(Jolke Chol 20)
শিবের অনেকগুলো মিসড কল আর টেক্সট দেখে একটু ঘাবড়ে গেল রাই। সাধারণত শিব কল করে না পেলে একটাই মেসেজ করে রাখে। পরে সেটা দেখে সে কল ব্যাক করে। পড়ার সময় সে ফোনটা সাইলেন্টে রাখে। তাছাড়া এই সময় সচরাচর শিব ফোন করে না। সকালে একবার গুড মর্নিং, দুপুরে লাঞ্চ করেছে? কিংবা কোনও মেসেজ না করে এক সেকেন্ডের কল। রাই হ্যালো বলা মাত্র- গলাটা শুনতে ইচ্ছে হল, বলে ফোন রেখে দেয়।
রাই সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কল ব্যাক করল। কী হয়েছে?
আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪) ,(১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯)
– তুমি কোথায় ছিলে?
– একটু চোখ লেগে গিয়েছিল।
– আমার বাপি আর মায়ের মধ্যে তুমুল ঝামেলা হয়েছে। তুমি তো জানো এসব অশান্তি আমার ভাল লাগে না। আমার বড় কষ্ট হয় ঝগড়াঝাটি দেখলে।
– কই আমার সঙ্গে তো দিন রাত ঝগড়া করো, তার বেলা কষ্ট হয় না!
– হয় বলেই তো পরমুহূর্তে সরি বলে ক্ষমা চেয়ে নিই। ভাব করার চেষ্টা করি।
– বুঝলাম। কিন্তু এতে আপসেট হওয়ার কী হল? বাবা মায়ের ঝগড়া সব পরিবারেই হয়, আবার কিছুক্ষণ বাদে ঠিক হয়ে যায়।
আমি জানতে চাইলাম কেন এগুলো করছ? আমাকে একটা চড় মারল। দিয়ে বলল- এই তোরা না জন্মালে আমার জীবনে শান্তি থাকত। চলে যেতাম ঝাড়া হাত পা হয়ে।
– সে যায় আমিও জানি। কিন্তু এবার হবে না।
– কেন?
– মা নিডস ডিভোর্স ফ্রম পাপা।
– দূর! ওসব রাগের মাথায় বলে। মাথা ঠান্ডা হয়ে গেলে আবার সব শান্ত।

– এতদিন তো তাই হয়ে এসেছে। কিন্তু এবার মা লইয়্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
– মানে?
– হ্যাঁ। আমি জানতে চাইলাম কেন এগুলো করছ? আমাকে একটা চড় মারল। দিয়ে বলল- এই তোরা না জন্মালে আমার জীবনে শান্তি থাকত। চলে যেতাম ঝাড়া হাত পা হয়ে। আচ্ছা রাই বলো, আমাদের জন্য মা এতদিন যেতে পারেনি এটা হতে পারে? আমি তো বরাবর হোস্টেলে থেকেছি। সেই টুয়েলভের পর ফিরলাম। ছোটবেলায় মাকে ছেড়ে থাকতে কত কষ্ট হত, বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদতাম। একবার মায়ের ম্যাক্সি নিয়ে চলে এসেছিলাম গায়ের গন্ধটা পাব বলে। কিন্তু কখনও মা আমাকে ভালবাসে না, এটা মনে হয়নি। অথচ মা বলছে, আমাদের জন্য যেতে পারেনি। বাপি মায়ের জীবনটা হেল করে দিল…।
শিবের কথাটা শুনে রাই উত্তেজিত হয়ে বলল- কি বোঝাতে চাইছ? আমার বাবা দূরে থাকে, এবার তুমি চাইছ মাও অন্য কোনও শহরে থাক?
– এগুলো সব হিট অফ দ্য মোমেন্টের টক। খানিক বাদেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি তো দিন দিন দেখি বাচ্চা হয়ে যাচ্ছ। কী যে করি এই বাচ্চাটাকে নিয়ে!
– রাই যাদের মা থাকে না নিজের কাছে, আমার মতো হোস্টেলে বড় হতে হয়, তারাই একমাত্র বোঝে মা-বাবার গুরুত্বটা! বিশেষ করে মায়ের। তোমার তো মা কাছে থাকে, তুমি বুঝবে না।
শিবের কথাটা শুনে রাই উত্তেজিত হয়ে বলল- কি বোঝাতে চাইছ? আমার বাবা দূরে থাকে, এবার তুমি চাইছ মাও অন্য কোনও শহরে থাক?

– না রাই, আমি চাই পৃথিবীর কোনও সন্তান যেন ছোট বয়সে তার মাকে না হারায়। আমি নিজের চোখে দেখেছি গোগো আর আঞ্জুকে। তুমি চেনো তাদের। গোগোর যখন দশ বছর, তখন আমার মৌসি মানে মাসি চলে গেল হঠাৎ হার্টফেল করে। আঞ্জু তখন সবে উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে। গোগো বুঝতে পারছে না, কী ঘটে গেল ওর জীবনে। খালি মা মা করত।
মেসোর মুখের দিকে তাকানো যেত না। সব কাজ ছেড়ে মেসো বাড়িতে বসে থাকত, একটা ঘরে চুপ করে। খালি মাসির নাম করে কাঁদত। মাকে দেখেছি তখন একেবারে ভেঙে পড়তে। একদিকে গোগো, অন্য দিকে আঞ্জু। বাবা চেষ্টা করত মেসোকে সঙ্গ দিতে।
আমি হোস্টেল থেকে বাড়ি এলে, মা ওদের আমাদের বাড়িতে থাকতে বলত। গোগো ঘুমের মধ্যে মা মা বলে কেঁদে উঠত। ওর পাশে আমি শুতাম। আমার ঘুম ভেঙে যেত। ভাবতাম, আমি তাও মাকে হোস্টেল থেকে ফিরে দেখতে পাই, কিন্তু গোগো! আঞ্জুটাও কেমন হঠাৎ করে বড় হয়ে গিয়েছিল। তার খুব বিদেশে গিয়ে পড়ার ইচ্ছে ছিল। পড়াশোনায় দারুণ। উচ্চ মাধ্যমিকে ৯৮% নাম্বার পেয়েছিল। যদিও মাসি তা জানতে পারল না। তবু।
মেডিকেলে বসেছিল মাসির জন্য। পেয়ে গেল। তার নিজের খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। তার ইচ্ছে ছিল কেমব্রিজে পড়া, সেখানেই পড়ানো। কিন্তু এই ঘটনা তাদের জীবনটাই বদলে দিল।
– আঞ্জু এখন কী করে?
– মেডিকেলে বসেছিল মাসির জন্য। পেয়ে গেল। তার নিজের খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। তার ইচ্ছে ছিল কেমব্রিজে পড়া, সেখানেই পড়ানো। কিন্তু এই ঘটনা তাদের জীবনটাই বদলে দিল। সে মায়ের ইচ্ছেকেই সম্মান দিয়ে ডাক্তারি পড়ল। অবশ্য হোস্টেলে থাকেনি। বাড়ি থেকেই যাতায়াত করত। এ বছর হাউস স্টাফ হিসেবে যোগ দিয়েছে।
– বাহ, এটা তো ভালই।
– ভাল, তবে সে তো মন থেকে এটা চায়নি। গোগোকে বড় করতে হবে, মেসোকে সামলাতে হবে সব ভেবে পড়েছিল। তবে এখন সেই বাইরে যেতে হল। প্রথম দু’বছর তো গ্রামের হাসপাতালে হাউস স্টাফ হতেই হবে।

– ওমা! তাই? প্রাইভেটে জয়েন করতে পারবে না?
– না, বন্ড থাকে, দু’বছর কিচ্ছু করতে পারবে না।
– ও, তাই গোগো এখন তোমাদের কাছে?
– সামনে পরীক্ষা যে, তাই মা নিয়ে এসেছে।
আসলে মনে হল বাপি মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেলে আমার জীবনটাও ছন্নছাড়া হয়ে যাবে। গোগোদের দেখে থেকে আমার একটা আতঙ্ক হয় ছোট থেকেই।
– বুঝলাম। তবে শোনো একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, তোমার বাপি-মায়ের ডিভোর্স ফাইনাল এটা ভেবে কেন নিচ্ছ? আর তার সঙ্গে গোগোর মা নেই এটাকে জুড়ছ কেন? আর মা যদি চলে যাবেই ভাবত, তাহলে গোগোকে আনত?
– এটা মাথায় আসেনি। আসলে মনে হল বাপি মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেলে আমার জীবনটাও ছন্নছাড়া হয়ে যাবে। গোগোদের দেখে থেকে আমার একটা আতঙ্ক হয় ছোট থেকেই।
– উফ্। আর পারি না এই ছেলেটাকে নিয়ে। গোগোর মা আর কখনও ফিরে আসবে না। তাকে আর হাজার চেষ্টা করলেও দেখতে পাওয়া যাবে না। তার ২০৬টা হাড়, মেদ মজ্জা সব কবে ধোঁয়া হয়ে আকাশে মিলিয়ে গেছে। এখন গোগোদের ভাবনায়, ছবিতে সে থাকবে। কিন্তু আন্টি আঙ্কেল এখনও ভেরি মাচ প্রেজেন্ট এবং একসঙ্গেই। কাজেই এইসব ভুলভাল চিন্তা করার কোনও মানেই নেই।

– আসলে রাই, তুমি তো জানো, আমি ভীষণ পরিবারকেন্দ্রিক। মা ছাড়া শৈশব কৈশোর কেটে গেছে, তাই এখন মা চলে যাবে বলছে বলে কেমন একটা অজানা কষ্ট হচ্ছে। তোমাকে বোঝাতে পারছি না ঠিক। খালি মনে হচ্ছিল তোমাকে বলতে পারলে শান্তি পাব।
– একদম চিন্তা কর না। কিছুই করবে না তারা। কাল দেখবে দু’জনে আবার হেসে হেসে কথা বলছে।
– সত্যি বলছ?
মাও কেমন নিরুত্তাপ গলায় বাবার সঙ্গে কথা বলে। তাদের কি ডিভোর্স হয়ে গেছে? আমার কারণেই তাদের কথা বলতে হয়? এটাই কি ডিভোর্সের শর্ত ছিল?
– একদম। মিলিয়ে নিও।
– ওকে। দেন বাই।
– বাই।

শিব ফোন রেখে দিল। রাই মোবাইলটা হাতে নিয়ে বাবার ছবি দেখতে লাগল। তারও বাবার কাছে যেতে ইচ্ছে করে খুব। সেই যে ছোটবেলায় মা তাকে নিয়ে চলে এল, আর গেল না। বাবা ঠাকুরদা মারা যাওয়ার পর এল ঠিকই। কিন্তু সাতদিন থেকেই চলে গেল। এটা ঠিক দু’দিন অন্তর ভিডিও কল করে, তাতে সাধ মেটে না। তার ইচ্ছে করে সামনে বসে গা ঘেঁষে গল্প করতে। বন্ধুদের গল্প, কলেজের গল্প, অথচ ভিডিও কলে কিছুই বলা হয় না।
মাও কেমন নিরুত্তাপ গলায় বাবার সঙ্গে কথা বলে। তাদের কি ডিভোর্স হয়ে গেছে? আমার কারণেই তাদের কথা বলতে হয়? এটাই কি ডিভোর্সের শর্ত ছিল? মা তো কিছুই বলে না। আম্মাও চুপ। কার থেকে জানবে সে! তবে মা-বাবার সম্পর্কটা যে জোরালো একটা সম্পর্ক নয়, সেটা সে বোঝে। দু’জনের মাঝে হাইফেনের মতো সে ঝুলে আছে।
মিস ইউ বাবা। আমি আসব তোমার কাছে। না না পড়তে নয়, ঘুরতে আর তোমার সঙ্গে লম্বা সময় কাটাতে।
ছবিটার দিকে ভাল করে দেখল আরেকবার। তারপর বলল,
– মিস ইউ বাবা। আমি আসব তোমার কাছে। না না পড়তে নয়, ঘুরতে আর তোমার সঙ্গে লম্বা সময় কাটাতে। তুমি আমাকে ভালবাসো তো বাবা? নিজের মনে বলতে বলতে ল্যাপটপ অন করল।
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত