(Aloy Dariye)
চল্লিশে পা দিলেও সায়রীকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। দু’টো সন্তানের মা— তবুও শরীরের রেখাগুলো এখনও তার শাসনে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখে— পেটের মেদ কতটা কমল, গালের হাড়টা ঠিকঠাক ফুটে উঠছে কি না। বোটক্সের দরকার পড়েনি এখনও। মাঝে মাঝে কেমিক্যাল পিলিং করলেই ত্বক ঝকঝকে থাকে।
জিমে যেতে ভাল লাগে না। সপ্তাহে তিনদিন সাঁতার, দু’দিন পিলাটিস। পল্লব এইসবে তাকে খুব উৎসাহ দেয়। বরাবরই দিয়েছে। কারণ পল্লব জানে— সায়রী শুধু তার স্ত্রী নয়, তার বিনিয়োগ। বিয়ের পর থেকেই পল্লব বুঝেছিল— অফিসে, ক্লাবে, পার্টিতে— যেখানেই সায়রী যায়, সকলের চোখ তাকে দেখে থেমে যায়। সেই থেমে থাকা চোখগুলোকে পল্লব ভয় পায়নি— ব্যবহার করতে শিখেছে।
আরও পড়ুন: স্মরণে কেয়া সরকার C/O ‘আলচা’
ক্লাবে গেলে সায়রীই কেন্দ্রবিন্দু। কলকাতার এক নামকরা রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে কাজ করে পল্লব। কোম্পানির মালিক অবাঙালি কিন্তু তিন পুরুষের ব্যবসা কলকাতাতেই। পল্লবকে কলকাতার এক নামী ক্লাবের মেম্বারও করে দিয়েছে তারা। বরের সঙ্গে সায়রী ক্লাবে আসলে কোম্পানির বড়কর্তা, মেজকর্তা— সবাই তার চারপাশে ঘোরে। হাসি, স্পর্শ, একটু ঝুঁকে কথা বলা— সবই মেপে দেয় সায়রী।
মাঝে মাঝে লং ড্রাইভে যায় কারও সঙ্গে। পল্লব জিজ্ঞেস করে না— কোথায়, কেন। তাদের মধ্যে এই নীরব চুক্তি অনেকদিনের। সায়রী জানে— এইসবের পরেই বিদেশ সফর আসে, হিরের হার আসে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিবাহবার্ষিকীর নিখুঁত ছবিগুলো আসে। ‘পারফেক্ট কাপল’— কমেন্ট পড়ে।

সবকিছুই চলছিল। সুন্দর ছবির মতো। হঠাৎই একদিন কোম্পানির মালিকানা বদলে গেল। বিদেশি কোম্পানি কিনে নিল পল্লবের কোম্পানিকে। নতুন বস, নতুন ম্যানেজমেন্ট— আসবে সিঙ্গাপুর থেকে। বসের নাম— আকাশ। সে নাকি কোনও পদবি ব্যবহার করে না। রাতে ল্যাপটপে কাজ করতে করতে পল্লব সায়রীকে বলেছিল, ‘মনে হচ্ছে লোকটা খুব টাফ। সাবধানে থাকতে হবে।’
কিন্তু যেদিন প্রথম মিটিং, সেদিনই ভুল ভাঙল। আকাশ— মেয়ে। ছোট করে কাটা চুল, সাদা শার্ট, কালো ট্রাউজার। মুখে কোনও মেকআপ নেই। চোখে একধরনের স্থিরতা— যেটা কাউকে খুশি করার জন্য নয়।

প্রথম সপ্তাহেই বোঝা গেল— এই মানুষটাকে প্রভাবিত করা যাবে না। দ্বিতীয় সপ্তাহে পল্লব বুঝল— তার চেয়ারটা নড়ছে। তৃতীয় সপ্তাহে সে রাতে ঘুমোতে পারল না। সেদিন রাতে অন্ধকারে শুয়ে পল্লব হঠাৎ বলেছিল, ‘আমি যদি এই চাকরিটা হারাই… তুমি থাকবে তো?’ সায়রী উত্তর দেয়নি। শুধু পাশ ফিরেছিল। পল্লব বুঝেছিল— সে শুধু সায়রীকে ব্যবহার করে না, সায়রীও তাকে সমানভাবে ব্যবহার করে।
‘একটু চেষ্টা করো’, কয়েকদিন পর বলল পল্লব। ‘একটা ভাল ইমপ্রেশন তো পড়বে।’ আন্ডার আই ক্রিম লাগাতে লাগাতে সায়রী আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকাল— মনে মনে বলল, ‘আমি কি এখনও পারি?’ তারপর সে হেসে ফেলল, ‘আমি তো সবসময়ই পেরেছি।’ সেদিন সে শহরের নামী রেস্তোরাঁ থেকে খাবার অর্ডার করল। নিজের হাতে বানানো বলে সাজিয়ে নিল ক্যাসারোলে। পল্লবের কেবিনের দরজা ঠেলে ঢুকতেই সময় থেমে গেল। হঠাৎ। সামনে দাঁড়িয়ে— অলোকানন্দা।
পল্লব পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। পরিচয় করিয়ে দিল— ‘আমার বস— আকাশ। আর আমার স্ত্রী সায়রী। আপনার জন্য নিজে হাতে রান্না করে নিয়ে এসেছে! তোমরা কথা বলো, আমি একটু আসছি’, বলে বেরিয়ে গেল পল্লব।
হাত কেঁপে উঠল। পল্লব পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। পরিচয় করিয়ে দিল— ‘আমার বস— আকাশ। আর আমার স্ত্রী সায়রী। আপনার জন্য নিজে হাতে রান্না করে নিয়ে এসেছে! তোমরা কথা বলো, আমি একটু আসছি’, বলে বেরিয়ে গেল পল্লব।
কেবিনের দরজা বন্ধ। বাইরে থিয়েটার রোডের গাড়ির হর্ন, রাস্তার শোরগোল— সব ফিকে হয়ে গেল। নিজের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা ছাড়া, আর কিছুই শুনতে পাচ্ছে না সায়রী।

তার মাথার মধ্যে আজ থেকে পঁচিশ বছর আগের একটার পর একটা ছবি খুলে যাচ্ছে। টিফিন পিরিয়ড, মেয়েরা সব খেলতে চলে গেছে। ফাঁকা ক্লাসরুম। অলোকানন্দার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে সায়রী। তারপর তাকে খুব কাছে টেনে নিয়ে ঠোঁটে চুমু খেল সায়রী।
সেটাই তার প্রথম চুমু। নিজের থেকেই। অলোকানন্দাকে প্রথম ভালবাসার চিঠি— সেই লিখেছিল, নিজের থেকেই। অলোকানন্দা— ফার্স্ট গার্ল। শান্ত, স্থির, গভীর। দেখতে— অদ্ভুতভাবে মিল ছিল আমির খানের সঙ্গে। সেই মিলটুকুই কি তাকে টেনেছিল? না কি অন্য কিছু? সায়রী আজও তার উত্তরটা জানে না।
ঠান্ডা বাতাসে নিঃশ্বাস ধোঁয়ার মতো বেরোচ্ছিল। হাত ধরেছিল তারা। তারপর— হঠাৎ শব্দ। ‘কী হচ্ছে এখানে?’ স্কুলের টিচার কাকলিদি তাদের দেখে ফেলেছিলেন— খুব কাছাকাছি ছিল তারা।
স্কুলের এক্সারশানে তারা গেছিল দার্জিলিং। পাইন গাছের ফাঁকে কুয়াশা নেমেছিল। ঠান্ডা বাতাসে নিঃশ্বাস ধোঁয়ার মতো বেরোচ্ছিল। হাত ধরেছিল তারা। তারপর— হঠাৎ শব্দ। ‘কী হচ্ছে এখানে?’ স্কুলের টিচার কাকলিদি তাদের দেখে ফেলেছিলেন— খুব কাছাকাছি ছিল তারা।
কলকাতায় ফিরে স্কুলে টিচার্স মিটিং এ ডাক পড়ল তাদের দু’জনের। হেডমিস্ট্রেসের সামনে দাঁড়িয়ে সায়রীর হাত কাঁপছিল। ‘বল, কী হয়েছে?’ অলোকানন্দা চুপ। কিছু বলেনি। এক মুহূর্তের জন্য সায়রী ভেবেছিল— সত্যিটা সব বলে দেবে। তারপর মনে পড়েছিল— মা। বাবা। সমাজ।

পুরনো কলকাতার স্কুলের লাল মেঝে, স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়াল— ঘরটায় হঠাৎ খুব ঠান্ডা লাগছিল সায়রীর। সেদিন নিজেকে বাঁচাতে সায়রী বলেছিল— ‘আমি কিছুই করিনি দিদি, আমাকে ওই… জোর করেছে।’ অলোকানন্দা মাথা তুলে তাকিয়েছিল। না রাগ, না অভিমান— শুধু একটা শান্ত দৃষ্টি। সায়রী সেই চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। সেই ঠান্ডা চোখের ভয়ে কাঁপছিল তার হাত পা।
আর কোনওদিন তাকায়নি। তাকাতেও হয়নি। স্কুলের বিচারসভায় স্কুল থেকে নাম কাটা যায় অলোকানন্দার। ফার্স্ট গার্ল হলেই বা— এই সব বিকৃতি স্কুলে অন্য মেয়েদের জীবনে বিপদ ডেকে আনতে পারে। বড়দির রায়ে সেদিন স্কুল ছাড়তে হয়েছিল অলোকানন্দাকে। পাড়ার এক সাধারণ স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছিল অলোকানন্দা। সায়রী খবরের কাগজে দেখেছিল— মেয়েদের মধ্যে ফার্স্ট হয়েছে সে। কিন্তু আর কোনওদিন সামনাসামনি দেখা হয়নি তাদের। আজ হল, এত বছর পর!
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা— একই চোখ, একই নীরবতা। ‘কেমন আছ?’ —গলা শুকনো সায়রীর। কোনও উত্তর নেই অন্যদিকে, খালি সোজা দৃষ্টিতে সায়রীকে দেখছে অলোকানন্দা।
বর্তমানে ফিরে এল সায়রী। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা— একই চোখ, একই নীরবতা। ‘কেমন আছ?’ —গলা শুকনো সায়রীর। কোনও উত্তর নেই অন্যদিকে, খালি সোজা দৃষ্টিতে সায়রীকে দেখছে অলোকানন্দা। সায়রীর মাথার মধ্যে হঠাৎ একটা হিসেব জেগে উঠল। এই মানুষটা তাকে একসময় ভালবাসত। হয়তো এখনও— যদি একটু… ছোঁয়া যায় সেই জায়গাটাকে?
সে ধীরে বলল, ‘আমরা তো… একসময়—’ দরজা খুলে গেল। এক ঝলমলে মেয়ে ঢুকে এসে হাসতে হাসতে জড়িয়ে ধরল অলোকানন্দাকে। জড়িয়ে চুমু খেল গালে। ‘Sorry, I’m late!’ সায়রী তাকিয়ে রইল। আকাশ বলল, ‘Meet my partner, ঊর্মি।’

Partner— শব্দটায় একটু জোরে ধাক্কা খেল সায়রী। ঊর্মি হাত বাড়াল, ‘Hi!’ সায়রী হাত তুলল, কিন্তু তার চোখ ছিল অলোকানন্দার উপরেই। অলোকানন্দা ঊর্মিকে বলল, ‘তুমি দু-মিনিট ওয়েট করো, আমি একটা কথা সেরে আসছি।’
দরজা বন্ধ হতেই সাহস জুগিয়ে সায়রী একটু অস্পষ্ট গলায় বলল, ‘আমরা আগে… বন্ধু—’ অলোকানন্দা এবার কথা বলল। শান্ত, স্থির গলায়— ‘ছিলাম। এখন নই।’ একটু থামল। ‘নিজেকে লুকিয়ে বাঁচা খুব ক্লান্তিকর, সায়রী।
আজকে আমি বলি! পার্থক্যটা তুমি বুঝতে পারছ তো সায়রী?’ তারপর খুব সহজভাবে— ‘আমি এখন আকাশ। পুরনো নাম, পুরনো জীবন— সব ফেলে এসেছি।’
আমি সেটা আর করি না।’ সায়রীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল। অলোকানন্দা ধীরে ধীরে বলল— ‘তখন আমি চুপ থাকতাম। কিন্তু আজকে আমি বলি! পার্থক্যটা তুমি বুঝতে পারছ তো সায়রী?’ তারপর খুব সহজভাবে— ‘আমি এখন আকাশ। পুরনো নাম, পুরনো জীবন— সব ফেলে এসেছি।’
আকাশের চোখে একটুকরো আলো জ্বলে উঠল। ‘আমি খুব ভাল আছি, সায়রী।’ বেরিয়ে আসার সময় সায়রী ঠিক বুঝতে পারছিল না— সে হাঁটছে, না মাটিতে মিশে যাচ্ছে একটু একটু করে। লিফটের আয়নায় নিজের মুখটা দেখল। সব ঠিক। মেকআপ ঠিক। চুল ঠিক। হাসিটাও ঠিক।

গাড়িতে বসে দরজা বন্ধ করতেই নিঃশ্বাসটা হঠাৎ আটকে গেল। সে নিজের দু’হাতের দিকে তাকাল। এই হাত— যে হাত একদিন কাউকে জড়িয়ে ধরেছিল— আজ এত ভারী কেন? তার মনে পড়ল— সেদিন যদি সে চুপ থাকত? সেদিন যদি সে মিথ্যে না বলত? তার জীবন কি আলাদা হত? সে উত্তর জানে না।
শুধু জানে— আজ, এত বছর পরে, একজন মানুষ, যাকে সে একদিন অন্ধকারে ফেলে এসেছিল, সে আলোয় দাঁড়িয়ে আছে। সায়রী গাড়ির আয়নায় তাকাল। হঠাৎ নিজের দিকে তাকিয়ে তার মনে হল— এই সায়রীকে কোনওদিন সে দেখেনি। যাকে দেখেছে সে সাজানো, বানানো-ব্যবহারের যোগ। আয়না থেকে চোখ নামিয়ে নিল সায়রী।
বিকেল হয়ে এসেছে। থিয়েটার রোড হয়ে উঠেছে আলোয় ঝলমল— কিন্তু তার মনে হল সে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। নিজের কাছে আজ স্বীকার করল— আসলে সে কোনওদিনই আলোয় দাঁড়ায়নি। সে শুধু আলো ব্যবহার করেছে। সারাজীবন। এতদিন নিজের তৈরি অন্ধকারেই বেঁচে ছিল সে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
9 Responses
ভালো লাগলো গল্পটা
Excellent👍
ভালো লাগল!
Chaliye jan. Thamben na.
Besh bhalo laglo golpota.
খুব ভালো লাগলো
ভালো
আমার পড়ে মনে হল AI দিয়ে লেখা। সেটাকে এডিট করা হয়েছে।
গল্পটি এক্সপেরিমেন্টাল,অন্য ধরণের একেবারেই,বেশ গতি রয়েছে আর ভাবায়