(Hiroshima Day)
‘নিউইয়ার্কে শ্রুত টোকিও বেতারে প্রচারিত এক সংবাদে বলা হইয়াছে যে, এ্যাটম বোমা বর্ষণের ফলে হিরোসিমার সমস্ত মানুষ, জন্তু অগ্নিদগ্ধ হইয়া মারা গিয়াছে। মৃত ও আহত ব্যক্তিদিগকে সমাহিত করা যাইতেছে না; সমগ্র শহরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হইয়াছে। টোকিও বেতারে আরও বলা হইয়াছে— যাহারা বাহিরে ছিল তাহারা আগুনে পুড়িয়া মরিয়াছে, আর যাহারা ঘরের মধ্যে ছিল তাহারা প্রচণ্ড ঝাপ্টা ও উত্তাপে প্রাণ হারাইয়াছে।’
তৎকালীন বাংলার অন্যতম অগ্রগণ্য পত্রিকা ‘যুগান্তর’-এ ছাপা হয়েছিল এই খবর, ৯ আগস্ট ১৯৪৫ তারিখে। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ জানতেন না, ওই দিনই বিধ্বস্ত হবে অন্য এক শহর— নাগাসাকি। তাঁদের সংবাদসূত্র তখনও ৬ আগস্ট হিরোশিমার বীভৎসতা থেকে এগোতে পারেনি। অন্যদিকে, প্রায় কাছাকাছি সময়েই সমর সেন লিখছেন কবিতা— ‘নিপ্পনের রক্তসন্ধ্যা, মেঘে মেঘে ঘোর শব্দ!’ আশ্চর্যের বিষয়, কবিতাটির শিরোনামও ‘৯ আগস্ট ১৯৪৫’।
আরও পড়ুন: বাংলা কবিতা, সাম্প্রতিক আধুনিকতা ও বিষ্ণু দে-র ‘ভ্রম’
এই সূত্র ধরেই চিন্তা যায় বাংলা কবিতার দিকে। সমসাময়িক বাংলা কবিতায় নির্দিষ্টভাবে হিরোশিমা-নাগাসাকি কতটা স্থান দখল করেছিল, তা গভীর অনুসন্ধানসাপেক্ষ। কিন্তু প্রায় দু-দশক পরের একটি অনূদিত বই আলোচনায় উঠে আসতে পারে। হিরোশিমা নিয়ে লেখা অনেকগুলি জাপানি কবিতার অনুবাদ করেছিলেন জ্যোতির্ময় চট্টোপাধ্যায়। ‘হিরোসিমা কবিতা সংকলন’— এই ছিল বইটির নাম। প্রকাশকাল ১৯৬৮, প্রকাশক মনীষা গ্রন্থালয়।
১৯৫৫ সালে, মিয়াও ওহারার সম্পাদনায় প্রথম বেরোয় মূল বইটি— ‘হিরোসিমা-নো-উতা’। বইটি ছিল দ্বিভাষিক, অর্থাৎ একদিকে ইংরাজি অনুবাদ, অন্যদিকে মূল জাপানি কবিতা। সম্পাদক লিখেছিলেন (জ্যোতির্ময় চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদে)— ‘হিরোসিমার দুর্দশায় যাঁরা ভুক্তভোগী তাঁদের কাব্যিক অভিব্যক্তি এই কবিতাগুলির সংবেদনায়।’ উদ্দেশ্যও ছিল স্পষ্ট— ‘পৃথিবীর বর্তমান অবস্থায় শান্তির বাণী বহন করার দায়িত্ব অসামান্য। সাহিত্য যাঁদের মাধ্যম, তাঁদের সেই মাধ্যমেই বলতে হবে পারমাণবিক বোমার অর্থহীনতা ও হিরোসিমার দুঃখের কথা, যাতে আমরা আশা করি এ বই শুধু সেই সাহায্যটুকুই করবে তাই নয়, শান্তির জন্য অনুপ্রাণিতও করবে।’

এই চিন্তাসূত্রের সঙ্গে বইটির বঙ্গীয় সংস্করণ প্রকাশের কাল (১৯৬৮) মিলিয়ে দেখলে ভিন্ন ব্যঞ্জনা পাই আমরা। হিরোশিমার সঙ্গে অবশ্যই তুলনীয় নয়, কিন্তু সে সময়ের উত্তাল বঙ্গীয় পটভূমিতে এ বই কি শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছিল? মনে হয় না। বরং হারিয়ে গিয়েছিল কালের গর্ভে।
কলকাতার জাপানি কনসাল অফিসে জাপানি ভাষার ডিপ্লোমা ক্লাসের ছাত্র থাকাকালীন, অধ্যাপক তাকাশি সাদাই জ্যোতির্ময় চট্টোপাধ্যায়কে দেন ‘হিরোসিমা-নো-উতা’ বইটি। ইতোমধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় বইটির অনুবাদ প্রকাশিত হলেও, বাংলায় প্রথম অনুবাদের (সম্ভবত শেষও) কৃতিত্ব জ্যোতির্ময়েরই। বারোজন জাপানি কবির একুশটি কবিতা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই সংকলন। এই বারোজনের অনেকেই ছিলেন হিরোশিমার বাসিন্দা, পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
কবি তাকোনারি সিমিজু আহ্বান জানান জনগণকেই— ‘সারা পৃথিবীর লোক তোমরা/ হিরোসিমার লোকেদের বলো তাদের/ ব্যথার গান গাইতে,/ তোমাদের হৃদয় তাতে দ্রবীভূত হোক।’
সানকিচি তোগে-র কবিতা ‘৬ আগস্ট’ তুলে ধরে সেদিনের বীভৎসতার বয়ান। কবি নিজে সেদিন সকালে হিরোশিমার থেকে খানিক দূরে ছিলেন। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাবে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং তাঁর মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মৃত্যুর পিছনেও সেই কারণই অনুভূত হয়। কবি লিখছেন— ‘ভুলব কি করে সেই স্তব্ধতা/ তিন লক্ষ লোকের এই নগরে?/ এই স্তব্ধতায়/ সন্তান হারানো/ শাদাটে দৃষ্টিতে মা খোঁজে/ সন্তান,/ দাগ কেটে বসে মনে, আত্মায়।’ পড়ার পর, অপরিসীম শূন্যতা জাগে পাঠকের মনে।
কবি সাদাকো কুরিহারা ছিলেন সেদিনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তাঁর কবিতা ‘ওরা কী করে সহ্য করবে’ এক ঘটনাদৃশ্য ধারণ করেছে। চারদিকে ভাঙাচোরা বাড়ি, ধ্বংসস্তূপ, আর তার মধ্যেই এক আসন্নপ্রসবার চিৎকার— এক্ষুনি সন্তান হবে তাঁর। এগিয়ে এলেন এক ধাত্রী, যিনি নিজেও গুরুতর জখম। সন্তানের জন্ম দিলেন তিনি ঠিকই, কিন্তু তারপরেই মৃত্যু হল সেই ধাত্রীর। ‘জীবন দিয়ে ফুটিয়ে তোলা/ এক নব জীবনের উন্মেষ’— লিখছেন কুরিহারা।

কবি তাকোনারি সিমিজু আহ্বান জানান জনগণকেই— ‘সারা পৃথিবীর লোক তোমরা/ হিরোসিমার লোকেদের বলো তাদের/ ব্যথার গান গাইতে,/ তোমাদের হৃদয় তাতে দ্রবীভূত হোক।’
কিসিরো তানাকা-র কবিতা ‘সূর্যাস্ত’-য় ভেসে ওঠে বিধ্বস্ত হিরোশিমার ব্যথাতুর দৃশ্য— ‘শিশুরা নেই আর!/ প্রাথমিক স্কুলের ছাত্রাবাস/ অস্তগামী সোনালি রৌদ্রে,/ এখানে ওখানে খুলির হাড়/ হায় আমার অণু-বিধ্বস্ত হিরোসিমা।’
বইটির মুখবন্ধে কবি বিষ্ণু দে-র বক্তব্যটি উল্লেখযোগ্য। তিনি জাপানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক, ইংরাজি ভাষায় অনুবাদের সূত্রে জাপানি কবিতার সঙ্গে পরিচয় এমনকি সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গানুবাদে জাপানি কবিতার পাঠ অভিজ্ঞতারও উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে জ্যোতির্ময়ের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভোলেননি।
লক্ষ্যণীয়, বিস্ফোরণের পরে হাড়ের প্রসঙ্গ বা রূপক ফিরে ফিরে এসেছে একাধিক কবিতায়। মুনোটোসি ফুকুগাওয়া হাড়কে হাজির করেছেন ধ্বংসের বিপরীতে প্রতিরোধ হিসেবে— সব খাক হয়ে গেলেও, ‘একখানি সুদর্শন হাড়’ মাথা উঁচিয়ে রয়েছে। এ কি শুধুই প্রতিস্পর্ধা, নাকি ভয়ংকরের ইঙ্গিতও? সোশুকে সিমা লেখেন— ‘এই অশান্ত হাড়ের টুকরোগুলো/ বিবর্ণ প্যারাসুটের কাপড়ে/ জড়িয়ে রাখো।’ ভবিষ্যত যেন বিস্মৃত না হয় এই মর্মন্তুদ দিনগুলি।
এমন আরও অনেক কবিতার উল্লেখ করা যায়। ধ্বংসের ঘটনা যেমন উঠে এসেছে, তেমনই অন্ধকারাচ্ছন্ন দিন থেকে উত্তীর্ণ হয়ে আশাবাদের চর্চাও করেছেন তাঁরা। ‘চিরকাল থাকুক সবুজ ও তাজা/ হিরোসিমার মোহানায়।’— আমিকি হারা-র কবিতায় সেই আশাবাদেরই প্রতিফলন। সম্পাদক মিয়াও ওহারা-র কথা উদ্ধৃত করি আবার, যা এই সংকলনের উদ্দেশ্যও— ‘হিরোসিমার পুনরাবৃত্তি না হয়ে পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি বজায় থাকে।’

অনুবাদে মূল কবিতার সুর ও যন্ত্রণা ধারণ করা কঠিন। ভাষার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় আবহ, বদলায় বর্ণনার তীব্রতাও। তারপরও, জ্যোতির্ময় স্বয়ং জাপানি ভাষায় দক্ষ হওয়ায়, আমাদের অনুমান, মূল ভাবটিকে যথাসম্ভব ধরতে পেরেছিলেন তিনি। বইটির মুখবন্ধে কবি বিষ্ণু দে-র বক্তব্যটি উল্লেখযোগ্য। তিনি জাপানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক, ইংরাজি ভাষায় অনুবাদের সূত্রে জাপানি কবিতার সঙ্গে পরিচয় এমনকি সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গানুবাদে জাপানি কবিতার পাঠ অভিজ্ঞতারও উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে জ্যোতির্ময়ের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভোলেননি, কেননা তাঁর মতে এই সংকলনটি ‘হিরোসিমার ভয়াবহ ও করুণ প্রসঙ্গে জাপানী কবিদের মানবিকতার নিদর্শন।’ সমাপ্তিতে বিষ্ণু দে লেখেন— ‘কবিতাচর্চা এবং শান্তিসংগ্রাম এ ক্ষেত্রে স্পষ্টতই অবিভাজ্য, যেমন অবিভাজ্য হিরোসিমা-ধ্বংসের নৃশংসতার প্রতিবাদী বার্ষিকী-পালন এবং ভিয়েতনামে বর্তমান সাম্রাজ্যলোভীর সুদীর্ঘ বর্বরতা।’
আজকের পাঠকও কি হিরোশিমা বা ভিয়েতনামের অতীতের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলা যুদ্ধ ও অস্থিরতার মিল পান না? শান্তি চান না? যেমনটি লিখেছিলেন সাদাকো কুরিহারা— ‘এই নরকের ঈশ্বরকে বলে যাব/ আমি হিরোসিমার সাক্ষী/ চরম দুর্দশার কথা বলে যাব/ আমার জীবন দিয়ে;/ “আর যুদ্ধ নয়।”’
বর্বরতার সূত্রেই তেইশ বছর আগের হিরোশিমার সঙ্গে তাঁর সমকালের ভিয়েতনামকে জুড়ে দিয়েছিলেন বিষ্ণু। সেকালের বাঙালি নিজের দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা নিয়েও ব্যথিত হত, প্রতিবাদও জানাত সাধ্যমতো। আজকের পাঠকও কি হিরোশিমা বা ভিয়েতনামের অতীতের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলা যুদ্ধ ও অস্থিরতার মিল পান না? শান্তি চান না? যেমনটি লিখেছিলেন সাদাকো কুরিহারা— ‘এই নরকের ঈশ্বরকে বলে যাব/ আমি হিরোসিমার সাক্ষী/ চরম দুর্দশার কথা বলে যাব/ আমার জীবন দিয়ে;/ “আর যুদ্ধ নয়।”’
যদি আমাদের মধ্যে থেকেও সেই শান্তিকামনা ধ্বনিত না হয়, ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না— এটুকু নিশ্চিত।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত