরাডুবির পর দলের ভেতর নতুন করে অসন্তোষ দেখা দেয়। ১৯৭৮ সালের ২ জানুয়ারি ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সমর্থকদের নিয়ে তিনি এক নতুন দল কংগ্রেস (ইন্দিরা) বা সংক্ষেপে কংগ্রেস (আই) গঠন করেন। ১৯৮১ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশন এই ইন্দিরা কংগ্রেসকেই মূল বা ‘আসল’ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

জনতা পার্টি ক্ষমতা দখলের পর পশ্চিমবঙ্গসহ বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ওড়িশা, পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং হিমাচল প্রদেশ মোট নয়টা রাজ্যের বিধানসভা ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা করে। ইতিমধ্যে ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে সিপিআই(এম) (CPI-M), আরএসপি (RSP), ফরোয়ার্ড ব্লক (AIFB), মার্ক্সবাদী ফরোয়ার্ড ব্লক (MFB) এবং আরও কয়েকটা বামপন্থী দল একত্রে বামজোট গঠন করে ফেলেছে। নির্বাচনের আগে বামফ্রন্ট এবং জনতা পার্টির মধ্যে আসন সমঝোতার চেষ্টা হলেও সেটা ব্যর্থ হয়। বামফ্রন্ট জনতা পার্টিকে ৫৬% আসন এবং প্রফুল্ল চন্দ্র সেনকে মুখ্যমন্ত্রী করার প্রস্তাব দিলেও জনতা পার্টি ৭০% আসনের দাবিতে অনড় থাকে।
৩০শে এপ্রিল ১৯৭৭-এ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয় ফলে ১৪ই জুন বিধানসভা নির্বাচনে দলগুলো পৃথকভাবে নির্বাচনে লড়াই করে। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায় বাংলার ২৯৪টা আসনের মধ্যে সিপিআই(এম) একাই ১৭৮টা আসনে জয়লাভ করেছে। কংগ্রেস ২০টা এবং জনতা পার্টি মাত্র ২৯টা আসন পেয়েছিল। বামফ্রন্ট ২৩০টারও বেশি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বাংলায় সরকার গঠন করে।
বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪বছর ক্ষমতায় টিকে থাকার পিছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করেছিল। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলন, ভূমি সংস্কার (Land Reform) এবং শ্রেণি রাজনীতি।
১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা বদল ছিল ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে সেই বছরই প্রথম জ্যোতি বসু এবং প্রমোদ দাশগুপ্তের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসে এবং টানা ৩৪ বছর (১৯৭৭–২০১১) ক্ষমতায় ছিল। ভারতের অন্য কোনও রাজ্যে বামপন্থীরা এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি।
বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪বছর ক্ষমতায় টিকে থাকার পিছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করেছিল। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলন, ভূমি সংস্কার (Land Reform) এবং শ্রেণি রাজনীতি।

স্বাধীনতার পর গ্রামীণ বাংলায় ভূমিহীন চাষীরা উৎপাদিত ফসলের সঠিক অংশ পেত না এবং যেকোনও সময় তাঁদের জমি থেকে উচ্ছেদের ভয় থাকত। ১৯৭৮ সালে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন সরকার এই অবস্থা বদলাতে উদ্যোগ নেয়। প্রচলিত ধীরগতিসম্পন্ন আইনি পদ্ধতির পরিবর্তে, সরকারি কর্মকর্তারা গ্রামে গ্রামে ক্যাম্প বসিয়ে সরাসরি ভাগচাষীদের নাম নথিবদ্ধ (Record of Rights) করেন। ফলে বর্গাদাররা তাদের চাষ করা জমির ওপর আইনি অধিকার লাভ করে এবং জোতদাররা তাদের ইচ্ছামতো জমি থেকে চাষিদের উচ্ছেদ করার অধিকার হারায়। পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে ১৫ লক্ষের বেশি বর্গাদার রেকর্ড করা হয়েছে এবং ৫.৬ লক্ষেরও বেশি মানুষের মধ্যে জমি বন্টন করা হয়েছে। “অপারেশন বর্গা” মূলত শোষিত ভাগচাষীদের সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক সাহসী প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
পশ্চিমবঙ্গের “অপারেশন বর্গা” প্রয়োগকে ভারতের অন্যতম সফল ভূমি সংস্কার কার্যক্রম হিসেবে গণ্য করা হয়, যা গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রাখে এবং কেন্দ্রের নীতির তুলনায় রাজ্যের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি সৃষ্টি করে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, কেরালা ছাড়া ভারতের অন্যান্য রাজ্যে বিশেষত বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাট, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং হরিয়ানায় ভূমি সংস্কারের তেমনভাবে উল্লেখযোগ্য কোনও প্রভাব ছিল না। কারণ সেখানের অধিকাংশ জোতদার রাজনীতিবিদ হওয়ার ফলে সংস্কার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বিষয়ে তাঁদের ইচ্ছাশক্তি খুব একটা কাজ করেনি।
‘অপারেশন বর্গা’র মাধ্যমে বামপন্থীরা যে মজবুত গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করেছিল, তা পরবর্তী তিন দশক তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করেছিল। কংগ্রেসের বিভাজন ও জনতা পার্টির উত্থান-পতনের মাঝে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে উঠেছিল ভারতীয় রাজনীতির এক স্বতন্ত্র দুর্গ।
১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিছক সরকার বদল ছিল না, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়ার এক প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে। ‘অপারেশন বর্গা’র মাধ্যমে বামপন্থীরা যে মজবুত গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করেছিল, তা পরবর্তী তিন দশক তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করেছিল। কংগ্রেসের বিভাজন ও জনতা পার্টির উত্থান-পতনের মাঝে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে উঠেছিল ভারতীয় রাজনীতির এক স্বতন্ত্র দুর্গ।
বাংলার ছাত্র রাজনীতি ও প্রতিবাদের ঐতিহ্য
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘সত্তরের দশক’ এই সময়কালটা ছিল একই সঙ্গে চরম আদর্শবাদ এবং ধ্বংসাত্মক বিপ্লবের সংমিশ্রণের দশক। ১৯৬৭ সালে উত্তরবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রাম ‘নকশালবাড়ি’তে চারু মজুমদার এবং কানু সান্যালের নেতৃত্বে এক স্ফুলিঙ্গের সূচনা হয়, তা দ্রুত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও। তাঁরা (নকশালপন্থী) বিশ্বাস করতেন “সশস্ত্র বিপ্লবই মুক্তির পথ”, অর্থাৎ ব্যালট নয়, বন্দুকের নলই হবে ক্ষমতার উৎস। সেক্ষেত্রে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও করে বিপ্লব শুরু হবে। গ্রামের কৃষকরাই হবে প্রধান চালিকাশক্তি। তার জন্যে শ্রেণিশত্রু খতম করে জমিদার ও জোতদার উচ্ছেদ করে কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য। কৃষকদের সঙ্গে জমিদারদের এবং পুলিশের সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে এই অন্দোলন এক উগ্র রাজনৈতিক নকশাল আন্দোলনে পরিণত হয়। যা প্রায় এক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে।

এই আন্দোলনের অন্যতম আশ্চর্যজনক দিক হল কলকাতার প্রথম সারির মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর, শিবপুর, কলকাতা মেডিকেল কলেজ বা আরজি কর-এর মতো প্রতিষ্ঠানের উজ্জ্বল শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে গ্রামের কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেন। তাঁদের স্লোগান ছিল— ‘সত্তরের দশক মুক্তির দশক’। এই স্লোগান সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে এক দ্রুত বিপ্লবী পরিবর্তনের আশাও জাগিয়ে তুলেছিল।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই আন্দোলনের ভরকেন্দ্র গ্রাম থেকে সরে এসে কলকাতায় থিতু হয়। শ্যামবাজার, কাশীপুর-বরানগর, বেলেঘাটা, যাদবপুর এবং কলেজ স্ট্রিটের মতো এলাকাগুলো হয়ে ওঠে নকশালদের প্রধান ঘাঁটি। শুরু হয় সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ- নকশাল ছাত্ররা তথাকথিত ‘বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থা’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বাংলার নবজাগরণের মনীষীদের মূর্তি ভাঙা এবং স্কুল-কলেজের পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া ছিল তাঁদের এক বৈপ্লবিক বিতর্কিত পদক্ষেপ। পুলিশ ও সরকারি কর্মচারীদের ওপর আক্রমণ এবং পাল্টা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নে কলকাতা এক রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। পাড়ায় পাড়ায় তখন বারুদের গন্ধ আর লাশের মিছিল।
বহু ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মী এই সময় থেকেই কেন্দ্রের আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক চিরস্থায়ী রাজনৈতিক মনোভাব গ্রহণ করে।
সর্বব্যাপী সহিংসতা সত্ত্বেও, নকশাল আন্দোলন তৎকালীন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বিপ্লবী ধারণার জন্ম দিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় কঠোর হস্তক্ষেপে এবং অভ্যন্তরীণ মতভেদে এই আন্দোলন দমিত হলেও বাঙালির রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বকে চিরতরে বদলে দেয়। বহু ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মী এই সময় থেকেই কেন্দ্রের আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক চিরস্থায়ী রাজনৈতিক মনোভাব গ্রহণ করে।
নকশালবাড়ি আন্দোলন ছিল বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের এক চরম অস্থিরতা ও স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ। এই আন্দোলনের রণকৌশল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, সমাজের নিচুতলার মানুষের অধিকার এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের যে আকাঙ্খা তৈরি করেছিল, তা আজও বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অমলিন স্মৃতি হয়ে রয়েছে। সত্তরের সেই অগ্নিগর্ভ দিনগুলো আজও বাঙালির যাপনে এক মিশ্র অনুভূতির সঞ্চার করে।
(তৃতীয় পর্বে সমাপ্য)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত