(Bishnu Dey)
কবি যদি প্রকাশক হয়ে যান, তবে কি তাঁর নিজস্ব কবিতাচর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়? এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এমন অনেক প্রকাশককে দেখেছি, যাঁরা প্রথম যৌবনে কবিতাচর্চাতেই মনোনিবেশ করেছিলেন; পরবর্তীতে প্রকাশনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিজের লেখা। কিন্তু কবি যদি সম্পাদক হন? তাতে কবিতাচর্চার ক্ষতি তো হয়ই না, বরং কবির অন্তর্দৃষ্টির ফলে সম্পাদনাকর্ম ‘বিশেষ’ হয়ে ওঠে। এরও যে ব্যতিক্রম নেই, তা নয়। তবে বাংলাভাষার অধিকাংশ উল্লেখযোগ্য কবিই সম্পাদক হিসেবে যে ছাপ রেখে গেছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সম্পদ।
আরও পড়ুন: ত্রিদিব মিত্র: কবিতা, সম্পাদনা বনাম অভিমান
বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২), বাংলা ভাষার প্রধান কবিদের মধ্যে অন্যতম। বর্তমান সময়ে তাঁর কবিতা কেন তত পড়া হয় না, কেন তাঁর কবিতাভাষা ও দর্শনের থেকে উত্তরপ্রজন্ম দূরত্ব বাড়িয়ে নিল— সে তর্ক ভিন্ন। কিন্তু দীর্ঘকাল তাঁর মান্যতার কোনও কমতি ছিল না। অবশ্য কবি বিষ্ণু দে নন, সম্পাদক বিষ্ণু দে-ই আজকের আলোচ্য। ১৯৬৩ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশ পায় ‘একালের কবিতা’। আধুনিক পর্বের প্রায় নব্বই জন কবির দেড় শতাধিক কবিতা নিয়ে এই সংকলন।
বাংলা কবিতার আধুনিকতাকে সম্পাদক চিহ্নিত করেছেন এভাবে— ‘রবীন্দ্রনাথের চোদ্দ-পনেরো বছর বয়স থেকেই সচরাচর বাংলা কাব্যে আধুনিক পর্ব নির্দিষ্ট।’ ফলে, বিষ্ণু দে সম্পাদিত সংকলনটি শুরু হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ থেকেই, যাঁর জন্মসাল ১৮৬১। তরুণতম কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, আনন্দ বাগচী, কল্যাণকুমার দাশগুপ্ত, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়— প্রত্যেকেই ১৯৩৩-এর জাতক।

১৯৬২-তে সম্পাদনার কাজ করার সময় বিষ্ণু দে-র লক্ষ্য ছিল, সর্বনিম্ন তিরিশ বছর বয়সী কবিতেই থামবেন, অর্থাৎ আলোক সরকার, কবিতা সিংহ, যুগান্তর চক্রবর্তী, তরুণ সান্যাল, শঙ্খ ঘোষ প্রমুখে (প্রত্যেকেরই জন্ম ১৯৩২-এ)। অথচ, ব্যতিক্রম ঘটিয়ে পাঁচজন ঊনত্রিশ বছর বয়সীকেও যে রাখলেন, তার একমাত্র কারণ এঁদের কবিতা অস্বীকার করতে না পারা। একই সঙ্গে, কবিতা ও সংকলনের স্বার্থে পূর্বনির্ধারিত সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তেও যে বদল ঘটানো যেতে পারে, সেই শিক্ষাও দিলেন।
সংকলনটিতে সর্বাধিক কবিতা রয়েছে রবীন্দ্রনাথের— ১৫টি। তারপরেই জীবনানন্দ— ১৪টি। জীবনানন্দের ক্ষেত্রে বিষ্ণু দে-র বক্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য— ‘জীবনানন্দ প্রেরণাবশত কবিতাটি লিখেই বিরত হতেন না, অনেক সময়েই তার মানসধৃত মৌলরূপের কাঠামোতে— হিউমের অর্থে— লৌহতন্ত্রীর মতো তাকে মেলাতে মেলাতে ক্লান্তিহীনভাবে স্বকীয়তায়, আধুনিকতায়, পুনর্লিখিত করতেন।’ এই পুনর্লিখনই যে বহু ক্ষেত্রে একটি কবিতাকে উৎকর্ষের দিকে পৌঁছে দেয়— নেপথ্যে তা-ই চিহ্নিত করতে চেয়েছেন বিষ্ণু।
আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য, ধর্ম ও প্রত্যাশাগুলিকে ষাটের দশকের গোড়ায় যথাযথভাবে চিহ্নিত করেছিলেন বিষ্ণু। প্রায় পঁয়ষট্টি বছর পরেও, উপরের কথাগুলির প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি এতটুকু।
আলোচ্য সংকলনে সম্পাদক লিখিত ভূমিকাটি যে কোনও কবিতাপ্রয়াসী ও সম্পাদকের অবশ্যপাঠ্য হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। আধুনিকতার চিন্তা, সম্পাদনার চরিত্র ও সম্পাদকের চিন্তাসমন্বিত এই টেক্সট এক উজ্জ্বল সংযোজন।
বিষ্ণু বলেন— ‘আধুনিক কাব্যে কল্পপ্রতিমা রূপকীকৃত না হয়ে প্রতীকোৎসারী হয়ে ওঠে, অতিভাষী সুবোধ্যতার মসৃণ ময়দান ছেড়ে কবিতা বিহার করতে ওঠে মিতবাক, হয়তো উচ্চাবচ, এমনকি হয়তো আপাত-দুর্বোধ্যতার পাথুরে জমিতে। একই কারণে কাব্যের ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাসের প্রাবল্যের চেয়ে ব্যক্তি-সমাজের নিহিত ভাষাবিনিময়ের আততিই হচ্ছে আধুনিক কাব্যের মৌলিক লক্ষণ। এবং যেমন এর নির্মাণের লৌহভিত্তি আত্মসচেতনতার অভ্যাসে গ্রথিত, তেমনি এর প্রত্যাশা হচ্ছে যে পাঠকও রাখবেন সচেতনতায় অভ্যস্ত সদাজাগ্রত মন।’ এই অংশটি ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য, ধর্ম ও প্রত্যাশাগুলিকে ষাটের দশকের গোড়ায় যথাযথভাবে চিহ্নিত করেছিলেন বিষ্ণু। প্রায় পঁয়ষট্টি বছর পরেও, উপরের কথাগুলির প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি এতটুকু।

এর পাশাপাশিই, আধুনিকতা নিয়ে আলোচনায় বিষ্ণু দে এনেছেন ফরাসি দার্শনিক জাক মারিত্যাঁ-র প্রসঙ্গ। প্রয়োজনীয় বোধে, ওই অংশটিও উদ্ধৃত করা যাক— ‘…মারিত্যাঁই তাই তাঁর এক সাম্প্রতিক গ্রন্থে ‘ডিস্টর্শন’ বা অভিজ্ঞ বিকৃতির কথা বলেছেন, আধুনিক শিল্পীরা অনেক সময়ে উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে বিকৃতি আনেন বিকৃতিরই শখে, সমগ্র চৈতন্যের প্রেরণায় বা গরজে নয়। মারিত্যাঁর এ বিচারে কোনো কোনো পাঠকের সম্ভবত গত দশ বারো বছরের বাংলা কবিতার আধুনিকতা খানিকটা পথভ্রষ্ট মনে হতে পারে, মনে হতে পারে বিকৃতির প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে চেষ্টাকৃত, শুধুমাত্র চমক লাগাবার জন্য, বা বয়ঃসন্ধিশোভন নিজেকে নিয়ে ভিত্তিহীন নাটকীয়তার লোভে। অবশ্য বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েরা যে আত্মসচেতন অস্বস্তি বোধ করে, সেটা মোটেই তাদের পক্ষে ঝুটা নয়, কিন্তু তার কারণ ব্যক্তিগতভাবে সাময়িক অর্থাৎ আপতিক, মননের দিক থেকে গভীর নয়, মৌলিক নয়। অবশ্য ঐ অস্বস্তিই অনেক সময়ে সততাকে পরের পর্বে উত্তীর্ণ করে দেয়।’ বর্তমান সময়েও কবিতার প্রতি এই অভিযোগ ঘোচেনি। যে কারণে গণ্ডির বাইরে তার যাতায়াত সীমিত।
কিন্তু এই উদ্ধৃতির সঙ্গে একমত হওয়ারও উপায় নেই বিশেষ। বিষ্ণু দে তাঁর পাঠ-অভিজ্ঞতা ও সমসময়ের অবস্থান থেকে মারিত্যাঁর প্রসঙ্গ টেনে যে প্রবণতাটি চিহ্নিত করেছিলেন, তা কালক্রমে তামাদি প্রতিপন্ন হয়েছে। যে সময়ের আধুনিক কবিতাকে (মূলত পঞ্চাশের দশকের) তিনি চিহ্নিত করছেন, তা চমকসর্বস্ব, অগভীর ও মৌলিকতাহীন— এ-কথা মেনে নিতে গেলে, এই সংকলনের তরুণতম কবি যাঁরা, তাঁদেরই বাতিল করতে হয়। কিন্তু আরও কয়েক দশক পেরিয়ে আমরা জানি, দুর্বোধ্যতার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠলেও, বাংলা কবিতার আধুনিক সুরটিকে বহন করে গিয়েছেন তাঁরা, এবং তাকে মূলস্রোতে প্রতিষ্ঠাও করেছেন।
ক্ষুব্ধ সুনীল এই প্রসঙ্গে মলয় রায়চৌধুরীকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন (১৯৬৪)— ‘বিষ্ণু দের যেমন আর সময় নেই, চিরজীবন বোকাই রয়ে গেলেন।’
আবার, একই সঙ্গে, একজন তরুণ কবিতাপ্রয়াসীর প্রাথমিক অপক্ক চর্চার দিনগুলিও ভুললে চলে না। সেদিকেই কি ইঙ্গিত করতে চেয়েছিলেন বিষ্ণু দে? অথচ তিনি এই সংকলনে তরুণতম যাঁদের নিয়েছেন, সকলেই প্রায়-তিরিশ এবং ততদিনে কবি হিসেবে প্রায় মান্য। ‘বয়ঃসন্ধি’জনিত অভিযোগ খাটে না সেখানে। সামগ্রিকভাবে, বিষ্ণুরই পূর্বোদ্ধৃত একটি বক্তব্য তুলে ধরা যাক আবার— ‘যেমন এর নির্মাণের লৌহভিত্তি আত্মসচেতনতার অভ্যাসে গ্রথিত, তেমনি এর প্রত্যাশা হচ্ছে যে পাঠকও রাখবেন সচেতনতায় অভ্যস্ত সদাজাগ্রত মন।’ পাঠকের প্রস্তুতি ও সদাজাগ্রত মনের প্রত্যাশী বর্তমানের তরুণ কবিরাও।

পরিশেষে, একটি বিতর্ক দিয়ে সমাপ্তির দিকে এগোনো যাক। বাকি কবিদের কথা জানা নেই, কিন্তু ১৯৬৩-৬৪ সালেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অভিযোগ তুলেছিলেন— বিষ্ণু দে তাঁর সংকলিত কবিতা ‘সহজ’-এর অঙ্গচ্ছেদ করেছেন। আমরাও মিলিয়ে দেখেছি, ঠিকই, শেষ সাতটি লাইন সংকলনে অনুপস্থিত। একজন সম্পাদকের কি কোনও কবিতা খণ্ডিত করার এক্তিয়ার থাকে? বিশেষ করে কবির অনুমতি ব্যতিরেকে? সম্পাদনার এই মৌলিক শর্তটিকে যেভাবে লঙ্ঘন করেছেন বিষ্ণু, সম্ভবত এক পাতায় ধরানোর উদ্দেশ্যেই, তা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়।
ক্ষুব্ধ সুনীল এই প্রসঙ্গে মলয় রায়চৌধুরীকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন (১৯৬৪)— ‘বিষ্ণু দের যেমন আর সময় নেই, চিরজীবন বোকাই রয়ে গেলেন।’ আবার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে আরেকটি চিঠিতে একই প্রসঙ্গে সুনীল জানান— ‘বিষ্ণু দে-কে আমি অশিক্ষিত বলেছি আগেও, কৃত্তিবাসের পাতায় ব্যক্তিগত রাগে, কারণ উনি ওঁর সংকলনে আমার কবিতা আদ্দেক কেটে বাদ দিয়েছেন বলে।’ অগ্রজ কবি ও সম্পাদকের প্রতি তরুণ এক কবির এই ক্ষোভ ভিত্তিহীন নয়। তেমনই তরুণ কবিদের প্রতি বিষ্ণু দে-র মনোভাবের ধারণাও কি পাওয়া যেতে পারে এই পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে?
তরুণতর কবিদের নিয়ে ছুঁৎমার্গ নয়, বরং তাঁদের আপন করে নেওয়াই অগ্রজ কবির ধর্ম হওয়া উচিত। সুনীল সে বিষয়ে কার্পণ্য করেননি। বিষ্ণু দে-ও যে আড়ষ্ট ছিলেন না, প্রমাণ দেয় তাঁর সম্পাদিত সংকলনে তিরিশের কাছাকাছি বয়সের কবিদের অন্তর্ভুক্তি।
প্রায় কাছাকাছি শিরোনামে, ‘আজকের কবিতা’ শীর্ষক একটি সংকলন পরবর্তীকালে সম্পাদনা করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সুব্রত রুদ্র। ভূমিকায় সুনীল লেখেন— ‘আমাদের সময়কার ও এবং পূর্ববর্তীগণ অনেকেই এখনো রীতিমতন সমসাময়িক কবি নিশ্চিত, কিন্তু এখানে আমি গ্রহণ করেছি আমাদের চেয়ে তরুণতর কবিদেরই রচনা।’ বিষ্ণু দে সম্পাদিত ‘একালের কবিতা’-র সঙ্গে চরিত্রগত ও ভাবনাগত ফারাক স্পষ্ট। এই সূত্রে, ‘একালের’ ও ‘আজকের’ শব্দ দুটির অর্থগত ফারাক নিয়েও আলোচনা হতে পারে। দ্বিতীয় সংকলনটির উল্লেখ করা হল শুধুমাত্র বিষ্ণু-সমালোচক সুনীলের সম্পাদনাকালীন মনোভাব ও অবস্থান বোঝার জন্যেই।

মোদ্দা কথা, তরুণতর কবিদের নিয়ে ছুঁৎমার্গ নয়, বরং তাঁদের আপন করে নেওয়াই অগ্রজ কবির ধর্ম হওয়া উচিত। সুনীল সে বিষয়ে কার্পণ্য করেননি। বিষ্ণু দে-ও যে আড়ষ্ট ছিলেন না, প্রমাণ দেয় তাঁর সম্পাদিত সংকলনে তিরিশের কাছাকাছি বয়সের কবিদের অন্তর্ভুক্তি। এই ধারা ক্রমবহমান। বাংলা কবিতা অগ্রজদের স্নেহ, শাসন ও প্রশ্রয় থেকে বঞ্চিত হয়নি কোনওদিনই। আর এই বৈশিষ্ট্যই উত্তরাধিকার পরম্পরায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জুড়ে দেয় আজকের তরুণতম কবিটিকেও। এই যাত্রা অব্যাহত থাকুক…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত