(Jolke Chol 18)
ঘড়ির দিকে তাকালো মোহনা। অনেকটাই রাত হয়েছে। মেয়েটা কি এখন শিবের সঙ্গে ভিডিও কলে আছে? এই ভেবে রাইকে দু-বার ডেকেও সাড়া না পেয়ে উঠে এল রাইয়ের স্টাডিরুমে। রাই ল্যাপটপ কোলের উপর রেখে লিখছে। কানে হেডফোন।
– কিরে শুবি না? রাইয়ের কানে গেল বলে মনে হল না। এবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মাকে সামনে দেখে রাই বলল, একটু পড়া বাকি আছে। করে আসছি।
– কানে হেডফোন সব সময় কেন লাগিয়ে রাখিস? কানটা তো যাবে।
আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪) ,(১৫), (১৬)
একটা কান থেকে হেডফোন খুলে রাই বলল- নোটস নিচ্ছি প্রতীজ্ঞার থেকে। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।
– বেশি রাত করিস না, বলে মোহনা ফিরে এল নিজের বিছানায়।
এই জেনারেশনের ভাবনা চিন্তার সঙ্গে মাঝে মাঝে তাল রাখতে পারে না সে। এমনকি এদের জীবনযাত্রার পথটাও কেমন আলাদা। সারা রাত জেগে পড়ার অভ্যাস তারও ছিল। কিন্তু সেটা শুধু ফাইনাল পরীক্ষার আগে। অন্য সময় ঘড়ি ধরে এগারোটার মধ্যে বিছানায়। ঘুম না এলেও শুয়ে পড়তে হবেই। উঠতে হবে একেবারে পাঁচটার মধ্যে। তার পরেও শুয়ে থাকলে মা বিছানা থেকে টেনে নামিয়ে দিত। বলত- “Early to bed and early to rise Makes a man, healthy, wealthy and wise। ভোরের আলো গায়ে মাখলে রোগের বালাই থাকে না, শরীর চর্চার উপযুক্ত সময় হল ভোর। তাছাড়া পড়ার জন্যেও আদর্শ। যদি পড়তে ভাল না লাগে বাইরে হেঁটে আয়।” যতদিন পড়াশোনা করেছে, ততদিন এটাই জেনে এসেছে সে।

অথচ রাইয়ের ঘুম ভাঙে ন’টায়। সাড়ে ন’টা থেকে ক্লাস শুরু। অবশ্য কলেজে বা স্কুলে যখন যেত, তখন আটটার মধ্যেই উঠে পড়ত। অনলাইন ক্লাস, বাড়ির মধ্যে আবদ্ধ জীবন এদের সব অভ্যাস বদলে দিল। খাওয়া ঘুম সব অনিয়মিত হয়ে গেল। বন্দি দশা এই প্রজন্মের থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিল। কেমন ভার্চুয়াল একটা জগত গড়ে উঠছে। সে নিজেও ক্রমশ ফেসবুক লাইভে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। কারওর সঙ্গে কারওর আন্তরিক ছোঁয়ার, মুখোমুখি বসে গল্প, আড্ডা দেওয়ার যে বন্ধনটা কি চিরতরে হারিয়ে যাবে? কে জানে! ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল মোহনা।
আচ্ছা কেমন হবে শব্দহীন, ভাষাহীন, অনুভুতিহীন সেই জগত! রোবটের মতো মানুষ কেবল কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে আঙুল চালিয়ে যাবে? ধীরে ধীরে কি অন্য অঙ্গগুলো অব্যবহারের ফলে শরীর থেকে খসে পড়বে? কোথায় যেন পড়েছিল, জন্মের সময় মানুষের লেজ থাকে। যেহেতু তার কোনও ফাংশন নেই, তাই নাড়ি কাটার সময় ওই অংশটা নিজে থেকেই খসে যায়। অবশ্য রাইয়ের জন্মের সময় এই নিয়ে ভাবার মতো মানসিক শক্তি তার ছিল না। তবে হয়তো এগুলোকে ভেবেই লেখা হয় কল্পবিজ্ঞানের গল্প উপন্যাস।
চারদিকে আছি অথচ পর মুহূর্তেই নেই- এর হাইফেনটা এত দ্রুত মুছে যাচ্ছে দেখে সকলে আতঙ্কিত হলেও, এগুলোতে সে বিস্মিত হয় না। আসলে জীবন মৃত্যু এই চিরসত্য শব্দগুলো সে একেবারেই সহজ ভঙ্গিতে গ্রহণ করেছে, সেই চোদ্দ বছর বয়স থেকেই। এগুলোর মধ্যে কোনও বৈচিত্র্য খোঁজে না সে।
হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে গেল সুকুমার রায়ের কবিতার লাইনগুলো- হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না)/হয়ে গেল “হাঁসজারু” কেমনে তা জানি না।/বক কহে কচ্ছপে– “বাহবা কি ফুর্তি!/অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।” আচ্ছা সুকুমার রায় কি কল্পবিজ্ঞানের লেখক ছিলেন? এসব উদ্ভট ভাবনা তাঁর মাথায় এসেছিল কেমন করে! নিজেকেই প্রশ্ন করল সে। তারপর রাইয়ের জন্য অপেক্ষা না করে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।
আলোকের শরীরটা তেমন ভাল নেই ক’দিন ধরেই। অবশ্য এই সমস্যা তার ঘুরে ফিরে আসে কয়েক মাস অন্তর। সপ্তাহ দু-য়েক ভোগায়, তারপর আবার যেমন কার তেমন চলে জীবন। তবে এবার জ্বরের সঙ্গে কোমর থেকে পায়ের পাতা অবধি যন্ত্রণাটা বেশ কাবু করেছে। এটাও গত পঞ্চাশ বছরের সঙ্গী। শরীরের কোনও অংশ ঠিক আছে তার! মাঝে মাঝে নিজেরই অবাক লাগে কীভাবে বেঁচে আছে সে? কবেই তো নেই–এর তালিকায় নাম উঠে যাওয়ার ছিল।
চারদিকে আছি অথচ পর মুহূর্তেই নেই- এর হাইফেনটা এত দ্রুত মুছে যাচ্ছে দেখে সকলে আতঙ্কিত হলেও, এগুলোতে সে বিস্মিত হয় না। আসলে জীবন মৃত্যু এই চিরসত্য শব্দগুলো সে একেবারেই সহজ ভঙ্গিতে গ্রহণ করেছে, সেই চোদ্দ বছর বয়স থেকেই। এগুলোর মধ্যে কোনও বৈচিত্র্য খোঁজে না সে।
বিছানায় বসে সিগারেট খেতে খেতে দেখল, হৈম পা টেনে টেনে রান্নাঘরের দিকে গেল। এটাকে আলাদা করে রান্নাঘর বলা যায় না। ড্রইংরুমের একটা অংশ এইভাবে ব্যবহৃত হয়। অধিকাংশ ফ্ল্যাট বাড়িতেই এখন এভাবেই কিচেন আর ড্রইংরুমের একসঙ্গে মেলবন্ধন। আলাদা রান্নাঘর ছিল তাদের সাবেকি বাড়িতে। অন্তত দশ জন লোক সেখানে একসঙ্গে বসে দাঁড়িয়ে কাজ করতে পারত। ড্রইংরুম বলে কনসেপ্ট তখনও ঢুকে পড়েনি মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তের বাড়িতে। সেখানে ছিল বৈঠকখানা। বাইরের লোকেরা সেখানে বসে আড্ডা দিত। খাওয়া দাওয়া চলত।
সে দেখল, হৈম গ্যাস জ্বালিয়ে সসপ্যান বসাল। সে বাড়িতে থাকলে, বিশেষ করে বিছানায় পড়ে থাকলে হৈমর এই কাজটা বার বার করতে হয়। দুটো নেশা সে কোনওভাবেই ছাড়তে পারেনি, সিগারেট আর চা। ডাক্তার বহুবার বারণ করলেও শোনে না। তার মনে হয়, এই যে উদবৃত্ত জীবন পেয়ে সে বেঁচে আছে, তাতে এই দু-টো একটা বড় অংশ।
তাদের বাড়িও একসময় দিনরাত লোকেদের আগমনে সরগরম হয়ে থাকত। একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য সংখ্যাই ছিল ষাটের বেশি। তারা নিজেরাই দশ ভাই বোন। আর এখন সর্ব সাকুল্যে তিনজনে এসে দাঁড়িয়েছে। বাড়ির অন্য সদস্যরাও সব একে একে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছে। তারও তো কবেই চলে যাওয়ার টিকিট কনফার্ম হয়ে গিয়েছিল। কীভাবে যে বাতিল হল, সেটা ভাবলেই এখনও এই সত্তর বছর বয়সে এসেও তার অবাক লাগে।
সে দেখল, হৈম গ্যাস জ্বালিয়ে সসপ্যান বসাল। সে বাড়িতে থাকলে, বিশেষ করে বিছানায় পড়ে থাকলে হৈমর এই কাজটা বার বার করতে হয়। দুটো নেশা সে কোনওভাবেই ছাড়তে পারেনি, সিগারেট আর চা। ডাক্তার বহুবার বারণ করলেও শোনে না। তার মনে হয়, এই যে উদবৃত্ত জীবন পেয়ে সে বেঁচে আছে, তাতে এই দু-টো একটা বড় অংশ। এগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে মরা আর বাঁচা তার কাছে সমান্তরাল।

অন্য সময় অফিস যাওয়ার দিনগুলোতে এতটা চা বাড়িতে পান করা হয় না। প্রতি রবিবার সে সারা সপ্তাহের রান্না করে আলাদা আলাদা পাত্রে রেখে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখে। প্রতিদিন প্রয়োজন অনুযায়ী বের করে মাইক্রোওভেনে গরম করে নেয়। খালি ভাতটাই নিয়মিত করে। রাতে রুটিটা ফেরার সময় পাড়ার মোড়ের দোকান থেকেই নিয়ে নেয়। জীবন এখন অনেক সোজা। টাকা থাকলে কায়িক পরিশ্রম না করলেও, খেতে না পেয়ে মরে যেতে হবে না। ভাবতে ভাবতে আরেকটা সিগারেট ধরাল। কাশিটা শুরু হল সঙ্গে সঙ্গেই।
হৈম ট্রে-তে দু-কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢুকে তাকে কাশতে দেখে, একটু বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে হাসল। সে জানে আলোক এই নেশা থেকে কখনও বেরোতে চায় না। তাই কিছু বলা মানে বেকার শব্দের অপব্যবহার। ট্রে-তে আনার সময় চা খানিকটা চলকে পড়েছিল। সেটা আঁচল দিয়ে মুছে বিছানায় রাখল। কপালে হাত দিয়ে আলোকের গায়ে জ্বর কতটা বোঝার চেষ্টা করল।
হ্যাঁ, তুমি বলতে পারো, এত হিংসা খুন না করলেও হয়তো হত। কিন্তু একটা আন্দোলনে যখন সমাজের বৃহত্তর অংশ জড়িয়ে যায়, তখন এই ঘটনা ঘটবেই। কারণ তখন তার রাশ আর নেতা-নেত্রীদের হাতে থাকে না।
– এত চিন্তা কোরো না। এতদিন যখন টিকে গেছি এবারও যাব।
হৈম বলল- এটা কোনও কথা হল? মুখে কিছু আটকায় না তোমার।
– আচ্ছা হৈম সত্যি করে বলো তো, তোমার আমার বাঁচার কোনও রাস্তা কি সেদিন খোলা ছিল? আমি সেদিনও ঈশ্বরে বিশ্বাস করিনি। আজও করি না। কিন্তু এটা তো অস্বীকার করতে পারি না যে, সেদিনের সেই মানুষটা আমাদের নব জন্ম দিয়েছিলেন। তিনি না থাকলে আজ কি তোমার সঙ্গে বসে চা খেতে পারতাম!
– সত্যি কী সব দিন গেছে! ভাবলেও গায়ে কাঁটা দেয় আমার। তোমার মনে হয় না, তোমাদের বা আমাদের সেদিনের পথটা ভুল ছিল? অনুতাপ হয় না?
– না হৈম এতটুকুও হয় না। যে কোনও বিপ্লব আন্দোলনের শুরু হয় মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। তারপর তাতে বেনোজল ঢুকে পড়ে। তা বলে আন্দোলনের উৎস বা প্রতিবাদটা মিথ্যে হয়ে যেতে পারে না। হ্যাঁ, তুমি বলতে পারো, এত হিংসা খুন না করলেও হয়তো হত। কিন্তু একটা আন্দোলনে যখন সমাজের বৃহত্তর অংশ জড়িয়ে যায়, তখন এই ঘটনা ঘটবেই। কারণ তখন তার রাশ আর নেতা-নেত্রীদের হাতে থাকে না।
আর এটাকেই কাজে লাগায় রাষ্ট্র। ইচ্ছে করে এমন কিছু মানুষ ঢুকিয়ে দেয় জনগণের মাঝে, যাতে মূল লক্ষ্য থেকে সরে যায় আন্দোলন। এটা তো ইচ্ছে করেই লেখা হচ্ছিল, বলা হচ্ছিল সেই সময়- “দেশ এখন ওই চরমপন্থীদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধে নেমেছে, এ যুদ্ধে গণতন্ত্রের নামে পরিহাসের কোনও স্থান নেই। কেন না ঐ চরমপন্থীদের কাছে গণতন্ত্র মূল্যহীন।” এর ফলে দেশবাসীর কাছে নকশালদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যায়, আর তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। তুমি বিশ্বের একটা আন্দোলন বলো যেটা সম্পূর্ণ অহিংস! গান্ধীজির কোনও আন্দোলনই কি শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছিল ওই পথে? চৌরিচৌরাই বল আর সত্যাগ্রহই বল- সব ভেস্তে গেছিল। হৈম বলল- কিন্তু আমরা সেদিন কেউ আঠেরোও হইনি। অতি মাত্রায় সাহসিকতা দেখিয়ে ফেলাটা কি মূর্খামি ছিল না?
– তুমি ভুলে যাচ্ছ ক্ষুদিরামও দুঃসাহসিকতাই দেখিয়েছিলেন। আমরাও ঢুকে পড়েছিলাম। হয়তো না জেনেই। কিন্তু চক্রব্যুহে ঢুকে পড়লে, আর তো ফেরার পথ পাওয়া যায় না। আমার স্কুলের দাদারা যখন আমাকে দিয়ে প্রেসিডেন্সিতে কাগজ পাঠাত বইয়ের ভেতরে ঢুকিয়ে, আমি কি জানতাম কী লেখা থাকত বা সেগুলো কী! শুধু জানতাম দাদারা ভরসা করে আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছে, সেটা পালন করতে হবে। তুমিও তো এভাবেই জড়িয়ে পড়েছিলে। আলোক বলল।
যেদিন সেই দারোগাবাবু আমাকে নিয়ে জিপে তুললেন, আমি ভেবেছিলাম আজ শেষ দিন। তার আগে রোজ শুনতাম যাদের ভ্যানে তুলছে, তারা আর কেউ ফিরছে না। পার্থ, সুজিত, অজিত কোথায়, সেটাও জানতে পারছিলাম না। আমার সঙ্গে প্রথম ক’দিন সুমন ছিল। তারপর এত টর্চার সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে গেল।
– হ্যাঁ সেই। যেদিন দাদাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল সেদিনই প্রথম জানতে পারলাম, আমি যে কাগজগুলো পৌঁছে দিতাম সেগুলো মারাত্মক কিছু।
– আমাদের পাঁচ বন্ধুকে এক সঙ্গে ধরল। স্কুল থেকে বেরিয়ে প্রেসিডেন্সিতে কাগজগুলো দিয়ে বাড়ি ফিরছি। সেদিন বিকেলে ম্যাচ আছে ফুটবলের। তাই প্রায় দৌড়ে দৌড়ে আসছি। এই যে খোকারা শোনো- বলে একটা লোক ডাকল। তারপর সোজা ভ্যানে।
আজ আলোক যেন নিজের মধ্যে নেই। গত তিনবছরে প্রিয় মানুষদের মৃত্যু তাকে বিষাদগ্রস্ত করে তুলছিল ক্রমাগত। পুরোনো দিনগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছিল। অতীত কি এভাবেই পিছন থেকে ডাকে? ভুলতে চাইলেও ভুলতে দেয় না?

হৈম বলল- হুম। তারপর আমাকেও বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেল। কী আশ্চর্য তাই না, তার আগে তোমাকে দেখলেও সেভাবে পরিচয় হয়নি।
– হ্যাঁ। বলতে বলতে পা সোজা করার চেষ্টা করল আলোক।
হৈম দেখল ফুলে আছে। সে বলল- ব্যথাটা খুব বেড়েছে তাই না?
– সেদিনগুলোর তুলনায় এটা কিছুই না। প্রথম যখন জেরা করতে শুরু করল, সত্যি জানতাম না দাদাদের সকলের নাম। কিন্তু একটা শক্তি ভর করছিল। মনে হচ্ছিল, যে নামগুলো জানি, বলে দিলে তাদের অবস্থা ভাল হবে না। থার্ড ডিগ্রি কথাটা ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে বার বার এসেছে, পড়েছি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও সেই ডিগ্রিটা এতটাই রয়েছে, তা ভাবতে পারিনি। পার্থ, সুমিত, অজিত যেটুকু জানত বলে দিল নখগুলো উপড়ে নেওয়ার পর। আমি কেমন হতবাক হয়ে দেখছিলাম- এত হিংস্র হতে পারে মানুষ! তখনই জেদ এসে গেল। বলব না কিচ্ছু বলব না এদের। যা পারে করে নিক।
– হ্যাঁ, তার ফল আজও ভোগ করছ। পায়ের পাতা থেকে শিড়দাঁড়া, হাতের নখ থেকে কব্জি কোনওটাই অক্ষুণ্ণ নেই।
– ঠিক। যেদিন সেই দারোগাবাবু আমাকে নিয়ে জিপে তুললেন, আমি ভেবেছিলাম আজ শেষ দিন। তার আগে রোজ শুনতাম যাদের ভ্যানে তুলছে, তারা আর কেউ ফিরছে না। পার্থ, সুজিত, অজিত কোথায়, সেটাও জানতে পারছিলাম না। আমার সঙ্গে প্রথম ক’দিন সুমন ছিল। তারপর এত টর্চার সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে গেল। ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। জানতেও পারলাম না কী হল। আমার সেইদিন তোমার জন্য প্রথম চিন্তা হল।
বিশ্বাস করো আমি ভাবতেও পারিনি আমাকে এভাবে উনি নিয়মের বাইরে গিয়ে কাউকে না জানিয়ে অন্য একটা জায়গায় পাঠিয়ে দিতে পারেন। সেই গাড়িটা আমাকে নিয়ে গিয়ে তুলল ঘাটশিলা। একটা ঘর, রান্নাঘর আর বাথরুম।
হৈম হাসল। হাসলে এখনও বড় সুন্দর দেখায় হৈমকে। আলোক খানিকক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল- তুমি কী করে সহ্য করেছিলে এত নিপীড়ন কে জানে!
– আসলে ওই যে তুমি বললে, বয়স। সেই বয়সটাই এমন ছিল। তবে তোমার মা যে কেন সেদিন হঠাৎ করে আমাকে- তোমার প্রেমিকা, তোমাকে তুলে নিয়ে গেছে বলে আমাকেও তুলে আনা হয়েছে এসব বলেছিলেন, বুঝতে পারিনি। পরে বুঝতে পারলাম আমাকে বাঁচাবার জন্য এগুলো বলেছিলেন।
– হ্যাঁ। আসলে বড়দা মানে তোমার দাদা তো আমার ছোড়দার বন্ধু ছিল। তাই মা জানত সবই। অথচ দেখো আমাকে বাঁচাবার জন্য মা কোনও আবেদন করেননি। দারোগাবাবু যখন আমাকে নিয়ে জিপে তুললেন, আমি জানতামও না কোথায় যাচ্ছি। কলকাতা ছাড়িয়ে জিপ চলল। দু-পাশের রাস্তাগুলো বদলে গেল। আমার মনে হচ্ছিল মা জানলোও না, আমি কোথায় চলে গেলাম। মাকে আর দেখতে পাব না। আমি তো বরাবর মা নেওটা। বাবার সঙ্গে একটা দূরত্ব ছিল। একটা জায়গায় গাড়িটা থামল। তিনি নামলেন। আমার হাতে টাকা দিলেন, আর অন্য আরেকটা গাড়িতে তুলে দিলেন। গাড়ির নাম্বার পশ্চিমবঙ্গের নয়। বললেন, “সাবধানে থাকিস। আগামী পাঁচ বছর কলকাতামুখো হবি না।”
বিশ্বাস করো আমি ভাবতেও পারিনি আমাকে এভাবে উনি নিয়মের বাইরে গিয়ে কাউকে না জানিয়ে অন্য একটা জায়গায় পাঠিয়ে দিতে পারেন। সেই গাড়িটা আমাকে নিয়ে গিয়ে তুলল ঘাটশিলা। একটা ঘর, রান্নাঘর আর বাথরুম। আমি তখন হাঁটতেও পারতাম না। বুক ঘষে ঘষে বাথরুম যেতাম। দাঁড়াবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
শারীরিক অসুস্থতা সইতে না পেরেই, এই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি বলে অনুমান। বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। সেদিন তাঁর চোখে জল পড়েনি, কিন্তু কোথাও একটা শূন্যতা কাজ করছিল।
– হ্যাঁ। একটা বড় শ্বাস নিয়ে হৈম থেমে থেমে বলল- তুমি চলে গেলে অন্য জায়গায়, আর তোমার মা আমাকে নিয়ে এলেন তোমাদের বাড়িতে, ব্যক্তিগত জামিনে। বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ হল। কোথা থেকে একটা কাগজ জোগাড় করে দারোগাবাবু কোর্টে বললেন, আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা, বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলাম, বিয়েও করেছি অমতে। তোমাকে ধরেছে বলে, আমিও চলে এসেছি। অনেক পরে বুঝেছিলাম এইসব ছিল তাঁর পরিকল্পনা। তোমার মাকে তিনি নিজের মায়ের মতো সম্মান দিয়েছিলেন।
– অথচ আমি এসব কিছুই জানতাম না। ওই ঘরটায় শুয়ে জানলা দিয়ে টিলা দেখতাম, নদী দেখতাম। মনে হত, আমাকে ওরা হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সেই যে বলে নিশির ডাক। অথচ আমি যাব কী করে! একদিন মেজদা এলেন, বললেন, আমার নামে শ্যুট ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে। আমি নাকি জেল থেকে পালিয়েছি। কলকাতা বা এ রাজ্যের কোথাও আমাকে দেখলেই গুলি।

আমার কাছে তখন ফেরার কোনও উপায় নেই। বিছানায় শুয়ে সারাদিন। দাদা আমাকে নিয়ে চলে গেলেন লখনউ। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টার। এখানে আসার পথে আমার মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাই তিনি নিয়ে এসেছেন খবর পেয়ে- সকলে এমনই জানল। উত্তর আর মধ্য কলকাতার সামান্য অংশ চেনা ষোলো বছরের একটা ছেলে চলে এল এমন একটা জায়গায়, না জানে সেখানকার ভাষা, না জানে সংস্কৃতি। শুধু জানে ঘুরে দাঁড়াতে হবে, যে করেই হোক। তোমার মনে আছে হৈম যখন পরীক্ষা দেওয়ার মতো অবস্থায় এলাম, বসতে পারছি নিজে নিজে, তখন কতগুলো গাড়ি পালটানো হত হাওড়ায় নেমে। কত ছদ্মবেশ নিতাম। পরীক্ষা হলে আমার মুখটা আসল কেমন কেউ জানতেও পারেনি।
– হ্যাঁ। তুমি তো জানতেই না, ততদিনে তোমার স্ত্রীর পরিচয়ে আমি এ বাড়ির ছোট বউ। আমার মাঝে মাঝে ভয় হত, তুমি যদি সুস্থ হওয়ার পর, ফিরে এসে আমাকে বিয়ে না করো, ভাল না বাসো তখন কী হবে! মা ভরসা দিতেন- আমি যখন তোমাকে নিয়ে এসেছি, আমার ছেলে তোমাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবেই। তার মূল্যবোধ নিয়ে আমার কোনও সংশয় নেই।
– হ্যাঁ। মা চিরকাল আমার উপর ভরসা করেছেন, মায়ের জন্যই তো সব। তবু জানো কখনও কখনও ভাবি, মা তার সন্তানের ভাল চাইবেন, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দারোগাবাবু? তিনি কেন বাঁচালেন? শুনেছিলাম শুধু তুমি আমি নই, এমন অনেককেই তিনি একইভাবে বাঁচিয়েছিলেন।
বয়সটাই বা কী ছিল? অনেক কথা বললে, এবার স্নান করে নাও। আস্তে আস্তে বাথরুমে যাও। মাথায় জল দিলে একটু ভাল লাগবে। বলে হৈম চায়ের কাপ ট্রেতে নিয়ে উঠে পড়ল।
– হ্যাঁ। আসলে কী বলতো! পুলিশ প্রশাসন সবই তো একটা সিস্টেমের অন্তর্গত। তাতে খারাপ ভাল সবই থাকে। তিনি সেই সিস্টেমের অংশ ছিলেন। কিন্তু তার মধ্যে থেকেও চেষ্টা করেছিলেন, আর তাই আমরা এখনও পাশাপাশি বসে কথা বলছি।
– তবে ওই বিপর্যয় আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ওই পাঁচ বছরে আমি যত বই পড়েছি, তা পড়া হত না। আর এই পেশাতেও আসা হত না। তুমি বলবে, আর তো কিছু করার মতো অবস্থায় আমি ছিলাম না, সারাদিন দাঁড়াবার, বসার, হাঁটার চেষ্টা, আর বাকি সময় তাহলে কী করতাম! জানি না কিছু করার ছিল কি না! কিন্তু আমি বইকেই আঁকড়ে ধরেছিলাম। মজার বিষয় কী জানো, তখনই ওখানে একটা হিন্দি ডেইলি পেপার পড়ে জানলাম- নকশালবাড়ি এলাকার আদি বাসিন্দারা ছিলেন মূলত রাজবংশীরা। ব্রিটিশ আমলে সেখানে চা বাগান করার হিড়িক পড়ে যায়।
বিহার, ওড়িশা ও মধ্যপ্রদেশের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ নেপাল থেকেও শ্রমিক আনা হয়। বঞ্চিত শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার জন্য ছুটে আসেন চারু মজুমদার। সংগঠিত করেন সশস্ত্র বিপ্লব। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সে তুংয়ের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে নকশালবাড়িতে সংগ্রাম শুরু করেন। তাঁর বিপ্লবের মন্ত্র আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে গোটা পশ্চিমবঙ্গে। হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী পথে পথে আওয়াজ তোলে, ‘লাঙল যার জমি তার, বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস, নকশালবাড়ির পথ বিপ্লবের পথ, একটি স্ফুলিঙ্গই দাবানল সৃষ্টি করে’ ইত্যাদি। এগুলো শুনতাম দাদাদের মুখে স্কুলের ক্যান্টিনে, যখন প্রেসিডেন্সিতে যেতাম, সেখানে কাগজ দেওয়ার পর শুনতাম- বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। কিন্তু এত গভীরে যাওয়ার প্রয়োজনটাই বুঝতে পারিনি।
– বয়সটাই বা কী ছিল? অনেক কথা বললে, এবার স্নান করে নাও। আস্তে আস্তে বাথরুমে যাও। মাথায় জল দিলে একটু ভাল লাগবে। বলে হৈম চায়ের কাপ ট্রেতে নিয়ে উঠে পড়ল।
শারীরিক অসুস্থতা সইতে না পেরেই, এই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি বলে অনুমান। বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। সেদিন তাঁর চোখে জল পড়েনি, কিন্তু কোথাও একটা শূন্যতা কাজ করছিল।
তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল আলোক। এই মেয়েটার কাছে সে চির কৃতজ্ঞ। বাড়ি ফেরার পর থেকে তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য যে অমানসিক পরিশ্রম সে করেছে, তা বর্ণনা করার কোনও ভাষা তার জানা নেই। হৈম কখনও তাকে বলেনি, জেলে তার উপর কী কী নির্যাতন চলেছিল! কিন্তু টেনে টেনে হাঁটা, ক্রমশ একটা প্রাণবন্ত, কাজপাগল মেয়ের জবুথবু হয়ে যাওয়া, নার্ভের সমস্যা বুঝিয়ে দেয় সব।

তবে এখন খুব ইচ্ছে করে নকশালবাড়ি যেতে। সে কখনও সেখানে যায়নি। সারা ভারত ঘুরলেও কেন জানে না, ওখানে যেতে ইচ্ছে করেনি তাদের কখনও। সেই জায়গাটা হেঁদোয়ার বাড়িটা থেকে কত দূর ছিল, যার জন্য সারা বাংলা উত্তাল হল, একটা প্রজন্মের মেধাবী, শিক্ষিত, আবেগপ্রবণ ছেলেরা মায়ের কোল শূন্য করে দিয়ে চলে গেল, কেমন আছে সেই অঞ্চল! সেখানে কি আজও লোকে মনে রেখেছে চারু মজুমদার, সরোজ দত্ত, কানু সান্যালকে? চারু বাবুকে আলিপুর জেলেই খুন করা হয়েছিল এ খবর সে লখনউতে পেয়েছিল। সরোজ দত্ত পুলিশের এনকাউন্টারে। আর কানু সান্যালের খবর পেল ২০১০ এ খবরের কাগজের ভেতরের পাতায়। লেখা হয়েছিল- চলে গেলেন নকশাল আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা কানু সান্যাল। ২৩শে মার্চ দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি থানার হাতিঘিষা গ্রামের নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।
শারীরিক অসুস্থতা সইতে না পেরেই, এই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি বলে অনুমান। বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। সেদিন তাঁর চোখে জল পড়েনি, কিন্তু কোথাও একটা শূন্যতা কাজ করছিল।
ভূমি আন্দোলন কাকে বলে না জেনেও সেদিন সে জড়িয়ে গিয়েছিল যে সংগ্রামে, তা তার নিয়তি ছিল। আর পুলিশের হাতে ধরা পড়ে মার খেয়ে তাদেরই একজনের বদান্যতায় পালিয়ে গিয়ে যে জীবন শুরু হয়েছিল, তাও বোধহয় পূর্বনির্ধারিত ছিল। নইলে পারিবারিক ব্যবসা ছেড়ে প্রকাশনা জগতে কেন এল, তার সদুত্তর আজও সে পায় না। সব ঘটনার নেপথ্যে একটা কার্য কারণ সম্পর্ক থাকে। এটাও হয়তো তাই ছিল! এসব ভাবতে ভাবতে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল আলোক।
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
রুদ্ধশ্বাসে পড়ে ফেললাম এই পর্বটি। অনবদ্য লেখা।