(Breast Cancer)
রাজু আমাদের প্রাক্তন ড্রাইভার। কয়েকদিন আগে ও ওর পরিচিত একজনকে এনেছিল, তার শারীরিক কিছু অসুবিধে দূর করার জন্যে। এখন ভাল হয়ে গেছে, তারই প্রতিদানস্বরূপ সে রাজুর হাত দিয়ে বেশ কয়েকটা বড় সাইজের গলদা চিংড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। দিনটা ছিল রবিবার। ঘ্রাণের টানে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কাঞ্চন আর শেলির আগমন। ওরা মাঝে মাঝেই আসে। বললাম, ‘তোমরা ভাল দিনেই এসেছ, এত গলদা আমাদের পক্ষে হজম করাই মুশকিল। তা ছাড়া আজ শেলির হাতের রান্না খাব। ওর রান্নার স্বাদ অমৃতসমান।’
শেলি বলে উঠল, ‘সে না হয় হবে, কিন্তু তার আগে আমাকে কিছু জানতে হবে। মহিলা হিসেবে আমার মেয়ে পুচুর জন্যে।’
আরও পড়ুন: নিজের সব্জি খাইব সুখে
-বলো, কি জানতে চাও?
শেলি বলল, ‘একটা জায়গায় পড়লাম, মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তনের ক্যানসার হয় সবচেয়ে বেশি।’
-ঠিকই পড়েছ, এটা শুধু ভারতে নয়, এই পরিসংখ্যান পৃথিবীব্যাপী। জীবনকালে, ভারতে প্রতি ২৮ জনের মধ্যে ১ জনের স্তনের ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা। এর মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৪ জনের জীবনহানির সম্ভাবনা। সাধারণত অনেক দেরিতে ধরা পড়ে, শতকরা ৬০ ভাগের স্টেজ ৩ এবং ৪ অবস্থায় ধরা পড়ে ক্যানসার।
শেলি – ওরে বাবা, এত?

-আরও আছে। আনুমানিক প্রতি ১৩ মিনিটে ১ জন মহিলা স্তন ক্যানসারে মারা যান। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ হলে জীবিত থাকার সম্ভাবনা ৯৩ শতাংশ। আনুমানিক প্রতি ৪ মিনিটে ১ জন মহিলা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন।
এই পরিসংখ্যান শোনার পর যা হয়, স্বাভাবিকভাবেই শেলি জানতে চাইল, ‘স্তন ক্যানসার কী কী কারণে হতে পারে?’
-আগে ক্যানসার ব্যাপারটা কী, সেটা জানতে হবে। একটা শিশু ছোট থেকে বড় হয় কোশ বিভাজনের মাধ্যমে। আমাদের শরীরের প্রায় প্রতিটি কোশের একটা নির্দিষ্ট আয়ু রয়েছে। চামড়ার কোশের আয়ু ১২০ দিন, রক্তকণিকার ১৮০ দিন। অর্থাৎ, সুস্থ শরীরের জন্য কোশ বিভাজন প্রয়োজন। সাধারণত, একটা কোশ বিভাজনের পর প্রাপ্তবয়স্ক না হলে, আর বিভাজিত হয় না। যদি কোনও কারণে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বিভাজিত হয়, অর্থাৎ এঁচোড়ে পাকা হয়ে যায়, তখন সে প্রাপ্তবয়স্কের কাজ করতে পারে না, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে। এটাই ক্যানসার।
যাদের তাড়াতাড়ি, অর্থাৎ কম বয়সে মাসিক ঋতুস্রাব শুরু হয়, আর যাদের দেরিতে ঋতুবন্ধ হয়, তাদের সম্ভাবনা বেশি। এছাড়াও, অত্যধিক ওজন, মদ্যপান এবং শরীরচর্চা না করাও স্তন ক্যানসারের অন্যতম কারণ।
শেলি – সেটা তো বুঝলাম, কিন্তু স্তন ক্যানসারের কারণ কী?
-সঠিকভাবে নির্দিষ্ট কারণ বলা যায় না। তবে কিছু সমাপতন দেখা গেছে।
শেলি – যেমন?
-যেমন, যাঁরা শিশুকে স্তন্যপান করান না, দেরিতে সন্তানধারণ করেন, অথবা নিঃসন্তান থাকেন, তাঁদের এই ক্যানসারের আশঙ্কা বেশি।
শেলি – মাসিক ঋতুস্রাবের সঙ্গে কি এর কোনও সম্বন্ধ আছে?

-হ্যাঁ, তা-ও কিছুটা আছে বটে। যাদের তাড়াতাড়ি, অর্থাৎ কম বয়সে মাসিক ঋতুস্রাব শুরু হয়, আর যাদের দেরিতে ঋতুবন্ধ হয়, তাদের সম্ভাবনা বেশি। এছাড়াও, অত্যধিক ওজন, মদ্যপান এবং শরীরচর্চা না করাও স্তন ক্যানসারের অন্যতম কারণ।
শেলি – আচ্ছা, গর্ভনিরোধক বড়ি খাওয়ার সঙ্গে এর কি কোনও সম্বন্ধ আছে?
-কিছুটা আশঙ্কা থাকে, তবে আজকাল কম ডোজের ইস্ট্রোজেন বা শুধুমাত্র প্রোজেস্টেরন বড়ি পাওয়া যায়। এগুলোতে স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা প্রায় নেই। মেনোপজের পর বেশিদিন হরমোন রিপ্লেসমেন্ট নিলেও ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
শেলি – আর, রক্তের সম্পর্কে কারওর যদি স্তন ক্যানসার থাকে, তাহলে রিস্ক আছে? মানে, আমি জানতে চাইছি জিনের কোনও প্রভাব আছে?
-অবশ্যই আছে। স্তন ক্যানসারের প্রধান জিন হল BRCA1/BRCA2। এই দুই জিনের মিউটেশনই ক্যানসারের অন্যতম কারণ।
ভাল হয় যদি নিয়মিত ডাক্তারকে দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়। ২০ থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি ৩ বছরে এক বার, আর ৪০-৭০ বছর বয়সের মধ্যে, প্রতি বছর একবার করে চেকআপ করাও। সন্দেহ হলে ম্যামোগ্রাফি করিয়ে নিতে হবে।
শেলি – প্রাথমিক অবস্থায় কীভাবে বুঝব স্তন ক্যানসার হয়েছে কি না? কোনও উপায় আছে?
-অবশ্যই আছে। নিজের পরীক্ষা নিজে করা। তাতেই রোগটা আগেভাগে ধরা পড়ে।
শেলি – সেটা করা যায়? কিভাবে করবো?
-মাসিক ঋতুস্রাব শেষ হলে, তার ২-৩ দিন পর বন্ধ ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়াবে। লক্ষ করবে, বুকে কোনও ব্যথাহীন পিণ্ড চোখে পড়ছে কি না। হাত তুলে দেখবে, বগলে কোনও পিণ্ড আছে কি না। এছাড়াও, স্তনের ত্বকের, গঠনের, রঙের কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কি না সেটাও দেখতে হবে। কোথাও টোল খেয়েছে কি না, তাও একবার দেখে নেবে। এগুলো দেখা গেলে, স্তনবৃন্তটা দেখতে হবে। তার আকারের কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কি না, স্তনবৃন্ত ভেতরে ঢুকে গিয়েছে কি না, বা সেখান থেকে কোনও রস নির্গত হচ্ছে কি না, তাও দেখে নিতে হবে। এরপর, একটা হাত ওপরে তুলে, অন্য হাতের আঙুলের চেটোর অগ্রভাগ দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে স্তন এবং বগল। আঙুল বৃত্তাকারে, ওপর-নিচ, কোনাকুনি ঘুরিয়ে দেখতে হবে কোনও পিণ্ডের মতো কিছু আছে কি না।

শেলি – এসব ছাড়া আর কি কিছু করণীয় আছে, যা থেকে বোঝা যেতে পারে?
-ভাল হয় যদি নিয়মিত ডাক্তারকে দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়। ২০ থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি ৩ বছরে এক বার, আর ৪০-৭০ বছর বয়সের মধ্যে, প্রতি বছর একবার করে চেকআপ করাও। সন্দেহ হলে ম্যামোগ্রাফি করিয়ে নিতে হবে।
শেলি – প্রাথমিক পর্যায়ে যদি স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে, তাহলে সেরে ওঠার সম্ভাবনা কত?
-ক্যানসার হলে সুস্থ থাকার সম্ভাবনা, সাধারণত রোগনির্ণয়ের পর আরও ৫ বছর। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সেটা ৯০ শতাংশের ওপর।
শেলি – শুনেছি, কেউ কেউ স্তন ক্যানসারের ভয়ে অপারেশন করে দুটো স্তনই বাদ দেন। এটা কি ঠিক?
অ্যাঞ্জেলিনা জোলি পরীক্ষা করে জানতে পারেন, ওঁর জিন মিউটেশন আছে, যাতে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৮৭ ভাগ। এটা জেনে তিনি ২০১৩ সালে দুটো স্তনই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাদ দেন।
-ঠিকই শুনেছ। হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি পরীক্ষা করে জানতে পারেন, ওঁর জিন মিউটেশন আছে, যাতে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৮৭ ভাগ। এটা জেনে তিনি ২০১৩ সালে দুটো স্তনই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাদ দেন। এ ছাড়াও, মার্কিন অভিনেত্রী ক্রিস্টিনা অ্যাপলগেটের স্তনপিণ্ড অপারেশন করার পর পরীক্ষায় জানা যায়, ওঁরও জিন মিউটেশন ছিল। যার ফলে দুটো স্তনই বাদ যায়, ২০০৮ সালে। ক্যানসারের সম্ভাবনা বেশি থাকায় (৩৭.৩৭ শতাংশ) মার্কিন অভিনেত্রী লিসা অলিভিয়া মুন তাঁর দুটো স্তনই ২০২৪ সালে বাদ দেন।
শেলি – আর একটা কথা, স্তন ক্যানসার কি ছেলেদের হতে পারে?
-পারে, তবে খুবুই কম। সব স্তন ক্যানসারের ১ শতাংশ মতো।
শেলি – এ দেখছি, বেঁচে থাকা বড় বালাই।

-ঠিকই তো। সে আর বলতে! সবই তো সেই জন্যে…
-‘আর সেই জন্যেই তো আমার আসা।’ বলে দু’হাতে দুটো নারকোল নিয়ে আলোচনার আসরে প্রবেশ অমরনাথদার। ঢুকেই প্রশ্ন, ‘তা কী নিয়ে তোমাদের আলোচনা হচ্ছিল?’
সব শুনে বললেন, ‘আমার জানা ছিল, মহিলাদের সব থেকে বেশি ক্যানসার হয় জরায়ুর মুখে।’
-সেটা বহু বছর আগের কথা। তখন বালিকাবিবাহ ছিল, বালিকাদের সন্তান হত, আর উপযুক্ত ভ্যাকসিন ছিল না। ওসব এখন অতীত।
-কিন্তু এবার আপনাকে আমার প্রশ্ন, ‘আপনি জানলেন কি করে যে বাড়িতে গলদার আগমন ঘটেছে?’
অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে, পাল ও চন্দ্র রাজবংশের সময়, রান্নার এই কৌশল বাংলায় প্রবেশ করে। আজকে যেটাকে আমরা মালাইকারি বলি, সেটা বৈদেশিক রেসিপির সঙ্গে দেশি স্বাদের মিশ্রণ। একটু পড়াশোনা করো। শুধু খেলেই হবে?
-তাই নাকি? কী জানি! ভায়রাভাই চারটে নারকোল দিয়ে গেল, ভাবলাম তোমাকে দিয়ে আসি। তবে টেলিপ্যাথির জোর আমার যে একটু-আধটু আছে, সেটা তো জানোই। এটা অবশ্য ভালই হল। আজকের মেনুতে অ্যাডেড আইটেম গলদা মালাইকারি। কিন্তু বলতে পারো, দুধের মালাই দিয়ে না রেঁধেও কেন একে ‘মালাইকারি’ বলে?
-ও সব তো আপনার ডিপার্টমেন্ট।
-তাহলে শোনো, এ রান্নাটা মালয় দেশ অর্থাৎ মালয়শিয়া থেকে এসেছে তাই এই নামকরণ। সেই সময়, ব্যবসা করতে আসা নাবিকদের হাত ধরে এই রেসিপি বাংলায় প্রবেশ করে। তখন নাম ছিল মালয় কারি উদং। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে, পাল ও চন্দ্র রাজবংশের সময়, রান্নার এই কৌশল বাংলায় প্রবেশ করে। আজকে যেটাকে আমরা মালাইকারি বলি, সেটা বৈদেশিক রেসিপির সঙ্গে দেশি স্বাদের মিশ্রণ। একটু পড়াশোনা করো। শুধু খেলেই হবে?
শেলিকে সরিয়ে এরপর নিজেই নারকোল কুরোতে বসে গেলেন অমরনাথদা।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
21 Responses
A clear detailed discussion of breast cancer by you Dada
Thank you Debasish.
Thank you Debasish.
The article has been written easy to understand. ..I have learned a lot after reading this article..
Thank you Jayanti.
Darun laglo. Vison formative and helpful. Thanks for sharing 👍
Thank you Debasish.
Very informative and pleasant reading with cooking recipies.
এক কথায় অসাধারন।সচেতনতার চমৎকার উপায়।অনেক অনেক শুভকামনা রইলো।
Thank you Abhay.
Great article loved it.
খুব ভাল লাগল অশোকদা। সহজ গদ্যে শক্ত প্রসঙ্গ প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে।
Thank you Bhaskar.
ধন্যবাদ ভাস্কর।
Ashokda thank you apnar ei shabolil bhabe ekta mahabipod jonok oshuk sambonde amadrr alert korbar jonyo.
ধন্যবাদ অজন্তা। ভালো থেকো।
ধন্যবাদ।
Important information given in an interesting way. 👍 looking forward for more discussion on other such topics.
Thank you Susmita.
অসংখ্য ধন্যবাদ তথ্যাটার জন্যে ❤️
খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অত্যন্ত সহজ ভাবে বিবৃত! ভাল লাগল 🙏🏽