(Pranay Roy)
বেশ কয়েক দশক আগের কথা। দক্ষিণ দিল্লির কিছু রাজপথ অতিক্রম করে পৌঁছাতাম রেল ভবন, সংসদ ভবনের কাছে। রেল ভবন এবং পার্লামেন্ট হাউসের কাছেই ছিল অফিস। দক্ষিণ দিল্লির পথ ধরে যখন যেতাম, গাড়ির জানালা দিয়ে দেখতাম এনডিটিভি-র বড় বড় হোর্ডিং। বিজ্ঞাপনে প্রণয় রায়ের একটা মস্ত অবয়ব। ঝকঝকে সপ্রতিভ যুবক। সেদিনও দাড়িটা ছিল। তার সঙ্গে বহু জায়গায় থাকত তিন নবীন সাংবাদিকের ছবি। রাজদীপ সরদেশাই, অর্ণব গোস্বামী আর বরখা দত্।
এই তিনজনকে প্রণয় তখন তাঁর নবপ্রতিষ্ঠিত নিউ দিল্লি টেলিভিশনের (যা সংক্ষেপে এনডিটিভি) অন্যতম মুখ করে তুলতে চাইছেন। প্রোজেক্ট করছেন, তাঁরা কথা বলছেন। ১৯৮৪ সালে এনডিটিভি-র যাত্রা শুরু। প্রণয় নিজে ছিলেন চার্টাড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। সেই অর্থে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করেননি। কিন্তু সমকালীন রাজনীতিতে উৎসাহ ছিল। সেই উৎসাহ থেকে সাংবাদিকতার মধ্যে প্রবেশ করলেন।
আরও পড়ুন: শক শশাঙ্ক বৌদ্ধ মুঘল এই পাঁজিতেই লীন
টেলিভিশনের পর্দায় যখন প্রণয় সাংবাদিকতা শুরু করলেন, তখন দূরদর্শন ছাড়া প্রাইভেট চ্যানেল ছিলই না। বলা যেতে পারে, ইংরেজি প্রাইভেট চ্যানেল প্রণয়ই প্রথম শুরু করেন।

সেই চ্যানেলের সাংবাদিকতা দূরদর্শনের সাংবাদিকতার থেকে ভিন্ন ছিল। আবার, প্রিন্ট জার্নালিজম থেকেও সেই সাংবাদিকতা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট নিয়ে আজ কতরকম গবেষণা, কত ধরনের সমালোচনা, কত আলোচনা! সেদিন কিন্তু ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় অ্যাঙ্কর কীভাবে কথা বলবে, সেই ‘ডুস অ্যান্ড ডোন্টস’ প্রণয় তাঁর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। এরপর আর প্রণয় পিছন দিকে তাকাননি। নিজের মুকুটে একের পর এক সাফল্যের পালক বসিয়েছেন।
দূরদর্শনে প্রতি সপ্তাহে একটা অনুষ্ঠান হত— ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’। প্রণয় রায় উপস্থাপিত করতেন। আমরা সেই অনুষ্ঠানটি দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। বিশ্বের নানা প্রান্তের বেশ কিছু ঘটনা তিনি দেখানোর চেষ্টা করতেন। তখন এত ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট, এত রিসার্চ, পিসিআর নামক এত শক্তিশালী প্রোডাকশন অফিস দূরদর্শনে ছিল না। রিসার্চ টিমও ছিল দুর্বল। প্রণয় তাঁর নিজের মতো করে গবেষণা শুরু করেন। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে এই অনুষ্ঠান নিয়েই বহু দুর্যোগ এসেছিল। দীর্ঘদিন দূরদর্শনের সঙ্গে একটা বড় বিতর্ক চলে। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’ প্রোজেক্টের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে তৎকালীন সরকার। তদন্তকারী সংস্থাকে দিয়ে অর্থ তছরুপের অভিযোগ তোলা হয়। প্রণয়কে তাঁর টাকা দূরদর্শনকে ফিরিয়ে দিতে হবে। কংগ্রেস জমানায় সেই প্রথম শুরু!

সেই সময় তদন্ত যাই হোক, সাধারণ মানুষের ধারণা হয়েছিল, নির্ভীক ও দৃঢ়চেতা এক সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রযন্ত্র দমিয়ে দিতে চাইছে। রাষ্ট্রের অসহিষ্ণুতার প্রকাশ পেয়েছে। পরবর্তীকালে এনডিটিভির বিরুদ্ধেও সিবিআই এবং এনফোর্সমেন্ট বিভাগ তদন্ত শুরু করে। তখনও সাধারণ মানুষের এটিই মনে হয়েছিল। প্রণয় রায় অভিযোগ করেছিলেন, এইসব তদন্ত অনেকটাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার কারণ এনডিটিভি-র রাজনৈতিক মতাদর্শগত লাইন বিজেপি বিরোধী, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী। প্রণয় কিছুটা বামপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত। যদিও, তিনি নিজেকে কখনও বামপন্থী বলে দাবি করেননি। তবে, তাঁর স্ত্রী রাধিকার বোন, বৃন্দা কারাত সিপিএমের বিশিষ্ট নেত্রী এবং পলিটব্যুরোর সদস্য। বৃন্দা কারাতের স্বামী প্রকাশ কারাত সিপিএমের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও এক হাতে মোবাইল ক্যামেরা আর আরেক হাতে বুম নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। এই বয়সেও উৎসাহের কোনও ঘাটতি নেই।
দিল্লিতে তাঁরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকতেনও। এনডিটিভির সম্পর্কে আমাদেরও ধারণা ছিল— এটি বামপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত। আমি এনডিটিভির আর্থিক বিষয় সম্পর্কে আদৌ অবগত নই; জানা নেই, তার অভ্যন্তরীণ ডায়নামিকস কী ছিল। কাজেই সেই ব্যাপারে আলোচনা আমার প্রতিপাদ্য বিষয় নয়।
কিন্তু, সেই কোন অতীত থেকে প্রণয় রায়ের সাংবাদিকতা দেখে আসছি। আজ মনে হয়, যেভাবে সংবাদমাধ্যমের এক ভয়াবহ চীৎকৃত গণতন্ত্রের পরিচয় পাচ্ছি, তাতে ভারতীয় সাংবাদিকতার প্রতিনিয়ত অপমৃত্যু হচ্ছে। সেই অপমৃত্যুর মাঝে প্রণয় রায় আজও এক স্মরণীয়, অনুসরণযোগ্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

প্রণয় রায়ের জন্ম এই কলকাতা শহরেই, ১৯৪৯ সালে ১৫ই অক্টোবর। বাঙালি খ্রিস্টান পরিবারের সন্তান ছিলেন। প্রখ্যাত মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশনের বড়কর্তা পি এন হ্যারিকেন রয় ছিলেন তাঁর বাবা। ঠাকুরদা ছিলেন পরেশলাল রয়। ওঁরা ‘রায়’ নয়, ‘রয়’-ই লিখতেন। বাঙালি সাহেব পরিবার। ঠাকুরদা ছিলেন পুলিশের ট্রাফিক সুপারিন্টেন্ডেন্ট, আবার, ছিলেন এক নামী বক্সারও। ঠাকুরদাকে বলা হত— ‘ফাদার অফ ইন্ডিয়ান বক্সিং’। এহেন পরিবারের সন্তান কলকাতার লা মার্টিনিয়ার থেকে পড়াশোনা করে চলে যান ‘দুন’ স্কুলে। সেখানে বোর্ডিং স্কুলের অভিজ্ঞতা। এরপর রাধিকার সঙ্গে আলাপ।
প্রণয় এবং রাধিকা দু-জনেই উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে পাড়ি দেন। সারাজীবন স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৭৩ সালে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক। তারপর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। লন্ডনেই বিয়ে প্রণয়-রাধিকার। তারপর দেশে ফিরে দিল্লিতে থাকা শুরু। দিল্লি ‘স্কুল অফ ইকোনমিক্স’ থেকে কৃষি অর্থনীতিতে পিএইচডি সেরে ‘প্রাইসওয়াটারহাউসে’ প্রথমে কনসালটেন্ট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও এক হাতে মোবাইল ক্যামেরা আর আরেক হাতে বুম নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। এই বয়সেও উৎসাহের কোনও ঘাটতি নেই।
দেশের নির্বাচন, নির্বাচনী রাজনীতিতে বরাবরই তাঁর আগ্রহ ছিল। ১৯৭৭ সালে যখন নির্বাচন হল, তখন তিনি নির্বাচন সমীক্ষা করলেন, আলোচনা করলেন। সেগুলো মেনস্ট্রিম পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল। তখনও বলেছিলেন, কীভাবে জনতা পার্টির মতো একটা কেন্দ্রীয় শক্তির ভারতের রাজনীতিতে উত্থান হচ্ছে।
অক্সফোর্ডের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড বাটলার এবং ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ীর সঙ্গে তিনি একযোগে কাজ শুরু করেন। ভারতে এই সেফোলজি নামক বিদ্যাকে জনপ্রিয় করেন। এই ব্যাপারে একযোগে বেশ কয়েকটি বই লিখে ফেলেন। ‘ইন্ডিয়া টুডে’ পত্রিকা তাঁকে নির্বাচনী বিশ্লেষক হিসেবে নিযুক্ত করে। ১৯৮৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রণয়ের নির্বাচনী ভবিষ্যতবাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। সেই সময় ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ৪০০-র বেশি আসন পায়। ভবিষ্যতবাণী ঠিক হয়ে যাওয়ায় তিনি সেফোলজিস্ট হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠিত হন।

১৯৮৪ সালে তিনি ‘নিউ দিল্লি টেলিভিশন লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করেন। আন্তর্জাতিক খবর পরিবেশন শুরু করেন। একদিকে যেমন প্রণয় দূরদর্শনের মাধ্যমে ভিজ্যুয়াল মিডিয়াকে জনপ্রিয় করেন, দূরদর্শনে ‘ডেইলি’ সাপ্তাহিক বুলেটিন এবং ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’ অনুষ্ঠান চালিয়েছেন, তেমন এনডিটিভিতেও সাংবাদিকতার এক নতুন ঘরানা তৈরি করলেন। দূরদর্শনে ‘নিউজ টুনাইট’ সেই সময় ছিল খুব বিখ্যাত অনুষ্ঠান। কিন্তু, এনডিটিভিতে যে ধারা তিনি তৈরি করেছিলেন, তাঁর সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল প্রণয় চিৎকার করে অ্যাঙ্করিং করতেন না। অত্যন্ত মৃদুভাষী ছিলেন।
বিশ্লেষণে জোর দিতেন। যে কোনও খবরের গভীরে যেতেন। সব মিলিয়ে প্রণয়ের মধ্যে এক অদ্ভুত নিজস্বতা ছিল। তিনি কখনওই রাষ্ট্র বা কোনও রাজনৈতিক নেতার তল্পিবাহক বলে পরিচিত হননি।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও এক হাতে মোবাইল ক্যামেরা আর আরেক হাতে বুম নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। এই বয়সেও উৎসাহের কোনও ঘাটতি নেই।
‘স্টার ইন্ডিয়ার’ সঙ্গে পার্টনারশিপে দীর্ঘদিন চ্যানেলটিকে চালান। আজ এত বছর পর এনডিটিভি-কে কার্যত আর্থিক কারণে এবং নানান রাজনৈতিক চাপে পড়ে বিক্রি করতে বাধ্য হলেন। তবে, এনডিটিভি ছাড়ার পরেও তিনি সাংবাদিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। কারণ, সাংবাদিকতা তাঁর স্নায়ুতে স্নায়ুতে রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে তাই, এই বয়সেও তাঁকে আমরা দেখতে পেলাম রাজপথে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও এক হাতে মোবাইল ক্যামেরা আর আরেক হাতে বুম নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। এই বয়সেও উৎসাহের কোনও ঘাটতি নেই।
প্রণয় রায় সাংবাদিকতার জগতে এক ভিন্ন, নিজস্ব ধারা তৈরি করেছিলেন। একজন ব্যক্তি যে রাজনৈতিক দলেরই অনুগত হন না কেন, তাঁর সাংবাদিকতাটা সাংবাদিকতার জায়গায় থাকা প্রয়োজন। সেই সাংবাদিকতার যে ব্যাকরণ, কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছতে হয়, কীভাবে মানুষকে জানাতে হয়, সেখানে তাঁর কোনও অহংকার নেই। আমি কত কিছু জানি, সে নিয়ে সদর্প ঘোষণা নেই। এই আন্ডারস্টেটেড পরিশীলিত আধুনিক ধারার প্রবর্তক প্রণয় রায়। সাংবাদিকতার ভয়াবহ বিচ্যুতি ঘটেছে আজ। প্রণয়ের ধারার সাংবাদিকতাকে তাই ফিরিয়ে আনা বড় জরুরি।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত