Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

পুতুল নগরী কলকাতা

শুভঙ্কর দাস

মে ২০, ২০২৬

kolkata clay doll
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Kolkata Clay Doll)

তিলোত্তমা কলকাতা। ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতা। রাজনীতি, আন্দোলন, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, সম্প্রীতি, ভালবাসার শহর কলকাতা। ঐতিহ্যের প্রাসাদ নগরীর বুকে আজও বেঁচে রয়েছে কলকাতার মাটির পুতুলের সত্তা। পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জনপদের মতোই কলকাতার মাটির পুতুলের নিজস্ব ধারা ও শৈলী লক্ষ করা যায়। বিশ্বায়নের আধুনিকতার মাঝে আজও বেঁচে রয়েছে কলকাতার পুতুল শিল্প, যা বাঙালির কাছে অহংকার ও গর্বের বিষয়। 

শহর কলকাতার বুকে মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য সগর্বে ধরে রেখেছে কুমোরটুলি। পশ্চিমবঙ্গের সীমানা ছাড়িয়ে অবশিষ্ট ভারত এবং গোটা বিশ্বে কুমোরটুলির প্রতিমার খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা বাঙালির কাছে গর্বের বিষয়। কিন্তু কুমোরটুলিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাঠামোর প্রতিমা তৈরি হয়ে থাকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আজও ছোট, কাঁচা মাটির, ছাঁচের রঙিন মাটির পুতুলের ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সম্পর্কে দুই জা মৃৎশিল্পী অনিমা পাল এবং মায়া পাল।


আরও পড়ুন: নবদ্বীপে চড়কের মেলার মাটির পুতুল


প্রতি বছর ঝুলন ও জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে মাটির পুতুল তৈরি করেন বর্ষীয়ান দুই শিল্পী। তাঁদের পুতুল নির্মাণ ও শৈলীর মধ্যে বাঙালির ফেলে আসা অতীতের নিদর্শন আজও লক্ষ করা যায়। তাঁদের পুতুলগুলোর মধ্যে আজও অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার ছোঁয়া পাওয়া যায়। সবজি বিক্রেতা, মুদি দোকানের মালিক, বাজারে মাছ বিক্রেতা, মাথায় সবজি নিয়ে যাওয়া কৃষক, অনাবৃত শরীরে মাছ ধরার অপেক্ষায় বড়শি হাতে বসে থাকা পুতুলগুলির মধ্যে ফেলে আসা অতীতকে লক্ষ করা যায়। বোতামহীন ফতুয়া, হাঁটুর উপরে পরা ধুতি ও টেরিকাটা চুল ছাপোষা বাঙালি জীবনের কথা বলে চলে। বেলুনওয়ালা, আইসক্রিম বিক্রেতা পুতুলগুলির মধ্যেও সেই একই ধারা লক্ষ করা যায়।

মৃৎশিল্পী অনিমা পালের কথায়, প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ধরে কুমোরটুলির বুকে দাঁড়িয়ে মাটির পুতুল তৈরির এই ধারাকে তাঁরা টিকিয়ে রেখেছেন। মূলত, ঝুলনযাত্রা এবং জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে পুতুলগুলি তৈরি করা হয়। তাঁদের তুলির টানের নমনীয়তা সমাজজীবনের চরিত্রগুলোকে পুতুলসুলভ করে শিশুমনকে আন্দোলিত করে দিয়ে যায়। সমাজের প্রতিটা শ্রেণির কথা পুতুল নির্মাণে তাঁরা তুলে ধরেছেন। তার মধ্যে যে-রকম রয়েছে লাটাই হাতে ঘুড়ি ওড়ানো কিশোর, বেলুনওয়ালা, ঘুগনি বিক্রেতা, ফ্রক পরা কিশোরী; তেমন রয়েছে পুলিশ ও মিলিটারি, ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান খেলোয়াড় পুতুল। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, আইসক্রিম বিক্রেতা পুতুলের বাক্সের উপর অনিন্দ্যসুন্দর আলপনা শৈলীর নকশা করা রয়েছে। মাথায় সবজি নিয়ে যাওয়া কৃষক পুতুলের শরীরে কায়িক পরিশ্রমের ছাপ সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পীরা। 

Kolkata Clay Doll
সাপুড়ে পুতুল

কুমোরটুলির পরে কলকাতার যে পটুয়াপাড়ার ঐতিহ্য বাংলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক আঙিনাকে মোহিত করে রেখেছে, তা হল কালীঘাট পটুয়াপাড়া। একটা সময় পটচিত্রের জন্য বিখ্যাত ছিল এই পটুয়াপাড়া। কালীঘাট পটুয়াপাড়ার তুলির টানের নিজস্বতা তাকে বাংলার অন্যান্য পটুয়াপাড়ার থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে। এখানকার দুই মৃৎশিল্পী শেফালি ও ডলি চিত্রকর কালীঘাটের মাটির পুতুল তৈরির ধারাকে আজও অব্যাহত রেখেছেন। তাঁদের সরু তুলি টানের মধ্যে আজও বেঁচে রয়েছে কালীঘাট পটচিত্রের ছোঁয়া। কাঁচা মাটির রঙিন ছাঁচের পুতুলের মধ্যে তাঁরা নিজেদের দীর্ঘ সময়ের অধ্যাবসায়কে তুলির টানে সার্থক করে রেখেছেন।

মূলত ঝুলন এবং জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে শিল্পীরা পুতুল তৈরি করে থাকেন। কুমোরটুলির মতো কালীঘাটের মাটির পুতুলের মধ্যে কোনও প্রকার অভ্রের মিশ্রণ দেওয়া হয় না। ফলে পুতুলের লোকজ স্বতন্ত্র সত্তা মনকে আন্দোলিত করে তোলে। তুলির টানের মধ্যে দিয়ে কালীঘাটের পুতুলগুলির মধ্যে নাটকীয় অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলা হয়। সরল অথচ অনুভূতিসুলভ। মাটির পুতুল হলেও এই শিল্প সুষমা যেন বাঙ্ময় হয়ে ওঠে শেফালি ও ডলি চিত্রকরের হাতে।

Kolkata Clay Doll
যোদ্ধা পুতুল

কালীঘাটের পুতুলের দুটি ধারা রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে সমাজজীবন। যেখানে হুঁকো হাতে বলিষ্ঠ শরীরের অধিকারী বাবু বসে রয়েছে। ঘোমটা দেওয়া রমণী উনুন জ্বালিয়ে খুন্তি নেড়ে চপ ভাজছে। আবার, শ্রমজীবী সত্তার দেখাও কালীঘাট পুতুলের মধ্যে পাওয়া যায়। সেখানে যেমন রয়েছে মাথায় ফসল, ফল ও মাছ নিয়ে এগিয়ে চলা রমণী; তেমনই রয়েছে কাঁধে বাঁক নিয়ে মহাদেবের উদ্দেশ্যে জল ঢালতে যাওয়া নববধূ। 

বেলুনওয়ালা ও আইসক্রিম বিক্রেতা পুতুলগুলির অঙ্গসজ্জার মধ্যে শিল্পীরা আলপনা শৈলীকে তুলির টানে তুলে ধরেছেন। ছাঁচের শৈলীর মূর্তির কৃত্রিমতার উর্ধ্বে উঠে পুতুল নির্মাণের সহজাত ভাব প্রস্ফুটিত হয়েছে। অন্য দিকে, শ্রীকৃষ্ণ লীলা-মাহাত্ম্যের প্রসঙ্গ পুতুল নির্মাণের মধ্যে আলোকিত হয়ে রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের মাখন চুরি করে খাওয়ার দৃশ্য, শিশু কৃষ্ণকে মাথায় করে বাসুদেবের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত তৃণাবর্ত অসুরের কৃষ্ণকে ছুঁড়ে মারার দৃশ্যও। এই পুতুলগুলির মধ্যে প্রবল নাটকীয় অভিব্যক্তি তুলে ধরেছেন শিল্পীরা। কংসের কারাগারের কারারক্ষীদেরও পুতুলরূপে এঁকেছেন শিল্পীরা।

Kolkata Clay Doll
কৃষ্ণকে ছুঁড়ে ফেলার দৃশ্য

সব মিলিয়ে প্রায় পঁচিশ থেকে তিরিশ রকমের পুতুল তৈরি করে থাকেন এঁরা। এর মধ্যে লোকজ গ্রাম্য মাটির বাড়ি, বাঘ ও সিংহ রয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, বছরের বাকি সময়টা দুই শিল্পী প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন। ডলি চিত্রকর প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে মা দুর্গার চক্ষুদানও করে থাকেন। কালীঘাট পটুয়াপাড়ার অন্যতম বর্ষীয়ান মৃৎশিল্পী হলেন মীরা চিত্রকর। তার তৈরি পুতুলের মধ্যে সেই একই শৈলী ও ধারা লক্ষ করা যায়। কিন্তু বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে আগের মতো পুতুল তৈরি করা কমিয়ে দিয়েছেন।  

কলকাতার উল্টোডাঙার বিধাননগর স্টেশনের ব্যস্ততার পাশে বিরাজ করে দক্ষিণদাঁড়ি কুমোরপাড়া। পূর্ববঙ্গের মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে বিহার থেকে আগত মৃৎশিল্পীদের সহাবস্থান এই কুমোর পাড়ায়। মাটির বিভিন্ন শৈলীর প্রদীপ, ছোট ছাঁচের বিভিন্ন প্রতিমার মাঝে আজও ঝুলন ও জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উচ্চতার ও শৈলীর মাটির পুতুল তৈরি করে থাকেন মৃৎশিল্পী বিজয় পাল ও তার সহধর্মিণী অঞ্জনা পাল।

Kolkata Clay Doll
কালীয় দমন

তাঁদের পুতুল তৈরির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ঘুমন্ত পুলিশ। পাহারা দিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে পুলিশ। শরীর জোড়া সবুজ উর্দি। পায়ে কালো বুট। মুখ ভরা দাড়ি। কপালে লাল তিলক। আর মাথায় পাগড়ি। মাটিতে ভর দেওয়া লাঠির উপর দুই হাত দেওয়া রয়েছে। তার উপর মুখ রেখে ঝিমোচ্ছে পুলিশ। দুই ছাঁচের কাঁচা মাটির এই পুতুলের মধ্যে অভ্রের ব্যবহার লক্ষণীয়। এছাড়াও মৃৎশিল্পী ট্রাফিক পুলিশ, মিলিটারিসহ শৈশব ও সমাজজীবনের বিভিন্ন দিক নিজের পুতুল নির্মাণের মধ্যে তুলে ধরেন।

শিল্পীর কথায়, প্রায় পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ রকমের মাটির পুতুল তৈরি করা হয়। তার মধ্যে যেরকম রয়েছে ব্যান্ড পার্টি পুতুল; তেমনই রয়েছে বর-বউ, পাখি, ময়ূর, হাতিসহ জীববৈচিত্র্যের নানা উপাদান। এছাড়াও, শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা-মাহাত্ম্যের দেখাও এখানে পাওয়া যায়। শিল্পীর তৈরি প্রতিটা পুতুলই কাঁচা মাটির। বাড়ির মধ্যে থেকেই পাইকারি দরে পুতুলগুলি বিক্রি হয়ে থাকে। পুতুল তৈরির ক্ষেত্রে বিজয় পালের শাশুড়ি বর্ষীয়ান মৃৎশিল্পী বীণাপাণি পালও যোগ্য সঙ্গত দেন।

Kolkata Clay Doll
হুঁকা হাতে এক পুরুষ পুতুল, কলসি কাঁখে বউ

দক্ষিণদাঁড়ির অপর দুই বর্ষীয়ান মৃৎশিল্পী হলেন মধুসূদন পাল ও তাঁর সহধর্মিণী রীণা পাল। পোস্ট বাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে খাকি উর্দি পরা পোস্টম্যান পুতুল, টিউবওয়েল থেকে জল বের করে আনছে রমণী পুতুল, ছাতা সারাই পুতুলসহ সমাজ জীবনের বিভিন্ন দিক শিল্পী নিজের পুতুলে তুলে ধরেছেন। এছাড়াও, তাঁর তৈরি পুতুলের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের লীলা-মাহাত্ম্য প্রস্ফুটিত হয়েছে। সেখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কংসের কারাগার। গোটা কারাগারটি অসামান্য দক্ষতায় তৈরি করেছেন শিল্পী। 

শিল্পীর কথায়, কাঁচা মাটির এবং পোড়ামাটির দুই ধরনেরই মাটির পুতুল তৈরি করে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর পুতুল রপ্তানি হয়। এই পাড়ায় বিহার থেকে আসা মৃৎশিল্পীরা দীপাবলির সময় এক ধরনের পুতুল বানায়। সেই পুতুলের হাতে প্রদীপ থাকে। বিহার থেকে আসা মৃৎশিল্পীরা এই পুতুলকে ‘ডায়েন গুরিয়া’ নামে অভিহিত করে থাকে। 

Kolkata Clay Doll
ঝালমুড়ি বিক্রেতা পুতুল

কলকাতার মানিকতলার ইস্ট ক্যানাল রোডে অবস্থিত খালপাড় পটুয়াপাড়া। এখানকার কাঠামোর পাশাপাশি ছাঁচের প্রতিমার জনপ্রিয়তাও গোটা বাংলায় রয়েছে। আজ থেকে প্রায় চোদ্দ বছর আগেও এখানকার প্রতিটা মৃৎশিল্পী মাটির পুতুল তৈরি করতেন। কিন্তু কালের নিয়মে সেই ধারা হারিয়ে গিয়েছে। মানিকতলার চালতাবাগানের ঝুলনবাড়িতে ঝুলনযাত্রা উপলক্ষ্যে যখন বিশাল মেলা বসত, তখন সেই মেলা আলো করে থাকত এখানকার শিল্পীদের তৈরি করা মাটির পুতুল।

কিন্তু আজ সেই দিন আর নেই। তারকনাথ শিল্পালয়ের মৃৎশিল্পী কেষ্ট পাল দীপাবলি উপলক্ষ্যে কিছু সংখ্যক মাটির পুতুল তৈরি করে থাকে। তার মধ্যে সন্তান কোলে রমণী, কলসি কাঁখে বউ পুতুল, পুলিশ পুতুল, সবজি মাথায় দিয়ে যাওয়া শ্রমজীবী রমণী পুতুল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুলিশ পুতুলের মধ্যে ব্রিটিশ ভারতীয় পুলিশের ছাপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গোটা উর্দিটাই সাদা। মাথার পাগড়িটাও সাদা। থ্রি নট থ্রি বন্দুক। ব্রিটিশ জমানার কলকাতার কথা মনে করিয়ে দেয় এই পুতুল। অন্যদিকে এই পাড়ার গৌরাঙ্গ পাল ও তার পরিবারবর্গ জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে শ্রীকৃষ্ণের লীলা-মাহাত্ম্য তৈরি করে থাকেন।

Kolkata Clay Doll
ব্রিটিশ ও ভারতীয়দের পুতুল

ভারতের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে কলকাতায়। পুতুল নির্মাণের ক্ষেত্রেও তার ছাপ আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি। কলকাতার জোড়াবাগান থানার কাছে দত্তপাড়া লেনের চুনা গলিতে সিন্টু ও বিকাশ পাল প্রায় তিন প্রজন্ম ধরে মাটির পুতুল তৈরি করে চলেছেন। মা সুমিত্রা পালের কাছে পুতুল তৈরির হাতেখড়ি হয় দুই ভাইয়ের। তারপর থেকে তাঁদের তৈরি পুতুল কলকাতার সীমানা ছাড়িয়ে গোটা ভারতবর্ষে রপ্তানি হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের দশহরার সময় তাঁদের পুতুলের চাহিদা সর্বাগ্রে থাকে। তিন পুরুষ আগে প্রতিবেশী রাজ্য বিহার থেকে কলকাতায় বসতি স্থাপন করে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা। তারপর থেকেই কলকাতাকেই আপন করে নিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের কথায়, কলকাতা গোটা ভারতের মধ্যে মৃৎশিল্পের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। এখানকার মৃৎশিল্পের গরিমা গোটা ভারতে সমাদৃত। তাঁদের তৈরি পুতুলের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের লীলা-মাহাত্ম্য যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনই রয়েছে নগর জীবনের সামাজিক চালচিত্র। তাঁদের পুতুল নির্মাণের মধ্যে উত্তর ভারতীয় শৈলীর ছোঁয়া প্রত্যক্ষ করা যায়। মাটির পাটাতনের উপর একাধিক পুতুল চরিত্রকে বসিয়ে শিল্পীরা যেন কাহিনিকে বলতে চায়। যেমন ঝালমুড়ি বিক্রেতার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে ক্রেতা। গ্যাসবেলুন বিক্রেতার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে মা ও সন্তান।

Kolkata Clay Doll
বসুদেব ও সদ্যজাত কৃষ্ণ

পুতুল নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁরা একটি পূর্ণাঙ্গ রূপকে সাধারণের মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে দিতে চায়। তাঁদের পুতুল নির্মাণের মধ্যে কাবুলিওয়ালা যে রকম রয়েছে, তেমনই রয়েছে পিওন পুতুল। তাঁদের তৈরি হাওড়া ব্রিজ পুতুলের মধ্যে ফেলে আসা অতীতকে আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি। ব্রিজের মধ্যে ট্রাম ছুটে চলেছে, সঙ্গে হাতে টানা রিকশা। এক স্মৃতিমেদুর শহরের গল্প বলে যায় তাঁদের তৈরি মাটির পুতুল।

বড়বাজারের কাছে নতুন বাজারের কচুরি গলিতে মাটির পুতুল তৈরি করে থাকে নন্দুলাল প্রজাপতি এবং তার ভাই বিন্দুলাল প্রজাপতি। তাঁদের তৈরি মোটকা-মুটকি পুতুল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৮০ বছর ধরে শহর কলকাতার বুকে মাটির প্রতিমা ও পুতুল বানিয়ে চলেছেন। তাঁদের পূর্বপুরুষ এসেছিলেন বেনারস থেকে। সেই থেকে এখনও পর্যন্ত শিল্প সাধনায় রত তাঁরা। দীপাবলির সময় তাঁদের তৈরি বেনারস শৈলীর লক্ষ্মী-গণেশের চাহিদা অনেক বেশি থাকে।

জন্মাষ্টমীর সময় বড়বাজারের সত্যনারায়ণ পার্ক এসি মার্কেটে সামনে বিশাল পুতুলের মেলা বসে। গোটা ভারত থেকে বিভিন্ন ধরনের পুতুলের সমাহার এখানে দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে বেনারসের কাঠের পুতুলের দেখাও মেলে।

পাইকপাড়ার টালা থানার কাছে অবস্থিত একটি পালপাড়ায় মাটির পুতুল বানান সুরাজ পাল। তাঁর তৈরি হাতি, হরিণ, ময়ূর, পাখি পুতুল শিশুমনকে আকৃষ্ট করবে। ঘাগরা চলি পরা কাঁখে ও মাথায় কলসি নিয়ে যাওয়া বউ পুতুলের মধ্যে উত্তর ভারতীয় ছাপ সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। প্রতি বছর চড়ক উপলক্ষ্যে বিডন স্ট্রিটের ছাতুবাবু-লাটুবাবু বাজারে চড়কের মেলায় তাঁর পুতুলের দেখা মেলে।

প্রসঙ্গত, জন্মাষ্টমীর সময় বড়বাজারের সত্যনারায়ণ পার্ক এসি মার্কেটে সামনে বিশাল পুতুলের মেলা বসে। গোটা ভারত থেকে বিভিন্ন ধরনের পুতুলের সমাহার এখানে দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে বেনারসের কাঠের পুতুলের দেখাও মেলে। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির কাছে বাসতলার স্যার হরিরাম গোয়েঙ্কা স্ট্রিটেও জন্মাষ্টমীর সময় মাটির পুতুলের বিশাল পশরা নিয়ে বসা মেলার দেখা পাওয়া যায়। দীপাবলির প্রাক্কালে শিয়ালদার ‘ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া’ ক্রসিং-এ বিভিন্ন ধরনের পুতুলের সমাহার দেখতে পাওয়া যায়। এই সকল মেলার পুতুল শৈলীর মধ্যে উত্তর ভারতীয় শৈলীর ছাপ সুস্পষ্ট। 

বাংলার পুতুল নির্মাণের ক্ষেত্রে কলকাতা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গঠিত হয়ে চলে কলকাতার মাটির পুতুলের ধারা, যা প্রতিটি বাঙালির কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। 

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্য়মে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of শুভঙ্কর দাস

শুভঙ্কর দাস

পেশায় সাংবাদিক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপনে স্নাতকোত্তর। বাংলার পুতুল শিল্পকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। লেখকের, ‘আমাদের কথা’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। সেখানে বাংলার বিভিন্ন জেলার মাটির পুতুল নিয়ে ১৫০ টি পর্বে ভিডিও করেছেন তিনি। শিল্পীদের ঘরে গিয়ে শুনেছেন তাঁদের মনের কথা। এছাড়া শিবের মুখোশ, চালচিত্র, লক্ষ্মী সরা, মনসা ঘট, মনসা চালি, ছলনের ঘোড়া নিয়েও তিনি পর্ব তৈরি করেছেন তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে। লেখক নিজে পুতুল সংগ্রাহক। এই লেখায় ব্যবহৃত ছবিগুলো লেখকের নিজের সংগ্রহে থাকা পুতুলের।
Picture of শুভঙ্কর দাস

শুভঙ্কর দাস

পেশায় সাংবাদিক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপনে স্নাতকোত্তর। বাংলার পুতুল শিল্পকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। লেখকের, ‘আমাদের কথা’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। সেখানে বাংলার বিভিন্ন জেলার মাটির পুতুল নিয়ে ১৫০ টি পর্বে ভিডিও করেছেন তিনি। শিল্পীদের ঘরে গিয়ে শুনেছেন তাঁদের মনের কথা। এছাড়া শিবের মুখোশ, চালচিত্র, লক্ষ্মী সরা, মনসা ঘট, মনসা চালি, ছলনের ঘোড়া নিয়েও তিনি পর্ব তৈরি করেছেন তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে। লেখক নিজে পুতুল সংগ্রাহক। এই লেখায় ব্যবহৃত ছবিগুলো লেখকের নিজের সংগ্রহে থাকা পুতুলের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

হেমেন্দ্রকুমার রায়
বিতস্তা ঘোষাল
নীলাঞ্জন দরিপা

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
ইন্দ্রনাথ রুদ্র
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com