(Bengali Calender History)
বর্ষবরণ, হালখাতা, মিষ্টিমুখ, আর কবজি ডুবিয়ে খাওয়াদাওয়া। বাংলা নববর্ষের পয়লা বৈশাখ উৎসবপ্রিয় বাঙালির কাছে আর পাঁচটা পার্বণের মতোই হইহই ব্যাপার। তাই এই দিনটি ঘিরে আজও টইটুম্বুর বাঙালিয়ানা।
তবে এই বাঙালিয়ানা নিয়েও নানারকম তর্কাতর্কি শুরু হয়েছে গত কয়েক বছর ধরে। বাংলা সনের প্রবর্তক কে, তাই নিয়ে তর্ক। একদল গবেষকের দাবি, বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করেছিলেন মুঘলসম্রাট আকবর। আরেক দলের দাবি, গৌড়াধিপতি শশাঙ্কই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক। কিন্তু বাংলা সনের প্রবর্তক কি আদৌ কোনও শাসক, না বাঙালি জাতি নিজেই? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজারই চেষ্টা এখানে। তবে উত্তর খোঁজার আগে ভারতের ক্যালেন্ডার গণনা পদ্ধতি খানিকটা জানা জরুরি।
তিন ধরনের ক্যালেন্ডার
প্রাচীন কাল থেকে বিশ্বে প্রধানত তিনরকম ক্যালেন্ডার প্রচলিত— সৌর ক্যালেন্ডার (সোলার ক্যালেন্ডার), চান্দ্র ক্যালেন্ডার (লুনার ক্যালেন্ডার) ও সৌর-চান্দ্র ক্যালেন্ডার (লুনিসোলার ক্যালেন্ডার)।
সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। যে ক্যালেন্ডারে এই সময়কে ভাগ করে মাস ও বছরের হিসেব করা হয়, তাকে সোলার ক্যালেন্ডার বলা হয়। সোলার ক্যালেন্ডারে ২৮-৩২ দিনে মাস। আমাদের বাংলা সন হল সোলার ক্যালেন্ডার।

লুনার ক্যালেন্ডারে মাস ও বছরের গণনা হয় চাঁদের হিসেবে। এক মাস হয় ২৯ দিনে। ১২ মাসে একটা বছর। ফলে এক চান্দ্র বছর ৩৫৪ দিনে হয়। এদিকে এক সৌর বছর হচ্ছে পৃথিবীর নিয়মে ৩৬৫ দিনে। সৌর বছর – চান্দ্র বছর = ১১ দিন। অর্থাৎ, প্রতি বছর ১১ দিন করে এগিয়ে যায় চান্দ্র বছর। ইসলামি হিজরি সন একটি চান্দ্র ক্যালেন্ডার।
তৃতীয় ধরনের ক্যালেন্ডার হল লুনিসোলার বা সৌর-চান্দ্র ক্যালেন্ডার। এই ক্যালেন্ডারে মাস মাপা হয় চাঁদের হিসেবে, আর বছর সূর্যের হিসেবে। অর্থাৎ ২৯ দিনে মাস ও ৩৬৫ দিনে বছর। কিন্তু ১২ মাসে বছর হলে দিনসংখ্যা হয় ৩৫৪টি। অর্থাৎ, এক সৌর বছরের তুলনায় ১১ দিন কম। দুই বছরে প্রায় ২২ দিন কম। তাই, প্রতি তৃতীয় বছরে এই ক্যালেন্ডারে একটি অতিরিক্ত মাস যুক্ত হয়। সেই মাসে ৩০ দিন থাকে। হিন্দু ক্যালেন্ডার বিক্রম সম্বত হল লুনিসোলার ক্যালেন্ডার। মলমাস হল সেই অতিরিক্ত মাস। এছাড়া, ফার্সি, বৌদ্ধ প্রভৃতি ক্যালেন্ডারও লুনিসোলার।
বিক্রম সম্বত ও বাংলা সন
পৃথিবীর অধিকাংশ ক্যালেন্ডারে বছর শুরু হয় বিষুবদিবস বা তার কাছাকাছি দিন থেকে। এক্ষেত্রে বসন্তের বিষুব দিবস অর্থাৎ ২১ মার্চ বেশি জনপ্রিয়। বিষুবদিবসে দিন রাত সমান সমান। ভারতের প্রাচীন ক্যালেন্ডার বিক্রম সম্বতের গণনা শুরু ৫৭ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে। সম্বতের প্রথম মাস চৈত্র। বঙ্গাব্দের সঙ্গে বেশ কিছু মিল রয়েছে এর। বিক্রম সম্বত ও বাংলা সনের প্রধান মিল মাস ও নক্ষত্রের নামে, এবং রাশি অনুযায়ী মাস বিভাজনেও। তবে অমিল রয়েছে বছরের প্রথম মাসে। আর্যাবর্ত তথা উত্তর ভারতে বিক্রম সম্বত মেনে বছর শুরু হয় চৈত্রে। কিন্তু, বাংলার ক্যালেন্ডারে বছর শুরু হয় বৈশাখে।

শশাঙ্ক-আকবর বিবাদ
শশাঙ্ক-আকবর তর্কে প্রবেশের আগে দুটি বিষয় মনে রাখা দরকার। এক, বঙ্গ বলতে তখন বোঝানো হত পূর্ববঙ্গ বা হাল আমলের বাংলাদেশ। মুর্শিদাবাদ, নদীয়া এলাকা ছিল গৌড়। তাই শশাঙ্ক ছিলেন গৌড়াধিপতি। অন্যদিকে, রাঢ়বঙ্গ ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম দিক অর্থাৎ বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর ইত্যাদি। বাংলার বিভিন্ন অংশের এই নাম নিয়ে সব তরফের ঐতিহাসিকই একমত। দুই, বাংলা সনের প্রধান বৈশিষ্ট্য এটি বৈশাখে শুরু। ১৮৯০ সালে মাধবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মিল রেখে, বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে বাংলা সনের সংস্কার করেন। তখন ব্রিটিশ শাসন। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রভাব ছিল সেই সংস্কারে। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার সোলার মতে চলে। সম্ভবত তখন থেকেই বাংলা সন সোলার ক্যালেন্ডার হয়। তার আগে বিক্রম সম্বতের মতোই লুনিসোলার ছিল বঙ্গাব্দ।
আকবর তত্ত্বের সপক্ষে
আকবরের মতবাদটি অমর্ত্য সেনের ‘Argumentative Indian’ বইয়ে উল্লিখিত তত্ত্ব থেকে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বলে মনে করা হয়। এই তত্ত্বের নেপথ্যে রয়েছে ১৯৬৩ সালের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি। ওই কমিটিতে প্রথম আকবরকে বঙ্গাব্দ প্রবর্তক বলা হয়েছে। আবার, সেই বিবৃতির কারণ হলেন বাংলার স্বাধীন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ। তিনি আকবরের কর ব্যবস্থা মেনে খাজনা আদায় করতেন।

প্রথমে আকবরের সপক্ষের যুক্তিগুলো বলা যাক। আকবর (১৫৪২-১৬০৫) দিল্লির মসনদে বসেন ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। ১৫৮৪-৮৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ তিনি ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ প্রচলন করেন। হিজরি ক্যালেন্ডার মেনে চলার ব্যাপারে তাঁর অনীহা ছিল। নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির ভার ছিল ইরানি (পারস্য) জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লাহ শিরাজির উপর। হিজরি সন প্রতি বছর ১১ দিন এগিয়ে যায়। এই সন মেনে খাজনা আদায়ে সমস্যা হত বলে ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ প্রচলন। ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ থেকেই বাংলা সনের প্রবর্তন বলে অনেকে মনে করেন।
‘তারিখ-ই-ইলাহী’র ভিত্তিবর্ষ ছিল ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ আকবরের ক্ষমতায় আসার বছর। আবার, ওই বছর হিজরি সন ছিল ৯৬৩। অর্থাৎ, ২০২৬ (বর্তমান বছর) – ১৫৫৬ (আকবরের ক্ষমতালাভের বছর) + ৯৬৩ (হিজরি ভিত্তিবর্ষ) = ১৪৩৩ (বাংলা সন)।
আকবর তত্ত্বের বিপক্ষে
এবারে আকবর তত্ত্বের বিপক্ষের যুক্তি। প্রথমত, ১৫৮৫ সালে আকবর বাংলা দখল করতে পারেননি। রাজমহল অবদি যেতে পেরেছিলেন শুধু। তাহলে কীভাবে তিনি একটা ক্যালেন্ডার প্রচলন করলেন বঙ্গদেশে? এখানে বলা জরুরি, ১৫৮৫ সালে না হলেও, মৃত্যুর আগে অর্থাৎ ১৬০৫ সালে আকবর বাংলায় মুঘল শাসন কায়েম করতে পেরেছিলেন। ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ ১৫৮৫ সালে শুরু হলেও বাংলায় পরে প্রচলিত হয়েছিল, এমনটা হতেই পারে। তার জন্য ভিত্তিবর্ষ পাল্টানোর দরকার হয় না।

দ্বিতীয়ত, আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’-তে বঙ্গাব্দের উল্লেখ নেই। প্রতিযুক্তি হিসেবে অনেকেই এটি বলেন। কিন্তু আকবর প্রতিটি সুবে বা প্রদেশে আলাদা আলাদা নামে ক্যালেন্ডার চালু করবেন, এমন আশা করা কি যুক্তিসঙ্গত? তাহলে তার অন্য সুবেতেও অন্য নামে পঞ্জি থাকত না? ওই যুক্তিটি তাই বর্জনীয় ধরা হল।
তৃতীয়ত, আকবরের মৃৃত্যুর পর ‘তারিখ-ই-ইলাহী’র ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায় গোটা আর্যাবর্তে। সেই ক্যালেন্ডার বাংলায় রয়ে গেল কীভাবে? ভারতের যে অংশ আকবর সবচেয়ে বেশি সময় শাসন করলেন, সেখানেই ক্যালেন্ডারটি টেকেনি। বাংলায় কীভাবে টিকে গেল?
নীতিশ সেনগুপ্ত ‘Land Of Two Rivers’-এ লিখছেন, বাঁকুড়ার ডিহারগ্রাম ও সোনাতপন গ্রামে হাজার বছর প্রাচীন টেরাকোটার শিব মন্দিরের গায়ে ‘বঙ্গাব্দ’ খোদিত রয়েছে। ফলে আকবরের আগে থেকেই বঙ্গাব্দের প্রচলন ছিল বলা যায়।
চতুর্থত, আকবরের বহু আগে, নবদ্বীপে স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের জন্ম। শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের ২৫ বছর পর, অর্থাৎ ১৫১১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম হয়। তিনি ও রাঘবানন্দ প্রথম বাংলা পাঁজি তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। ‘নবদ্বীপ পঞ্জিকা’ নামেও পরিচিত ছিল সেই পাঁজি। বাংলা সনের ধারণা না থাকলে পাঁজি তৈরি করা কি সম্ভব?
পঞ্চমত, নীতিশ সেনগুপ্ত ‘Land Of Two Rivers’-এ লিখছেন, বাঁকুড়ার ডিহারগ্রাম ও সোনাতপন গ্রামে হাজার বছর প্রাচীন টেরাকোটার শিব মন্দিরের গায়ে ‘বঙ্গাব্দ’ খোদিত রয়েছে। ফলে আকবরের আগে থেকেই বঙ্গাব্দের প্রচলন ছিল বলা যায়।
শশাঙ্ক তত্ত্ব
এবার শশাঙ্ক তত্ত্বে আসা যাক। বাংলার প্রথম স্বাধীন হিন্দু রাজা শশাঙ্ক, গুপ্ত আমলের এক মহাসামন্ত ছিলেন। সেখান থেকে তাঁর গৌড়াধিপতি হওয়া। শশাঙ্ক সিংহাসনে বসেছিলেন ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল, সোমবার। শৈব বলে ওই দিন থেকেই তিনি বছর গণনা শুরু করেন। তখন থেকেই বাংলা সনের শুরু। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ২০২৬ (বর্তমান বছর) – ৫৯৩ (শশাঙ্ক সিংহাসনে আরোহণ) = ১৪৩৩ (বাংলা সন)।

অন্য এক তত্ত্ব অনুযায়ী, ৫০০ শতকে গুপ্ত যুগের গণিতজ্ঞ আর্যভট্ট ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ রচনা করেন। কুষ্ঠ আক্রান্ত শশাঙ্ক সৌর উপাসকদের কাছে চিকিৎসা করাতেন। গৌড়াধিপতি সেই সময় তাঁদের পরামর্শে ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ অনুসরণ করে বৈশাখী বর্ষগণনা চালু করেন।
সূর্যসিদ্ধান্তে মহাবিষুব থেকে বছর শুরু হয়। আর, তখন মহাবিষুব আর পয়লা বৈশাখ একই দিনে পড়েছিল। এবারে, সূর্যসিদ্ধান্তের হিসেব অনুযায়ী, এক বছর সম্পূর্ণ হয় ৩৬৫.২৫৮৭ দিনে। অন্যদিকে, সৌর বর্ষের প্রকৃত দৈর্ঘ্য ৩৬৫.২৪২১ দিন। অর্থাৎ প্রতি বছর ০.০১৬ দিন অতিরিক্ত গণনা হত। তাই, ১০০ বছরে ক্যালেন্ডার ১.৬ দিন পিছিয়ে যেত। গবেষকদের দাবি, এভাবে ১৪০০ বছরে বাংলা সন ২২.৪ দিন পিছিয়েছে। সে জন্য, আজ পয়লা বৈশাখ ১৪-১৫ এপ্রিল পালন করা হয়।

এছাড়াও, ইতিহাস বলছে, ৫০০ শতকের পরপরই বাংলায় তন্ত্রের প্রভাব বাড়ছিল। চৈত্র মাসের বিভিন্ন উৎসব ছিল তান্ত্রিক রীতিনীতির ফসল। সেই উৎসব শেষে বছর শুরু হত বৈশাখে। ৫০০ শতকের শেষ দিকেই গৌড়ের উত্থান হয়। তন্ত্র আর গৌড়ের উত্থান প্রায় এক সময়ে বলেই, শৈব শশাঙ্ককে বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে ধরা হয়।
শশাঙ্কের বিপক্ষে
এবার প্রতিযুক্তি। প্রথমত, শশাঙ্ক নিজের নামে মুদ্রা চালু করেছিলেন, দীঘি খনন করেছিলেন। সেসবের প্রমাণ আজ ১৪০০ বছর পেরিয়েও রয়েছে। কিন্তু ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের কোনও প্রমাণ নেই। তিনি গৌড় এলাকায় মাকর সপ্তমী উৎসব প্রবর্তন করেন। সেখানকার এক সম্প্রদায় ১৪০০ বছর পরে আজও সেই কথা মনে রেখেছে। অথচ, একটা গোটা বাংলার কোথাও কেউ তাঁর ক্যালেন্ডারের কথা মনে রাখতে পারল না? নাকি, তিনি বঙ্গাব্দ প্রচলন করেননি বলেই কি মনে রাখেনি?
বিক্রম সম্বতের মতোই কি শশাঙ্কের অব্দে বছর শুরু হত চৈত্রে? তাহলে কি বৈশাখ থেকে শুরু বাংলা সনের কৃতিত্ব তিনি পেতে পারেন? সবচেয়ে বড় কথা, বিক্রম সম্বতের মতো একই সময়ে ও একই নিয়মে আরেকটি অব্দ শুরু হলে, তাকে পৃথক অব্দ বলা যায়?
দ্বিতীয়ত, ধরা যাক, শশাঙ্কই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক। অর্থাৎ, সূর্যসিদ্ধান্ত মেনে তিনি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অব্দ প্রচলন করেছিলেন। তাহলে, সেই সময় গৌড় অধীনস্থ গঞ্জামের তাম্রলেখে কেন ৩০০ গুপ্তাব্দ লেখা হল? তাঁর সময় একমাত্র প্রচলিত ক্যালেন্ডার ছিল বিক্রম সম্বত। এটি গুপ্ত যুগের ক্যালেন্ডার ছিল বলেও মনে করেন ঐতিহাসিকরা। এই গুপ্তাব্দের সঙ্গে কি কোনও ফারাক ছিল না শশাঙ্কের অব্দের? বিক্রম সম্বতের মতোই কি শশাঙ্কের অব্দে বছর শুরু হত চৈত্রে? তাহলে কি বৈশাখ থেকে শুরু বাংলা সনের কৃতিত্ব তিনি পেতে পারেন? সবচেয়ে বড় কথা, বিক্রম সম্বতের মতো একই সময়ে ও একই নিয়মে আরেকটি অব্দ শুরু হলে, তাকে পৃথক অব্দ বলা যায়?

তৃতীয়ত, সূর্যসিদ্ধান্তের হিসেব দেখিয়ে তাঁকে বৈশাখী বর্ষগণনার পুরোধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। হিসেবটি তাহলে বিশদে দেখা যাক। ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ শশাঙ্কের সিংহাসনে আরোহণের বছরে মহাবিষুব দিবস ছিল ১৮ মার্চ। অর্থাৎ ওই দিনই পয়লা বৈশাখ আর ওই বছর থেকেই বাংলা সন গণনা শুরু। এবার, ১৮ মার্চ + ২২.৪ দিন (১৪০০ বছরের যে হিসেব উপরে দেখানো হয়েছে, সেই অনুযায়ী) = ৯ বা ১০ এপ্রিল। অর্থাৎ আজকের সময়ে পয়লা বৈশাখ ৯ বা ১০ এপ্রিল হওয়ার কথা! কিন্তু হয় ১৪ বা ১৫ এপ্রিল। ৫ দিনের এই তফাতের ব্যাখ্যা কী?
চতুর্থত, গৌড়াধিপতি শশাঙ্ক কেন নিজের নামে অব্দ চালু করলেন না? গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজের নামে বা বংশের নামে অব্দ প্রবর্তন করাই তো বাঞ্ছনীয় ছিল।
স্থানের নামে অব্দ চালু করলেও, গৌড়কে না বেছে, গৌড়রাজ বঙ্গ শব্দটি বেছে নেবেন কেন? তাছাড়া ঐতিহাসিকদের মতে, বঙ্গ শশাঙ্কের দখলে ছিল না সেভাবে। তাহলে, শশাঙ্কের সময় কীভাবে ‘বঙ্গাব্দ’ শুরু হল?
পঞ্চমত, স্থানের নামে অব্দ চালু করলেও, গৌড়কে না বেছে, গৌড়রাজ বঙ্গ শব্দটি বেছে নেবেন কেন? স্বয়ং শ্রীচৈতন্য ১৫০০ খ্রিস্টাব্দেও গৌড়ীয় বৈষ্ণব বলে অ্যাখ্যা পাচ্ছেন। তাছাড়া ঐতিহাসিকদের মতে, বঙ্গ শশাঙ্কের দখলে ছিল না সেভাবে। তাহলে, শশাঙ্কের সময় কীভাবে ‘বঙ্গাব্দ’ শুরু হল?
ষষ্ঠত, চৈত্রের যে বিশাল উৎসব বছরের শেষ বা শুরু নির্দেশ করত, শশাঙ্ক সেগুলির প্রবর্তক নন। একটি উৎসবের প্রবর্তন করলেও অন্যগুলি তিনি চালু করেননি। মূলত, বাংলা, আসাম ও ওড়িশার এক বিশাল জনগোষ্ঠীর তান্ত্রিক রীতিনির্ভর জীবনযাপনের ফসল ছিল এই উৎসবমুখর চৈত্র। বঙ্গের লোকায়ত উৎসবগুলি তাঁর অভ্যুত্থানের বহু আগে থেকেই প্রচলিত। তাই অব্দ প্রচলনের কৃতিত্ব তাঁর পাওয়ার কথা নয়।
শিকড় যেখানে
শশাঙ্ক বা আকবর, কেউই সন্দেহাতীতভাবে বাংলা সনের প্রবর্তক নন। তবে এই দড়ি টানাটানির আগে দেখা দরকার, তাঁদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়কাল। সেই সময়কালেই লুকিয়ে থাকতে পারে ক্যালেন্ডার বিবাদের সম্ভাব্য নিষ্পত্তি। শশাঙ্কের আগের সময়কাল নিয়ে রয়েছে দুটি তত্ত্ব। একটি বৈজ্ঞানিক ও অন্যটি ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক।
বাঙালির নৃতত্ত্ব ও অনার্য সংস্কৃতি
১৪ বা ১৫ এপ্রিল শুধু বাংলায় নয়, তামিলনাডু, কেরল, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস ও চিনের দাইজাতি-অধ্যুষিত অঞ্চলেও নববর্ষ পালন করা হয়। বাংলা তথা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে এক সময় প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড গোষ্ঠীর মানুষেরা বসবাস করতেন। আর্যাবর্তের সঙ্গে বাংলার সেই জনগোষ্ঠীদের নৃতাত্ত্বিক ও আচারগত অনেক তফাত ছিল।

দক্ষিণ এশিয়ার অনার্য সংস্কৃতির সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ ও আর্য সংস্কৃতির মিশ্রণই খুব সম্ভবত প্রভাব ফেলেছে ক্যালেন্ডার গণনার ধরনে। এসব অঞ্চলে বেশিরভাগ ক্যালেন্ডারে বছর শুরু হত অনার্য সংস্কৃতি মেনে আর, বছরের হিসেব হত আর্য সংস্কৃতি মেনে। তাই আর্যাবর্ত বা মধ্য এশিয়ার মতো মধ্য মার্চে (মহাবিষুব দিবসে) নয়, মধ্য এপ্রিলে শুরু হত এইসব অঞ্চলের বছর। বাংলায় সেই প্রভাব থাকতেই পারে। তবে এর থেকেও যুক্তিগ্রাহ্য তন্ত্র ও বৌদ্ধধর্মের প্রভাব।
চতুর্থ তত্ত্ব: তন্ত্রের প্রভাব
প্রথমে বাংলার তান্ত্রিক সংস্কৃতির কথা বলা যাক। বঙ্গাব্দের উৎস তন্ত্রে নিহিত থাকার সম্ভাবনা অনেকটাই। ৫০০-৬০০ শতকে পূর্ব ভারত তন্ত্রসাধনার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বঙ্গে তন্ত্রের সঙ্গে জ্যোতির্বিদ্যার সম্পর্ক নিবিড়। প্রমাণ খনা ও তাঁর বচন। এছাড়াও, চৈত্রের চড়ক, গাজন, হাজরা চালানের মতো বিভিন্ন উৎসবে তন্ত্রের প্রভাব যথেষ্ট। সেই সব উৎসব শেষে বৈশাখে নতুন বছর শুরু হত। উৎসব শেষে বছর শুরুর আরেকটি নিদর্শন আছে। এক সময় অগ্রহায়ণে বছর শুরু হত বলে দাবি অনেক গবেষকের। তার আগেই পড়ত কার্তিক অমাবস্যা কালীপুজোর তিথি। প্রবল তন্ত্রযোগ।

পঞ্চম তত্ত্ব: বৌদ্ধধর্মের প্রভাব
তন্ত্রযোগের প্রতিযুক্তিতে মেলে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব। উৎসব দিয়ে বছর শেষ করার চেয়ে, বছর শুরু করাই বেশি যুক্তিযুক্ত। গোটা বৈশাখে গন্ধেশ্বরী পুজো ছাড়া আর কোনও উৎসব নেই। তাহলে চৈত্রের শেষে বছর শুরু কেন? বিক্রম সম্বতের মতো চৈত্রের শুরুতে নয় কেন? বিক্রম সম্বতই তো তখন সবচেয়ে খ্যাত ক্যালেন্ডার। এখানেই আসে বৌদ্ধধর্ম। ফসল তোলা বা খাজনা মেটানোর তত্ত্বের চেয়েও তা বেশি যুক্তিযুক্ত ও প্রাচীন।
প্রথমত, বৌদ্ধদের সবচেয়ে বড় উৎসব বুদ্ধপূর্ণিমা। এটি পড়ে বৈশাখী পূর্ণিমায়। বৈশাখেই গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাব, বোধিলাভ ও পরিনির্বাণ। উপরে উল্লিখিত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে বৌদ্ধ প্রভাব যথেষ্ট। বৌদ্ধরা বিক্রম সম্বতকেই ক্যালেন্ডার হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু, বছর শুরু করেছিল বৈশাখে। আজও তাই হয়। বুদ্ধ পূর্ণিমা ওই মাসে বলে সেটাই স্বাভাবিক। দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি নেপালেও তাই ১৪-১৫ এপ্রিল নববর্ষ হয়। নেপালের জাতীয় ক্যালেন্ডার বিক্রম সম্বত, তবে বছর শুরু বৈশাখে।

দ্বিতীয়ত, মৌর্য যুগ অর্থাৎ ৩২১-১৮৫ খ্রিস্টপূর্বে বাংলায় ব্যাপক প্রসার লাভ করে বৌদ্ধধর্ম। শশাঙ্ক বা আকবরের শাসনকালের বহু আগে। শশাঙ্কের পর, পাল যুগেও বঙ্গদেশে বৌদ্ধধর্মের চর্চা হত। ফলে, বঙ্গাব্দে বৌদ্ধ প্রভাব থাকার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি, অন্যান্য তত্ত্বের চেয়ে। তবে এখানে মনে রাখা জরুরি, বৌদ্ধপ্রভাবিত বঙ্গাব্দের কৃতিত্ব কোনও একজন ব্যক্তির নয়। বরং, গোটা বাংলার। বাংলার সুদীর্ঘ ধর্মসংস্কৃতি চর্চাই এই অব্দ প্রচলনে ইন্ধন দিয়েছে।
বাঙালির বহুত্ববাদ
আকবরের ধর্মীয় উদারতা তুলে ধরতে আকবর তত্ত্বকে সমর্থন করেন অনেকে। মুঘলসম্রাট আকবর ‘দীন-ই-ইলাহি’র মতো উদার ধর্মের প্রচলন করেছিলেন। তবে, তার বঙ্গযোগের প্রমাণ বেশ দুর্বল। প্রমাণ থাকলেও তার আগের ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্ম থেকে সুলতানি, নবাবি শাসন, সবটাই পেয়েছে শ্রীচৈতন্য-শ্রীরামকৃষ্ণের বাংলা। তাই, দুর্বল আকবর তত্ত্ব ‘হেরে’ গেলেও, বাংলার ধর্মীয় সম্প্রীতি হারিয়ে যাওয়ার নয়।
একইভাবে, শশাঙ্ক তত্ত্বকে বর্তমানে সমর্থন করছেন বহু হিন্দুত্ববাদীরা। তবে, এই সমর্থন বাঙালিয়ানার গৌরব বৃদ্ধি করতে না হিন্দুত্ববাদের জয়গাথা গাইতে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। বাঙালিয়ানাকে সুদৃঢ় করতে হলে বাংলার শিকড় খোঁজা জরুরি। মুসলিম সম্রাট ও হিন্দু রাজার তর্ক সেখানে গৌণ।

ব্রিটিশরাও ইংরেজি ক্যালেন্ডার প্রচলন করেছিল। তার জন্য বাঙালির নববর্ষ পালন আটকেছে কখনও? একটু নিবিড় পর্যবেক্ষণ বলে দেয়, বহুত্ববাদে বিশ্বাসী বাঙালি যে সংস্কৃতি একবার গ্রহণ করেছে, তা আর কখনও বর্জন করেনি। সেন আমল পেরিয়েও তাই টিকে গিয়েছে বৌদ্ধ ভাবধারা ও তান্ত্রিক রীতিনীতি। একই কারণে আকবর, শশাঙ্ক বা তেমন কোনও শাসকের বদলে, বাংলার সুপ্রাচীন সংস্কৃতিই ‘বঙ্গাব্দ প্রবর্তক’ উপাধির প্রধান দাবিদার।
সময়ের হাত ধরে আমাদের বঙ্গাব্দে যেমন লীন হয়ে গিয়েছে লুনিসোলার বিক্রম সম্বত, তেমনই লীন হয়ে আছে সোলার ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ানের হিসেব। বৈশাখী বর্ষারম্ভে যেমন মিশে গিয়েছে বৌদ্ধ ও তান্ত্রিক ধারা, তেমনই মিশে গিয়েছে দক্ষিণ এশীয় অনার্য সংস্কৃতি। বারো মাসে তেরো পার্বণে ভরপুর বাংলা সন আসলে বাংলা ও বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচন বা ন্যাচারাল সিলেকশন! কোনও শাসকের কি ক্ষমতা আছে সেই নির্বাচনে প্রভাব ফেলার?
তথ্যসূত্র
১. Alison Ensign – A Guide to the Different Types of Calendars Used Around the World
২. Anand Sharan – Understanding of Periodic Motions and Utilization of this Knowledge in Ancient India
৩. M N Saha and N C Lahiri – History of the Calendar in Different Countries through the Ages। CSIR, Delhi, 1992.
৪. British Museum – A timeline of Tantra
৫. রণবীর চক্রবর্তী – বঙ্গাব্দ বিতণ্ডার ইতিবৃত্ত
৬. স্বামী বিজ্ঞানানন্দ – সূর্যসিদ্ধান্ত
৭. শিশির ভট্টাচার্য – বঙ্গাব্দের উৎসবিচার
৮. সুশীলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় – বঙ্গাব্দের উৎস কথা
৯. Nitish Sengupta – Land Of Two Rivers
১০. গৌতম বসুমল্লিক – পুজো করবেন কোন পঞ্জিকা মেনে, গুপ্তপ্রেস না বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত?
১১. গাজি তানজিয়া – তারিখ-ই-ইলাহী থেকে বাংলা সন গণনা
১২. তমাল দাশগুপ্ত – বঙ্গাব্দের উৎস
চিত্রঋণ: উইকিমিডিয়া কমনস, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ব্রিটানিকা
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত