(Ujjhomanush 5)
কুলটিতে থাকত অঞ্জুদা। বা এখনও থাকে হয়তো। নিশ্চয়ই। মনে নেই ঠিক কোনটা, তবে ভারতলক্ষ্মী স্টুডিয়োয় কোনও একটা শুটিংয়ে, আলাপ হয়েছিল, প্রথম। আশা করিনি আবার দেখা হবে, কারণ অঞ্জুদা, টালিগঞ্জের ভাষায়, ‘জুনিয়র আর্টিস্ট’। অর্থাৎ, যাঁরা ‘ছোটখাট’ রোল করেন, ভিড় সাজেন, ‘মূল’ সিনে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের পিছন দিয়ে হেঁটে যান, দাঁড়িয়ে থাকেন বা খুব ‘সৌভাগ্য’ হলে এক-দুটো সংলাপ বলতে পান।
আরও পড়ুন: উহ্যমানুষ (১), (২), (৩), (৪)
ফলে, সে দিন যে কাজটা করতে এসেছিলেন, হওয়ার পর ফের আর কবে দেখা হবে, স্বভাবতই নিশ্চিত ছিলাম না। প্রথম বার, যখন তাঁর সঙ্গে দেখা, তখন আমি এবং আমার আর এক সহকর্মী মেক-আপ ঘরে বসেছিলাম, এসি-টা কিঞ্চিৎ জোরেই চলছিল। অঞ্জুদা বা আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁদের বাইরে বসানো হয়েছিল, তা-ই সাধারণত হয়ে থাকে…।

অঞ্জুদা কোনও এক ফাঁকে ওই ঘরে ঢুকেছিল। আমাদের কাছে যেন দুঃখপ্রকাশ করেই। আমরা অবাকই হয়েছিলাম, যে ওমা দুঃখপ্রকাশ হঠাৎ কেন! পরক্ষণেই বুঝে গিয়েছিলাম, যে অমনটাই তো ‘চল’, তাই অঞ্জুদা-র অমন প্রতিক্রিয়া। বেশিক্ষণ বসতে পারেনি অঞ্জুদা, ভিড় সাজতে ছুটতে হয়েছিল, কিন্তু সে দিন শটের মাঝখানে, ব্রেকে, বেশ জমে গিয়েছিল অঞ্জুদা’র সঙ্গে। বলেছিলেন, এখনও মনে আছে— ‘কোনও লজ্জা নেই জানো, ভিড়-টিড় সাজতে, অনেক বাচ্চা ছেলে বিরক্ত হয়, মন দিয়ে কাজ করে না, বলে— ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকব, কী আবার মন-টন… ওরা বোঝে না, ভিড় আসলে কী… ভিড় কি শুধু কয়েকটা লোক বলো? সবাইকে আসলে দেখা যায় ভিড়ে…’
অঞ্জুদা খুব সহজে বলেছিল। আমি বোধহয় অল্প মাথা নেড়েছিলাম। নিজের সংলাপ নিয়েই তখন অধিক চিন্তা।
সে দিন শুট শেষ হতে দেরি হল। আমি, আমরা গাড়ি পেলাম। অঞ্জুদা’রা দাঁড়িয়ে ছিলেন, ওদের নাকি গাড়ি দেওয়া হবে। হয়েছিল নিশ্চয়ই। কিছুটা দূর ওরা এগিয়ে গিয়েছিল, নিশ্চয়ই।

তার বছর দেড়েক পর বা ওরকমই কিছু হবে, আবার আশ্চর্যভাবে দেখা অঞ্জুদা’র সঙ্গে। কেমন এড়িয়ে যাচ্ছিল আমায়। আমি গিয়ে ধরি, বলি কী গো আছ কেমন? চিনতে পারছ না। তাতে খেয়াল করলাম, আরও অপ্রস্তুত হল অঞ্জুদা। ইউনিটের এক পরিচিত বোঝালেন— আমার নাকি খানিক পরিচিতি হয়েছে, তাই একটা দূরত্ব রাখতে চাইছেন…।
অঞ্জুদা সেবার একবার ‘ধরা’ দিয়েছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হল, কথাই বলছ না যে… বিশেষ উত্তর দেয়নি সেসবের, কী মনে হওয়ায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, এখনও তোমায় ভিড় সাজতে হচ্ছে? একটু তাকিয়ে বলেছিল, যদ্দুর মনে আছে— “এখন আমি আরও দারুণ ভিড় হতে পারি। দম থাকে তো কেউ আমার থেকে বেটার ভিড় হয়ে দেখাক…’
আমি খানিক ভিরমি খেয়ে বসে, আর অঞ্জুদা উঠে চলে গিয়েছিল। আরও এক জায়গায় ভিড় হতে।
আর সে দিন ফের, আমার কাছে ভিড়ের মধ্যে উহ্য হয়ে থাকা অগুনতি মানুষ, জলজ্যান্ত হয়ে উঠেছিল। যে ভিড়ে, কখনও আমি, কখনও আপনিও হেঁটেছেন, বা এড়িয়েছেন। লিখেছি এ প্রসঙ্গে আগেও, বলেছিও এ কথা, কিন্তু তা বলে যে কথা জাগিয়ে রাখে, ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়, তা তুলব না কেন আবার? ফেরাব না কেন বাদল সরকারকে? যেখানে ভেসে আসবে অদৃশ্য এক ‘খোকা’ ও ‘বুড়ো’।

খোকা, বাদল সরকারের লেজেন্ডারি সেই ‘মিছিল’-এ বারে বারে ঘুরে মরে, চিৎকার করে বলে চলে, ‘আমি খুন হয়েছি। আমি। এই যে এখানে। আমি খুন হয়েছি। আমি। আমি। এই যে আমি। আমাকে মেরে ফেলেছে। আমি মরে গেছি। এই মাত্র। এই মাত্র খুন হয়েছি আমি। আমি খুন হলাম আজ। আমি খুন হয়েছি গতকাল। আমি খুন হয়েছি পরশু। তরশু। গত সপ্তাহে। গত মাসে। গত বছর। আমি খুন হই রোজ। আমি খুন হব কাল। পরশু। তরশু। আসছে সপ্তাহে। আসছে মাসে। আসছে বছর। আমি। আমি। দেখতে পাচ্ছ না কেন, শুনতে পাচ্ছ না কেন? আমি। আমি। এই যে এখানে— আমি— খুন হয়েছি— মরে গেছি— রোজ খুন হই— রোজ রোজ খুন রোজ— মৃত্যু রোজ…’

মুহূর্তেই আমি কি খেই হারিয়ে ফেলি? আমি আসলে ঠিক কে, ওই খোকা না বুড়ো? যে বুড়ো এক সময় বলে, ‘আমি তখন ছোট ছিলাম, খুব খুব ছোট— তখন এক দিন, এক সকালে, হেমন্ত-শীতের মাঝামাঝি, হিম হিম রোদ রোদ ঝিরঝিরে মিষ্টি এক সকালে, আমার বাবার হাত ধরে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। কাঁচা রাস্তা দিয়ে শুকনো পাতা খসে গিয়ে মাড়াতে মাড়াতে গাছের পাতার বুনো ফুলের কাঁচামাটির গন্ধে গন্ধে হাঁটছিলাম… আর রাস্তাটা এঁকেবেঁকে যাচ্ছিল, পায়ের নীচ দিয়ে পেছনে সরে সরে যাচ্ছিল, আবার নতুন রাস্তা আসছিল…সব রাস্তা একটু দূরে গিয়ে মোড় ঘুরে অদৃশ্য, আবার মোড়ে পৌঁছলে নতুন রাস্তা…বাবা বলল খোকা চলো ফিরি, আমি বললাম আর একটু ওই মোড় অবধি, ওই মোড়ের পর কী আছে…’
কিন্তু খোকা তো এখন প্রায় প্রতি মোড়ে খুন হয়ে পড়ে থাকে। আবার বাদল দেখিয়েছেন, ওই খোকা-ই তো একদা খোকা-এখন বুড়োকে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ শুনিয়েছে। বুড়ো তো তা-ই প্রায় হাজার বছর ধরে পথ হেঁটে চলেছে, সেই, সেই ‘নতুন বাড়ি’ পৌঁছবে বলে। বুড়ো জানে না রাস্তা কোথায়, ঘুরেফিরে তো সেই একই রাস্তায় এসে পড়ে সে। মোড় ঘুরে মোড় ঘুরে একই রাস্তা, মিছিল খুঁজে পায় না সে, যে মিছিল পথ দেখাবে। যা হবে ‘সত্যিকারের’ মিছিল। সেও তো তাই খুঁজে মরে। মাঝে আবার খোকার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় বুড়োর। বুড়ো প্রশ্ন করে— ‘কোথায় চললে?’ খোকা বলে— ‘মরতে। খুন হতে।’ বুড়ো তখন ফের বলে— ‘চলো, আমি তোমার পেছনে আছি।’ খোকা প্রশ্ন করে— ‘পেছনে আছি মানে? পেছনে আছ কেন?’ বুড়ো বোধহয় একটা দীর্ঘশ্বাস আটকে বলে— ‘সামনে যাবার কথা ছিল। পারিনি। তার আগেই হারিয়ে গেছি। তাই পেছনে আছি।’

আমি ভিড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাড়ি-ফেরতা পথে আরও তল হারাই। কোন ভূমিকা যে সুপ্রিম নাট্যকার আমার জন্যে লাল রং দিয়ে দাগিয়ে গিয়েছেন, ভেবে যাই। মিছিলের অপেক্ষাতেই ৫০ ওভারের বাকিটা কাটিয়ে দেব কি না, ভাবি। কোনওদিন, কোনও এক মোড়ের মাথায় সহসা সেই ‘সত্যিকারের’ মিছিল পেয়ে যাব, এটাকেই কি পার্সোনাল হোপ বলে, বাদলবাবুর প্রতিটা কাজে যা ঠিকরে বেরোত? নাকি, পার্সোনাল হোপ আসলে, কোনও দিন নিজেই একটা মিছিল শুরু করতে পারা? এটা জেনেও যে, মিছিলের অগ্রভাগে থাকা খোকাকে গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়তেই হবে। ভাবি, ভাবি, ভাবা প্র্যাক্টিস করি অন্তত।
অঞ্জুদা কি শেষ সে দিন, এটা বুঝে ফেলেছিল?
অঞ্জুদা কি শুনে ফেলেছিল, নিশীথরাতের বাদলধারা…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
2 Responses
বড্ড চোখ জ্বালা করছে….গলাটা আটকে যাচ্ছে….. কান্নাধোওয়া ঝাপসা হওয়া অতীত ! না,বড় বেশি স্পষ্ট অতীত
Ki bhalo lekha!