(Palta Rathakar)
বাঙালির কাছে রথযাত্রা শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক আরাধনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার সাংস্কৃতিক ব্যাপ্তির বিশালতার মধ্যে বঙ্গ জীবনের নিজস্বতা প্রস্ফুটিত হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। রথযাত্রা মানেই রথের মেলা। আর সেই মেলার মধ্যে ঝুড়ি ভরা মাটির পুতুল, কাঠের তৈরি খেলনা গাড়ি, তালপাতার সেপাই। আবার রাতের দিকে মেলার মধ্যে পুতুল নাচের আসর। মেলার মধ্যে থাকা জিলিপি, গজার স্বাদ বাঙালিকে আজও স্মৃতিমেদুর করে তোলে। আবার বনেদি রথের গায়ে অনিন্দ্যসুন্দর রথচিত্র আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে।
পটুয়া পাড়ায় বিশালাকায় কাঠামোর দুর্গা প্রতিমার পাশে ছোট ছাঁচের জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলভদ্র আধ্যাত্মিক স্নিগ্ধতা প্রকাশ করে চলে। রথযাত্রার বিকেলে শিশুদের ভিড়ে এগিয়ে চলে ছোট রথ। একটা সময় ছিল যখন শিশুদের জন্য তৈরি হওয়া ছোট কাঠের তৈরি রথগুলির নান্দনিক আকর্ষণ শৈশবকে আকৃষ্ট করে চলত। কিন্তু কালের অমোঘ নিয়মে সেই নান্দনিক উৎকর্ষতা ক্রমে তলানিতে এসে ঠেকেছে। সেলোফেন বা রংবেরং-এর কাগজে মোড়া রথগুলির মধ্যে সেই আগের শিল্পসুষমামণ্ডিত আকর্ষণ আর দেখা যায় না। অনেকটা যেন ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ নিয়মে আজকালকার শিশুদের রথ তৈরি হচ্ছে।

বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এই ধরনের রথের রমরমা সর্বাধিক বেশি। তবে এমন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়েও শিশুদের জন্য ছোট কাঠের রথের সেই নান্দনিকতা আজও বজায় রেখেছেন উত্তর চব্বিশ পরগনার পলতার শিল্পী শিবনাথ আচার্য। তার তৈরি রথের মধ্যে নব্বইয়ের দশকের ফেলে আসা নান্দনিক শিল্পসত্তা বিরাজ করছে আজও। শহর এবং শহরতলির রথের বাজারে তাঁর তৈরি রথ বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে।
প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাঠের রথ বানান শিবনাথ আচার্য। স্থানীয়রা তাঁকে মোহন আচার্য নামেই চেনে। বাবা অনিল কুমার আচার্যর কাছে কাঠের চাকা লাগানো খেলনা এবং কাঠের তৈরি রথের কাজ শেখেন তিনি। বর্তমানে বয়স সত্তর বছর। মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে পিতার কাছে কাজ শেখা শুরু। আজও রথ তৈরির সেই ধারা বহন করে চলেছেন। তাঁর তৈরি রথ উত্তর চব্বিশ পরগনা, হুগলি, বর্ধমান, কলকাতা জেলায় যায়। এ বছর এক হাজারেরও বেশি রথ তৈরি করেছেন।

শিল্পীর কথায়, একটা সময় ছিল যখন হুগলি জেলার শ্রীরামপুরের ঐতিহ্যবাহী মাহেশের রথের মেলায় আলো করে থাকত তাঁর তৈরি রথ। এ ছাড়াও নৈহাটির কাঁঠালপাড়া ও ব্যারাকপুরের ষষ্ঠীতলার রথের মেলায় নিজের তৈরি রথ নিয়ে বসতেন। বর্তমানে বয়সের ভারে সেসব করা আর হয়ে ওঠে না। ফলে নিজের তৈরি রথ পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে দিয়ে দেন। তারাই বিভিন্ন মেলায় এই সকল রথ বিক্রি করে থাকেন।
রথ রং করতে শিল্পী ব্যবহার করে থাকেন লাল, হলুদ, গোলাপি ও সবুজ। রথের মেঝে বা পাটাতনের রং কখনও হলুদ তো, কখনও গোলাপী, তো কখনও লাল। দোতলা রথ হলে নিচের মেঝের রং গোলাপি আর উপরের তলের রং হলুদ।
রথ তৈরি করতে তিনি প্লাইউড এবং কদম কাঠের তৈরি সফট উড ব্যবহার করেন। বাজার থেকে গুঁড়ো রং কিনে এনে সেগুলো ফেভিকলে মিশিয়ে রং করা হয়। রথ তৈরি করতে তাঁকে যোগ্য সঙ্গ দেন সহধর্মিণী ও পুত্র। বৈশাখ মাসের শেষের দিকে রথ তৈরির কাজ শুরু হয়। রথযাত্রার দিন পনেরো আগে থেকেই পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে যায় তাঁর তৈরি রথ। মূলত তিন রকম উচ্চতার রথ তৈরি করে থাকেন।

সবচাইতে বড় অর্থাৎ তিনতলা রথটির উচ্চতা হচ্ছে ৪০ ইঞ্চি। সর্বনিম্ন একতলা রথের উচ্চতা ১৬ ইঞ্চি। আর দ্বিতল রথের উচ্চতা ৩৩ ইঞ্চি। যেহেতু শিশুদের মধ্যে দোতলা বা দ্বিতল রথের আকর্ষণ সবচাইতে বেশি, তাই এই রথের উচ্চতার বিন্যাসও শিল্পী তিন রকমের করেছেন। প্রথমটির উচ্চতা ৩৩ ইঞ্চির হলেও, উপর দুইটির উচ্চতা ৩০ এবং ২৫ ইঞ্চি। প্রস্থেও রকম ফের রয়েছে।
রথ রং করতে শিল্পী ব্যবহার করে থাকেন লাল, হলুদ, গোলাপি ও সবুজ। রথের মেঝে বা পাটাতনের রং কখনও হলুদ তো, কখনও গোলাপী, তো কখনও লাল। দোতলা রথ হলে নিচের মেঝের রং গোলাপি আর উপরের তলের রং হলুদ। রথের মেঝের মধ্যে থাকে সুন্দর ফুলের নকশা। রথের খিলান বা প্রবেশদ্বারের উপরিভাগে কাঠচেরাই করে তৈরি হয় নান্দনিক মাধুর্য। সেখানে ফুলের নকশাও থাকে। ঠিক একইভাবে খিলানের দুয়ার কাঠচেরাই করে নকশার কাজ পূর্ণ করা হয়। রথের ধ্বজা বা পতাকা দণ্ডটিকে ধরে থাকে চারটি কাঠের স্তম্ভ। সেগুলোও আলাদা করে বিভিন্ন রঙে রাঙিয়ে তোলা হয়।

রথের উপরিভাগে অর্থাৎ যেখানে পতাকা দণ্ডটি থাকে, সেটির মেঝে মধ্যবর্তী স্থানটি হলুদ রঙের। তার চারিদিকে লাল রঙের বর্ডার টানা হয়। প্রতিটি কোণে ফুলের নকশা। রথের গায়ে কোনও প্রকারের সেলোফেন বা রঙিন কাগজ ব্যবহার করা হয় না। রথের পতাকা দণ্ডের রং সবুজ। পতাকার রং লাল। রথ তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রতিটি তল বা তলা আলাদা করে তৈরি করা হয়। চারটি কাঠের স্তম্ভের উপরিভাগ এবং নিম্নবর্তী ভাগকে আগে যুক্ত করা হয়। এরপর সেগুলির ওপর ছাউনি দেওয়া হয়। তারপর সেগুলিকে দ্বিতল, ত্রিতল অনুসারে যুক্ত করা হয়।
পলতার স্টেশন রোডের সুভাষ কর্নারের কাছে নিজের ছোট্ট ঘরের মধ্যে এভাবেই শৈশবকে আজও আনন্দ দিয়ে চলেছেন শিল্পী শিবনাথ আচার্য। আক্ষেপের সুরে তিনি বলে ওঠেন, এ বছরই শেষ আগামী বছর থেকে আর বানাবেন না।
রথের কাঠের পতাকাটি এমন ভাবে তৈরি করা হয় যেন মনে হয় সেটি উড়ছে। বর্তমানে বাজারচলতি যে সকল রথ আমরা কলকাতা শহর এবং শহরতলিতে দেখতে পাই, সেখানে পতাকার দিকটি পিসবোর্ড দিয়ে তৈরি করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সেগুলি কাঠ দিয়ে নির্মিত। রথের প্রতিটি তলার স্তম্ভের রং আলাদা হয়। ধরা যাক দোতলা কোনও রথের নিচের তলার রং লাল হলে দ্বিতলের রং হলুদ। রংয়ের প্রয়োগের মধ্যে স্নিগ্ধতা বিচ্ছুরিত হতে থাকে।
পলতার স্টেশন রোডের সুভাষ কর্নারের কাছে নিজের ছোট্ট ঘরের মধ্যে এভাবেই শৈশবকে আজও আনন্দ দিয়ে চলেছেন শিল্পী শিবনাথ আচার্য। আক্ষেপের সুরে তিনি বলে ওঠেন, এ বছরই শেষ আগামী বছর থেকে আর বানাবেন না। কারণ বয়সজনিত কারণে এই বিপুল পরিমাণের কর্মযজ্ঞ একার কাঁধে আর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন না। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

একটা সময় ছিল যখন তার তৈরি বিভিন্ন ধরনের কাঠের খেলনা আলো করে থাকত বাঙালির শৈশবকে। কয়েক বছর আগে কাঠের তৈরি খেলনা তৈরি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। আধুনিকতার দৌড়ে ও বিশ্বায়নের বাজারে ব্যাটারিচালিত খেলনার দাপটে তাঁর কাঠের তৈরি গাড়ির চাহিদা কমে গেছে। তাই এই সিদ্ধান্ত।
তাঁর তৈরি কাঠের এরোপ্লেন দেখে প্রশংসা করেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়। স্মৃতিমেদুর হয়ে শিল্পী বলে চলেন, ১৯৭২ সালে সল্টলেকে এক সরকারি অনুষ্ঠানে প্রশংসিত হয় বাচ্চাদের জন্য তাঁর তৈরি সেই খেলনা।
আজও শিশুমন তাঁর তৈরি ছোট্ট নন্দীঘোষকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রথের বিকেলে। আর সেখানেই শৈশবের কোমলতা আধ্যাত্মিক ভালবাসা পরম্পরাগত উচ্ছ্বাস এবং বাঙালির শিল্প সাধনার সার্থকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
বর্তমানে রথের মধ্যে দিয়েই নিজের শিল্পসত্তাকে তিনি বাঁচিয়ে রেখেছেন। প্রায় অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই বিপুল কর্মযজ্ঞ এগিয়ে নিয়ে গিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয়তা বা প্রচারের থেকে অনেক দূরেই বসত করেন শিল্পী।
আজও শিশুমন তাঁর তৈরি ছোট্ট নন্দীঘোষকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রথের বিকেলে। আর সেখানেই শৈশবের কোমলতা আধ্যাত্মিক ভালবাসা পরম্পরাগত উচ্ছ্বাস এবং বাঙালির শিল্প সাধনার সার্থকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সেই মহা ঐক্যের মধ্যে আজও নীরবে বিরাজ করে চলেন শিবনাথ আচার্যের মতো শিল্পীরা।
(চিত্র সৌজন্য: লেখক)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত