(West Bengal Trade)
প্রাচীন বঙ্গে রাঢ়ভূমি ছিল বাণিজ্য ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বর্তমানে বীরভূম, বর্ধমান, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা নিয়ে রাঢ়ভূমির গঠন। এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অজয়, দামোদর ও রূপনারায়ণ নদী বাণিজ্যপথ হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করত। প্রাচীন যুগে রাঢ়ভূমির সঙ্গে মগধ, তাম্রলিপ্ত ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। রাঢ়ভূমি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।
মঙ্গলকোটের বাণিজ্যের ইতিহাস সুদীর্ঘ। রাঢ়ভূমির মঙ্গলকোটে মৌর্য, কুষাণ, গুপ্ত, গুপ্ত পরবর্তী পাল ও সেন যুগে নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। নানা আকারের মুদ্রা, টেরাকোটার মূর্তি, সিলমোহর এখানে পাওয়া যায়। এখানে উঠে আসে বহু বীর রাজা ও সওদাগরদের কথা।
আরও পড়ুন: দীপাবলিতে পুতুল শ্রমজীবি মানুষের কথা বলে
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী লিখছেন,
বিক্রমকেশরী তাঁহার নগরী
আছে কত সদাগর –
কাব্যে রাজার কথা উঠে এলেও আজ আর জানার উপায় নেই। অনেকে মনে করেন, তিনি সদগোপ রাজা ছিলেন। আমরা ধরে নিতে পারি, সওদাগরদের সঙ্গে এই রাজার বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক বজায় ছিল। সওদাগররা ছিলেন শৈব। বর্ধমান আর হুগলি অঞ্চল জুড়ে এক সময় বণিকরা বাস করতেন।
বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে বাঙালি বণিক সওদাগরেরা একচেটিয়া ব্যবসা করতেন। রাঢ়ভূমি থেকে লোহার তৈজসপত্র, তামা, বস্ত্র, সুপারি, লবণ নদীপথ ধরে এই অঞ্চলের সঙ্গে বাইরের বাণিজ্য চলত।
নদীমাতৃক এই বাংলায় এককালে একাধিক নৌকাঘাট ও বন্দর গড়ে উঠেছিল। ব্যবসাবাণিজ্যের কারণে নৌযানের প্রয়োজন বাংলায় সবসময় ছিল। বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে বাঙালি বণিক সওদাগরেরা একচেটিয়া ব্যবসা করতেন। রাঢ়ভূমি থেকে লোহার তৈজসপত্র, তামা, বস্ত্র, সুপারি, লবণ নদীপথ ধরে এই অঞ্চলের সঙ্গে বাইরের বাণিজ্য চলত। লবণ ছিল বাণিজ্য সম্ভারে অন্যতম। নীহাররঞ্জন রায় বাঙালির ইতিহাসে উল্লেখ করেছেন, ভূমি-দানের সময় প্রাচীন লিপিগুলিতে সলবণ কথাটি বারবার ব্যবহার হয়েছে।

রাঢ়বঙ্গে মঙ্গলকোট, সতীপীঠ উজানিনগর, চম্পাইনগর, সপ্তগ্রাম থেকে নির্ধারিত হত বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস। বর্ধমানে অজয় নদ, কুনুর নদী, ভাগীরথী ধরে সদাগরী ডিঙা চলাচল করত। চাঁদ সদাগর, ধনপতি সদাগর, লখিন্দর, শ্রীমন্ত সদাগরেরা মধুকর ডিঙা, শঙ্খচুড়, চন্দ্রপাল, ছোটমুটি, দুর্গাবর, গুয়ারেখী, নাটশালা প্রভৃতি ডিঙা বেয়ে বাণিজ্য করতেন। নদীর তীর ধরে তাদের বসতি গড়ে উঠেছিল। সমৃদ্ধির চিহ্নগুলো এক এক করে ফুটে ওঠে।
প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে উত্তর রাঢ় অঞ্চলে সওদাগররা বাস করতেন। ‘একে একে বণিকের কত কব নাম/ সাতশত বেনে আইসে ধনপতি ধাম।’
উজানিতে ধনপতি সদাগরের গৃহে প্রায় সাতশো বণিক এসেছিলেন শোনা যায়। নদনদীর সঙ্গে বণিক সমাজ শত শত বৎসর ধরে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে করেছে বসবাস।
উজানিতে ধনপতি সদাগরের গৃহে প্রায় সাতশো বণিক এসেছিলেন শোনা যায়। নদনদীর সঙ্গে বণিক সমাজ শত শত বৎসর ধরে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে করেছে বসবাস।
মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্য বণিকদের নাম ও বাসস্থানের এক দিক নির্দেশ করে। চম্পকনগরীতে বাস চাঁদসদাগরের। রাঢ় অঞ্চল জুড়ে অজয় দামোদর দুই ধার ধরে সুবর্ণবণিক, তাম্বুলিবণিক, দত্ত উপাধিধারী গন্ধবণিকদের বাস। বহু গবেষক দাবি করেন, বণিকরা গৌড় দেশ না রাঢ় দেশ থেকে ছড়িয়ে পড়েছিলেন, সে নিয়ে বিতর্ক ছিল।
হোসেন শাহের আমলেও বাংলার বাণিজ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও উন্নত হয়েছিল। প্রচুর পরিমাণে সুতি ও রেশম বস্ত্র মধ্য প্রাচ্য ও ভারতের নানা জায়গায় রপ্তানি করা হত। রাঢ় বঙ্গের মঙ্গলকোটে পাওয়া যায় হোসেন শাহের একটি মসজিদ। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই মসজিদের কথা উল্লেখ করেছেন। হোসেন শাহের টাঁকশাল ছিল ফতেপুর। হোসেনশাহি মসজিদে খিলান, ভাঙা ইট, ফুল, লতা পাতার নকশা অত্যন্ত সুন্দর।

রাঢ় অঞ্চলের উজানিনগর নিয়ে আছে এক আশ্চর্য বিষয়। উজানিনগরের সওদাগরেরা যখন বাণিজ্যে যেতেন না, ওই সময় তাঁরা বিশাল ভ্রমরার দহে বাণিজ্যযাত্রার সমুদ্রগামী পোতগুলো ডুবিয়ে রাখতেন। ধনপতি ও শ্রীমন্ত দত্ত তাদের ডিঙাগুলো ভ্রমরার জলে ডুবিয়ে রাখতেন। অজয় আর কুনুর নদীর ঠিক সঙ্গমে এই ভ্রমরার দহ। ভ্রমরা হলেন দেবী দুর্গা। ভ্রমরের রূপ ধারণ করে তিনি অসুরকে নিধন করেছিলেন।
কবিকঙ্কন লিখেছিলেন, ‘প্রথমে ভ্রমরা জলে/শ্রীমন্ত নৌকায় চলে/পূজিয়া মঙ্গলচন্ডিকায়।’ ভ্রমরার দহ থেকে বণিকরা সিংহল যাত্রা করতেন (ছবি জয়পুরের টেরাকোটার নকশাটি মঙ্গল কাব্যে)।
ব্যবসা-বাণিজ্যে সমুদ্রের অদূরে রূপনারায়ণের তীরে এই বন্দরের শতকের পর শতক ধরে খ্যাতি ছিল। বলা হয়, প্রাচীনকালে সম্রাট অশোক সিংহলী কয়েকজন দূতকে বিদায় সংবর্ধনা জানাবার জন্য নিজে তাম্রলিপ্ত পর্যন্ত এসেছিলেন।
আরেক প্রসিদ্ধ তীর্থ, বারো ঘাট তেরো হাটে ইন্দ্রাণী জনপদ। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই জনপদে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন। সঙ্গী ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। ইন্দ্রেশ্বর মন্দিরের জন্যে এই জনপদে এক তীর্থ স্থান হয়। সেই মন্দির আজ গঙ্গার অতলে। কাছেই কন্টকনগর বা কাটোয়া। এখানেই ১৫১০ সালে কেশব ভারতীর কাছে চৈতন্য মহাপ্রভু সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। এখানে একদিকে শৈব ধর্ম, অন্যদিকে বৈষ্ণব প্রভাব। এই জনপদে নদীপথে পণ্য আনাগোনা চলত।
রাঢ় ভূমির তাম্রলিপ্ত বন্দরের কথা বারবার আলোচিত হবে। বাণিজ্যসমৃদ্ধির অন্যতম বন্দর। তমালিনী, বিষ্ণুগৃহ, তামলিকা, বেলাকুল, তামলিত্তি ইত্যাদি একাধিক নাম পাওয়া যায়। ব্যবসা-বাণিজ্যে সমুদ্রের অদূরে রূপনারায়ণের তীরে এই বন্দরের শতকের পর শতক ধরে খ্যাতি ছিল। বলা হয়, প্রাচীনকালে সম্রাট অশোক সিংহলী কয়েকজন দূতকে বিদায় সংবর্ধনা জানাবার জন্য নিজে তাম্রলিপ্ত পর্যন্ত এসেছিলেন। তাম্রলিপ্ত বা আজকের তমলুক ছিল শিক্ষাকেন্দ্র। ইৎসিঙ নিজে এখানে সংস্কৃত শিক্ষা করেছিলেন। ফাহিয়ান এখানে দুই বছর বৌদ্ধসূত্রের পাণ্ডুলিপি অধ্যয়ন করেন। বাণিজ্যের জন্য বণিকদের প্রধানত তাম্রলিপ্ত বন্দর পেরিয়ে সমুদ্রে যেতে হত। এখান থেকে সিংহল, চিন ও জাভাতে সওদাগরী জাহাজ যাত্রা করত। কুষাণ ও গুপ্ত যুগের সোনার রৌপ্য মুদ্রা, নানারকম অলঙ্কৃত মাটির পাত্র, বিভিন্ন প্রতীক, লিপিযুক্ত সিল, টেরাকোটা মূর্তি, নানারকম অলঙ্কৃত মাটির পাত্র ইত্যাদি খননকার্যের মাধ্যমে এখানে পাওয়া যায়।

রাঢ় বাংলার আরেকটি প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁও বন্দর। পাল ও সেন যুগে এই বন্দরের উত্থান হয়েছিল। তখন তাম্রলিপ্ত বন্দর ধীরে ধীরে প্রাধান্য হারাচ্ছে। চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মগ্রহণের প্রায় দু’শো বছর আগে জাফর খাঁ গাজী এই অঞ্চলটি জয় করেন। একসময় ইবনবতুতা এই বন্দরেই নেমেছিলেন। তখন বড় বড় সমুদ্রগামী জাহাজ এখানে যাতায়াত করত।
বাংলার সবচেয়ে বড় বন্দর ও বাণিজ্য নগর। সেন বংশে লক্ষণসেনের সময় সাতগাঁওয়ের কাছেই ছিল ‘বিজয়পুর’। এখানে লক্ষণসেনের সভাকবি ধোয়ী বাস করতেন। ১৫৭৪-১৬০৪ সালের মধ্যে মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যেও সপ্তগ্রামের বর্ণনা ছিল। বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবতে সপ্তগ্রামে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের বর্ণনা রয়েছে। লিখলেন,
‘সপ্তগ্রামে প্রতি বণিকের ঘরে ঘরে
আপনি শ্রীনিত্যানন্দ কীর্তন বিহারে
বণিক সকল নিত্যানন্দের চরণ
সর্বভাবে ভজিলেন লইয়া শরণ।’
লক্ষণসেনের তাম্রপত্রে বেতড্ড চতুরক হল আজকের বেতর। অন্যতম প্রধান এক বাণিজ্যকেন্দ্র। সপ্তগ্রাম বন্দর যখন হারাতে শুরু করে, তখন বেতর অব্দি বড় ছোট জাহাজ আসা যাওয়া করত।
হুগলি নদী থেকে উৎপন্ন সরস্বতী আরও দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। ত্রিবেণীর কাছে হুগলি থেকে সরস্বতী, যমুনা ও কুন্তী নামে তিনটি শাখা নদী বেরিয়েছে। এরমধ্যে হুগলি নদী, সরস্বতী ও যমুনা নিয়ে দক্ষিণের ত্রিবেণী সঙ্গম বলা হয়, যা মুক্তবেণী নামেও পরিচিত। সরস্বতী নদীর তীরে সপ্তগ্রাম থেকে বাংলার উৎপাদিত সূক্ষ্ম মসলিন, রেশম বস্ত্র, চাল, চিনি ও বিভিন্ন স্থানীয় পণ্য নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ত। আজ সরস্বতী নদী প্রায় লুপ্ত। ১৫৩৭-৩৮ সালে সপ্তগ্রামে পর্তুগিজদের পাওয়া যায়। এখানে তখন তিনরকম বণিক শ্রেণি বাস করতেন। পর্তুগিজ বণিকরা জাহাজ বোঝাই করে এখান থেকে কাপড়, চিনি, চাল এসকল চালান দিতেন।
চিৎপুর পূজে রাজা সর্বমঙ্গলা
নিশিদিশি বসে ডিঙ্গা নাহি করে ফেলা
তাহার পূর্বকূল বাহিয়া এড়ায় কলকাতা
বেতর চাপায় ডিঙ্গা চাঁদ সওদাগর
অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায় ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’-এ উল্লেখ করেছেন হাওড়া জেলার সমগ্র ভূভাগ অঞ্চলটি সূহ্ম ভূমি। যার আরেক নাম দক্ষিণ রাঢ় অঞ্চল। লক্ষণসেনের তাম্রপত্রে বেতড্ড চতুরক হল আজকের বেতর। অন্যতম প্রধান এক বাণিজ্যকেন্দ্র। সপ্তগ্রাম বন্দর যখন হারাতে শুরু করে, তখন বেতর অব্দি বড় ছোট জাহাজ আসা যাওয়া করত। তারপর সেখান থেকে নৌকায় পণ্য পরিবহন করা হত। প্রাচীন বঙ্গের রাঢ়ভূমি বাণিজ্য, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ কেন্দ্র, এই কথা বলা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক আদানপ্রদানের মাধ্যমে রাঢ়ভূমি প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। তাই রাঢ়ের বাণিজ্যিক ঐতিহ্য আজও বাংলার গৌরবময় অতীতের স্মারক হয়ে রয়েছে।
তথ্যসূত্র: বৃন্দাবন দাস, নীহাররঞ্জন রায়, তারাপদ সাঁতরা, সুধীর কুমার মিত্র, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
ছবি সৌজন্য- লেখক
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত