(Rabindra Jayanti)
চতুর্ভূজ এম.এ পাশ করে গ্রামে এসেছে। সঙ্গে তার একটি কাবুলি বিড়াল। চতুর্ভূজ মনে করেছিল তার এম.এ পাশের খবরে সকলে খুব অবাক হবে শুধু নয়, গ্রামে একটা হুলুস্থুল পড়ে যাবে। কিন্তু গ্রামের লোক কি আর এম.এ পাশের মাহাত্ম্য বুঝবে? সকলে কেবল চতুর্ভূজকে তার কোলে ধরা কাবুলি বিড়ালটার কথা জিজ্ঞাসা করতে থাকে। নীলরতন, জমিদার মশাই, সাধুচরণ, সাতখুড়ো, পরাণ, হরি এমনকি চতুর্ভূজের মা এবং বাড়ির দাসীটা পর্যন্ত ওই কাবুলি বিড়ালটাকে নিয়ে উৎসাহ দেখাতে শুরু করে। চতুর্ভূজের এম.এ পাশের গুরুত্ব কোথাও সম্পূর্ণ ম্লান হয়ে যায়।
প্রায় ১৪০ বছর আগে ১২৯২ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে (ইংরেজিতে সম্ভবত ১৮৮৫ সাল নাগাদ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘অভ্যর্থনা’ নামক হাস্যরসাত্মক নাটিকাটি রচনা করেন, বাঙালি জীবনে শিক্ষার গুণাগুণ ও প্রভাব নিয়ে ব্যঙ্গ করতে। চতুর্ভূজের এম.এ পাশের থেকেও কাবুলি বিড়ালের যে মূল্য বেশি, তা বোঝাতে অপূর্ব নাট্যরসের সঞ্চার করা হয়েছে এই নাটিকায়।
আরও পড়ুন: রবিঠাকুর যেভাবে জাগেন
কিন্তু কথা তা নিয়ে নয়। আমাদের ছোটবেলায়, কোয়ার্টার্সে রবীন্দ্র জয়ন্তীর জন্য একবার এই ‘অভ্যর্থনা’-কে বেছে নেওয়া হয়েছিল। কারণ, এখানে চরিত্র বেশ কয়েকটা, এবং মা ও দাসী চরিত্রের জন্য মেয়েদের রোলও আছে! কোয়ার্টার্সে তখন আমরা অনেকগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। সুতরাং, সবাই অংশগ্রহণ করতে পারবে, এমন নাটক মঞ্চস্থ হওয়াই তো ভাল।

কিন্তু বাঁধ সাধল রিহার্সাল। আমাদের নাটকের পরিচালক সুদীপদা টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওতে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের কাজ করে তখন। আমাদের ‘অভ্যর্থনা’ নাটকের রিহার্সালে একেকটা দৃশ্য অভিনয় করে দেখাতে গিয়ে বহু সময় স্বভাববশত বলে দেয়- ‘রোল ক্যামেরা! অ্যাকশন!’ এবার মুশকিল হচ্ছে, যার যে পার্টই মুখস্থ থাক, সুদীপদা যতক্ষণ অ্যাকশন না বলছে, ততক্ষণ কেউ অভিনয় শুরু করছে না। এ তো মহা ফ্যাসাদ! নাটক সিনেমা হতে গিয়ে কি না কি হয়ে যাবে, সে কারণে সুদীপদা অ্যাকশন আর কাট বলা বন্ধ করল।
বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে তখন ক্লাস সেভেন থেকে টেন-এর কোটায়। আর কেউই অভিনয় তেমন জানে না। কোন চরিত্রের আবেগ কোথায় বাঁধতে হবে, তা আমাদের তখন জানা-বোঝার কথাও নয়। যাই হোক, চতুর্ভূজের মায়ের রোল গেল সুপর্ণাদির কাছে। ও তখন ক্লাস এইট-নাইনে পড়ে। সুপর্ণাদি রোলটা লুফে নিল কারণ, ও মনের সুখে বউ সাজতে পারবে! প্লাস্টিকের শাঁখা, লাল আবির দিয়ে সিঁদুর, গা ভর্তি ইমিটেশনের গয়না, লালপেড়ে সাদা শাড়ি, মুখে পান দিয়ে একদম পাক্কা গিন্নি। অন্যদিকে চতুর্ভূজের রোলে ইন্দ্রদা।

সুপর্ণাদির বোধহয় ওর প্রতি কোনও ব্যথা ছিল— যখন ডায়লগ বলে, মনে হয় না চতুর্ভূজ ওর পুত্র। চতুর্ভূজের সামনে ঘোমটা দিয়ে এমন করে লজ্জা পায় যেন চতুর্ভূজরূপী ইন্দ্র ওর স্বামী! সুপর্ণাদি আবার কান্নার অভিনয়টা তখনও দখল করতে পারেনি। যখনই কাঁদতে বলা হত— ও মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সানুনাসিক সুরে একটা কেমন উঁউঁউঁ আবার বিরতি দিয়ে উঁউঁউঁ, আবার উঁউঁউঁউঁউঁউঁ করে কেঁদে উঠত!
এদিকে দাসীর রোলের জন্য মেয়ে পাওয়া যায়নি। বেশিরভাগ মেয়ে ‘ঋতুরঙ্গ’-এর নাচে চলে গিয়েছিল, আর আমরা ছেলেরাও সবাই ‘অভ্যর্থনা’-তে পার্ট পেয়ে গিয়েছিলাম। তাই দাসীর চরিত্রে শেষমেশ নিতে হল শুভকে। বেশি ডায়লগ নেই। গিন্নি মায়ের সঙ্গে থেকে ওকে শুধু হুঁ-হাঁ করতে বলল সুদীপদা। মেয়ে সাজতে হবে জেনেও শুভ আপত্তি করল না কারণ, আর যাই হোক, বন্ধুদের সঙ্গে এক নাটকে থাকতে পারবে।

নাটকের দিন ওর দুপুরে ২৫ ওভারের ম্যাচ মসজিদ পাড়ার সঙ্গে। সারা দুপুর রোদে পুড়ে মেকআপে এসে যখন খাটো ছাপার শাড়ি আর ব্লাউজ পরল, তখন ওকে বাড়ির দাসী মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল বাড়ির দারোয়ান শাড়ি-ব্লাউজ পরে আছে। শুভ খেলাধুলো খুব করলেও পড়াশোনায় একদম ভাল ছিল না। একটাই ডায়লগ ছিল ওর। চতুর্ভূজকে ওষুধ খাওয়ানোর কথায় বলবে— ‘দাদাবাবু! এক দাগ খেয়ে এস!’ সেটাও ব্যাটা নাটকের দিন ভুল করে বলে দিল, ‘দাদাবাবু! চলো এক দান খেলে আসি!’ বাড়ির দাসী ঘরের ছেলেকে এক দান কী খেলে আসতে ইঙ্গিত করতে পারে, তখন বুঝিনি। কিন্তু দর্শক ওই দৃশ্যে এমন হো-হো করে হেসেছিল যে, শুভ প্রায় শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পেয়ে যায় আর কী!
আমাদের হাউসিং এস্টেট রিক্রিয়েশন ক্লাবের ছিল দু’টি কক্ষ আর একটা বড় লাল সিমেন্টের চাতাল। রবীন্দ্র জয়ন্তী তথা যে কোনও অনুষ্ঠান হত ওই চাতালে, আর রিহার্সাল হত দু’টো ঘরে ভাগ করে। নাটকে অংশ নেওয়া আমাদের তরুণদের স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকত পাশের ঘরে চলা নাচের রিহার্সালের প্রতি। যে কোনও অজুহাতে ওই ঘরটায় ঢুকতে পারলে, আর সেইসব তরুণীদের সঙ্গে চোখাচোখি হলে, আমরা যারপরনাই খুশি হয়ে যেতাম। তাই ওদের জল লাগবে কি না, পাখা চলছে তো, জানলাগুলো যেন বন্ধ না থাকে, কারও ওখানে ভিড় মনে হলে আমাদের ঘরে এসে বসতে পারে, এবং দরকার হলে আমরা দু’চারটে ছেলে বাইরে বেরিয়ে যাব কিন্তু মেয়েদের যেন কোনও অসুবিধা না হয় ইত্যাদি ব্যাপারগুলো চলতেই থাকত।

আসলে বছরে রবীন্দ্র জয়ন্তীর সময়টা ছিল সুখের সময়। তখন মার্চ মাসে অ্যানুয়াল পরীক্ষা হত। এপ্রিলে একটা মাস ছুটি থাকত আর রবিবার না পড়লে ২রা মে নতুন ক্লাস শুরু হত। এপ্রিলের ওই একটা মাস আমাদের পড়াশোনার কোনও চাপ থাকত না। আমরা মনের আনন্দে রবীন্দ্রজয়ন্তীর রিহার্সাল দিতাম। এখন হয়তো অনেকে বিশ্বাস করবে না, খোদ কলকাতা শহরের টালিগঞ্জে তখন লোডশেডিং আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গী। অন্তত মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে অবধি, সন্ধ্যাবেলা অ্যানুয়াল পরীক্ষার পড়া আমরা হ্যারিকেনের আলো ছাড়া পড়েছি বলে মনে পড়ে না।
রবীন্দ্রজয়ন্তীর রিহার্সালও আমাদের এই লোডশেডিং-এর অন্ধকারে চলত। ক্লাবের সামনে বড় মাঠটায় নানা বয়সের মানুষ দলে দলে গোল করে বসে থাকত লোডশেডিং হলে। চাঁদের আলো ছাপিয়ে পড়ত মাঠজুড়ে। এদিকে ক্লাবে নাচের গান চলত খালি গলায়- কখনও ‘রিমঝিম ঘন ঘন রে’ আবার কখনও ‘হিমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে’ অথবা ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়’। আমাদের নাটকের ডায়লগ বলাও চলত। অন্ধকারে ডুবে যাওয়া কোয়ার্টার্স, কিন্তু বাড়িতে বাড়িতে হ্যারিকেনের মিঠে আলো, চাঁদের আলো ছাপা মাঠ, ক্লাবের চাতালে নাটকের কথোপকথন, আর রবীন্দ্রনাথের একেকটা ঋতুর গান মেয়েদের খালি গলায়— সব মিলিয়ে কী একটা রহস্যময় অথচ অপার সুন্দর কিছু মুহূর্ত তৈরি হত, যা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না! একটা ছোট সরকারি আবাসনের নিম্নবিত্ত মানুষদের রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধার্পণের প্রস্তুতি ছিল খানিকটা এমনই।

এখন ফিরে দেখলে, সেই দিনগুলির মূল্য অনেক বেশি মনে হয়। শুধু আমাদের কোয়ার্টার্স বলে নয়। বাংলার সমস্ত পাড়ায় পাড়ায় কিংবা গ্রামে রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষ্যে নাচ-গান-নাটক-আবৃত্তির যেসব আয়োজন চলত, সেসবের ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে শুধু বোদ্ধাদের নন, বরং যে-কোনও মানুষের, তা ওই ছোট ছোট অনুষ্ঠানগুলিই বুঝিয়েছিল। হয়তো আমাদের মতো অংশগ্রহণকারী ছেলেমেয়েগুলো পরবর্তীকালে আর কখনও ওভাবে রবীন্দ্রনাথ মঞ্চস্থ করেনি। কিন্তু, তাঁকে আত্মস্থ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ছোটবেলার সেই লোডশেডিংঘন দিনগুলি থেকে।
যাঁরা প্রতিনিয়ত রবীন্দ্রনাথ চর্চায় থেকেছেন, তাঁরা ভাগ্যবান। কিন্তু যাঁরা সে সুযোগ করে উঠতে পারেননি, তাঁরা প্রত্যেকেই ছোটবেলার ওই অনুষ্ঠানগুলির প্রতি কৃতজ্ঞ।
রবীন্দ্রনাথের কোনও একটা গান, অথবা নৃত্যনাট্যের অংশ কিংবা একটি কবিতা হয়তো সারা জীবন একটা মানুষ বুকে করে রেখেছে। জীবনে অনেক কিছু ভুলেছে, ছোটবেলার সেই সব জায়গা থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে, হয়তো দেশেই থাকেনি কিন্তু ওই এক টুকরো রবীন্দ্রনাথ তাকে ছেড়ে যায়নি। যাঁরা প্রতিনিয়ত রবীন্দ্রনাথ চর্চায় থেকেছেন, তাঁরা ভাগ্যবান। কিন্তু যাঁরা সে সুযোগ করে উঠতে পারেননি, তাঁরা প্রত্যেকেই ছোটবেলার ওই অনুষ্ঠানগুলির প্রতি কৃতজ্ঞ।
চতুর্ভূজের এম.এ পাশকে গ্রামের কেউ গুরুত্ব দেয়নি, তার কাবুলি বিড়ালটাকে নিয়ে পড়েছিল। কিন্তু, রবীন্দ্রনাথ কার হৃদয়ের কোন অলিন্দে বসে আছেন, তা উপলব্ধি করার গুরুত্ব সাংঘাতিক। সেই ব্যক্তি হয়তো রাবীন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারেননি সারা জীবন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে ভালবেসেছেন। কারণ, রবীন্দ্রনাথকে ছুঁয়ে আজও তিনি আপন শৈশব-কৈশোরে ফিরে যেতে পারেন। কোনও পঁচিশে বৈশাখে যেন আমরা এইসব মানুষ আর সেইসব রবীন্দ্র জয়ন্তীগুলির কথা না ভুলি!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত